শনিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৮

কিসান সভার সংসদ অভিযান ~ সুশোভন পাত্র

৩০ মিনিটে কি হয়? ৩০ মিনিটে এদেশে ডমিনোসের চিজ বার্স্ট পিৎজার হোম ডেলিভারি হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে আইপিএল'র পাওয়ার-প্লে তে 'মনোরঞ্জন কা বাপ' খোঁজা হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে অ্যামাজন-মিন্ত্রা'র ফ্ল্যাশ সেলে ব্র্যান্ডেড পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে নিয়ম করে ইষ্টিকুটুমের ন্যাকামি পরিবেশন করা হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে 'মন কি বাতে' গল্প দাদুর আসর জমানো হয়। আর প্রতি ৩০ মিনিটে, এদেশে একজন কৃষক কে আত্মহত্যা করতে হয়¹। 

এই যে আপনি-আমি, প্রতিদিন ডিজিটাল ইন্ডিয়া-বুলেট ট্রেনের গল্প শুনি, ছিমছাম ক্যান্ডেল লাইটে ডিনার সারি; এই যে আপনি-আমি নগর সভ্যতার ভিড় করা ইমারতে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখি, ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা শপিং মলে 'উন্নয়ন' খুঁজি, হ্যালোজেনের নিয়ন আলোয় ভিজে বিশ্বায়নের ইঁদুর দৌড়ে মাতি; ঠিক সেই হ্যালোজেনের ঘুপচি কোণের অন্ধকারেই বাস করে আরেকটা 'ইন্ডিয়া'। যে 'ইন্ডিয়া'র কৃষক'দের আজও 'মাইক্রো ফাইনান্সের' চক্রব্যূহে 'বউ বন্দক রেখে' ব্যাঙ্কে ঋণ নিতে হয়²। যে 'ইন্ডিয়া'র দলিত বৌ'দের আজও পানীয় জল জোগাড় করতে 'বেশ্যা' বৃত্তি করতে হয়³। আর যে 'ইন্ডিয়া' তে ১৯৯৫-২০১৩ অবধি ২,৯৬,৪৬৬ জন কৃষক কে ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করতে হয়। 

এই ২,৯৬,৪৬৬ কৃষকের লাশ দিয়ে, ইডেন গার্ডেনস ৪.৫বার কানায় কানায় ভরিয়ে দেওয়া যায়। এই ২,৯৬,৪৬৬ কৃষকের লাশ দিয়ে ভারতবর্ষের প্রমাণ মাপের ট্রেন কে ২০০বার রিজার্ভড করা যায়। এই ২,৯৬,৪৬৬ কৃষকের লাশে ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতার এয়ারবাস কে ৬০০বার টেক-অফ করানো যায়⁴। অবশ্য বিজেপি সাংসদ গোপাল শেট্টি'রা বলেন, কৃষকের আত্মহত্যা স্রেফ নাকি 'ফ্যাশান'⁵! 

গোপাল শেট্টি'দের রিং-মাস্টার নরেন্দ্র মোদী ২০১৪'র নির্বাচনী প্রচারে বাড়ি বয়ে বলে গিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে কৃষক'দের আত্মহত্যার মিছিল থামিয়ে দেবেন। ২০০৬ থেকে নর্থ ব্লকের ডাস্টবিনে পড়ে থাকা স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করবেন। শুধু বলেননি ওনার কাছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি গুলো আসলে চুইংগামের মত। 'যো চাবায়া অর ফেক দিয়া'। তাই গত সাড়ে চার বছরে অক্লান্ত বিদেশ সফরের মাঝে যে নরেন্দ্র মোদী কৃষক'দের জীবন যন্ত্রণার চার আনারও হিসেব রাখার ফুরসৎ পাননি; সেই নরেন্দ্র মোদীই আজ ২০১৯'র নির্বাচনী দামামা বাজতেই খরিফ শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য(MSP) বাড়ানোর আইওয়াশে বলছেন "প্রতিশ্রুতি পূরণ করে, MSP বৃদ্ধি তে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে বিজেপি⁶।" 

ডিয়ার নরেন্দ্র মোদী, আপনি কি জানেন না যে, স্বামীনাথন কমিশন রিপোর্টে বলেছিল শুধুমাত্র সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, ডিজেল ইত্যাদির মোট ব্যয়(A2) এবং কৃষক পরিবারের মোট শ্রম(FL) যুক্ত করে ফসলের উৎপাদন খরচা নির্ধারণের মান্ধাতার আমলের যে ফর্মুলা সিএসিপি ব্যবহার করে তা যথেষ্ট নয়? আপনি কি জানেন না যে, এই ফর্মুলার সাথে জমির খাজনা লিজ এবং ঋণের খরচ যোগ করে উৎপাদন খরচা(C2) নির্ধারণ এবং তার উপর ৫০% লাভ রেখে MSP ধার্য করার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছিল ঐ রিপোর্টেই? আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই, A2+FL ফর্মুলায় ধানের উৎপাদন মূল্য ১,১৬৬টাকা/কুইন্টাল। যার উপর ৫০% লাভে MSP দাঁড়ায় ১৭৫০টাকা/কুইন্টাল। আর স্বামীনাথন কমিশনের(C2) ফর্মুলায় উৎপাদন মূল্যের উপর ৫০% লাভে MSP হওয়া উচিৎ ২৩৪০টাকা/কুইন্টাল। জনাব প্রধানমন্ত্রী, তাহলে পাটিগণিতের ঠিক কোন নিয়মে 'প্রতিশ্রুতি পূরণ' হল একটু বলবেন? বাস্তবে যখন দেশের মাত্র ৬% কৃষকের সরকার ঘোষিত MSP নসিব হয় তখন শুধু ঘোষণায় ঠিক কার লাভ হল একটু বলবেন? আর আজ আপনার ১৩% MSP বৃদ্ধি যদি 'ঐতিহাসিক পদক্ষেপ' হয়, তাহলে ২০০৮ ইউপিএ'র ৬৫% MSP বৃদ্ধির গিমিকটা ঠিক কি পদক্ষেপ ছিল একটু বলবেন⁷ ⁸?

গত চার বছরে ভারতবর্ষে কৃষিজ ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ১.৮৬%। কৃষক'দের আয় বৃদ্ধির হার .৪৪%। ২০বছর আগে এনডিএ'র সময়েও মুখ থুবড়ে পড়েছিল গ্রামীণ অর্থনীতি। ১৯৯৮-২০০৪ কৃষিজ ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছিল ১.৭৬% আর কৃষক'দের আয় বৃদ্ধির হার .৫৫%⁹। আন্তর্জাতিক সংস্থা OECD বলেছে, পৃথিবীর যে মাত্র ৩টি দেশে কৃষিকাজ লোকসানে চলছে তার অন্যতম ভারত¹⁰। বিজেপির ক্ষমতায়নের সাথে গ্রামীণ অর্থনীতির ধসের পুনরাবৃত্তি নেহাত কাকতালীয় নয়। আসলে, ধর্মের জিগিরের আড়ালে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারিগর সেদিন অটল বিহারি বাজপেয়ীও ছিলেন আজ নরেন্দ্র মোদীও আছেন। কৃষিতে বিদেশি বিনিয়োগের রাস্তা পরিষ্কার করে কৃষক'দের চিতা সেদিন লালকৃষ্ণ আদবানিও সাজাতেন আজ অমিত শাহও সাজান। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর দুর্ভাগ্য যে সেই চিতার আগুনই দাবানল হচ্ছে আজ। ২০১৪'তে যেখানে কৃষক বিক্ষোভের সংখ্যা ছিল ৬২৮, ২০১৬ তে সেটা ৮গুন বেড়ে ৪,৮৩৭⁹ ¹¹। আর তাই ভয় পেয়েই দশলাখি স্যুটের প্রধানমন্ত্রী এখন কৃষক'দের সান্তাক্লজ সেজে রাজ্যে রাজ্যে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোট ভিক্ষা করতে। 

ছুটুন প্রধানমন্ত্রী, ছুটুন। আপনি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ছুটুন। আম্বানি-আদানি'দের চার্টার্ড বিমানে চেপে কৃষক দরদী সাজুন। প্রতিশ্রুতির প্যান্ডোরার বক্স হাতে নিয়ে ধাপ্পাবাজি করুন। আধপেটা খেয়ে থাকা ভারতবর্ষের চাষা গুলোর মধ্যে জাতপাতের ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করুন, ধর্মের বিষে শ্রমিক ঐক্য হিন্দু-মুসলিমে ভাঙ্গার চেষ্টা করুন। কারণ ঘৃণাই আপনার রাজনীতির ইউএসপি। ভাঙাই আপনার রাজনীতির কৌশল। আপনি বিলক্ষণ জানেন, যেদিন দেশের বঞ্চিত চাষা গুলো একসাথে বলবে 'কৃষক' আমার 'জাতি' আর 'চাষ'ই আমার 'ধর্ম', যেদিন শ্রমিকরা হিন্দু-মুসলিম ভুলে একসাথে তাঁদের রক্ত-ঘামের হিসেব কষবে, ঠিক সেদিনই আপনাদের সুবিধাবাদী রাজনীতির ভ্যালিডিটিও শেষ হয়ে যাবে। 
আর ভাঙ্গা-গড়ার এই লড়াইয়ে, আপনার 'শ্রেণীশত্রু' হিসেবে বিপক্ষে থাকবো আমরা। ঘৃণা ছড়ানোর কাজটা আপনি করুন ভালোবাসা দিয়ে বঞ্চিত কৃষক-শ্রমিক ঐক্য গড়ে তুলব আমরা। বছর বছর বিগ-বিজনেস হাউসের কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড় দেওয়া গেলে দেশের কৃষক'দের ঋণ মকুব করা যাবে না কেন- ৯'ই আগস্ট জবাব চাইবো আমরা। ৫'ই সেপ্টেম্বর দিল্লীর রাজপথ শ্রমিক'দের রক্তভেজা লাল পতাকায় মুড়িয়ে দিয়ে শ্রমের ন্যায্য মূল্য চাইবো আমরা। ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী, জাতের নয়; ভাতের লড়াইয়ে, হকের লড়াইয়ে আপনার নিশ্চিন্ত ঘুম উড়িয়ে দেব আমরা।