বুধবার, ১৮ জুলাই, ২০১৮

আক্রান্ত মেডিক্যাল কলেজ ~ অনিকেত চ্যাটার্জী

১৮৪ বছরের পুরোনো এশিয়ার প্রাচীনতম মেডিক্যাল কলেজকে নিয়ে চলছে রাজনৈতিক স্বার্থের ছিনিমিনি খেলা।

গত তিনবছর ধরে বারবার আবেদনের পরেও কোনোরকম হোস্টেল কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া না করায় মেডিক্যাল কলেজের বর্তমান দ্বিতীয়, তৃতীয়, ও চতুর্থ বর্ষের ছাত্ররা কেউই হোস্টেল পায়নি। জলপাইগুড়ি, মালদা, রায়গঞ্জ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দিনাজপুর প্রভৃতি দূর দূর জেলা থেকে আসা ছাত্ররা তিন বছর ধরে হোস্টেল অ্যাকোমোডেশন পায়নি এবং প্রিন্সিপাল তাদের আবেদনের প্রতি ভ্রূক্ষেপও করেননি। এছাড়াও, শেষ হোস্টেল কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে ফাইনাল ইয়ার এবং ফোর্থ ইয়ারের ছাত্রদের একাংশ হোস্টেল পেয়েছিল, সেই মেইন বয়েজ হোস্টেলের পাঁচতলার টেম্পোরারিভাবে বানানো ফলস সিলিং গত কয়েক মাসে চার-পাঁচবার ভেঙে পড়ে গেছে এবং বেশ কিছু ছাত্র আহত হয়েছে।

এখন, কিছুদিন আগে প্রিন্সিপাল উচ্ছল কুমার ভদ্র একটি নোটিশের মাধ্যমে জানান, নতুন যে ১১ তলা হোস্টেল বিল্ডিং তৈরি হয়েছে (যে হোস্টেলে সব ছাত্রদের থাকার যথেষ্ট রুম রয়েছে), সেই হোস্টেলে কেবলমাত্র নতুন ভর্তি হতে আসা ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্ররাই জায়গা পাবে—অন্য কেউ নয়। এবং, সেই হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্টের পদ দেওয়া হয়েছে এমবিবিএস পাশ তৃণমূল ছাত্রনেতা পার্থপ্রতিম মণ্ডলকে, যার রাজনৈতিক গুণ্ডামি করার যথেষ্ট ইতিহাস রয়েছে। প্রায় ১০০ এর ওপরে ছাত্র যখন হোস্টেল পায়নি, তখন এমসিআই রেগুলেশনের দোহাই দিয়ে নতুন কলেজে আসতে চলা ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রদের আলাদা করে একটা হোস্টেলে রেখে তৃণমূলের নেতাকে সেই হোস্টেলের সুপার বানানো তৃণমূলের নতুন 'ক্যাডার' বানানোর প্রথম ধাপ বলেই মনে করছি আমরা।

আমরা, মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা, আমাদের দাবি নিয়ে মেডিক্যাল কলেজের কমন রুমে ব্যাগ-বিছানা-বালিশ নিয়ে অবস্থান শুরু করি। ৫ জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৮০ ঘন্টা অবস্থানের পরও প্রিন্সিপাল উদাসীন থাকেন ছাত্রদের দুর্দশার প্রতি — তিনি বলেন "Don't bother me", কখনো বলেন "আমি তোমাদের কোনো দায়িত্ব নেব না", আবার বলেন "তোমাদের ফার্স্ট ইয়ারের ত্রিসীমানাতেও ঘেঁষতে দেব না"! সিনিয়র-জুনিয়র রিলেশনশিপের ঐতিহ্য বহনকারী মেডিক্যাল কলেজে এরকম কথা রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া বলা যায় না।

এই অবস্থায় আমরা বাধ্য হয়েই গত ৫ জুলাই দুপুর তিনটে থেকে প্রিন্সিপাল রুমের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান শুরু করি এবং তাঁকে জানিয়ে দিই, ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবি তিনি এভাবে অগ্রাহ্য করতে পারেন না কোনোভাবেই। এরপরেই মেডিক্যাল কলেজ তার সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় দেখে।

রাত ৮টার সময় প্রিন্সিপালের নির্দেশে প্রায় ৭০-৮০ জন পুলিশ ও উর্দিছাড়া গুন্ডা কলেজ ক্যাম্পাসে এসে মেডিক্যাল কলেজের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লকের ভেতরে ঢোকে এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থানরত ছাত্রদের ওপর শুরু করে নির্মম অত্যাচার। একের পর এক চড়-ঘুঁষি-লাথি মারতে থাকে ছাত্রদের, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় প্রতিবন্ধী ছাত্রদের, উপস্থিত একজন ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি করতেও ছাড়েনি এই চটি-পুলিশের দল। টেনে হিঁচড়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয় ছাত্রদের, ছুঁড়ে ফেলা হয় তাদের নিজের কলেজ বিল্ডিংয়ের বাইরে। প্রায় ২০ জন মেডিক্যাল পড়ুয়া আহত হন, যাদের মধ্যে ২ জন গুরুতর আহত। এরপর পুলিশ তৃণমূলের দালাল প্রিন্সিপালকে গাড়িতে নিয়ে চলে যায়। ছাত্রদের ন্যায্য দাবিকে পিষে ফেলতে মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকিয়ে মার খাওয়াতে হলো প্রিন্সিপালকে।

তবে কলেজ ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকিয়ে দেওয়া প্রিন্সিপালের নোংরা চক্রান্ত মেডিক্যাল কলেজ বাস্তব হতে দেবে না। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখনো লড়ছে— স্বচ্ছ অরাজনৈতিক হোস্টেল কাউন্সেলিংয়ের দাবিতে। অবস্থান চলছে এখনো।

আমাদের বর্তমান দাবি হলো—
১) মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সমেত যেসকল ছাত্রেরা হোস্টেল পায়নি তিনবছর ধরে, এবং যারা পুরোনো হোস্টেলে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকছে, তাদের স্বচ্ছ ও অরাজনৈতিক হোস্টেল কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিনিয়রিটি ও দূরত্বের ক্রমানুসারে কলেজের প্রত্যেকটি হোস্টেল বিল্ডিংয়ে ( উক্ত New Boys' Hostel সহ) হোস্টেল অ্যাকোমোডেশন দিতে হবে।

২) উক্ত New Boys' Hostel এর সুপারিন্টেন্ডেন্ট কোনো তৃণমূলের এমবিবিএস পাস ছাত্রনেতাকে করা যাবে না। অন্যান্য হোস্টেলের মত এমসিআই রেগুলেশন অনুযায়ী কোনো অ্যাসোসিয়েট/অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর/হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্টকে ওই হোস্টেলের সুপারের পদ দিতে হবে।

৩) ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে কলেজ ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকিয়ে মার খাওয়ানো প্রিন্সিপালকে অবিলম্বে জবাবদিহি করতে হবে এবং পদত্যাগ করতে হবে।

৪) অবিলম্বে কলেজ কাউন্সিল এর মিটিং ডেকে ছাত্রপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সমস্ত দাবিদাওয়া নিয়ে সুস্থ আলোচনা করতে হবে।

মেডিক্যাল কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রাপ্য হোস্টেলের ন্যায্য দাবিতে লড়ছে। অবস্থানের ঘন্টা যতো বাড়ছে, কর্তৃপক্ষ‌ের ঔদ্ধত্য যতো বাড়ছে, আন্দোলনের তীব্রতাও ততো বাড়ছে ।এই লড়াই আমরা জিতবোই— কলেজের জন্য, আগামীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য, আমাদের জন্য। আমাদের পাশে দাঁড়ান। সাথে দাঁড়ান।


*** অনিকেত চ্যাটার্জী ওপরের ছবি তে অনশনকারী আন্দোলনরত মেডিকেল কলেজের ছাত্র ***