শনিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৮

ফাতিমা ~ দেবাশীষ সেনগুপ্ত

লক্ষ্নৌ এয়ারপোর্টটা আমার খুব প্রিয়। ছোট্টখাট্টো জাঁকজমক শূন্য একটা এয়ারপোর্ট। সাকুল্যে পাঁচখানা বোর্ডিং গেট, ইতিউতি ছড়ানো বসার জায়গা। দুএকটা খাবারের দোকান, একটা খাদি স্টোর আর একটা চিক্কনের কাপড়ের দোকান। ব্যস, খেল খতম! কেমন একটা ঘরোয়া পরিবেশ। বড় বড় এয়ারপোর্টগুলোর মত গিলে খেয়ে নেয় না।
ফ্লাইট মাত্র পনেরো মিনিট লেট, এখন আর অস্বাভাবিক লাগে না। তায় এ আবার দীর্ঘ দুরত্বের ফ্লাইট! দিল্লী-লক্ষ্নৌ-পাটনা-কলকাতা-বেঙ্গালুরু। আকাশপথে ভারতদর্শন!

বোর্ডিংয়ের পরই মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। আমার পেছনের সারিতেই এসে বসল পাঁচজন ষন্ডামার্কা ভাইয়া গোছের মক্কেল। সাদা শার্ট, চোখে কালোচশমা, গলায় মোটা সোনার চেইন আর মুখে ভকভক করছে বীয়ারের গন্ধ।  
এরা চারপাশের কাউকে মানুষ বলে গন্য করে না। তারস্বরে চেঁচিয়ে কথা বলে, হ্যা হ্যা করে হাসে, মেয়ে দেখলে চোখ দিয়ে গেলে বেহায়ার মত! গোটা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই বলদগুলো।
যাই হোক, আমি বুঝে গেলাম আমার টুকরো ঘুমের দফারফা। তবে কথাবার্তায় বুঝলাম দলটা পাটনায় নেমে যাবে। আপাততঃ ওটুকুই সান্ত্বনা।

টেকঅফের পরেই এইসব ছোটদূরত্বের ফ্লাইটে বিমানবালাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। আধঘন্টার মধ্যে সবাইকে খাবার / জল পরিবেশন করে, উচ্ছিষ্ট সাফ করে ওঠা চারজনের পক্ষে চাট্টখানি কথা নয়। সীটনম্বর অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নিলেও একেকজনের ভাগে ৩০ / ৩৫ জন প্যাসেঞ্জার তো পড়েই।
আমাদের ব্লকে যে মেয়েটি ট্রলি গড়িয়ে খাবার দিতে শুরু করল সে দেখলাম একটু ধীর স্থির। পেশাদারী হুটোপুটি এখনও রপ্ত হয়নি হয়ত। আমার পিছনের সীটের একভাইয়া তাকে হাত উঁচিয়ে ডাকলো, সে অল্প হেসে অপেক্ষা করতে বলল। দুমিনিট পরই আবার বেল বাজিয়ে ডাক। এবার মেয়েটি বলেই ফেলল - প্লীজ ওয়েট! একেক করে আসছি।
দুমিনিট পরই আবার ডাক, এবার উদ্ধতভাবে - হেই! হ্যালো! শুনো ইধার! 
মেয়েটি এলো খানিকটা - স্যর, ইয়ে রুল হ্যায়। সিরিয়ালী আনা হ্যায় মুঝে।
ভাইয়াজীর মুখটা দেখা গেল না, তবে গলায় ঝাঁজ একইরকম - পানি দেনা জারা।

হ্যাঁ, জল চাইলে দেওয়াই যায়। নিয়ম বা খিদের চেয়ে তেষ্টা সবসময় জরুরী।
মেয়েটা জল হাতে এগিয়ে এলো, আমি ঘাড় ঘোরালাম। একমিনিটের নিস্তব্ধতা, লোকটা একঝলক নজর বুলিয়ে নিল মেয়েটার বুকে আর তারপরই মুখ ঘুরিয়ে - রহনে দিজিয়ে। নেহী চাহিয়ে!
আমি অবাক, আরো দুচারজন ঘাড় ঘোরানো পাবলিকও অবাক! একমুহূর্তের জন্য মনে হল উঠে গিয়ে কষিয়ে চড় বসিয়ে দিই গালে। জল তেষ্টাটা অছিলা ছিল! আসলে কাছে ডেকে দেখার জন্যই তবে ....... ! ছিঃ
কিন্তু পরমুহূর্তেই চোখ চলে গেল ফর্সা মেয়েটার অপমানে প্রায় লাল হয়ে আসা মুখের দিকে। তারপর বুকে বসানো ব্যাজটার দিকে। মনকে আপ্রাণ বোঝাচ্ছি, না হতে পারে না। আগে যেটা ভেবেছিলাম সেটাই ঠিক নিশ্চয়ই।

ভাবতে ভাবতে অজান্তেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছি আমি। গ্লাসটা আমার হাতে ধরিয়ে মেয়েটা টানটান হয়ে দাঁড়াতেই আমার পাশের সর্দারজী হাঁক দিলেন - মুঝে ভী দিজিয়ে পানি। 
প্রায় একইসঙ্গে পাশে বসা তাঁর স্ত্রীও বলে উঠলেন - মুঝে ভি! ওপাশের যে দুজন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল ঘটনাটা, তারাও বাড়িয়েছে হাত - ওয়াটার প্লীজ! কি সর্বনাশ! এরা সবাই দেখেছে! সবাই বুঝেছে! তাই অন্ততঃ সাত আটজন যাত্রী তেষ্টা না পাওয়া সত্বেও জল চেয়ে খাচ্ছে!
পিছনের সারিতে তখন স্তব্ধতা। অপরাধবোধ? কে জানে! কয়েক সেকেন্ডের ফিসফাসের পর সব চুপ।
মিনিট দশেক পর মেয়েটি আমাদের সারিতে সার্ভ করা শেষ করতেই অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় তার টীমলিডার এসে ট্রলির ভার নিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে সেই পরিচিত গলা - জারা পানি দিজিয়েগা তো!
ঠান্ডা বরফচোখে তাকালো টীমলিডার মেয়েটি, তারপর গলাটা একটু চড়িয়ে ডাক দিলো আগের মেয়েটিকেই - ফতিমা! ইনকো পানি দেনা প্লীজ!
তারপর? তারপর আর কি! ৩৪০০০ ফুট ওপরে একটা ছোট্ট লড়াইতে জিতে গেল একদল মেয়ে!