শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

রাজস্থানে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন ~ অবিন দত্তগুপ্ত

২০১৭-র সেপ্টেমবর-এ রাজস্থানে এক ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন হয়েছিল । নেতৃত্ব দিয়েছিল সারা ভারত কৃষক সভা । এই আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন রাজস্থানের ,শেখাওয়াতি অঞ্চলের দুই কিংবদন্তি কমিউনিস্ট । সি পি আই এম-এর কমরেড অমরা রাম এবং কমরেড পেমা রাম । ১৩ দিন ধরে চলা সেই আন্দোলন , কৃষক আন্দোলন থেকে গণ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল । রাজস্থানের ইতিহাসে প্রথমবার কৃষকদের সমর্থন জানিয়েছিল ব্যবসায়ীরা । শেখাওয়াতি অঞ্চলের সিকার জেলা ,এই আন্দোলনের প্রাণ কেন্দ্র ছিল । লাখ লাখ মানুষ পথে নেমেছিলেন । অটো ,বাস এমনকি ডি জে ট্রাক চালকেরাও আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন । অমরা রাম আর পেমা রাম কে নিয়ে তৈরি হয়েছিল অসংখ্য গান । ১৩ দিন পুরো উত্তর রাজস্থান অবরুদ্ধ ছিল । রেশ ছড়িয়েছিল গোটা রাজ্যে । যে মূল দাবীগুলি নিয়ে কৃষকরা পথে নেমেছিল সেগুলি হল ঃ

১। বিভিন্ন বড়লোকের সাড়ে ১১ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ মাপ করেছে কেন্দ্রিয় সরকার । সমস্ত কৃষকদের ৫০,০০০ টাকা ঋণ মাফ করতে হবে । 
২। কৃষক যাতে ভবিষ্যতে ঋণের জালে জড়িয়ে না পরে ,তাই স্বামিনাথন কমিশন একটি নিদান দিয়েছিলেন । কমিশন জানিয়েছিল , ফসলের উৎপাদন মুল্যের দেড় গুন দামে সরকারকে কৃষকের থেকে ফসল কিনতে হবে । রাজস্থানের সরকারকে স্বামিনাথন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী কৃষকদের থেকে ফসল কিনতে হবে ,এই ছিল দ্বিতীয় দাবী ।
৩। রাজস্থানের গরুপ্রেমী সরকার , গরু কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল । তার ফলে গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি হয় এবং বুড়ো গরুর পাল কৃষকদের ফসল নষ্ট করতে থাকে । অতএব কৃষকদের দাবী ছিল , গরু বিক্রীর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলতে হবে ।
৪। প্রত্যেক খেত্মজুর এবং কৃষককে ২০০০ টাকা পেনশন দিতে হবে । 

১৩ দিনের আন্দোলন সরকারের কোমর ভেঙ্গে দেয় । কৃষক সভার নেতাদের রাজস্থান সরকার লীখিত ভাবে জানান ,তারা সব দাবী মেনে নিচ্ছেন । এও জানান যে ৩ মাস লাগবে , দাবী পুরনের প্রক্রিয়া শুরু করতে । 

 ডিসেম্বর ২০১৭ । তিনমাস কেটে গেলেও সরকার একটিও দাবী পূরণ করে নি । কৃষকসভা সিদ্ধান্ত নেয় ,আরও বড় আন্দোলনের । সিদ্ধান্ত হয় সারা রাজ্যের কৃষক ২২ ফেব্রুয়ারি বিধানসভা ঘেরাও করবে । বিধানসভায় ওই সময় বাজেট সেশন চলবে ,অতএব ওই সময়-ই  অনিদৃষ্টকালের জন্য ঘেরাও হবে সরকার ।সবকটা দাবী পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হলে ,তবে ঘেরাও উঠবে । এই কর্মসূচীকে সামনে রেখে সমস্ত গ্রামে প্রচার শুরু করে লাল ঝান্ডা । ঠিক হয় রণকৌশল । চুরু ,ঝুন্‌ঝুনু,শিকার ও নাগোর এই চার  জেলা থেকে চারটে জাঠা বিভিন্ন রুটে জয়পুর পৌঁছানোর কথা ২২শে ফেব্রুয়ারি । রাজস্থান সরকার কৃষকদের ভয় তটস্থ হয়ে ওঠে । তারাও পাল্টা ফন্দি আঁটে লালঝান্ডা কে আটকাবার । অতএব, ২০শে ফেব্রুয়ারি কমঃ অমরা রাম ,কমঃ পেমা রাম ,কমঃ হেতরাম বেনিওয়াল ,কমঃ মাঙ্গেজ চৌধ্‌রি সমেত ৫০০ জন কৃষকনেতাকে গ্রেপ্তার করে রাজস্থান পুলিশ এবং প্যারামিলিটারি ফোর্স ।  কাউকে মিছিল থেকে কাউকে গ্রাম থেকে ,কাউকে পাশের জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় । সম্পূর্ণ কৃষকসভা এবং সি পি আই এম নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করা হয় । এস এফ আই-ডি অয়াই এফ আই নেতৃত্বকেও গ্রেপ্তার করা হয় । কিন্তু কিছুজন গ্রেপ্তারি এড়াতে সমর্থ হন । 

সম্পূর্ণ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হওয়ার পর-ও কৃষকরা সিদ্ধান্ত নেয় জয়পুর মার্চ ২২শে-ই হবে । ২১ তারিখ পুরো উত্তর রাজস্থান বনধ্‌ হয় । ব্যবসায়ী সংগঠন ,বার এসোসিয়েশন , দুধ বিক্রেতাদের ইউনিয়ান , অটো-বাস-ডি জে চালক ইউনিয়ান-এর সমর্থনে সর্বাত্মক বনধ্‌ পালিত হয় । ২২ তারিখ মানে আজ ,লাখ লাখ কৃষক জয়পুর উদ্দেশ্যে রওনা দেন । কিন্তু বিশাল পুলিশ এবং মিলিটারি তাদের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ করে । কোন নেতা ছিল না , তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন ,যেখানে আটকাবে সেখানেই অবস্থানের । এই 'রিপোর্ট' যখন লিখছি ,তখন রাজস্থানের অর্ধেক রাস্তা স্তব্ধ হয়ে গেছে । লাখ লাখ কিষান আর হাজার হাজার লাল পতাকা দখল নিয়েছে সমস্ত হাইওয়ের ,কিচ্ছু নড়ছে না । আন্ডারগ্রাউন্ড নেতৃত্ব বেরিয়ে এসছেন ,কিন্তু এই আন্দোলনের আসল নেতা দুজন । লাল ঝাণ্ডা এবং প্রতিটি কৃষক নিজে । "মেয় হু অমরা রাম , মুঝে গিরিফতার কারো "- মূল স্লোগানের একটি । রাস্তায় রাত কাটানোর সমস্ত সামগ্রী নিয়ে 'অন্নদাতা-অন্নদাত্রী'-রা  অনিদৃষ্টকালের জন্য রাস্তায় । 

এই আন্দোলন ঐতিহাসিক । রাজস্থান গো-বলয়ের একটি রাজ্য । পেহলু খান -আফরাজুল-এর খুনিরা এখানে সরকারে । সেই রাজস্থানে সরকারকে মাটি ধরিয়ে দিচ্ছে শ্রেণী আন্দোলন -ব্যরিকেড ভাঙ্গছে লাল ঝান্ডা । হিন্দু-মুসলমানের আগে এগিয়ে আসছে শ্রেণীর আইডেন্টিটি ,কৃষক আইডেন্টিটি । গরু বিক্রী করতে দিতে হবেই - এটা সমস্ত কৃষকের মৌলিক দাবী । ধর্মের -জাতের-লিঙ্গের ব্যারিকেড ভাঙ্গছে লাল ঝান্ডা । লাখ মানুষের মিছিলে জিপের উপর দাঁড়িয়ে মাইকে নিজের কথা বলছেন রাজস্থানের গ্রামের মহিলারা । এই আন্দোলন ঐতিহাসিক । মনে রাখতে হবে ,এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি অর্থনীতি । এই আন্দোলন নয়া উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন । বসুন্ধরা রাজের বি জে পি সরকার যেভাবে কৃষকদের শোষণ করেছে ,ঠিক সেভাবেই শোষণ করেছে আগের কংগ্রেস সরকার । আগের কংরেস-এর হাত থেকে বাঁচতে রাজস্থানের কৃষক বি জে পি-র কাছ গিয়েছিল ,এখন বিজেপি-র থেকে বাঁচতে কার কাছে যাবে ? আর ঠিক এখানেই বিকল্প অর্থনীতির লড়াই করছে লাল ঝান্ডা । শ্রেণী ঐক্য-কে সংহত করে এভাবেই রাজস্থানের বালির ক্যানভাসে বিকল্পের লাল টুকটুকে ছবি আঁকা হচ্ছে প্রতিদিন ।