শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুর দম ~ অর্জুন দাশগুপ্ত

এই গল্পটা আমার জীবনের নয় , আমার বউয়ের।
তবে ফেবুতে অনিয়মিত আসার ফলে আমাকেই বলতে হচ্ছে।

সময়টা বেশ কয়েক বছর আগের শীতের লন্ডনে। আমরা দুজনে ডাক্তারি চাকরির স্বার্থে ইংল্যান্ডময় চক্কর কাটছি। এমন সময় মেয়েটি ( গল্পের স্বার্থে বউকে মেয়ে বলে উল্লেখ করছি) লন্ডনের পূর্বপ্রান্তে একটি জাঁদরেল হাসপাতালে চাকরি পেলো। জানা গেলো যে ইউনিটে পেয়েছে সেটি সবচেয়ে আকাঙ্খিত ইউনিট। সেই ইউনিটের বস একজন বৃদ্ধ দোর্দণ্ডপ্রতাপ কালো সাহেব। গাঁট্টা গোট্টা বক্সার দের মতো চেহারা, গলার আওয়াজ গুরুগম্ভীর, বচ্চনের থেকেও দু খাদ নীচে। সাহেবের ভয়ে হাসপাতাল তটস্থ। সে নাকি কিসব বিরল অপেরাশন জানে যা দেখতে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি থেকে দলে দলে ডাক্তার আসে। ভদ্রলোকের জীবনটাও রঙ্গিন। ৩ বা ৪ নম্বর বিয়ে অথবা ডিভোর্স চলছে। এছাড়াও কানাঘুষো শোনা যায় হাসপাতালেই বহু প্রেম করেছেন। ইউনিটে বহু ডাক্তার, তারা সারাদিন চরকির মতো ছোটাছুটি করে ওনার অঙ্গুলিহেলনে।বুড়ো কালো একটি ওভারকোট পরে সার্জণস রুমে বসে থাকেন। একটানা সিগারেট ঠোঁটে আর মুখে টনি ব্লেয়ারের অকথ্য নিন্দে। যাকে বলে একটি ছোটখাটো কিংবদন্তি।

এমন একটি ইউনিটে ছোটখাটো বাঙালি মেয়েটি কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে উপস্থিত হলো। প্রথম দিনের পর শুনলো বস তাকে ঘরে দেখা করতে বলেছেন।যাকে চেনেও না, চোখ তুলে দেখেও নি, তাকে হঠাৎ তলব কেনো? ভয়ে জবুথবু হয়ে কোনোরকমে সাহেবের ঘরে। সাহেব তাকে দেখে এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন " শোনো, তুমি কি আমায় কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুর দম খাওয়াতে পারবে? " । ঘরে অনেক্ষন নৈঃশব্দ্য বিরাজ করলো। সাহেব ইংরেজিতে বললেও কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুর দম কিন্তু বাঙলাতেই বলেছেন। এ যেন এস্কিমোর রিক্সা চাপতে চাওয়া, বা রেড ইন্ডিয়ানের গলায় দরবারী কানাড়া।
মেয়েটি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে সোজা বাড়ি। আমি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি দক্ষযজ্ঞ চলছে।কড়াইশুঁটি সেদ্ধ হচ্ছে। ময়দা মাখা হচ্ছে। এলাহী কান্ড। নিজের বউ বলে বলছি না, মেয়েটির হাতের রান্না খুবই ভালো। আমিও দুটি প্রসাদ পেলুম। পরের দিন খাবার দাবার প্যাক করে সোজা সাহেবের ঘর। ঘরে তখন অনেক ভিড়। বুড়ো মেয়েটিকে দেখেই সবাইকে ভাগিয়ে দিলেন। তারপর গোগ্রাসে খাবারগুলো গলাধঃকরণ। খেয়ে দেয়ে বুড়োর মুখে এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তির হাসি।
সিগারেট ধরিয়ে বুড়ো গল্প শুরু করলেন। জন্ম জামাইকাতে। কি একটা নেহেরুর করা এক্সচেঞ্জে উনি যৌবনে এক বছর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে কাটিয়েছিলেন। তখন কলেজ স্ট্রিটের কচুরি আর আলুর দম উনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। বললেন " জানো! লোভে পরে একবার এক বাংলাদেশি মহিলাকে বিয়ে পর্যন্ত করেছিলাম। কিন্তু সেই স্বাদ পেলাম না। শেষমেশ ডিভোর্স করে দিলাম"

এরপর বুড়ো নিত্য নতুন ফরমায়েশ করতে থাকলেন। দই মাছ, ইলিশ ভাপা, কষা মাংস, চিংড়িমাছের মালাইকারী.... ফিরিস্তির শেষ নেই। মেয়েটিও যোগান দিয়ে চলেছে। লন্ডনের নির্মম শীতে আমাদের ছোট্ট বাড়িতে অকালবসন্ত। খবর ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়িতে প্রচুর লোক আসছে। দু একজন তো সারা রাত গাড়ি চালিয়ে ডিমের ডেভিল খেতে উপস্থিত। বাজার হচ্ছে, রান্না হচ্ছে, বুড়ো খাচ্ছে, আর হেঁ হেঁ আমিও খাচ্ছি।
এদিকে ইউনিটের জটিল জটিল অপেরাশন সব দায়িত্ব পড়ছে নবাগতা ছোটখাটো লাজুক বাঙালি মেয়েটির ওপর। সবাই বেজায় অবাক। কিন্তু কিছু বলার সাহস নেই।

এক বছর বাদে ছেড়ে চলে যাবার আগে মেয়েটি বুড়োকে বিদায় জানাতে গেলো। জটিল নানারকম অপেরাশন করতে সে এখন বুড়োর কল্যানে সিদ্ধহস্ত।একাকী এই লোকটির প্রতি কেমন যেন মায়া পরে গেছিলো।আশীর্বাদ করে সাহেব বললো,ট্রেনিং শেষ করে মেয়েটি যেন কলকাতায় ফিরে যায়। আর উনিও কিছুদিন বাদে রিটায়ার করে দেখা করতে আর খেতে যাবেন কলকাতায়।

সেই কলকাতায় যাওয়া আর হয় নি। পরের বছর লন্ডনের এক কোনে প্রাসাদের মতো বাড়ির নুড়ি বিছানো পথে উপুড় হয়ে তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। এক হাতে বাড়ির চাবি, অন্য হাতে সিগারেট। একাই থাকতেন,তাই কেউ টেরও পায় নি। মেয়েটি নিজেকে সান্তনা দেয়, মরার আগে বুড়ো সাহেবের সারাজীবনের একটি অসম্পূর্ণ স্বাদ অন্তত পূরণ সে করতে পেরেছে। বুড়ো মরার আগে অন্তত কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুর দম খেয়ে যেতে পেরেছে

( ঘটনাটি সত্যি, তবে ছবিটা ইন্টারনেট থেকে। তেনার শরীর খারাপ। এখন কচুরি চাইলে বিপদ আছে)