বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

একটি কাল্পনিক(?) কথোপকথন ~ আর্কাদি গাইদার

'আপনি আমাকে গ্রেপ্তার করালেন কেন? এরকম তো কথা ছিলো না!'
' ওরকম করতে হয়। তোমার লোকজন সাংবাদিকদের গায়ে হাত তুললো কেন? সেটারও তো কথা ছিলো না।'
'ওরা উত্তেজিত হয়ে গেছিলো একটু। কিন্তু ধর্মান্তরকরণ যে করবো সেটা তো আমাদের বোঝাপড়াতেই ছিলো। আপনাদের না জানিয়ে তো করিনি।'
'হাহা! কৃতার্থ করেছো। যেন তুমি না জানালে আমরা জানতাম না! আমাদের পুলিশ, ইন্টালিজেন্স কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলে? তোমাদের সংগঠন ভর্তি আমাদের লোক। তুমি রাজপথে দাঁড়িয়ে ধর্মান্তরকরণ করবে আর আমরা সেই প্রোগ্রামের ব্যাপারে জানবো না?'
'জানি বলেই তো আপনাদের জানিয়েই করেছি। আপনারা তো বাধা দেননি। খালি সাংবাদিকগুলো একটু ক্যাচাল করে দিলো।'
'কিছুই ক্যাচাল করেনি। ওদের কাজ করেছে। তোমরাও মেরেছো। তোমাদের কাজ করেছো। আমরা গ্রেপ্তার করে আমাদের কাজ করেছি। শেক্সপিয়র রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন - All the world's a stage, all the men and women are players. এইরকমভাবেই প্রত্যেককে প্রত্যেকের রোলপ্লে করে যেতে হবে।'
'দেখুন, আমি চাই না আমাদের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝি হোক। আমি অনেকদিন আগে ভুল করেছিলাম, আপনার বিরুদ্ধে সরাসরি নেমে মেদিনীপুরে সংগঠন তৈরি করছিলাম। তারপর ভারতী ঘোষ গ্রেপ্তার করে বনগা জেলে নিয়ে গিয়ে দাওয়াই দিয়েছিলো। তারপর থেকে তো আপনাদের কথামতনই চলছি।'
' হ্যা জানি। খুব ভালো কাজ করছো তো। আমাদের তরফ থেকে কি সহযোগীতা পাচ্ছো না? জেলায় জেলায় আমাদের পার্টির লোক তোমাদের সংগঠনে ভিড় বাড়াচ্ছে। আমরা বাধা দিয়েছি? তোমাদের অফিস খোলবার জায়গা দিয়েছি সব জায়গায়। তোমাদের ক্যাম্প, শিবির করবার পারমিশন দিয়েছি সরকারি স্কুলে, মাঠে। এই যে তোমরা জেলায় জেলায় মিটিং করো, মিছিল করো, প্রতিবছর তোমরা কলকাতার বুকে এই নাটকটা করো, হেটস্পিচ দাও, উস্কানিমূলক স্লোগান দাও, আমাদের অনুমতি ছাড়া পারতে? চাইলে কি পুলিশ দিয়ে তোমাদের মাজা দুদিনে ভেঙে দিতে পারতাম না? ছাত্রদের মিছিল, বন্ধ, নবান্ন অভিযান, ভাঙরের আন্দোলন, ইসলামপুর, বীরভূম, ভাবাদীঘি - এসব জায়গায় পুলিশ আর আমাদের সংগঠননের লোকজন যা করছে তা তোমাদের সাথে কি করতে পারতাম না? যেখানে অন্য কোন রাজনৈতিক দল ফ্ল্যাগ অবধি লাগাতে পারে না, সেই নন্দীগ্রামে এত বড় সভা করে এলে, আমরা যদি চাইতাম আটকাতে পারতাম না।?'
'পারতেন। কিন্তু করেননি। সেটা কিন্তু দয়া করে না। তার কারন আপনিও জানেন যে আমাদের কাজকর্মে আপনার লাভ বৈ ক্ষতি হচ্ছে না। সেই বনগা জেলের পর থেকেই আমি জনসমক্ষে আপনাকে সমর্থন জানিয়ে আসছি। আমাদের সব মিটিং এ আমি সরকারের পক্ষে ঝোল টেনে।কথা বলি। কোথাও আপনার দলের বিরোধিতা করি না। এমনকি নির্বাচনের আগেও সরাসরি ঘোষনা করে আপনার দলকে ভোট দেওয়ার আর্জি জানাই। জনসভায়, ফেসবুকে। আপনার দলের কর্মীদেরকে সরাসরি বলি - তৃণমুল আর হিন্দু সংহতি একসাথে করবার মধ্যে কোন বিরোধ নেই।'
'হাহাহাহাহা। তোমার মনে হয় তুমি আমাকে ভোট দেওয়ার আর্জি জানাবে বলে তোমার সংগঠনকে আমরা ব্যাবহার করি?'
'তাহলে?'
'বোকা। তুমি আমাকে সমর্থন জানালে কি বিরোধিতা করলে তা দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। আমি চাই তোমরা তোমাদের এই ঘৃনার রাজনীতি করে যাও। একটু লোকজনের মাথার মধ্যে ধর্ম ঢোকাও। দুএকটা ছোটখাট দাঙা সংগঠিত করো। এই বাংলার হিন্দু মুসলিমগুলো ভাবনাচিন্তার সময় পেলেই ওই জমি, ক্ষতিপূরণ, গনতান্ত্রিক অধিকার, ইউনিয়ন, বাকস্বাধীনতা, শিক্ষাব্যাবস্থা, দুর্নীতি নিয়ে চর্চা শুরু করে দেয়। ওই যে ভাঙরেই দেখো না। তা এসবে আমাদের তো সমস্যা হয়ই, বোঝোই তো। তাই তোমরা একটু নাচানাচি করলে বরং হিন্দু মুসলিম দু পক্ষই প্যানিক করবে, ভয় পাবে, সারাক্ষন এসব নিয়ে ঝগড়া করবে, মারামারি করবে। আমরা মাঝেমধ্যে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়ে চোর পুলিশ খেলবো। মেরুকরণের পালে একটু হাওয়া দেবো। কারন ভোটের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে তো। আমরা চাই লোকজন এসব ইস্যুকে মাথায় রেখেই ভোট দিক। ওই জমি বা ইউনিয়ন না। তোমরা হচ্ছো যাকে বলে necessary idiots.'
'আচ্ছা। বুঝলাম।'
'কিন্তু বাড়তে গিয়ে বেশি বেড়ো না। সাংবাদিকদের মেরেছো বলে বলছি না, ওরকম এক দুটো মারলে ক্ষতি নেই, তোমাদের একটু পাব্লিক ভয় টয় পাবে, কিন্তু নিজেদের বিশাল ক্ষমতাবান ভেবে ফেলো না। প্রয়োজন পড়লে কিন্তু তোমায় এক রাতে হাপিস করে ফেলতে পারি।'
'ঠিক আছে দিদি। এবার ছাড়া পাবো কবে?'
'দেখছি, একটু আলোচনা করে নিই লোকজনের সাথে।'

(পরে)

'দেখা হয়েছে?'
'হ্যা।'
'কি বললো?'
'সমস্যার কিছু নেই। আলোচনা করে বোঝাপড়া পরিষ্কার করে নিয়েছি। তোমরা কাজকর্ম থামিও না। ওখানে কোন অসুবিধে করবে না মনে হয়।'
'এরকম করে আর কতদিন চলবে?'
'ধৈর্য আর অপেক্ষা, দুটোই বড় গুন। একটা ক্রিটিকাল মাস রিচ করা অবধি ওদের সাহায্য আর সহযোগীতা যদি আমরা পাই, তাহলে ক্ষতি কি? তারপর সেই ক্রিটিকাল মাসের অভিমুখ নির্ণয় করবার ক্ষমতা তো আমাদের হাতে।'
'তপনদা, আপনার কি মনে হয় না আপনি ব্যাবহৃত হচ্ছেন?'
'দূর বোকা। কে যে কাকে ব্যাবহার করে তা একমাত্র অন্তর্যামীই জানেন।'

--একটি কাল্পনিক(?) কথোপকথন।