শনিবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১৮

প্রজাতন্ত্র দিবস ~ সুশোভন পাত্র

- ভাগ্যের জোরে যে রাজনৈতিক দল দেশে ক্ষমতায় এসেছে, তারা দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে তিরঙ্গা জাতীয় পতাকা উপহার দিয়েছেন। দেশের মানুষ কোনদিনই তিরঙ্গা জাতীয় পতাকা কে সম্মান করবে না। 'তিন' সংখ্যাটি অশুভ। তিরঙ্গা যতদিন জাতীয় পতাকা থাকবে, ততদিন মানসিক ভাবে খারাপ প্রভাব ফেলবে এবং দেশের ক্ষতি করবে ¹।  
কে বলে এমন অলক্ষণে কথা ? 'দেশদ্রোহী' কানাহাইয়া কুমার ? 'পাকিস্তানের স্পাই' উমর খালিদ ? না 'চিনের দালাল' সীতারাম ইয়েচুরি ? আজ্ঞে না ! গণপরিষদ তিরঙ্গা কে জাতীয় পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার প্রতিবাদে, ১৪'ই অগাস্ট ১৯৪৭, এই কথা গুলো ফলাও করে ছাপা হয়েছিল সঙ্ঘের'র মুখপত্র 'দি অরগানাইজার'এ। এমনকি স্বাধীনতার ৫২ বছর অবধি, সঙ্ঘে'র হেড কোয়ার্টারে কোনদিন উত্তোলন করাই হয়নি তিরঙ্গা জাতীয় পতাকা ² । 
- আমাদের সংবিধান পাশ্চাত্যের দেশগুলির বিভিন্ন নিবন্ধের দুর্বহ এবং বৈষম্যপূর্ণ সংকলনের জগাখিচুড়ি। জাতীয় লক্ষ্য, জীবন দর্শনের কোন পথনির্দেশই সংবিধানে নেই। কোন নিজস্বতাও নেই, কারণ গণ পরিষদের পণ্ডিতরা মনুস্মৃতির মত প্রাচীন ভারতের নৈতিক ও কার্যকরী আইন কে সংবিধানে জায়গা দেওয়ার প্রয়োজন বোধই করেননি।    
যে সংবিধানের সিঁড়ি বেয়ে প্রজাতন্ত্র আজ ৬৯-এ, সেই সংবিধান নিয়ে কাদের এমন মূল্যায়ন? কাদের এমন অনাসৃষ্টি? বিলক্ষণ নিশ্চয় 'কমিউনিস্টি'? আজ্ঞে না ! সংবিধান সম্পর্কে এই মূল্যায়ন স্বয়ং দ্বিতীয় সঙ্ঘ-চালক গোলওয়ালকারের, 'মনুস্মৃতি'কে সংবিধানের গৃহীত খসড়াতে মান্যতা না দেওয়ায় তাঁর 'বাঞ্চ অফ থটস' বইয়ে ২৩৮ পৃষ্ঠায় এভাবেই তুলোধোনা করেছিলেন গণ পরিষদ কে ³ ।   
তাই প্রজাতন্ত্র দিবসে, দিল্লীর রাজপথে, প্রধানমন্ত্রী যখন ঐ তিরঙ্গা জাতীয় পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে, সংবিধান মেনে দেশ পরিচালনার নিখুঁত অভিনয় করেন; নাগপুরের রেশিম বাগের হেড কোয়ার্টারে তখন মোহন ভাগবত গোঁফের নিচে মুচকি হাসেন। আসলে মোহন ভাগবত আলবাত জানেন, তাঁদের ফ্যান্টাসি'র ঐ 'হিন্দুরাষ্ট্রে', সংবিধানের প্রস্তাবনা মেনে 'গণতন্ত্রের' বালাই নেই। 'ধর্ম নিরপেক্ষতা'-'সমাজতান্ত্রিক'-'প্রজাতন্ত্র'-'সামাজিক সমতা', -এসব ভারী শব্দ বন্ধের নাম ও নিশান নেই ⁴ । মোহন ভাগবত আলবাত জানেন, তাঁদের ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র' আসলে ফ্যাসিস্ট'দের জন্যই টেলার মেড। তাঁদের ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র' আসলে নাৎসি'দের জার্মানির কার্বন কপি।      
সঙ্ঘের গঠনতন্ত্রে ও কর্মপদ্ধতি'তে ফ্যাসিস্ট পার্টির বৈশিষ্ট্যই রুবারু। সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হেডগাওকারের মতাদর্শ গত অভিভাবক বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে,  ১৯৩১'র মার্চে ইউরোপে গিয়ে একাধিক মিলিটারি স্কুল পরিদর্শন করেন। তাঁকে সবচেয়ে প্রভাবিত করেছিল রোমের বালিলা এবং আভংগুরাডিস্টি'র ফ্যাসিস্ট পার্টির ইয়ুথ অর্গানাইজেশন ⁵। মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাত সম্পর্কে মুঞ্জে ডাইরি তে লেখেন, "মুসোলিনির সাথে দেখা করে আমি অভিভূত। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে মুসোলিনি এবং তার ফ্যাসিস্ট পার্টির সম্পর্কে নানান সমালোচনা ও বিষোদ্গার শুনলেও, আমি তাঁদের মধ্যে আপত্তিকর কিছুই খুঁজে পেলাম না। বরং ভারতের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিকাশমান জাতির ফ্যাসিস্ট সংগঠনই প্রয়োজন।" মুঞ্জের পরামর্শেই ফ্যাসিস্ট পার্টির ধাঁচেই সঙ্ঘ কে গড়ে তোলেন হেডগাওকার। ফ্যাসিস্ট পার্টির মতই, সঙ্ঘও ছয় থেকে আঠারো বছর বয়সী ছেলে মেয়েদের সংগঠনে নথিভুক্ত করে। শারীরিক ব্যায়াম, আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ, ড্রিলস-প্যারেড করে। আবাসিক শিবিরে উগ্র 'হিন্দুত্ব'র বীজ মস্তিষ্কে বপন করার সুচারু কর্মযজ্ঞ শুরু করে। এমনকি ফ্যাসিস্ট পার্টির হবুহু নকল করে খাকি হাফ প্যান্টও পরে ⁶। 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাতিগত শুদ্ধতার অজুহাতে নাৎসি সামরিক বাহিনী তদানীন্তন জার্মান অধিকৃত ইউরোপের ষাট লক্ষ ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের উপর 'হলোকাস্টের' ন্যক্কারজনক গণহত্যা সংগঠিত করেছিল ⁷ ⁸, গোলওয়ালকার তাঁর "উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড" বইয়ে সেই গণহত্যারও ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছিলেন "জাতি এবং তার সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা বজায়ে জার্মানি নিজেদের কে ইহুদী মুক্ত করে বিশ্বে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। বিশ্বে একমাত্র জার্মানি'তেই জাতি গর্ববোধ পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হিটলার বুঝেছেন বিভিন্ন জাতি কে একসাথে নিয়ে এগোনো অসম্ভব। হিন্দুস্থানের জন্যও হিটলারের এই উদাহরণ দৃষ্টান্তমূলক। ⁹ " 
জার্মান লোকাচারে কথিত আছে, সঙ্ঘের হার্টথ্রব হিটলারে একবার নাটক দেখতে গিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়েন। কারণ নাটকের ভিলেনেরও হিটলারের মত বাটারফ্লাই গোঁফ ছিল। অতএব, ভিলেন কে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে -হিটলারে আদেশ। গোয়েরিং বলেন "ফুয়েরার, ভিলেন যদি গোঁফটা কেটে দেয়?" হিটলার নাকি উত্তর দিয়েছিলেন, "তাহলে গোঁফটা কাটার পর গুলি করে দিও। কেমন ?" 
তাই 'পদ্মাবতী' 'আই' কেটে 'পদ্মাবত' হওয়ার পরও, বেছে বেছে বি.জে.পি শাসিত রাজ্যে কর্নি সেনার বাঁদরামি দেখে অযথা অবাক হবেন না ¹⁰। সেদিন নাৎসি'র দেশে গোঁফ কেটে যেমন পার পান নি ভিলেন, তেমন আজকেও সঙ্ঘের দেশে 'আই' কেটেও পার পাবে না 'পদ্মাবতী'। কারণ, এই কর্নি সেনাপ্রধান লোকেন্দ্র সিং লাকভি'কেই তো ২০১৪'র লোকসভা নির্বাচনে রাজপুতে ভোটের জন্য বি.জে.পি তে আদর করে জায়গা দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। রাজনৈতিক রণকৌশলের প্রশংসার লুজ মোশেনে ভেসে গিয়ে মিডিয়া বলেছিল, "বিক্ষুব্ধ যশবন্ত সিংহ কে বি.জে.পি'র মাস্টার স্ট্রোক" ¹¹। 
আজ সেই মাস্টার স্ট্রোকের ফসল ঘরে তুলে তাঁদের ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র'র ¹² ট্রেলার দেখাচ্ছে সঙ্ঘ পরিবার। যে ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র' জাতি দাঙ্গায় মেতে থাকবে। যে ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র' ধর্মের নামে মানুষ খুন করবে। যে ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র' স্কুল বাসে ভাঙচুর করবে। যে ফ্যান্টাসি'র 'হিন্দুরাষ্ট্র' সিনেমা হলে আগুন জ্বালাবে। আর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও ¹³, কর্নি সেনার উপদ্রব দেখে, প্রধানমন্ত্রী মুখে কুলুপ এঁটে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকবেন। 
লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, সিট ব্যাক অ্যান্ড এনজয় দি লেটেস্ট ট্রেলার অফ 'হিন্দুরাষ্ট্র'। যে ট্রেলারে মূকাভিনেতা নরেন্দ্র মোদীর নীরবতাও হাজার কথা বলে। বলে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী বাক স্বাধীনতার পক্ষে নয় বরং দীপিকা'র নাক কাটার পক্ষে। বলে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে নয়, সঙ্ঘের নকশা করা 'হিন্দুরাষ্ট্র'র পক্ষে। বলে যে, প্রধানমন্ত্রী আসলে সংবিধান পক্ষে নয়, মনুস্মৃতির পক্ষে। বলে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পক্ষে নয় কর্নি সেনার উপদ্রবের পক্ষে। লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, ম্যাডনেসও যেমন মেথড আছে, অন্ধকারেরও যেমন সৌন্দর্য আছে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর নীরবতারও তেমন ভাষা আছে।