শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭

এফ আর ডি আই বিল ~ পুরন্দর ভাট

এফআরডিআই বিল নিয়ে অনেক লেখাপত্র ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যম এবং ফেসবুকে এসেছে। অনেকেই পড়েছেন, বুঝেছেন যে এ এক বিপজ্জনক আইন। অনেকে আমাকে বলেছেন এই নিয়ে লিখতে তাই একটা ছোট লেখা লিখছি, যদিও আমার নতুন করে এতে সংযোজন করার মতো কিছু নেই, সামান্য দু একটা পয়েন্ট ছাড়া।

প্রথমত, এই এফআরডিআই বিল বিষয়টা কী? কেন্দ্র সরকার একটা নতুন আইন প্রণয়ন করার ভাবনাচিন্তা করছে, আপাতত বিলটা জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে আছে, সেই আইনের নাম হলো ফিনান্সিয়াল রেজোলিউশন এন্ড ডিপোজিটরি ইনসিওরেন্স বিল, ছোট করে এফআরডিআই। দেশের ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে যে আইন সেই আইনকে সংস্কার করাই এই বিলের উদ্দেশ্য। সংস্কারের প্রয়োজন পড়ল কেন? পড়ল কারণ দেশের অধিকাংশ ব্যাংক বর্তমানে সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। বিভিন্ন ব্যাংক মোট ৬ লক্ষ কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণের ভারে ন্যুব্জ। সেই টাকা আর ফেরত আসবে না। এই অনাদায়ী ঋণের অধিকাংশটাই বড় কর্পোরেটদের কাছে পাওনা। আম্বানি-আদানি-এসার-বেদান্ত-কিংফিশার, প্রভৃতি। টাকা ফেরত না দিতে পারায় এদের কোনো শাস্তি হয়নি। কেউ লন্ডনে বসে উইম্বলডন দেখছে তো কেউ নিজের ছেলের বিয়ের কার্ড ছাপাচ্ছে যার এক একটার দাম দের লক্ষ টাকা। তো যাই হোক, অনাদায়ী ঋণ নিয়ে ভবিষ্যতে কী হবে? যে কোনো অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকের ক্ষতির অংকে যুক্ত হয়। ব্যাংককে নিজের রোজগার থেকে অনাদায়ী ঋণের অংকের ভরণ করতে হয়। ব্যাংকের রোজগার যদি অনাদায়ী ঋণের অংক ভরণ করবার মতো যথেষ্ট না হয় তাহলে ব্যাংকটি শেয়ার বিক্রি করে বা বন্ড বিক্রি করে বা অন্য কোনো ভাবে ধার নিতে পারে। যদি ধারও না পায় তাহলে ব্যাংকটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে, বন্ধ করে দিতে হয়। দেউলিয়া ঘোষিত হলে যাঁরা ব্যাংকে আমানত জমা করেছেন তাঁদের যত জনেরটা সম্ভব ব্যাংক ফেরত দেবে, যাদেরটা পারবে না তাদেরটা ফেরত দেবে সরকার। বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার যে আইন আছে তাতে এটাই দস্তুর। বর্তমান ব্যবস্থায় কিন্তু আমানতকারীদের টাকায় অনাদায়ী ঋণ বা ব্যাংকের অন্য কোনো ক্ষতির ভরণ করবার কোনো উপায় নেই, আইনত সেটা নিষিদ্ধ। বর্তমান আইনে ব্যাংক অনাদায়ী ঋণের ফলে হওয়া ক্ষতির ভরণ আমানতকারীদের টাকা দিয়ে করতে পারে না।

কিন্তু নতুন যে বিল আসছে তাতে এই নিয়ম বদলে যাবে। সেই বিলে একটি ক্লজ আছে, যাকে "বেইল ইন ক্লজ" বলা হচ্ছে, যা আমানতকারীদের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ক্ষতি ভরণ করবার রাস্তা খুলে দেবে। এই আইন পাশ হলে ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা আটকে রাখতে পারবে যদি সে সংকটে পড়ে। এমনকি আমানতকারীদের টাকা থেকে ব্যাংক ইচ্ছে মতো ঋণ নিতে পারবে অথবা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার বদলে তাদের ব্যাংকের শেয়ার দিয়ে দেবে যাতে ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা থেকে প্রয়োজন মত টাকা তুলে নিতে পারে ক্ষতি ভরণ করতে। অর্থাৎ সংকট এড়াতে আপনার তিন বছরের ফিক্সড ডিপোজিটের মেয়াদ বাড়িয়ে ৬ বছর করে দিতে পারে যাতে ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত টাকার যোগান থাকে। 

বর্তমান আইনে আপনার আমানতের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে আপনাকে টাকা ফেরত দিতে ব্যাংক বাধ্য। যদি না দেয় আপনি কোর্টে যেতে পারেন। কোর্টে যদি ব্যাংক বলে যে তাদের ফেরত দেওয়ার মত যথেষ্ট টাকা নেই তাহলে ব্যাংকের কর্তারা ওপর কেলেঙ্কারির মামলা হবে এবং সরকার যে কোনো উপায় আপনার টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। নতুন আইনে কিন্তু এই নিশ্চয়তা আর থাকবে না। ব্যাংক টাকা ফেরত না দিলেও আপনি কোর্টে যেতে পারবেন না কারণ আইনেই এই সুযোগ ব্যাংকের কাছে থাকছে। অর্থাৎ যারা ঋণ খেলাপি করলো আর যারা বেপরোয়া ভাবে ঋণ দিলো তাদের ক্ষতি হলো না, হলো সাধারণ আমানতকারীদের। 

এই বিল নিয়ে হই চই শুরু হওয়ায় সরকার এখন বলছে যে নতুন আইনেও ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে সরকার আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেবে, অরুণ জেটলি প্রেস কনফারেন্স করে বলেছেন যে অযথা ভয় তৈরি করা হচ্ছে মানুষের মনে। কিন্তু যেটা উনি বললেন না সেটা হলো যে ব্যাংককে দেউলিয়া ঘোষণা করার ভিত্তিই তো বদলে যাচ্ছে নতুন আইনে। বর্তমান আইনে ব্যাংক আমানতকারীর টাকা সময়মত ফেরত না দিতে পারলেই তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়ে থাকে আর আমানতকারীদের টাকা ফেরতের দায়িত্ব সরকার নেয়। কিন্তু নতুন আইনে তো সময়মত টাকা ফেরত না দেওয়ার রাস্তাই খুলে দেওয়া হচ্ছে ব্যাংকগুলোর সামনে, সময় মত ফেরত না দিলেও তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হবে না এবং তাই সরকারের টাকা ফেরতের দায়িত্ব নেওয়ার প্রশ্নও উঠবে না।

এই অবধি মোটামুটি অনেকেই লিখেছেন, আলোচনা করেছেন মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে। কিন্তু একটা বিষয় এখনো অবধি কোনো লেখায় আমার চোখে পড়েনি। তার আগে সামান্য ইতিহাস। ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার গ্যারান্টি সরকার দেওয়া শুরু করে ১৯৩৩-এ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তার আগে অবধি কোনো ব্যাংক ডুবলে তার আমানতকারীরাও ডুবত, সরকার তাদের টাকা ফেরানোর কোনো গ্যারান্টি দিত না। ১৯৩৩-এ আমেরিকায় পাশ হয় "গ্লাস স্টেইগাল এক্ট।" এই আইনে বলা হয় যে যদি কোনো ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষিত হয় তাহলে সরকার ছোট এবং মাঝারি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার গ্যারান্টি দেবে। সকলেই জানেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা আদ্যপান্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, সেখানে বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থ সব সময় প্রাধান্য পায়। তাহলে এহেন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কেন হঠাৎ ছোট আমানতকারীদের জন্যে উতলা হয়ে উঠলো? না, আমানতকারীদের প্রতি মানবিকতা থেকে আইন বানানো হয়নি, হয়েছিল ব্যাংকগুলোর স্বার্থের কথা ভেবেই। কী রকম? ১৯২০-এর দশকে আমেরিকায় যে ভয়াবহ আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছিল তার মূলে ছিল ব্যাংকের সংকট, তাদের দেউলিয়া হওয়া। কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার মত যথেষ্ট টাকা জোগাড় করতে অক্ষম হয় এবং দেউলিয়া ঘোষিত হয়। সেই ব্যাংকে আমানতকারীরা তাদের সঞ্চয় হারান। এতে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার হয়। সকলেই ভাবতে থাকেন যে কোনো ব্যাংকই বোধয় আর নিরাপদ নয়। সকল আমানতকারী একযোগে সব ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে শুরু করেন, এমন কি যে ব্যাংকে কোনো সংকট নেই সেই ব্যাংক থেকেও। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভীতি সঞ্চার হওয়া আশ্চর্য্যের কিছু না, যদি আপনার প্রতিবেশীর সব সঞ্চয় চোট হয়ে যায় তাহলে আপনিও নিজের ব্যাংকের ওপর সন্দিহান হবেন, আপনার ব্যাংক আলাদা হলেও। যেমন নোটবন্দীর সময় সবাই একসাথে ব্যাংকে দৌড়েছিলো পুরোনো নোট জমা দিয়ে ১০০ টাকার নোট তুলে, সঞ্চয় করে রাখতে যদিও অত টাকার হয়তো তক্ষুনি প্রয়োজন ছিল না। মানুষ ভীত হলে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সব আমানতকারী যদি একসাথে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে যায় ব্যাংক সেই টাকার যোগান দিতে পারবে না কারণ কোনো ব্যাংকই আমানতকারীদের সব টাকা জমিয়ে রেখে দেয় না, বেশিটাই সে ঋণ দিতে ব্যবহার করে। যেহেতু সাধারণত সব আমানতকারী একসাথে একদিনে টাকা তুলতে যায় না তাই আমানতকারীদের সব টাকা ধরে রাখার কোনো কারণ নেই ব্যাংকের, কিছু টাকা রাখলেই রোজের প্রয়োজন মিটে যায়। অতএব সব আমানতকারী একসাথে টাকা তুলতে এলে ব্যাংক যোগান দিতে পারবে না এবং এর ফলে একটা স্বাস্থ্যবান ব্যাংকও সংকটে পড়বে ও দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই প্যানিক রিয়াকশনের ফলে ১৯২০-৩০ এর মধ্যে আমেরিকার অধিকাংশ ব্যাংক সংকটে পড়ে যায়। যাদের আগে কোনো সংকটই ছিল না, শুধুমাত্র ভীত আমানতকারীদের একসাথে টাকা তুলে নেওয়ার ফলে তারাও দেউলিয়া হয়। প্রায় সমস্ত ব্যাংকই ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয় এই ভয়ের চোটে - যে আমানতকারীরা একসাথে টাকা ফেরত চাইলে যোগান দিতে পারবে না যদি সেই টাকা থেকে ব্যবসায়ীদের  ঋণ দেয়। এতে ক্রমশ ব্যবসা বাণিজ্য সব বন্ধ হয়ে যেতে থাকে, চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায় এর নাম হলো "Contagion" অর্থাৎ ছোঁয়াচে রোগ। একটি ব্যাংকের অসুখের ফলে সব ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই এহেন নাম। এই সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক হলো - টাকা ফেরতের সরকারি গ্যারান্টি। সরকার যদি গ্যারান্টি দেয় তাহলে আমানতকারীরা আর প্যানিক করবে না, একসাথে সবাই টাকা তুলতেও যাবে না, এবং সংকট ছড়াবে না। এই এক্ট অব্যর্থ টিকার কাজ করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে সাধারণ আমানতকারীদের কথা ভেবে এই আইন আসেনি, এসেছিল পুঁজিবাদী সংকট থেকে বাঁচতে, ব্যাংকিং সিস্টেমকে সংকট থেকে বাঁচাতে।

যদি এফআরডিআই বিল পাশ হয় তাহলে ব্যাংকের সংকট কমার বদলে উল্টে বেড়ে যেতে পারে। এক্সিস ব্যাংক যদি সংকটে পড়ে ঘোষণা করে যে তারা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না এক্ষুনি, এক বছর পরে ফেরত দেবে, তাহলে অন্যান্য ব্যাংকের আমানতকারীরাও ভীত হয়ে উঠতে পারে যে তাদের ব্যাংকও হয়তো এমন করবে। এই ভয়ের ফলে একযোগে সবাই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়া শুরু করতে পারে। অন্য কোনো ব্যাংক, ধরা যাক পাঞ্জাব ব্যাংক, যে হয়তো কোনো সংকটেই ছিল না, সেও আমানতকারীদের একযোগে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িকে সংকটে পড়ে যাবে এবং এই ভাবে একটা ব্যাংকের সংকট গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে। তাই এই বিলের বিরোধিতা শুধু আমানতকারীরা নয়, যাঁরা এইসব ব্যাংকে চাকরি করেন তাদেরও করা উচিত কারণ এই বিল তাঁদের ব্যাংককেও অনিশ্চয়তায় ফেলে দিতে পারে।