রবিবার, ৫ নভেম্বর, ২০১৭

পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গু ~ সুশোভন পাত্র

ঠিকই  তো বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মশা তো আর সরকারের হাতে নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মশার ডিমও পাড়েন না। খাল কেটে মশা ডেকেও আনেন না। জমা জলেই তো মশা ডিম পাড়ে। কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তো আর পাড়ে না। মশার কামড়েই তো ডেঙ্গু হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিমটি কাটলে তো আর হয় না। আপনার ঘরে মশারি কি মুখ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টাঙ্গিয়ে দিয়ে যাবেন ? নর্দমায় ব্লিচিং পাউডার কি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছড়িয়ে দেবেন?  আরে বাবা, আপনার জ্বর হলে ব্লাডের অগ্নিপরীক্ষা কি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন নাকি ? নো ! নেভার !  
এর পরেও কি আপনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নূন্যতম দায়বদ্ধতা আশা করছেন? নির্বাচিত সরকারের কাছে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রিঅ্যাক্টিভ অ্যান্ড কারেক্টিভ মেসার্স আশা করছেন? মৃত্যু মিছিল থামাতে প্রশাসনিক তৎপরতা আশা করছেন? আপনার ট্যাক্সের বিনিময়ে উন্নত পরিষেবা আশা করছেন? তাহলে কাইন্ডলি কদিন পরে আসুন! আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সরকার এবং প্রশাসন -মৃতের সংখ্যা নিয়ে জটিল অঙ্ক কষতে ব্যস্ত আছেন।  
১২'ই অক্টোবর মনিটরিং কমিটির বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "বেসরকারি কিছু ল্যাবরেটরি বাণিজ্যিক স্বার্থে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছে৷ ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে" ¹। ২৫শে অক্টোবর নজরুল মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ধিত কোর কমিটির বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীই আবার জানালেন "আর পাঁচটা রাজ্যের চেয়ে ঢের ভালো আছে বাংলা। এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা মাত্র ৩৪" ² । আর ৩০শে অক্টোবর নবান্নে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীই সাংবাদিক'দের বললেন "এখন পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গু মৃতের সংখ্যা মাত্র ১৩" ³ ।  
২৫শে অক্টোবরের ৩৪, ৩০শে অক্টোবর হয়ে গেলো ১৩। তাহলে কি ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা রাজ্যে প্রতিদিন কমছে? তাহলে কি 'মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায়' মৃত ব্যক্তি ডেঙ্গু সারিয়ে প্রাণও ফিরে পাচ্ছে? না, এমন বেয়াড়া প্রশ্ন করে মুখ্যমন্ত্রীর গৃহপালিত মিডিয়া সরকার কে বিব্রত করেনি। আসলে, শিলাদিত্যরা জানে, এ রাজ্যে প্রশ্ন করা মানা। অম্বিকেশরা জানে, এ রাজ্যে কার্টুন আঁকা মানা। আর ডাঃ শ্যামাপদ গড়াইরা জানে, এ রাজ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানা। 
 ২৬শে মে, ২০১১। 'পরিবর্তন' তখন টাটকা। মহাকরণের রুট বদলে সেদিন গাড়িটা সটান থেমেছিল বাঙ্গুর হাসপাতালে। স্বাস্থ্য পরিষেবা সরজমিনে পরিদর্শন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে গণ্ডা খানেক মন্ত্রী। ডজন খানেক পারিষদ। এবং শ-খানেক সাংবাদিক। 
মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন শুনে ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে পৌঁছন বাঙ্গুরের নিউর সায়েন্সে ডিপার্টমেন্টের অধিকর্তা ডাঃ গড়াই। শুরু হয় র‍্যাপিড ফায়ার রাউন্ড। "এম.আর.আই করতে দেরি হয় কেন?", "স্যালাইন ওয়াটারের সাপ্লাই নেই কেন?", "আউটডোরে লম্বা লাইন কেন?" – আফটার অল সি.পি.এম'র পরিত্যক্ত বাঙ্গুর তো; নবাগতা মুখ্যমন্ত্রীর তাই অভিযোগের লম্বা লিস্টি। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অপ্রত্যাশিত ভিড়ে রোগীদের অসুবিধা হবে বুঝে, মুখ্যমন্ত্রী কে বসে আলোচনার প্রস্তাব দেন ডাঃ গড়াই। বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন ,"আমি এসেছি বলে আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে? আপনি ফাইল নিয়ে কাল মহাকরণে দেখা করুন।" ডাঃ গড়াই সেদিনই জানান সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা অবধি অপারেশনের শিডিউল রয়েছে, 'কাল' দেখা করা সম্ভব নয়। আর তারই হাতে গরম জবাব দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যুৎ গতির তৎপরতায় রাতেই সাসপেন্ড হন ডাঃ গড়াই। পরিবর্তন দাদা পরিবর্তন ! 'ডু ইট নাও' থেকে 'সাসপেন্ড হিম টু-নাইট' ⁴ !
বড্ড ভুল করেছিলেন ডাঃ গড়াই। অপারেশন ছেড়েই মহাকরণে যাওয়া উচিত ছিল। গলায় গামছা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কে 'আপনি-আজ্ঞে' করা উচিত ছিল। ডাঃ গড়াই'র বোঝা উচিত ছিল, পরিদর্শনের নামে সেদিনের সারপ্রাইজ ভিজিটটা আসলে আপাদমস্তক রাজনৈতিক ব্রাউনি পয়েন্ট কুড়ানোর গিমিক। না হলে আজকে যখন ডেঙ্গু আক্রান্তদের ভিড়ে সরকারী হাসপাতালের বারান্দা উপচে পড়ছে;  কেন্দ্রীয় ভেক্টরবোর্ন ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের নির্দেশাবলী যখন ছত্রে ছত্রে অমান্য হচ্ছে;  চিকিৎসক সংগঠন যখন পৃথক কমিশন গঠন করে সত্য প্রকাশ্যের দাবি জানাচ্ছে ⁵; হাইকোর্ট যখন ডেঙ্গু পরিস্থিতির রিপোর্ট তলব করছে  ⁶; তখন মুখ্যমন্ত্রী 'স্বাস্থ্য পরিষেবা সরজমিনে' পরিদর্শন তো দূর বরং পায়ের উপর পা তুলে সাংবাদিক সম্মেলনে মৃতের সংখ্যা নিয়ে জাগলারি করছেন। আর অ্যাডিস মশাতে'ও সিপিএম'র ভূত দেখছেন ² ।
মুখ্যমন্ত্রী আপনিই ঠিকই বলেছেন কেরালা'তে সি.পি.এম'ই আছে। ডেঙ্গু'ও হয়েছে। লোক'ও মরেছে। কিন্তু আপনি যখন মৃত্যু কে ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত, তখন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "এই বিপর্যয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দলের একসাথে কাজ করা জরুরী। প্রাইভেট হাসপাতালের ডাক্তার'দের সরকারী হাসপাতালে পরিষেবা প্রদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। সকল মিডিয়া কে সচেতনতা মূলক প্রচার শুরু করতে অনুরোধ করছি। জন প্রতিনিধি'রা এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষক'রা 'ক্লিন কেরালা' প্রোগ্রামের নেতৃত্ব দিন। আমরা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সমাজের প্রত্যেকের অংশগ্রহণ ছাড়া সেই যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়" ⁷ ⁸ । আর সেই সার্বিক প্রচেষ্টা'তেই আপাতত বিপদমুক্ত কেরালা। অগাস্ট অবধি যেখানে ডেঙ্গু তে মৃতের সংখ্যা ছিল ২৮, সেখানে গত দু মাসে নতুন করে কাউকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মরতে হয়নি কেরালায় ⁹ ¹⁰ । 
ডিয়ার মুখ্যমন্ত্রী, ডেঙ্গু কে 'মহামারী' ঘোষণা করলেও আপনার ভোট ব্যাঙ্ক অক্ষতই থাকতো। 'অজানা জ্বরে'র জায়গায় ডেঙ্গু লিখলেও পঞ্চায়েত ভোট আপনার দলই জিতত। সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাহায্য চাইলেও আপনার সম্মান বলবৎ'ই রইত। প্রশাসনিক তৎপরতায় কটা প্রাণ বাঁচলে মানুষ আপনাকে আশীর্বাদই করত। কিন্তু আমরা জানি, আপনি এসব কিছুই করবেন না। করবেন না, কারণ ঘোলা করে জল খাওয়া আপনার পুরনো অভ্যাস। জ্ঞানেশ্বরী থেকে ডেঙ্গু -সিপিএমের ভূত দেখা আপনার পুরনো অভ্যাস। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে লাশ কুড়ানো আপনার পুরনো অভ্যাস। শুধু মনে রাখবেন, বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ জমিয়ে সিন্ধু গড়ে গদি উল্টে দেওয়া কিন্তু আমাদেরও পুরনো অভ্যাস। গিমিক সর্বস্ব রাজনীতি কে নবান্নের চোদ্দতলা থেকে মাটিতে নামিয়ে আনা কিন্তু আমাদেরও পুরনো অভ্যাস। আর লাশ কুড়ানো স্বৈরাচারী শাসক'দের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা কিন্তু ইতিহাসেরও পুরনো অভ্যাস।