শুক্রবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৭

BPMO জাঠা ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

তো, কমিউনিস্ট পার্টি আসলে কী? কেমন ছিল আমাদের যাদবপুর বেহালা টালিগঞ্জ কসবা অঞ্চলের পার্টির গল্পগুলো? পার্টি বলে কি আসলে কিছু ছিল? না কি পুরোটাই এক মায়াম্যাজিক? ছিল একমাত্র আমাদের স্বপ্নে, অথবা মাথার ভেতরে? এক অসঙ্গেয় অতিকথা হয়ে? 

বেশির ভাগ সময়ই একে একে দুই হয় না। মড়ার খাটের তলায় কে বোমার বস্তা ফেলে থাকে আমরা জানতে পারি না। জানি না কখন বেমক্কা খালি বন্দুক থেকে গুলি ছুটে খোপরি ফাঁক করে দেবে । আমাদের মগজে এই হিসেবগুলো মিলতে চায় না। একে একে দুইয়ে অভ্যস্ত মগজ বিব্রত হয়। ঘেন্না, রাগ, ভয়, ভালোবাসা, বিশ্বাস- সব মিলেমিশে এই রাজনৈতিক প্রবচনের কোন খোপে আমাদের চেনা যুক্তি আর কোথায় সেই অচেনা বোধ কাজ করে- ঠাহর হয় না। আমাদের গুলিয়ে যায়- ধর্ম। রাজনীতি। নৈতিকতা। বিশ্বাস। বিশ্বাস। এবং বিশ্বাস। নিটোল ক্ল্যাসিফিকেশন এবং নিখুঁত কম্প্যারিজন আমাদের স্বস্তি দিত- কিন্তু বেওয়াফা ইতিহাস সেই আরামটুকু দেয় না।

অশোক মিত্র একে বলেন পরিবৃত্ত- পার্টির পরিবৃত্ত। গত চল্লিশ পঞ্চাশ বছর ধরে পারিবারিক অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে, গোষ্ঠীগত লোককথা সম্বল করে, একসঙ্গে ইতিহাসের আঁচে বদলাতে বদলাতে গড়ে ওঠা এক পরিবৃত্ত। এখন কেউ দলছুট, কেউ নিরলস, কেউ বা ক্লান্ত, কেউ নিস্পৃহ- যেরকম হয় ইতিহাসে। যেরকম ভাবে মাকন্দো গড়ে উঠেছিল, এবং ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু এই বিভিন্ন পথে চলে যাওয়া আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো জড়ো হতে হতে যে যৌথ ইতিহাস তৈরি হয়েছে সেটা এই পরিবৃত্তের সবার কাছেই একটা রেফারেন্স ফ্রেম। প্রাইভেটে পাশ করা রিফিউজি বাপকাকা, ঘোর দারিদ্র্যের মধ্যে সবকিছু ছেড়ে ঝাণ্ডা হাতে পথে নামা, আবার হয় তো শান্তিকল্যাণ এলে নিশ্চুপে কোটরে ফিরে আসা, কংগ্রেসি গুন্ডাদের আক্রমণে ফেলে আসা ধ্বস্ত ঘরদুয়ার, বুককেসে এখনও সারি সারি হালকা সবুজ মলাটের  কালেক্টেড ওয়ার্ক্স অফ ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সাদা লাল মলাটে দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, পার্টি অফিসে জড়ো হতে থাকা ফড়ে দালালদের ছায়াপুঞ্জ। এই যৌথ ইতিহাসের উত্তরাধিকার, আমরা- এই পরিবৃত্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেকে  বহন করি। জ্ঞানে ও অজ্ঞানে আমাদের রাজনৈতিক সত্তায় এই ইতিহাস ছায়া ফেলে- আপাতত: উল্টোপথে চলা প্রাক্তন কর্মী, বা ক্রমশ: নির্জন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ কমরেড, কিম্বা ইদানীং ডান বা বাম কোনোদিকেই না থাকা সফল পুরুষটি- কেউই এই উত্তরাধিকার থেকে মুক্ত হতে পারি না। এই উত্তরাধিকার ঘেন্না-রাগ-ভয়-নিস্পৃহতা, এবং সর্বোপরি ভালোবাসার ইতিহাস- বাস্তবের ইতিহাস এবং ম্যাজিকের ইতিহাস- যুক্তির নিয়মমাফিক প্রকোষ্ঠের বারমহলে এই ইতিহাসের আনাগোনা। কেই বা জানে কেন এখনও ঠাকুরদার ফেলে যাওয়া চশমা, ট্রাঙ্কে তোলা আম্মার পুরোনো শাড়ির গন্ধ, ষাট সালে রাস্তা থেকে বাবার কেনা ফুটনোটসম্বলিত জেম্‌স জয়েস আমাদের ভালোবাসার শেষ সম্বল!

জীবনের সব ভালোবাসা এবং বিষাদ খুব ভেবেচিন্ত হিসেব করে হয় না। রাজনীতিও না। পিতৃপ্রেম এবং পিতৃদ্রোহ- দুইই একে অন্যের হাত ধরাধরি করে চলে। পঞ্চাশ ষাট  বছর ধরে বৌদ্ধিক সত্তায় , এবং প্রাত্যহিক জীবনচর্যায় আঁকশিলতার মতো জড়িয়ে যেতে থাকে এতদিন শুনে আসা যাবতীয় অতিকথা, কাহিনী এবং প্রবাদ। যে সময় পেরিয়ে আসতে হয়েছে সেই সময়ের হাত এড়াবার স্পর্ধা কারই বা থাকে? মায়া রহিয়াই যায়। এই মায়ার কোনো ইউনিভার্সালিটির দাবী নেই। যাদের ছুঁয়ে থাকে তাদেরই ছুঁয়ে থাকে। এই মায়ার কোনো লোক জড়ো করার তাগিদ নেই, অন্যকে দলভুক্ত করার ইচ্ছা নেই। পার্টিগত রাজনীতির হৈচৈ উল্লাস রক্তপাতের সীমানার বাইরে এই মায়া নিয়ে আমরা মরে যেতে থাকি।

(ভেবেছিলাম জাঠা নিয়ে লিখব। হল না। পার্টির  ভেতরে বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সামান্য সমর্থকের মাথার ভেতর অবিরত বহমান জাঠা নিয়েও লেখার কেউ থাকুক। যদিও সঙ্গের ছবিটি এক ভোরবেলার গ্রামের পথে জাঠারই ছবি। বাকিটা ব্যক্তিগত, হয়ত বা )