মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭

শীত ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

বছর শেষ হতে চললো, আমরাও আরেকটু এগিয়ে চললাম আমাদের শেষের দিকে। হালকা টান পড়ছে চামড়ায়, সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রীম বোরোলীন আর মহার্ঘ অলিভ অয়েলে সেজে উঠছে ড্রেসিং টেব্‌ল। বচ্ছরকার অতিথি এল বলে। চারদিকে তাকালেই দিব্যি মালুম হচ্ছে। অর্ধেক পাতা-ঝরা গাছগুলো হাত-পা ছড়িয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে পার্কের কুয়াশাভেজা বেঞ্চের পাশে। লাল,সবুজের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর ক'দিন বাদেই দেখা যাবে আপামর বাঙ্গালীর মাঙ্কিক্যাপে। গেরুয়াও চোখে পড়বে ইতি-উতি। তবে এসব বাদ দিলেও যে ব্যাপারটায় আমি আশ্চর্য হই, যে শীতকালে যেন শব্দরা বড্ড বেশী জীবন্ত হয়ে ওঠে। গভীর রাতে যখন টুপ্‌টাপ্‌ ঝরে পড়ছে শিশির ফোঁটা, একটা অস্পষ্ট শব্দ যেন শুনতে পাই। দূরে ডেকে ওঠা কোন একলা কুকুর বা সমবেত সারমেয় উল্লাস ফেলে যাওয়া বিবাহনুষ্ঠানের উচ্ছিষ্ট ঘিরে -- সব যেন বড় বেশী উচ্চকিত। মাঝরাতে কোন ডায়াবেটিক রুগীর বাথরুম ব্যবহার করার ছ্যাড়ছ্যাড়ানি, রাতটাকে উলঙ্গ করে দিতে চায়। জলের আওয়াজ এত কদর্য, অশ্লীল? কই, আগে তো কখনও খেয়াল করিনি! প্রতিবেশীর শীৎকার কান জ্বালিয়ে দ্যায়, অন্যসময় কিন্তু শুনতে পাইনা। তার মানে কি ওরা শুধু শীতকালেই...? ধুর, মরুগ্‌গে, কানের ওপর বালিশ চেপে ধরে মানসিক শান্তি ও শালীনতা বজায় রেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করি।

এই শীতকাল এলেই যত রাজ্যের উদ্ভুট্টি চিন্তা আসে মাথায়। একদিকে কত মেলা, হস্তশিল্প, বস্ত্রশিল্প, সস্তাশিল্প, মহার্ঘশিল্প ইত্যাদি প্রভৃতি... আর অন্যদিকে দ্যাখো, রোগা রোগা চেহারার কেলে-কুচ্ছিত কতগুলো বাচ্চা নোংরা, খড়ি-ওঠা জেব্রা ক্রসিং মার্কা হাত বের করে কেঁদে-ককিয়ে ভিক্ষে চেয়েই চলেছে। ব্যাটাচ্ছেলেরা আবার ইন্টেনশ্যানালি ঠিক ওই মেলার গেটগুলোর কাছেই দাঁড়িয়ে থাকবে। ক্যানো বাপু? ইদিক-উদিকে গিয়েও তো দাঁড়াতে পারে, তা'লে অন্তত এই 'ইমোশন্যাল অত্যাচার' থেকে বাঁচা যায়। আবার উত্তুরে হাওয়ায় হি-হি করে কাঁপছে দ্যাখো! বলি কী-ই বা এমন শীত পড়ে কলকাতায়? যেতিস যদি এই সময় দার্জিলিং বা সিকিম, ভুটান... কী করতিস? এই যে... এই দ্যাখ আমার ইম্পোরটেড ফার-কোট (গরম লাগে বটে এখানে গায়ে চাপালে কিন্তু তাও লোকে তো টেরিয়ে দ্যাখে, সলিড জিনিস) এতেও ঠান্ডা শানাতোনা।

তারপর ধরো যে এই ঠান্ডার সময়েই তো একটু খেয়ে-পরে আরাম আছে এই শহরে, শীতের উষ্ণতায় একটা বেশ মন-ভাল-করা আমেজে চট করে ফুরিয়ে আসা বিকেলগুলোতে বেরিয়ে পড়েছি হয়তো। কিন্তু দ্যাখো কান্ড, যেই দুপুরটা বিকেলের হাত ছুঁইয়েই সন্ধ্যার গায়ে এলিয়ে পড়ে, ঠিক তক্ষুণি মনে পড়ে যায় এইরকম ...ঠিক এইরকম একটা না-বিকেল-না সন্ধ্যা সময়েই ঠাম্মা বলে উঠেছিল,"শালখান আমার গায়ে জড়্যাইয়া দে কেউ, যাওনের সময় অইলো গিয়া"। ব্যস্‌ , বুড়ির শেষ বলা ডায়লগ যেই মনে পড়া, অমনি দ্রুত জুম-আউট হতে থাকে, নীল-সাদা ব্রীজ, রোশনাই ওয়ালা সারি সারি দোকান...কিচ্ছুটি আর হাতছানি দ্যায়না...স-অ-ব ঝাপসা। নিজেকেই খিস্তাতে ইচ্ছে করে। যাচ্ছিস একটা ফান-ড্রাইভে...এই সময় সেন্টিমেন্টের ঠাম্মা-দিদা না করলেই নয়? যত্ত সাব-অল্টার্ন ন্যাকামো!

তবুও শীতার্ত উত্তাপ ছড়ায় ধমনীতে। কেঁদুলীর মেলায় বন্ধুদের সঙ্গে নিষিদ্ধ উত্তেজনা, ''চোখ বন্ধ করে টান মার, বাবার প্রসাদ...কিস্যু হবে না ...আগুন-লাগানো ঘাস জাস্ট" ...তারপর কাশতে কাশতে প্রায় টিবি রুগী...সম্মোহিতের মত বসে সারারাত বাঊল গান, অজয়ের ওপর কুয়াশার মসলিন মায়াজাল।এক চোখ বিষণ্ণতা নিয়ে বসে থাকা এক সদ্য যুবতী, জীবনানন্দ... সেই যে, "এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা, কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।"  আমি? আমি-ই ছিলাম নাকি ওটা? নাকি অন্য মৃত্যু কোনো...কে জানে। স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে মাঘ, এই ভরা মাঘ। এইজন্যেই বিচ্ছিরি লাগে। বড্ড বেশী বিবর্ণ যেন চারপাশ। রঙচঙে মোড়ক কত, সযত্নে সরিয়ে রাখা মনখারাপ, তবুও ন্যাপথলিন আর একফালি পুরনো রোদের গন্ধমাখা নস্ট্যালজিয়া উঁকি দেবে, দেবেই। এইখানেই বোধহয় জিতে যায় এই বেয়াড়া ঋতুটা, পুরো প্রকৃতিটাকেই ডিফ্লাওয়ার করে দেওয়া, উদ্দাম, নির্মম এক সন্ন্যাসী। কুরে কুরে বের করে নিয়ে আসা আচমকা একরাশ যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে লেপের ওমের ভেতর দুটো শরীর এক হয়ে যায়। বসন্ত নয়, শীতকেই প্রেমের শিরোপা দেওয়া উচিৎ আমার মতে, আফটার অল,"Nothing burns like cold"।

আর সেই যে না-খেতে-পাওয়া, ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া চেহারাগুলো? ওদের কথা মনে পড়েনা আর। ক্রিসমাসের 'জিংগল বেল' আর কেক, নিউ ইয়ারের উদ্দাম ফূর্তির মাঝে কোথায় ওরা? আবার কোন এক দিন...সিগ্‌ন্যালে থেমে যাওয়া গাড়ীর পাশে উদয় হবে, কয়েক মুহূর্তের অপরাধবোধ আর মন-খারাপের উস্কানি। ব্যস্‌, আবার কী? শীত তো চলেই গেল...