সোমবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৭

মশা ও ডারউইন ~ আর্কাদি গাইদার

মশাদের জগতে একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটে চলেছে। ধরুন প্রথম যখন মশা মারবার জন্যে মানুষ কোন কীটনাশক আবিষ্কার করলো। সেই সময় যত মশা ছিলো তার মধ্যে ৯৫% এর ওপর এই কীটনাশক কাজ করে। বাকি ৫% এর ওপর করে না। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের আগে এই ৫%কে সেই ৯৫% এর সাথে প্রতিযোগীতা করে টিকে থাকতে হতো। মশার জগতে তাদের অনুপাতও ওই ৫% এর আশেপাশেই থাকতো। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের পরে এই ৯৫% এর মধ্যে অনেক মশা ধ্বংস হতে শুরু করলো। একটা পরিসরে তখন এই ৫% যারা ছিলো, তাদের বৃদ্ধি ঘটতে শুরু করলো। বেশ কিছু প্রজন্ম পরে দেখা গেলো যে ওই ৫% কীটনাশক-প্রতিরোধী মশারা বৃদ্ধি পেয়ে এখন সংখ্যাগুরু। তাই মশা ধ্বংস করবার কাজে ওই কীটনাশকের উপকারিতা নিম্নগামী। এখন মানুষকে নতুন কীটনাশক তৈরি করতে হবে। 
এই হলো Darwinism. এইতো কয়েকদিন আগেই বিজেপির অঘোষিত মুখপত্র 'স্বরাজ্যম্যাগ' একটি সম্পাদকীয় লিখে আমাদের আলোকিত করলো - বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার নাকি আমাদের ওপর এই Darwinism প্রয়োগ করতেই একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। সরকার চায় এই 'চ্যালেঞ্জ'গুলোর দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে দেশের মানুষ শক্তিশালী হোক, উন্নততর হোক। আমাদের কান্নাকাটির কোন মানে নেই। কারন সবশেষে, এই সুবিশাল Darwinian experiment এর পর, যে মানুষগুলো টিকে থাকবে, তারা হবে fittest. যেটা উহ্য রাখা হয়েছে, সেটা হলো যে যারা fittest না, তাদেরকে এই এক্সপেরিমেন্টের স্বার্থে খরচের খাতায় ফেলতে হবে। তারা expendable. কারন তারা যথেষ্ট fit নয়।
Darwinism কে সহজভাবে বোঝাতে অনেকেই survival of the fittest বলে এক লাইনে অভিহিত করেন। এটা বৃহৎভাবে ভুল বোঝাপড়া। Darwin নিজে কোনদিন এই লাইনটা ব্যাবহার করেননি। ওনার থিওরীকে যদি এক লাইনে প্রকাশ করতেই হয় - তাহলে সেটা হতে পারে survival of the most adaptable. কিন্তু ডারউইন নিয়ে বিতর্কের জন্যে এই লেখা না। এই লেখা মশা আর কীটনাশক নিয়ে। 
মশা - যার নাম সোনিকা কুমারী। ১১ বছর বয়স। দূর্গা পুজোর ছুটি বলে স্কুল বন্ধ। মিড ডে মিল নেই। আধার কার্ড নেই বলে বাড়িতে রেশন বন্ধ হয়ে গেছে। ৮দিন অভুক্ত থেকে মারা গেছে। 
 যদিও সুপ্রীম কোর্ট রায় দিয়েছে যে আধার কার্ডের সাথে কোনরকম বেনিফিট লিংক করা যাবে না। তাও। কারন উন্নততর দেশ বানানোর লক্ষ্যে সুপ্রীম কোর্ট, সোনিকা কুমারী, এদের নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। কীটনাশক তৈরি আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা একের পর এক কীটনাশক তৈরি করে যাবো। এবং প্রতিবার যারা টিকে থাকবে তাদের জন্যে তৈরি হবে নতুন কীটনাশক। নোটবন্দী। আধার। জিএসটি। সব শেষে যারা টিকে থাকবে তারাই হবে উন্নততর ভারতের উন্নততর নাগরিক। তাদের বেচে থাকতে রেশন লাগবে না। গ্যাসে ভর্তুকি লাগবে না। চাষে নূন্যতম মূল্য নির্ধারন লাগবে না। সারে ভর্তুকি লাগবে না। মিড ডে মীল লাগবে না। ১০০ দিনের কাজ লাগবে না। হাসপাতালে অক্সিজেন লাগবে না।
তাদের শুধু লাগবে ১০০ কোটি টাকার রামমূর্তি। তার পদতলে বসে তারা গান করে, আড্ডা মেরে, হাওয়া খেয়ে সুখে দিন কাটাবে। আর লাগবে আধার কার্ড। মরার পর গলায় কার্ড ঝুলিয়ে চুল্লিতে বা কবরে প্রবেশ করবে। সোনিকা কুমারীর যদিও আধার কার্ড নেই। তাই না খেয়ে মরে গেছে। আপাতত সরকারি ব্যাবস্থায় দাহও করা যাবে না বোধহয়। চলুন স্লোগান তুলি - জয় শ্রী ডারউইন।