মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

স্বাধীনতা ~ আর্কাদি গাইদার

স্বাধীন ভারতের ধারনা নিয়ে দ্বন্দ্ব বহুদিনের।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে স্বাধীনতার জন্যে যারা লড়েছিলেন, তাদের প্রত্যেকের মাথার মধ্যে স্বাধীন ভারতের ধারনা সম্পর্কে অবশ্যই আলাদা মতামত ছিলো। ভগত সিং যেই স্বাধীন ভারতের ধারনা মাথায় নিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলেন, আর গান্ধী যে স্বাধীন ভারতের ধারনা বুকে নিয়ে গডসের গুলি খেয়েছিলেন, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ে সূর্য সেনের নেতৃত্বে যেই সুবোধ রায়, অম্বিকা চক্রবর্তী, গনেশ ঘোষ আর লোকনাথ বল একইসাথে কাধে কাধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশদের তাক করে রাইফেল ছুড়েছেন, স্বাধীন ভারতে তারাই কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট - দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে একে অপরের বিরোধী হয়ে রাজনীতি করেছে্ন, ভারত নিয়ে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে।

আমরা, স্বাধীন ভারতের নাগরিক যারা, প্রত্যেকেই হয়তো আমাদের এই দেশের কাঙ্খিত চরিত্র সমন্ধে ভিন্ন ধারনা পোষণ করি। এবং এই ভিন্ন ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে হয়তো আমরা অনেকেই নিজেদের স্বল্প পরিসরে কোনরকম ভূমিকা পালন করবার চেষ্টা করি। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে, আমরা যারা ধারনার জগতে একে অপরের বিরোধী, তারাই আবার সহযাত্রীও বটে। কারন স্বাধীনতা তো কোন গন্তব্য নয়, স্বাধীনতা তো যাত্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে যারা লড়ে স্বাধীনতা আনলেন, তারা একটা অধ্যায় সমাপ্ত করলেন, এবং স্বাধীনতা যাত্রার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করলেন। এই অধ্যায়ের অনেক বৈরিতার মধ্যেও একটা ধারনা অবিচল রয়েছে - বহুত্ববাদ। আর এই বহুত্ববাদের বিরোধী ভারতের ধারনা যাদের, তারা কেউই স্বাধীনতার জন্যে বিশেষ লড়াই করেননি, মুচলেকা লিখে আর ব্রিটিশদের দালালি করে সময় কাটিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের উদ্দ্যেশ্যে লড়াই করা সৈনিকদের ইতিহাসের ভার যদি আমরা স্বেচ্ছায় বহন করবার দায়িত্ব নিই, তাহলে তাদের ভারতের ধারনা যা এই ইতিহাসের মধ্যে প্রবহমান, তাকে আমরা অস্বীকার করি কি করে?

স্বাধীন ভারতের ধারনার লক্ষ্যে আজকে ভারতের বুকে লং মার্চ করছেন কানহাইয়া কুমার এবং তার কমরেডরা, তাদের সাথেই পা মেলাচ্ছেন সদ্য আন্দামান থেকে ফিরে তেভাগার বিদ্রোহ সংগঠির করা সুবোধ রায়, স্লোগানের কোরাসে গলা শোনা যাচ্ছে মাষ্টারদা সূর্য সেনের।
গুরগাঁও তে মারুতি কারখানার যে শ্রমিকরা ইউনিয়নের অধিকারের দাবিতে স্ট্রাইক করে জেল খাটছেন, তাদের সাথেই জেলের ভেতর  ভগত সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত বসে ১৯২৯ এ ট্রেড ডিসপুট এক্ট পাশ করবার দিন এসেম্বলিতে বোম মারবার গল্প শোনাচ্ছেন। 
গুজরাটে আহমেদাবাদ থেকে উনা অবধি দলিতদের মহামিছিলের শেষে জিগ্নেশ মেওয়ানি স্টেজে উঠে যখন দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষনা করছেন - 'তুমহারা মাতা তুম রাখো, হামে আপনি জমিন দো', তখন আকাশে ছোড়া হাজারটা মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের মধ্যে একটা হাত আম্বেদকারের। 
বস্তারে শোনি সোরি যখন কর্পোরেট মাফিয়ার হাতে আদিবাসীদের জল-জমি লুঠের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কোন এক থানায় পুলিশের হাতে অত্যাচারিত হয়ে এক কোনে রক্তাত, ক্ষতবিক্ষত, খুবলে নেওয়া দেহ নিয়ে পড়ে আছেন, তখন ওই একই সেলে বন্দী মিত্রর কোলে নিজের কোলে তার মাথা টেনে নিয়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
আগামী নভেম্বরে দিল্লিতে শ্রমিকদের ধর্ণা এবং লাগাতার ধর্মঘটের আহ্বানের সময় সেই মঞ্চের ওপরেই বসে মুচকি হাসবেন নৌবিদ্রোহের সময় বোম্বেতে ধর্মঘট করা শ্রমিকরা। মঞ্চ থেকে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়বেন সাত এর দশকে শিবসেনার হাতে খুন হয়ে যাওয়া কমরেড কৃষ্ণ দেশাই। 
দিল্লি ইউনিভার্সিটির পিঞ্জরা তোড় আন্দোলনের মেয়েরা যখন পুলিশ আর এবিভিপির হাতে মার খাবে দেশদ্রোহী হিসেবে, তখন তাদের সাথে কয়েকটা লাঠির বাড়ি পড়বে প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার আর কল্পনা দত্তর মাথাতেও।
বাংলার বন্যায় যখন ছাত্র, ছাত্রী, যুবক, যুবতীরা ত্রান সংগ্রহ করে পৌছে যাবে জলমগ্ন দুর্গম অঞ্চলে, তখন জলের মধ্যে তাদের হাত ধরে থাকবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ত্রানের কাজ করা পিপলস রিলিফ কমিটির অরুনা আসফ আলি, মুজফফর আহমেদরা।
দেশের দিকে দিকে দাঙাবাজ এবং খুনিরা যখন নখ দাত বার করে ঝাপিয়ে পড়বে, তখন সাধারন মানুষকে প্রতিরোধের তালিম দেবেন ট্রাম শ্রমিক মহম্মদ ইসমাইল, তেলেঙানার সামরিক প্রশিক্ষক মেজর জয়পাল সিং।
গোরখপুরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে খুন হয়ে যাওয়া ৯০টি শিশুর রক্তের হিসেব চাইতে একদিন আগুন জ্বলে উঠবে। খুনিদের কাছে হিসেব চাইতে পৌছে যাবে একদল তরুন তরুনী, তাদের হাতে পিস্তল তুলে দেবেন জেনারেল ডায়ারের ঘাতক শহীদ উধম সিং।

স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের বর্তমান অধ্যায়ে এই নাগরিক চরিত্রগুলো যখন দেশ জুড়ে তাদের ভারতের ধারনা কে বাস্তবায়িত করতে মাঠে নেমেছে, 'আজাদি'র যাত্রায় সহযাত্রী হয়েছে, তখন আমরা সহনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার এই যাত্রা কে মহাড়ম্বরে উদযাপন করবো না কেন? আমরা প্রত্যকেই তো লড়ছি এই আজাদির জন্যে - আমাদের ভারতের ধারনা কে রক্ষা করবার জন্যে। এই স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা দেবেন যে প্রধানমন্ত্রী, তিনি এমন একটি সংগঠনের সদস্য যারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শুধু খাতায়-কলমে বিরোধিতাই করে থামেননি, মাঠে নেমে তার বিরুদ্ধে লড়েছেন,  এই দেশের পতাকা, সংবিধান কোনটাকেই স্বীকৃতি দেননি। স্বাধীন ভারতের যাত্রায় পায়ে পা মেলানোর এই সন্ধিক্ষনের মুহুর্তের ডাকে সাড়া দেবো না? 

আজাদির যাত্রা থামবে কেন?