শুক্রবার, ১১ আগস্ট, ২০১৭

যাদবপুর ও ছাত্রসমাজ ~ আর্কাদি গাইদার

আজ সারারাত যাদবপুর ইউনিভার্সিটি জাগছে। তারা ধর্নায় বসেছে।
কেন? 
কারন আমাদের রাজ্য সরকার একটি নতুন আইন আনছে। সেই আইনে বলা আছে যে কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ইউনিয়ন বলে কিছু থাকবে না। কোনরকম গনতান্ত্রিক নির্বাচন হবে না। কোনরকম সংগঠনের ব্যানার থাকবে না। 
তাহলে কি হবে?
স্টুডেন্টস কাউন্সিল নামে এক প্রহসন। যেখানে কলেজ কতৃপক্ষ নিজেরা কয়েকজন ছাত্রকে মনোনীত করবে এই কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে। সেই ছাত্রদের দ্বারা গঠির স্টুডেন্টস কাউন্সিল ছাত্র ইউনিয়নের জায়গা নিয়ে তাদের ভূমিকা পালন করবে।

আমাদের রাজ্য সরকারকে কিন্তু কেউ বোকা বলতে পারবে না। তারা জানে যে তাদের এরকম আইনের ব্যাপারে এই রাজ্যের বৃহত্তর ছাত্রসমাজের কিছুই যায় আসে না। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, এবং আরও কয়েকটা হাতেগোনা কলেজে মোটামুটি গনতান্ত্রিক পরিবেশ কিছুটা হলেও বজায় আছে, সেখানে ছাত্ররা সুষ্ঠুভাবে তাদের গনতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে ভোট দেয়, সংগঠনগুলো ক্যাম্পেন করে, ইউনিয়নের সদস্যরা নির্বাচিত হয়। এর বাইরে শহর এবং জেলার বিভিন্ন কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন একটা হাস্যকর ব্যাপার। গত ৬ বছর ধরে তৃণমুল ছাত্র পরিষদ নামক সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন এর ধারনাকে একটি ছেলেখেলায় পরিনত করেছে। কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে ইউনিয়ন মানে তৃণমুলের গুন্ডাদের দাদাগিরি, ঘুষচক্র, গোষ্ঠীদ্বন্দ, মারামারি, তোলা, ছাত্রীদের যৌন হেনস্থা। সুতরাং তাদের কাছে যদি বলা হয় যে রাজনৈতিক ইউনিয়ন উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় ব্যানারহীন কাউন্সিল আসবে, তারা কোনরকম দুঃখ তো পাবেই না, বরং উলটে আনন্দিত হবে।
এখানে বলে রাখা ভালো, আপনারা বলবার আগেই, যে আগের আমলে বিভিন্ন কলেজে এস এফ আই'র সময় কি স্বর্গরাজ্য ছিলো? একদম না। এই দাদাগিরি, ইউনিয়নের ভোটের নামে প্রহসন, মারামারি এইসব ছাত্র ফেডারেশন বা অন্য কোন রাজনৈতিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও ছিলো। কিন্তু তার সাথেও যেটা ছিলো, এসবের মধ্যেই, সেটা হলো কিছুটা হলেও ছাত্র রাজনীতি। মানে ছাত্রদের নিজস্ব দাবিদাওয়া, ইস্যু, শিক্ষাক্ষেত্রের পলিসি, এবং বৃহত্তর সমাজের ইস্যু নিয়ে লড়াই আন্দোলন। এই ইস্যুগুলো নিয়ে মোটামুটি এই দেশের বা রাজ্যের সমস্তরকম ছাত্র সংগঠন, কখনো না কখনো লড়াই আন্দোলনে যুক্ত থেকেছে। এমনকি সংঘ পরিবারের সংগঠন এবিভিপিও বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে লড়াই আন্দোলন করেছে। তাদের সেই ইস্যু বা স্ট্যান্ডের আমি বিরোধী, কিন্তু তার মধ্যে যে রাজনীতি আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। 
ব্যাতিক্রম একটা মাত্র ছাত্র সংগঠন। তৃণমুল ছাত্র পরিষদ। গত ৬ বছরে রাজ্য বা দেশের কোনরকম ছাত্রদের ইস্যু নিয়ে তাদের কোনরকম লড়াই বা আন্দোলন দেখা যায়নি। এমনকি কোনরকম স্ট্যান্ড বা বিবৃতিও দেখা যায়নি। রিসার্চ গ্রান্ট থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট, এইসব বিষয়ে নিয়ে তারা কোনদিন মাথা ঘামায়েনি। তারা ব্যাস্ত থেকেছে ঘুষ নিতে, তোলা তুলতে বা ইভটিজিং করতে। এরকম অদ্ভুত একটি 'ছাত্র সংগঠন' গত ৬ বছর ধরে আমাদের রাজ্যের সিংহভাগ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাঁকিয়ে বসে আছে, তার খুব স্বাভাবিক ফল হবে যে এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ধারনা হবে যে এই রাজনীতির থেকে অরাজনীতি ভালো। 
সার্বিক ভাবে আমাদের মধ্যে যেরকম অরাজনীতির ইনজেকশন ফুটিয়ে দেওয়া হয় - দেখো রাজনীতি কত নোংরা, দেখো রাজনীতির কারনে দেশ রসাতলে যাচ্ছে, দেখো পার্লামান্টে কোন কাজ হয় না, দেখো এই তোমাদের গনতন্ত্র, তোমাদের ভোটাধিকার এগুলোর কোন লাভ নেই, অতএব রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করো না, নিজের মতন জীবনযাপন করো, নিজেরটা বুঝে নাও - রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ এই বৃহৎ চক্রান্তের অংশের বাইরে নয়। এবং তাদের সাহায্য করতে গত ৬ বছরের বিভিন্ন কলেজের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস তৈরি রয়েছে।

ইতিহাস শেখায় -  ছাত্ররা সমাজের সমস্ত গুরুত্বপূর্ন লড়াইতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। সেই ছাত্রসমাজকেই যদি রাজনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যায়, তাদের মাথায় অরাজনীতির পাঠ ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই স্থিতাবস্থা বজায় রাখা আরও সোজা হয়ে যাবে। ক্ষমতার কেন্দ্রকে বোকা ভাববেন না। সে জানে, ঠিক কোন কোন পদক্ষেপ পর পর নিলে আস্তে আস্তে সাধারন মানুষ রাজনীতির প্রতি নিস্পৃহ হয়ে পড়বে, এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা সোজা হবে।

তাই যাদবপুর ইউনিভার্সিটিকে শুধু আজকের রাত নয়, এরকম অনেক রাত জাগতে হবে। তাদেরকে এই লড়াইটা পৌছে দিতে হবে রাজ্যের প্রতিটা কোনে, প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীর মগজে। এই আইন থাকলো কি গেলো তাই দিয়ে তাদের হার-জিতের বিচার হবে না। মেদিনীপুর বা পুরুলিয়ার কলেজের ছেলে মেয়েগুলো এই লড়াইটাকে নিজেদের লড়াই বলে অনুধাবন করতে পারলো কিনা, সেটাই হবে হার-জিতের আসল মাপকাঠি।