বৃহস্পতিবার, ৬ জুলাই, ২০১৭

স্মৃতিচারণ - ৪ ~ স্বাতী রায়

এরকম টুপটাপ, ঝিরিঝিরি বা ঝমঝম বৃষ্টির দিনে খুব মেসে কাটানো দিন গুলোর কথা মনে পড়ে। ২০০৪ সাল, রুমমেট আমি, রুমি, দীপমালা, অন্বেষা। আমি আর রুমি সমবয়সী বাকি দুজন বয়েসে বছর তিনেকের ছোটো। রুমি যাদবপুরের ফিলজফিতে মাস্টার্স করছে, বাকি দুটি ফার্স্ট ইয়ার। আমি তখন গ্র‍্যাজুয়েশন শেষে কাঠ বেকার, চাকরি খুঁজছি। বর্ষার দিনে আমাদের বিলাসিতা ছিলো ঘরের ভিতরেই স্টোভ জ্বেলে ঢ্যালঢ্যালে খিচুড়ি। বাকি তিনজন অভুক্ত বাচ্চার মত খাটের উপর পা গুটিয়ে বসে জুলজুলে লোলুপ দৃষ্টিতে বুগবুগ করে ফুটতে থাকা হলুদ অমৃতর দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমি খিচুড়িতে হাতা নাড়তাম। কখনো সেই সুগন্ধি আতপ আর মুগডালের মিশ্র গন্ধে পাগল হয়ে বলতো অনেক হয়েছে, এবার নামিয়ে খেতে দে। আমি ধমক দিতাম, দাঁড়া এখনো চাল ডাল আলাদা আলাদা তাকিয়ে রয়েছে, না মিশলে খিচুড়ি হবে? সকালের চায়ের দায়িত্ব ছিলো দীপ আর অন্বেষার। আমি চিরকাল কুঁড়ে মানুষ,  তায় লেট রাইজার। দুই কন্যা স্টিলের গ্লাসে চা নিয়ে আমায় ঠেলে তুলে দিতো। আর কতো ঘুমুবে? ওঠো। এদিকে বাইরে বেরোবার উপায় নেই গলিতে এক হাঁটু জল। আমাদের দিন রাত ব্যাপি আড্ডা, গান।

 স্মৃতিমেদুর মনে সেসব গলিতে জলজমা বর্ষাদিনের কথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়লো অন্বেষা আর দীপ সকাল সন্ধে ঘরে ধূপ দিতো। সেই ধূপের গন্ধে আমার বহুদূরে থাকা মায়ের কথা মনে পড়ত। শাঁখের আওয়াজ, চুড়ির রিনিঝিনি, তুলশী তলায় প্রদীপ। আমি মাথা নোয়াতাম না বলে আমার স্বল্প শিক্ষিত মায়ের বক্তব্য ছিল আমি নিশ্চই হাসপাতালে কোনো যবনীর বাচ্চার সাথে অদলবদল হয়ে গেছি। হিন্দুর বাচ্চা আমি হতেই পারিনা! পুরো স্কুল জীবন, আমি সামনা সামনি কোনো মুসলিমের সাথে মেশার সুযোগ পাইনি। শোনা কথার বিষ আমার ভিতরে কিছুটা হলেও ছিল। কলেজে পড়তে এসে প্রথম পেলাম কিছু অহিন্দু সহপাঠী, আর এই মেসে থাকতে এসে তো একই ঘরে বসত করা শুরু হল। এক সন্ধায় কামাখ্যার ভক্তিমতী দীপের সন্ধার ধূপ দেখানোর পর আমি রুমিকে জিজ্ঞাসা করলাম হ্যাঁ রে তোকে তো কোনো দিন নামাজ পড়তে দেখলাম না। "তোদের" নাকি পাঁচ বেলা নামাজ মাস্ট। রুমি বলল তোকেও তো কোন দিন ধূপ দিতে বা প্রণাম করতে দেখলাম না। আমার চোখের উপর থেকে একটা পর্দা সরে গেলো। মায়ের ভাষায় "যবনী " রুমি Rehana Haidar আমার জ্ঞান চক্ষু উন্মিলিত করে দিল, শিক্ষার বিকল্প নেই। দীপ আর অণ্বেষাকে কোনোদিন এক বিন্দুও অপ্রস্তুত হতে দেখিনি চারজনায় একে অপরের মুখের খাওয়ার কাড়াকাড়ি করে খেতে আপত্তি তো দূর। আদুরে দীপের ফেবারিট পাসটাইম ছিলো ঘুমন্ত আমার বা রুমির চাদরের মধ্যে টুক করে ঢুকে পড়ে জাপ্টে ধরে শুয়ে থাকা, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর না করা অবধি ছাড়তো না। অবিশ্বাসী আমায় বা অন্যধর্মের রুমি কে নিয়ে কই কোনোদিন একফোঁটাও অসহিষ্ণুতা দেখিনিতো। 

 আসলে ওই ফুটতে থাকা চাল ডাল গুলো আমরাই ছিলাম, আমাদের মিলে মিশে এক হয়ে থাকতে কোনো ধর্ম নামক জুজু চোখ রাঙায়নি। আমাদের এক থালায় ভাত খাওয়া, আমাদের একে অপরের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, এর ওর পিছনে লাগা কিছুই ব্যহত হয়নি। পরমা সুন্দরী রুমি কে আমি এখনো যখন-তখন বেগমসাহিবা বলে পিছনে লাগতেই পারি, বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। আমাদের একটাই পরিচয় ছিল, এখনো আছে- আমরা রুমমেট, আমরা বন্ধু এবং আমরা... আমরা মানুষ আর কি...