বুধবার, ১২ জুলাই, ২০১৭

সময় ~ রেজাউল করীম

মেয়ে বলল: দেখেছ t উপরে মাত্রা দিয়ে সময়কে ভেক্টর বানিয়ে দিয়েছে। বললাম: ভুল করেছে। সময় ভেক্টর নয়, কিন্তু বলেই কেমন ধন্দ লাগল। সময় কি কেবলই একটা মান, যা দিকশূন্যপুরে সহজেই হারিয়ে যায়! সময়ের গতি শুধু সুমুখপানে কিন্তু সামনে এগোতে পারলে পেছনপানে কেন যেতে পারবে না? আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে সময়ের গতি ও দিক নিয়ে নিয়ে বিস্তৃত গবেষনা হয়েছে। তিনরকমের সময়ের তীর বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করেছেন- thermodynamic, Cosmological ও psychological। মনোবৈজ্ঞানিক সময়ের তীর যদি আমাদের বিক্ষত না করত তাহলে পৃথিবীটাই অন্যরকম হত। দুষ্মন্ত সেই সময়ের তীর চালান করতে পারলে শকুন্তলাকে এত কষ্ট পেতে হতে না, জার্মান-প্রুশিয়া রাশিয়া-ফ্রান্সের সঙ্গে লড়তো না আর তাহলে হয়ত নাজি দলের উত্থান হত না। এমনি এক জুলাই মাসে প্রুশিয়ান আর্চ-ডিউক খুন হলেন জুগোশ্লাভ জাতীয়তাবাদী নেতাদের হাতে। রাশিয়া প্রথম যুদ্ধ শুরু করলো। ফ্রান্স ১৮৭৮ র হারের বদলা নেবার সুযোগ খুঁজছিল, তারা সহজেই রাশিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে ফেলল। দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হল আর পৃথিবীর চেহারাটাই গেল চিরতরে বদলে। 

সময়ের মানসিক তীর পশ্চাদগামী না হলে কেমন হত তা রবীন্দ্রনাথ ঠাট্টার ছলে লিখেছিলেন- "পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে। একটু ঠেলা মারলেই তার নিজের কাছে প্রমাণ হবে যে, সেণ্টিমেণ্টাল আত্মীয়েরা তার অন্ত্যেষ্টি-সৎকার করতে বিলম্ব করেছিল, বোধ করি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীকে চিরকাল ফাঁকি দেবার মতলবে।" সময়ের সাথে এগিয়ে না চলতে পারার নাম কী মৃত্যু? তাহলে, আমরা কমবেশী সবাই অল্প স্বল্প মৃত। কেউ সমাজের পুরনো রীতি আঁকডে ধরে প্রানপনে মরতে চাইছি, কেউ আবার ধ্বজাধারী ধর্মের ফসিল আঁকডে নিজেকে ভোলাতে চাইছি। সময়ের গতিপথ নিয়ে হকিং সায়েব বই লিখে ফেলেছেন।  সময় নাকি কোন এক যুগে আবার পেছনপানে চলতে শুরু করবে। আজ যা ঘটছে অনাদিকাল ব্যাপি অনন্তবার সেই ঘটনা ঘটেছে, আবার ঘটতেই থাকবে, এর কোন শেষ নেই। ভেক্টর যাই হোক, ফিজিক্স বেশ রোমান্স ভরা। কল্পনার রঙিন ডানায় ভর করা স্বপ্নকেও সে সাকার করে তোলে- তাই হকিংয়ের মুগ্ধবোধ পড়ে অন্যতর অনুভূতি হয়। শুধু সময়ের তীর যখন সাঁ করে উল্টো দৌড লাগাবে তখন কী সব মনে পড়বে নাকি "যে পথ চলে গেলি সে পথ কেন ভুলে গেলি রে" বলে গান ধরতে হবে!! 
সময়ের মান অর্থাৎ পরিমান নিয়ে ও একই রকম ধন্দ। প্রেমিকের জন্য এক মূহর্ত অপেক্ষা যেন অন্তহীন কিন্তু দেখা হলে? "যুগ যুগ হাম হিয়ে হিয়ে রাখলু/ নয়ন না তিরপেত ভেল!" নয়নের কথা বলেছেন কিন্তু আসলে সময় এত দ্রুত নিজেকে শেষ করে ফেলে যে ঘন্টাগুলো সেকেন্ডের মত দৌডায়। অমিত বলেছিল-  সময় যাদের বিস্তর তাদেরই পাঙ্ক্‌চুয়াল হওয়া শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্ক্‌চুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা। অমরাবতীর কেউ যদি প্রশ্ন করে 'ভবে এসে করলে কী' তখন কোন্‌ লজ্জায় বলব, 'ঘড়ির কাঁটার দিকে চোখ রেখে কাজ করতে করতে জীবনের যা-কিছু সকল সময়ের অতীত তার দিকে চোখ তোলবার সময় পাই নি"। 
এদেশের ঋষিরাও সময় নিয়ে বিস্তর চর্চা ও লেখালেখি করেছেন। কাল শাশ্বত এবং গতিশীল :হে চিন্ময় শক্তিসম্পন্ন ! আপনি পরমেশ্বর ভগবানের নিয়ন্ত্রনকারীরূপ শাশ্বত কালের গতিবিধি সম্বন্ধে অবগত । আপনি যেহেতু আত্ম-তত্ত্ববেত্তা, তাই আপনি আপনার দিব্য দৃষ্টির প্রভাবে সব কিছু দর্শন করিতে পারেন ।(ভাগবত ৩/১১/১৭)
এ শ্লোকে কালকে শাশ্বত বলে অভিহিত করা হয়েছে । কাল গতিশীল এ বিষয়টিও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে । এখানে দিব্য দৃষ্টির উল্লেখ করা হয়েছে যার দ্বারা একজন অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দর্শন করতে পারেন । দিব্য দৃষ্টির দ্বারা মহাবিশ্বের সবকিছু দর্শন করা যায় এমনকি কালের গতিবিধি সন্মন্ধে ধারণা পাওয়া যায় । রবিঠাকুর কালের যাত্রার ধ্বনিও শুনতে পেয়েছেন। সময়ের সেই অন্তহীন রথে চেপে  একদিন উধাও হয়ে যাব। যেতে যেতে হয়ত আজকের খণ্ড মূহুর্তগুলির সাথে দেখা হয়ে যাবে- নববধুটির মত সাজগোজ করে সময়ের সে বিন্দু বসে থাকবে, অন্তহীন যাত্রার ক্লান্তি সরিয়ে সে বন্দুক সাথে সুখ-দুখের বিনিময় করতে করতে হারিয়ে যেতে বোধহয় ভালোই লাগবে।