বৃহস্পতিবার, ৮ জুন, ২০১৭

কয়েকটা ইমেজ ~ অর্ক ভাদুরী

কয়েকটা ইমেজ মাথার মধ্যে ঢুকে বসে থাকে, বেরতে চায় না। অসম্ভব শীত করে, ভয় হয়। আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে থাকে সব।

গুরগাঁওয়ের কাছে একজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। রাত্রিবেলা বছর কুড়ির ওই মহিলা তাঁর একরত্তি মেয়েকে নিয়ে একটা অটোয় উঠেছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পরেই অটোচালক গাড়ি ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যান। তিনি এবং দুই সহযাত্রী ওই মহিলাকে যৌন হেনস্থা করতে শুরু করেন। বাচ্চাটা মায়ের বুকে ঘুমোচ্ছিল। ধস্তাধস্তিতে তার  ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। ওই মহিলা জানিয়েছেন, বাচ্চাটির কান্নায় ধর্ষকরা আরও অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ওঠে।

 এরপর একটা অন্ধকার এবং ফাঁকা জায়গায় অটোটিকে দাঁড় করানো হয়। অটোচালক দুই পুরুষ যাত্রীর একজনের উদ্দেশ্যে বলেন, "হরি, খানা লা।" এরপর ওই মহিলাকে টেনে নামানো হয়। তাঁর বুক থেকে বাচ্চাটিকে কেড়ে নেওয়া হয়। সে তখনও চিৎকার করছে। কান্না থামাতে একজন তার মুখ চেপে ধরে। এবার পরপর তিনজন ওই মহিলাকে পালা করে ধর্ষণ করে। বাচ্চাটির মুখও পালা করে চেপে রাখা হয়।

ওই মহিলা এফআইআরে জানিয়েছেন, ধর্ষণ করার পর ওরা বাচ্চাটিকে রাস্তার ধারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তাঁর কথায়, " কার্যত বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম, আমার সন্তানকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। রাস্তার ডিভাইডারে ওর কচি মাথাটা থেঁৎলে যাচ্ছে।"

এই পর্যন্ত সব ঠিক আছে। ঠিক থাকার কথা নয়, কিন্তু ঠিক আছে। এই বিষয়গুলিতে আমি অভ্যস্থ। আমার গবেষণার বিষয়, গণআন্দোলন দমনে যৌন হিংসার ব্যবহার। ফিল্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে অসংখ্য রেপ সারভাইভারের সঙ্গে কথা বলেছি। মায়ের সামনে মেয়ে বা মেয়ের সামনে মায়ের উপর হওয়া নির্যাতনের কথা ধর্ষিতাদের মুখ থেকেই শুনেছি। পেশাগত কারণেও অসংখ্যবার 'ধর্ষণ করে খুন' শিরোনামে খবর লিখে কফি খেতে গিয়েছি। সমস্যা হয় না, অথবা হলেও নিভৃতে পুড়িয়ে দেয় মাত্র।

সমস্যাটা শুরু হল এর পরেই। ওই মহিলা জানিয়েছেন, ধর্ষকগুলো অটো চালিয়ে চলে যাওয়ার পর তিনি কুচোটার কাছে যান। দেখেন, সে চুপটি করে আছে। মাথার পিছনটা চ্যাটচ্যাট করছ। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ওই অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। রাত তখন দু'টো। কিছুদূর হাঁটার পর একটি কারখানায় আশ্রয় নেন। সেখানকার নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে জানায়, ভোর পর্যন্ত কোনও যানবাহন মিলবে না। ভোর না হওয়া পর্যন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন মা। তখনও কোনও শব্দ করছে না সে।

ভোর হয়। তখনও পর্যন্ত নিজের যন্ত্রনা চেপে রেখেছেন মা। সকালে নিস্তব্ধ মেয়েকে নিয়ে দিল্লির এক ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার জানান, বাচ্চাটি ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছে। এতক্ষণ তিনি মরা মেয়ের লাশ বইছিলেন। বিশ্বাস হয়নি মায়ের। আরেকজন ডাক্তারের কাছে যান। তিনিও একই কথা বলেন। এতক্ষণ কাঁদেননি। এবার ভেঙে পড়েন তিনি।

............

মধ্যরাত্রের অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে একজন সদ্যধর্ষিতা মা তাঁর সন্তানকে খুঁজছেন। একরত্তি সন্তানের লাশ বুকে আঁকড়ে হেঁটে যাচ্ছেন আশ্রয়ের খোঁজে। মাথার গভীরে গেঁথে যায় এই ইমেজ।বমি পায়। নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের চুল, আঁচল, স্তন আর আঙুলের ছবি ভিড় করে আসে। প্রিয়তম মেয়েটির মুখ, তার গলা, চোখ, হাসি আর কানের লতির কথা মনে পড়ে।

মনে হয়, কেন বেঁচে আছি অকারন!