রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

কৃষি ঋণ ~ সুশোভন পাত্র

- দিস ব্লাডি ইউনিয়ন কালচার ইস ক্র্যাপ। 
আপিস ফেরত পথে চিলড্ বিয়ারে চুমুক দিয়ে বলেছিল অসীম। কেতাদুরস্ত মাল্টিন্যাশন্যালে প্রজেক্ট ম্যানেজার অসীম। ব্যালেন্স শিট, ডেটা মাইনিং, ক্লায়েন্ট মিটিং'র কচকচানি, তার উপর বিরক্তিকর ট্রাফিক, আর গোদের উপর বিষ ফোড়া শ্রমিক'দের 'নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির' দাবি তে ট্রেড ইউনিয়নের মিছিল। ফর্ক দিয়ে ক্যাপসিকামটা সরিয়ে একটুকরো পনির টিক্কা মুখে তুলে, একরাশ ক্ষোভ উগরে অসীম এক নাগাড়ে বলে গেল, 
- প্রফেশেনালিজম চাই। চাই ডিসিপ্লিন, ডেকোরাম। ঐ 'শ্রমিক ঐক্য' দিয়ে কিস্যু হবে না। 'দুনিয়ায় মজদুর' আর কবে এক হবে? মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট... যতসব ডিসগাসটিং এলিমেন্ট। ডেভলাপমেন্ট করতে একটা 'ওয়ার্ক কালচার' লাগে রে। আই মিন.. 'কর্ম সংস্কৃতি'।
গত পরশু প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন অফিসে গিয়েছিল অসীম। নবগঠিত তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী'দের ফোরামের প্রতিনিধি হিসাবে ¹। গত মাসে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি সেক্টরে যে ব্যাপক কর্মী ছাটাই হয়েছে অসীম সেই হতভাগা'দের একজন। খবরে প্রকাশ, দেশের শীর্ষ ৭টি তথ্য-প্রযুক্তি কোম্পানি তে আগামী একবছরে রেকর্ড হারে আরও ৫৬ হাজার কর্মী ছাটাই হবে ² । আপিস পাড়ায় কান পাতলেই 'টার্মিনেশন লেটার' আর 'ফায়ারিং নোটিশে'র ফিসফিসানি। 
আজ ট্রেড ইউনিয়ন আর তথ্য-প্রযুক্তি কর্মী'দের ফোরামের সমন্বয় মিটিং প্রথম বক্তৃতা করেছে অসীম। আগামী রবিবার সকল হতভাগ্য'দের মিছিলে পা মেলাতে আহ্বান জানিয়েছে। একরাশ ঘেন্না নিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে অসীম মাইকে বলেছে,   
-দিস হোল ব্লাডি সিস্টেম ইস ক্র্যাপ। 
আজ অসীম বুঝতে পারে ধর্মঘটের মানে। বুঝতে পারে ঝাঁ-চকচকে তথ্য-প্রযুক্তি দপ্তরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে বসে অ্যালগোরিদিমের পলিনমিয়াল কমপ্লেক্সটি ক্যালকুলেশন করার থেকে দেশের অসংগঠিত শ্রমিক'দের জীবনটা আরেকটু ঝুঁকির। কাজটা আরেকটু পরিশ্রমের। আর স্থায়ী রোজগারের নিশ্চয়তাটা আরেকটু কম। সেন্ট্রাল লেবার ব্যুরোর তথ্যানুসারে শুধু ডিমনিটাইজেশেনের পরবর্তী তিনমাসে কাজ হারিয়েছেন দেশের ১.৫২ লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিক ³ । আর গত আর্থিক বছরে ২.৩ লক্ষ ⁴ । ২০১৫-১৬'তে দেশের বেকারত্বের হার ৫% -গত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ ⁵। কেন্দ্রীয় সরকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্পেও কাজ কমেছে ৯.৭% হারে ⁶। কিন্তু এমনটা একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না। বরং কথা ছিল, ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের। কথা দিয়েছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী ⁷।  লেখা হয়েছিল, "২৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান লাগাম টানবে ক্রম ঊর্ধ্বমুখী বেকারত্বে" ⁸। লেখা হয়েছিল, খোদ বি.জে.পি'র নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু  রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে সেদিনের সেই বক্তৃতা আর নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিশ্রুতি বানের জলে ভেসে গেছে কবেই।  
অবশ্য এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভ্যাস বিক্ষিপ্ত নয়। ১৫'ই এপ্রিল ২০১৪, গুজরাটের সুরেন্দ্রনগরের জনসভায় নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন "বি.জে.পি ক্ষমতায় এলে, কৃষকদের বীজ, সেচ, বিদ্যুৎ, সার এবং কৃষির জন্য ব্যবহৃত অন্য দ্রব্যাদির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করেই উৎপাদন মূল্য নির্ধারণ করব। এবং তার সাথে কৃষকদের ৫০% মুনাফা সহ শস্যের সহায়ক মূল্য ঘোষণা করব ⁹।"  আসলে মিডিয়ার পোষ্টার বয় সেদিন কোন নতুন কথা বলেননি। 
আজ থেকে ১১ বছর আগে বামপন্থী'দের কমন মিনিমাম প্রোগ্রামের দাবী মেনেই প্রথম ইউ.পি.এ সরকার সার্বিক কৃষি ব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য স্বামীনাথনের নেতৃত্বে 'ন্যাশনাল কমিশন অফ ফার্মার্স' গঠন করে। সেই কমিশনের রিপোর্টে বলেছিল অবিলম্বে শস্যের উৎপাদন মূল্যের উপর কমপক্ষে ৫০% মুনাফা যোগ করে সহায়ক মূল্য ঘোষণা এবং সেই সহায়ক মূল্যের সঠিক বাস্তবায়ন করা দরকার। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দেশের সমস্ত রাজ্যে ব্যাপক ভূমি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে ¹⁰। কিন্তু  দেশের আরও পাঁচটা কমিশনের মতই স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্টের জায়গা হয়েছিল সেই ডাস্টবিনেই। 
আর হয়েছিল বলেই আজ, ১৯৯১'র 'ফ্রি-মার্কেট ক্যাপিটালিজম' আমদানির ২৬ বছর পর, দেশের জি.ডি.পি তে কৃষির অবদান ৩৫% থেকে কমে এখন ১৩%'এ। ১স্কয়ার কিলোমিটার চাষযোগ্য জমির অংশীদার ২৬৭ জন থেকে বেড়ে এখন ৩২৪  ¹¹।  সরকারের ধার্য করা সহায়ক মূল্য পান দেশের মাত্র ৬% কৃষক ¹² । বেড়েছে কৃষিতে বিদেশী বিনিয়োগ, বেড়েছে বিদ্যুৎ সার, কীটনাশক ডিজেলের দাম। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কৃষক আত্মহত্যাও। ১৯৯৫-২০১৬ অবধি ভারতবর্ষে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন ¹³ । মোট ৩,১৬,৪৬৬ জন। সংখ্যাটা ইডেন গার্ডেনসের কানায় কানায় পূর্ণ দর্শক সংখ্যার ৫ গুণ। ভারতবর্ষের প্রমাণ মাপের ট্রেনের, মোট যাত্রী সংখ্যার ২১১ গুণ এবং যেকোনো এয়ারবাসের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতার ৬৩৪ গুণ ¹⁴ । 
আজ থেকে ৭৫ বছর আগে রাতের অন্ধকারে মহারাষ্ট্রের শেলনী'র জঙ্গলে ব্রিটিশ পণ্যবাহী এক ট্রেন কে আটকে প্রচুর টাকা, অস্ত্র ও অন্য মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করে গরীব কৃষক'দের বিলিয়ে দেয় 'তুফান সেনা'। বিস্তীর্ণ সাতারা অঞ্চলে গোরা'দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা হয় পরের দিন সকালেই। ব্রিটিশ'দের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীনতার আগেই গঠিত হয় কৃষক'দের সমান্তরাল সরকার ¹⁵। 
দিল্লীর মসনদে বসে যে বেণীমাধবরা আজকে কৃষক'দের ফসলের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে দশলাখি স্যুট গায়ে বিদেশ সফরে রায় বাহাদুর'দের পদ লেহন করে বেড়াচ্ছেন, রাজ কোষগারের দখল নিয়ে যে বেণীমাধবরা আজকে শ্রমিকের শ্রমের মজুরি বকেয়া রেখে সেনসেক্স আর জি.ডি.পি'র বালখিল্যতায় উন্নয়নে রঙিন গল্প শোনাচ্ছেন, কৃষকের লাশের পাহাড়ে চেপে যে বেণীমাধবরা আজকে বিজয় মালিয়া'দের 'নন পারফর্মিং অ্যাসেট' কে 'রাইট অফ' করার নীতি নির্ধারণ করছেন, শ্রমিক'দের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে পুষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে যে বেণীমাধবরা আজকে আদানি'দের বিদেশে জমি কিনতে সস্তা সুদে ঋণ দিচ্ছেন -কেমন হবে বেণীমাধব এক একটা মন্দসৌরের বারুদ গুলো আজ যদি আগুন হয়ে জ্বলে? কেমন হবে বেণীমাধব সেই আগুন গুলোই আজ যদি হরিয়ানা থেকে রাজস্থানে, মহারাষ্ট্র ঘুরে তামিলনাড়ু তে দাবানল হয়ে গেলে? কেমন হবে বেণীমাধব চা-বাগানের হাভাতে গুলোর মজুরি আদায়ের মিছিল যদি সেই দাবানলে মেলে? কেমন হবে বেণীমাধব শ্রমিক-কৃষক 'তুফান সেনা' দিল্লীর রাইসিনা হিলে হিসেব চাইতে গেলে? কেমন হবে বেণীমাধব বেকার গুলো সব এককাট্টা হয়ে পার্লামেন্টের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিলে?