শুক্রবার, ৫ মে, ২০১৭

আমাদের পাড়া ~ স্বাতী সেনগুপ্ত

অনেকদিন ধরেই এটা লিখব ভাবছি লেখা আর হয়ে উঠছিল না। হঠাৎ করেই আজকাল চারপাশে "হিন্দুরা" বেশ নিপীড়িত হাব ভাব করতে লেগেছে। চেনাদের জন্যই বেশি চিন্তা হচ্ছে। এত বছরে কোনদিন জানতেই পারিনি তাদের জীবন এত কষ্টের। 

আচ্ছা রসিকতা থাক না হয়। খুব দরকারি কিছু কথা বলি। দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আমার বাড়ি। আমার ঠাকুরদা দেশ ভাগের আগেই এপারে ডাক্তারি পড়তে এবং ডাক্তারি করতে চলে এসেছিলেন। তারপরে এদিক ওদিক চাকরি সূত্রে ঘুরে আমার ঠাকুমার বাবার কথা মত এইখানে এসে জমি কিনে বাড়ি বানালেন। আমি কোন ছাড় আমার বাবার ছোটবেলাও ওখানেই কেটেছে। আজকাল আমার খুব সন্দেহ হয় ওখানে সব এলিয়েন রা থাকে। যশোর রোড আর ভি আই পি রোড এর জংশন -এ এই অদ্ভুত জায়গাটার শুরু। একদিকে মসজিদ আরেকদিকে কালি মন্দির। কি বলব মশাই এলিয়েন গুলো ঐ মসজিদ লাগোয়া ফুলের দোকান থেকে ফুল কিনে দুর্গা, কালিপুজা থেকে শুরু করে প্রেম পর্যন্ত করে। ভাবুন দেখি কি আক্কেল। আবার ফুল কিনে যাওয়ার পথে টুকুস করে মসজিদ-এর পীর বাবার কবরে খানিকটা চড়িয়ে ঘটাং করে একটা নমস্কার ঠুকে নেয়। এই এলাকার মুসলিম গুলোও কেমন যেন। প্রত্যেক বছর চাঁদা দিয়ে হিন্দু গুলোর সঙ্গে নেচে নেচে দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে আরও কি কি সব পুজা করে। তা এসব পাগল ফাগল কাটিয়ে ২কিমি মত ভেতরে ঢুকলে আমার বাড়ি। তা বলে না দিলে অবশ্য বুঝবেন না কোনটা হিন্দু বাড়ি আর কোনটা মুসলিমের। এপাড়ার বামুন গুলো আরও অদ্ভুত! মুসলিম, শুদ্র কিসসু মানে না। আমার পাশের বাড়ির ভাইগুলো (এরা আবার পুজা ও করে) সুবেদ আলি কাকাদের বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া করত। আমার এক বান্ধবির বাবাও কট্টর বামুন। তাদের বাড়িতে যে রান্না করে সে নাকি অচ্ছুৎ। আমাদের বাড়িতে যে পিসিরা পালা করে কাজ করে এসেছে তারা মুসলিম। বড় দুই পিসি আবার হিন্দু বিয়ে করেছে। তাদের ছেলেমেয়েগুলোর কি জাত? কি ধর্ম? কে যানে বাবা। ওরা নিজেরাও জানেনা। ওদের "বস্তি বাড়িতে" যখন খেলতে যেতাম তখন দেখতাম ওখানে তো হিন্দু-মুসলিম উঠোন গুলোও একাকার। সব চেয়ে ছোট পিসি এখনও আমাদের বাড়িতে কাজ করে। লক্ষিপুজার ভোগ টা ওই রান্না করে।

ঠাকুরদার কাছে দেখতাম গরিব লোক, বস্তি বাড়ির লোক ই বেশি আসত। ঠাকুরদার খাতায় দেখেছি ফীস লেখা থাকত। কোনদিন আড়াই টাকা, কোনদিন পাঁচ টাকা, এইরকম। উনি মারা গেছেন সেই ১৯৯৯ সালে। এখনও লোকে আমায় তাঁর নাতনি বলেই চেনে। কলকাতা আর আগের মত সুরক্ষিত নেই কিন্তু রাত ১২ টার সময়ও যদি ঐ এয়ারপোর্ট ১ নং গেট -এ পৌঁছে যাই তো নিশ্চিন্ত। ওখানের রিকশাওালা কাকু(এখন তো ভাই-এর বয়সিও থাকে) রা ঠিক বাড়ি পৌঁছে দেবে জানি। ওদের মধ্যে কিন্তু বেশির ভাগ-ই মুসলিম। 

ছোটবেলার কয়েকটা ঘটনা বলি। প্রথম টার সময় আমি বোধহয় ৩ বছরের। বাড়িতে পিসিমনি রা এসেছে। খুব হইচই হচ্ছে। পিসিমনি আমার জন্য একটা পুঁচকে চীনামাটির কাপ এনেছে আর তাতে করে আমি প্রথমবার একলা একলা চা খেয়েছি। এমন আনন্দের সময় খেয়াল হল বাবা বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে জিজ্ঞেস করায় মা বলল অমুককাকুর (নাম টা একদম ভুলে গেছি) বাড়ি দাবা খেলতে গেছে যেমন ছুটির দিনে মাঝেমধ্যেই যায়। অমনি আমি বাইরে পরার একটা জামা বগলে নিয়ে চুপিচুপি বাগান পেড়িয়ে, ঠাকুরদার রুগি দেখার ঘর পেড়িয়ে বড় গেটের উপরে চড়ে গেট খুলে ছুট (হ্যাঁ রে বাবা গেটের উপরেই চড়তে হত নয়ত হাত পৌঁছাত না।)। রাস্তা তো আমার চেনাই। বেশিদুর নয়। দুটো পুকুর পেড়িয়ে একটা গলি দিয়ে হেঁটে গেলেই অমুককাকুর বাড়ি। আর গেলেই দেখতে পাব বাবা আর সেই কাকু গম্ভির মুখে দাবা খেলছে বারান্দায় বসে। সে যাত্রা সুবেদ আলি কাকুর চোখে পড়ায় বেঁচে যাই। পুকুরে না ডুবলেও হারিয়ে নিশ্চয়ই যেতাম। তখনও আমাকে ঠাকুরদার নাতনি হিসেবে পাড়ার ৩-৪ টে বাড়ি বাদে আর কেউ চিনত না। 

এবারে ১৯৯৯ সাল। আমাদের পরিবারের উপর দিয়ে তখন একটা ঝড় যাচ্ছে। ঠাকুমা পিজি হসপিটালে ভরতি। Pacemaker বসবে। ঠাকুরদা মারা গেছেন সেদিন। আগের দিন রাতে তাঁকেও ভরতি করতে হয়েছে পিজি হসপিটালে। একসময় ওখানে ঠাকুরদা RMO ছিলেন। একা একা বসে আছি দোতলায় খাটের উপরে স্তম্ভিত হয়ে। মৃত্যু আগে ধারেকাছে আসেনি তা নয়, তবে এত আচম্বিতে কোনদিন ছোবল মারেনি। আমার বাড়ির পাশেই থাকে শেফালি। One of my best friends. ও এসে কিছু না বলে আমার পাশে বসেছিল অনেকক্ষণ। ওর বোধহয় ক্লাস ছিল। এক মাস পরেই পরিক্ষা। যাবার আগে সঞ্চয়িতা টা ধরিয়ে দিয়ে গেল। বলল "পড়। সব উত্তর পাবি।" ও মুসলিম। জীবনে আরও অনেক ঝড় দেখেছি কিন্তু ঐ ভাবে আর কেউ কোনোদিন আমার পাশে এসে বসেনি। আমাকে সবাই খুব শক্ত মনের মানুষ বলেই জানে। তাই কেউ কখন আমাকে সান্ত্বনা দেবার কথা মনেও করেনি। ঐ একজনই।

এবারে ২০০২। ঠাকুমা মারা গেছেন। বিশদে যাবনা। বাড়িতে বাবা মা কেউ নেই। অচেনা লোকের ভিড়ে বাড়ি ভরতি। অন্ধকার (power cut) ও হয়ে গেছে। ঐ যে সেই পিসিদের কথা বলছিলাম। যাদের কোলেপিঠে চড়ে বড় হয়েছি। মুসলিম।তাদের মধ্যে একজন, সে আমার ঘরের "দামি" জিনিস সামলায়, আমাকে সামলায়, আমার ভাইকে সামলায়। আর বসে বসে কাঁদে। যতক্ষণ না আমার জ্যেঠু বড়মা (বাবার পিসতুত দাদা বৌদি) এসেছে সে আমাদের পাশ ছেড়ে নড়েনি। যতক্ষণ না বাবা মা এসেছে (প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা বাদে) ততক্ষণ বাড়ি ছেড়ে যায়নি।

তো সেই কথাই বলছি আরকি। নিকুচি করেছে আপনার দেশভক্তির। ওসব রাখুন মশাই। আমার ভক্তি, ভালবাসা তা সব এই মানুষগুলো কে দিয়ে ফেলেছি অনেক আগেই। আপনার মত ঘ্যানঘ্যানে শয়তান দের দেওয়ার মত কিছুই রাখিনি। নিজের ছেলেমেয়ে কেও তো ভাল কিছু শেখাতে পারলেন না জীবনে ঘৃণা ছাড়া। বুড়ো বয়সে আপনাকে দেখবে তো? তা এহেন অদ্ভুত এলিয়েন জায়গাটার নাম ও আবার সুলতানপল্লি। মোরের মাথার নাম শুকুর আলির মোর। তবেই বুঝুন। দেশদ্রহিতা তো আমার রক্তে মশাই। আর সবার রক্তের রঙই আবার লাল। বিশ্বাস করুন দেশে এতগুলো বড় বড় riot হয়েছে তা ওই এলাকায় বসে কিছু বুঝতেই পারিনি। আশাকরি আমার এলাকাটা এইরকমই থাকবে।