বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০১৭

মিছিল ~ কৌশিক দত্ত

অনেক কিছু দেখার ছিল আজ, সেই হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দিন। নকশালবাড়ি হত্যার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন জাতীয়তাবাদী বিজেপি নগর-পুলিশের সদর দপ্তরে কামান দাগতে নামল, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল না। রাজনৈতিক গুরুত্বে পিছিয়ে না পড়ার তাড়না বড় বালাই, অত দিনক্ষণ খেয়াল রাখা যায় না। হঠাৎ সিদ্ধান্তের পর অল্প দিনে কত লোক জোগাড় করতে পারে, কোথা থেকে এবং কোন ধরণের মানুষ মিছিলে আসেন, সেসব রাজনৈতিক কৌতূহলের বিষয় হলেও আমার আগ্রহ ছিল অন্য কিছু বিষয়ে। 

১) বিজেপি কীভাবে মিছিল করে, ইটপাটকেল ছোঁড়ার পথে যায় কিনা, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন কাশ্মীরে পুলিশের দিকে পাথর ছোঁড়া এমনই বড় এক সমস্যা, যার মোকাবিলায় পেলেট গান এবং হিউম্যান শিল্ডকেও সমর্থনযোগ্য প্রশাসনিক পদ্ধতি বলা হচ্ছে তাদের নিজেদেরই তরফে! 

২) পুলিশ কীভাবে মিছিলের মোকাবিলা করে? আগের দিনের মতো পেটানো এবং না পেটানো, দুটোই সমস্যাজনক রাজনৈতিক সংকেত বহন করবে, এরকম পরিস্থিতিতে সরকার ও পুলিশের ভূমিকা দেখার ছিল। 

৩) যাই ঘটুক, বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির থেকে কেমন প্রতিক্রিয়া আসে, তাও আমাদের গণচরিত্র বোঝার জন্য এক মূলবান উপাদান।  

যা দেখা গেল, তার মধ্যে অপ্রত্যাশিত চমক বিশেষ নেই। জাতীয়তাবাদীরা ইট ছঁড়লেন, সাথে দু-একটা বোমাও। বোমাগুলো নিরীহ ধোঁয়া বোম ছিল, মিছিলে মিশে যাওয়া পুলিশের এজেন্টও ছুঁড়ে থাকতে পারে, কিন্তু ইটপাটকেল ছুঁড়েছে মিছিল (যা আগের দিনও ছোঁড়া হয়েছে) এবং জ্বালানো হয়েছে গাড়ি (যা আগের দিন হয়নি, তবে আগেরও আগে প্রায়শই হত)। সমস্যা হল, আজকের ভারতে বিজেপির মিছিলের এই কাজকর্ম বিভিন্ন উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে এই জাতীয় হিংসাত্মক কার্যকলাপকে বৈধতা প্রদান করে। সংবাদ পরিবেশনের কৌশলের কারণে হতে পারে, আজ মিছিল বিশেষ দেখতে পেলাম না, শুধু গণ্ডগোলই দেখা গেল।  

পুলিশ খানিক শিখেছে, কায়দা বদলেছে দেখা গেল। মারপিট করেছে, কিন্তু "ডিস্ক্রিশন" ব্যাপারটা রপ্ত করেছে তিনদিনেই। উল্লেখযোগ্য উন্নতি হল সাংবাদিকদের না পেটানো। পুলিশ তার তাৎক্ষণিক সুফলও পেয়েছে। আজ সব চ্যানেলে একজন আহত পুলিশকর্মীর কাতরতার দৃশ্য অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে। ভদ্রলোকের অবস্থা সত্যি বেশ খারাপ মনে হল, তাঁর আরোগ্য কামনা করি।  

মানুষের প্রতিক্রিয়া আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ। আজ যাঁরা মাথাফাটা যুবকের রক্তাক্ত ছবি দিয়ে পুলিশকে অত্যাচারী বলছেন, ২২ তারিখ তাঁদের দেখেছিলাম "মাকু"রা মার খাওয়ায় উল্লসিত হতে। আবার সেদিন যাঁরা পুলিশের হিংস্রতার প্রতিবাদে আগুন ঝরিয়েছিলেন স্লোগানে কলমে, আজ তাঁদের ভূমিকা অন্যরকম। কেউ সম্পূর্ণ নীরব, কেউ পুলিশের লাঠিচার্জকে ন্যায়সঙ্গত বলে যুক্তি পেশ করছেন, কেউ বিজেপি কর্মীদের আহত হবার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন (বিজেপির অবিমৃশ্যকারী আইটি সেল ফেক ছবি পোস্ট করে তাঁদের হাতে অস্ত্র দিয়েছে), কেউ আবার "চাড্ডি"রা মার খাওয়ায় বেশ আনন্দিত। আবার দুই দিনই পুলিশের ভূমিকাকে যাঁরা নিঃশর্তে সমর্থন করছেন, তাঁরা মূলত তৃণমূল সমর্থক। আর দু'মাস পর তাঁদের মনে পড়বে (প্রতি বছরের মতো) যে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযান করতে গিয়ে পুলিশের মারে আহত হয়েছিলেন তৎকালীন যুকং নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, থ্রি-নট-থ্রি বুলেটের ঘায়ে নিহত হয়েছিলেন ১৩ জন। তখন রাজ্যের তখতে আসীন ছিলেন তাঁরা, যাঁরা তিনদিন আগে শহরের রাস্তায় বেপরোয়া লাঠির শিকার হলেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রশক্তির চরিত্র বদলের জন্য বা অত্যাচারের প্রতিবাদের জন্য রাজনীতি নয় আমাদের; রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মেশিনারিটিকে নিজের স্বার্থে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারাই প্রকৃত লক্ষ্য। নইলে আজ অব্দি বিভিন্ন রাজনৈতিক মিছিলে নানা রঙের পতাকা হাতে নিয়ে অঙ্গ বা প্রাণ হারিয়েছেন যাঁরা, তাঁরা তো সাধারণ মানুষই। তাঁদের রক্ত আনন্দ দিয়েছে যাঁদের, তাঁরাও সেই একই বিরাট ব্র‍্যাকেটের অন্তর্ভুক্ত...  "সাধারণ মানুষ"! 

আবার "পুলিশ"কে রাষ্ট্রের দমননীতির বাহক ভাবতে অভ্যস্ত আমাদের রাজনৈতিক সত্তা উর্দির আড়ালে থাকা ব্যক্তি মানুষটিকে মানুষ হিসেবে চিনতে নারাজ। দলমতনির্বিশেষে তাই আমরা যখন বিরোধী শিবিরে থাকি, মিছিলে থাকি, তখন ব্যক্তি পুলিশ কন্সটেবল বা সার্জেন্টকে রক্তাক্ত লুটিয়ে পড়তে দেখে যুদ্ধজয়ের আনন্দ পাই। অথচ সেই মানুষটি হয়ত মাসের শেষা আমাদের চেয়েও কম মাইনে পাওয়ার জন্য চাকরি বাঁচাতে জ্যৈষ্ঠ-দুপুরে রাস্তায়। সে আর বাড়ি না ফিরলে তার মেয়েটির স্কুলে পড়তে যাওয়া ঘুচবে। উর্দি, কি অপূর্ব কৌশলে, মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয়! 

বোঝা যায়, "contradiction within the people", আমরা চাই বা না চাই, রীতিমত antagonistic এখনো। মানুষের জন্য ততটা নয়, যতটা কিছু মানুষের প্রতি ঘৃণার বশে আমাদের রাজনীতি। ঘৃণার রাজনীতির ভিত্তিই হল "শত্রু" নির্মাণ, আর "সাধারণ মানুষ" যেহেতু কোনো সমসত্ত্ব দ্রবণ নয়, তাই ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থের সংঘাতকে অবলম্বন করে "শত্র"র তালিকায় ঢুকে পড়ে কিছু সাধারণ মানুষই। কোনো দলই তাই শেষ পর্যন্ত মানুষকে রিপ্রেজেন্ট করে উঠতে পারে না। অত্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করলেও আনুগত্য বাঁধা পড়ে রঙের কাছে, ভালবাসা হারিয়ে যায় ঘৃণার স্রোতে। 

ঘৃণাকে পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মিছিলে হাঁটতে চাই। আমি নিশ্চিত, সেই মিছিলে কিছু লোক হবে। যাঁরা আজ আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন বা আমার দলীয় আনুগত্যহীনতাকে বিদ্রূপ করবেন, তাঁদেরও কেউ কেউ সেই মিছিলে পা মেলাবেন, স্বপ্ন দেখি।