মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০১৭

শ্রেনীযুদ্ধ ~ আর্কাদি গাইদার

আমরা যারা বামপন্থী রাজনীতি করি, আমাদের কাছে একটি অতি পরিচিত শব্দ - প্র‍্যাক্সিস।
প্র‍্যাক্সিস - অর্থাৎ থিওরি এবং প্র‍্যাক্টিস, বেশ মজার জিনিস। একটা বাদ দিয়ে শুধু অন্যটা দাঁড়ায় না।

এই যেমন আজকে নবান্ন অভিযানে ব্রিজে ওঠবার মুখে পুলিশের ব্যারিকেডের কাঠামোটাকে দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে যখন ঝাকানো হয়, পাশে হাত লেগে যায় দক্ষিন ২৪ পরগনা থেকে আগত লুঙি-শার্ট পড়া এক শীর্ণকায় বৃদ্ধ ক্ষেতমজুরের হাতে, দুজনের ঘাম একসাথে  লেপ্টে যায় ওই ব্যারিকেডের ধাতব দেহে, আর ঝাকাতেই থাকি, ঝাকাতেই থাকি, কারন ওই ব্যারিকেডটা ভাঙতে পারলেই একদিন পেড়ে ফেলবো রাষ্ট্রযন্ত্রকে, আর ঝাকাতে ঝাকাতে একটা তাল খুজে পাই সকলে, সেই তালে বারবার মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতন ঝিলিক দিয়ে ওঠে - শ্রেনী।
আর ব্যারিকেডটা ভাঙার পরের মুহুর্তেই যখন পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ,  তখন প্রাথমিকভাবে পিছু হটবার জন্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। তার মধ্যেই মানুষের স্রোতের উলটোদিকে সাঁতরে আসেন কিছু মানুষ, তাদের দেখে থমকে যায় মানুষ, থমকে যায় পুলিশের লাঠি, ছত্রভঙ্গ লালঝান্ডার ভিড় আবার একটু একটু করে এদের ঘিরে জমাট বাধতে থাকে রাস্তা জুড়ে, যেন চাপ চাপ রক্ত, এবং আবার পজিশন নিয়ে শুরু হয় লড়াই - ভ্যানগার্ড!
কোথা থেকে যেন জড়ো হয়ে যায় ইট, পাথর, চাঙড়, এবং কিছুক্ষনের জন্যে কলকাতার রাজপথ হয়ে ওঠে কাশ্মীর।
হঠাত টায়ার ফাঁটার মতন আওয়াজ করে টিয়ার গ্যাস সেলের বর্ষন শুরু হয়, লাল ঝান্ডা হারিয়ে যায় ধোয়ার মধ্যে, আর চারিদিকে ধ্বনি ওঠে - 'রুমাল ভিজিয়ে মুখে বাধুন কমরেড!' একদল ছাত্র, মুখে রুমাল বাধা, এই ভিড়ের মধ্যেই এদিক ওদিক দৌড়ে তপ্ত টিয়ার গ্যাস শেল সংগ্রহ করে ছুড়তে থাকে পুলিশের দিকে, আর প্রখর রোদে ফিনফিন সিল্কের মতন কাঁপতে থাকা হাওয়া আর ধোয়ায় চোখ নাক জ্বলতে থাকা অবস্থায় হঠাত যেন কলকাতা পালটে হয়ে যায় প্যালেস্তাইন, বা সিয়াটেল।

এরও অনেক পড়ে, হাসপাতালে এমার্জেন্সিতে পাশাপাশি রক্তাক্ত অবস্থায় রুমাল চেপে বসে থাকেন এক বৃদ্ধ পুলিশকর্মী আর এক ছাত্রী। ছাত্রীটি মনে মনে বলতে থাকে - 'আপনি রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকরি করেন, আপনার ভূমিকা পালন করেছেন। আমি কমিউনিষ্ট পার্টি করি, আমার ভূমিকা পালন করেছি।' তারপর ফোন বার করে মা'কে ফোন করে - 'তোমরা কোনদিকটায় চলে গেলে? বেশি লাগেনি তো?'

বাইরে রাস্তায় এখন রোদ মরে গিয়ে বিকেল নেমেছে। পিচের ওপর পড়ে রয়েছে রক্ত, ঘাম, টিয়ার গ্যাসের শেল আর ভাঙা ব্যারিকেডের টুকরো। কয়েকটা ছেড়া চটি। একটা প্লাস্টিকের ফ্রেমের চশমা। কলকাতা আজ ফ্রন্টিয়ার সিটি। শ্রেনীযুদ্ধ।