শুক্রবার, ১৯ মে, ২০১৭

বাংলা বিপন্ন! চলো নবান্ন!! ~ সুশোভন পাত্র

মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এগারোটা কমিশন গড়েছিল মেয়েটা। বছর ঘুরতেই আরও ছটা। এত কমিশন একসঙ্গে জীবনে দেখেনি রাজ্য বাসী। নবান্নের চোদ্দ তলার প্রথম থাকে সে রাখল 'জমি বণ্টনে অনিয়মে'র তদন্ত কমিশন'দের। রাজারহাটের কমিশন'টাকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, তুই আমার তুরুপের তাস। দ্বিতীয় থাকে রাখল সব 'গণহত্যার' কমিশন'দের। ২১শে জুলাই কমিশন'টাকে জড়িয়ে ধরে বলল তোর নাম বুদ্ধ ভট্টাচাজ বধ।
কিন্তু বছর যেতে না যেতেই ঘটে গেল সেই ঘটনাটা; বার সাতেকের নোটিশের প্যানপ্যানানি আর বার তিনেকের জেরার কচকচানির পরেও, জেলে পাঠানো গেল না গৌতম দেব'দের, মনীশ গুপ্ত কে বগল দাবা করেও, স্পর্শ করা গেলো না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কেশাগ্র। উল্টে জেলে চলে গেলো মেয়েটার কেষ্ট-বিষ্টু ভাইরা। মদন-কুণাল-সুদীপ-তাপসরা আজ ইতিহাস। নারদের লাইনে ঘুষখোর আরও কয়েকটা। এখন মেয়েটা সেটিং করতে দিল্লী-ভুবনেশ্বর করে বেড়ায় সপ্তাহে-মাসে। রাজনাথ-সোনিয়ার চৌকাঠে মাথা ঠোকে সমান তালে। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এগারোটা কমিশন গড়েছিল মেয়েটা। বছর ঘুরতেই আরও ছটা।
কমিশনের হাতি পুষতে সেদিন খরচা হয়েছিল রাজ কোষাগারের ৫ কোটি ¹। সিপি(আই)এম'র নেতাদের পিণ্ডি তর্পণের দিবাস্বপ্নে বিগলিত বুদ্ধিজীবীরা কমিশন'কেই দরাজ সার্টিফিকেট বিলিয়ে বলেছিলেন "এহি হ্যা রাইট চয়েস বেবি।" মিডিয়ার ক্যাকাফনি তে সেদিন অনায়াসেই চাপা পড়ে গিয়েছিলো অজিত লোহার-পূর্ণিমা ঘোড়ুই-জিতেন নন্দী'দের লাশের নিস্তব্ধতা। ঠিক যেমন আজ বরকতির লাল বাতি আর রাম নবমীর অস্ত্র মিছিলের ডেসিবেলে অবলীলায় অবহেলিত হচ্ছে কৃষক পরিবারের আর্তনাদ গুলো। ঠিক যেমন আজ প্রাইম টাইমে বড্ড সস্তায় ফেরি হচ্ছে হরিপদ বিশ্বাস'দের নিথর লাশ গুলো।
বর্ধমানের চাষি হরিপদ। চাষের জন্য ধার নিয়েছিলেন লাখ খানেক। তারপর ঐ চেনা চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি। বাজারে আলুর দর নেই, আলুর সংরক্ষণের পরিকাঠামো নেই; অতএব ক্ষেতের আলু পচে নষ্ট, অতএব আবার একবার চাষে লোকসান, এবং অগত্যা দেনাগ্রস্ত হরিপদর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা। চলতি মরশুমে হরিপদ রাজ্যে ষষ্ঠ ² ³ । শেষ ছ'বছরের ১৭৬তম ⁴ । এ রাজ্যে আলু চাষের খরচা গড়ে ৫০০ টাকা/কুইন্টাল। আর এবছর আলু বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১৪০-৩৪০টাকা/কুইন্টাল। রঙ্গনাথন কমিশনের সুপারিশে সি.এ.পি.সি ধার্য ধানের সহায়ক মূল্য যেখানে ১৪৭০টাকা/কুইন্টাল, সেখানে রাজ্য সরকার চাষি'দের ধান কিনেছে ৮০০-১১৬৬ টাকা/কুইন্টাল ⁵ ।  "নুন আনতে পান্তা ফোরানর সংসারে  এই টাকায় গলায় দেবার দড়ি ছাড়া আর কি বা জুটবে" –ভেজা গলায় বলেছিল কন্দর্বপুরের আরেক আত্মঘাতী চাষি চন্দন পালের ভাই কার্তিক ⁶।
২০১৩'র প্রাথমিক টেটের পরীক্ষা গ্রহণে প্রশাসনের অব্যবস্থার জন্য যেদিন রীতা ট্রেন থেকে পড়ে মারা গেলো, সেদিন আরও ৪৫লক্ষ পরীক্ষার্থী'দের মধ্যে কার্তিকও ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ অবশ্য জানিয়েছিল বৈধ পরীক্ষার্থী ১৭ লক্ষ ১২ হাজার। স্বপ্নের শবদেহ সাজিয়ে বাড়ি ফিরেছিল বাকি ২৮লক্ষ। অভিশপ্ত সেই প্রাথমিক টেটে পাশ করেছিল মাত্র ১.০৭% পরীক্ষার্থী। আর মোট পরীক্ষার্থী'র সাপেক্ষে চূড়ান্ত নিয়োগের অনুপাত ০.৬%। ১৯৯৮ থেকে ২০১০, এরাজ্যে প্রতি বছর এস.এস.সি'র মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছিল মোট ১,৮৫,৮৪৫ জন ⁷। পাড়ার মস্তান'দের ৮-১০ লক্ষ টাকার ঘুষ দিতে হয়নি, মেধা তালিকা গোপন রাখতে হয়নি, স্বজন পোষণ আর বেনিয়মের কলঙ্কও বয়ে বেড়াতে হয়নি। ২০১১'তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইশতেহারের ৩৪ পাতায় বলেছিলেন, "প্রতি বছর ২লক্ষ বেকারের চাকরি হবে ⁸।" হয়েছে; ২০০ কোটি দিয়ে ইমাম-মুয়াজ্জিন'দের ভাতা দেওয়া হয়েছে, বছরে ৮০ কোটি খরচা করে ক্লাবে গুণ্ডা পোষা হয়েছে, ৩০০ কোটির বিনিময়ে ঘটি-বাটি, মা-মাটি, ইলিশ-চিংড়ি উৎসবও হয়েছে, শুধু বছর বছর এস.এস.সি'তে নিয়োগটা আর হয়নি, শুধু কার্তিক'দের পেটের ভাতের জোগানটা আর হয়নি, শুধু রীতা'দের লাশের হিসেবটা আর হয়নি ⁹ ।
হিসেবে অবশ্য হয়নি বকেয়া ৫৪% মহার্ঘ্য ভাতারও। হয়নি বলেই বর্তমান মূল্যে রাজ্য সরকারের একজন গ্রুপ-ডি কর্মচারীর প্রতিমাসে ৩,৫৬৪ টাকার প্রাপ্য মহার্ঘ্য ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরে প্রায় ৪৩ হাজার। একজন গ্রুপ-সি কর্মচারীর বঞ্চনা প্রায় ৫৭ হাজারের। সরকারী হিসেব অনুযায়ী ৫৪% মহার্ঘ্য ভাতা বকেয়া থাকায় প্রতি মাসে সরকারী কোষাগার পুষ্ট হচ্ছে ৩০০ কোটি বাড়তি  টাকায়। বেড়েছে রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও। ২০১০-১১ আর্থিক বছরের ২১,১২৮ কোটি বর্তমানে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশী, ৪২,৪৯২ কোটি ¹⁰। পাল্লা দিয়ে ছাপ্পা ভোটের শতকরা বেড়েছে, মন্ত্রী বিধায়ক'দের ভাতা বেড়েছে, দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার সামগ্রীর দাম বেড়েছে, চোখের সামনে মুখ্যমন্ত্রীর দন্ত বিকশিত ছবি মার্কা হোর্ডিং'র সংখ্যাও বেড়েছে,  বাড়েনি শুধু আপনার ন্যায্য শ্রমের দামটা, বাড়েনি শুধু আপনার প্রাপ্য মহার্ঘ্য ভাতাটা।  
না, টিভির পর্দার ব্রেকিং নিউজে চিরুনি তল্লাশি করেও আপনি এসব খবর পাবেন না। সর্বাধিক বিকৃত কাগজের পাতায় চোখ রাখলে মনে হবে স্বর্গরাজ্যের সমস্যা বলতে, বিক্রম মদ খেলো কিনা আর লকেট হেলমেট পরল কিনা; দিলীপ ঘোষ জাবর কাটল কিনা, সিদ্দিকুল্লা চ্যাংড়ামি করল কিনা; শাহরুখের কে.কে.আর জিতল কিনা আর নিতা আম্বানি চুলে লরিয়েলের কালার করল কিনা। কিন্তু বিক্রি হয়ে যাওয়া ঘণ্টা-খানেকের চামাচাগিরিতে আর চাটুকার প্রিন্ট মিডিয়ার দিস্তা ভরানো কালিতে অজিত লোহার'দের রক্তের দাগের জায়গা নেই। চন্দন পাল'দের পরিবারের চোখের জলের নোনতা স্বাদের মূল্য নেই। রীতা'দের গতর খাটানো ঘামের গন্ধ নেই।  কিন্তু ওঁদের জন্য একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। ওঁদের রক্তস্নাত হয়েই একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। ওঁদের চোখের জল মুছিয়ে দিতেই একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। ওঁদের ঘামের গন্ধ গায়ে মাখতেই একটা লাল ঝাণ্ডা আছে। আর সেই লাল ঝাণ্ডা বুক দিয়ে আগলে রাখাতে হাজার-লক্ষ 'কমরেড' আছে। যারা পূর্ণিমা ঘোড়ুই-জিতেন নন্দী'দের সাথে একই আকাশ ভাগ করেছিল, একই বাতাসে শ্বাস নিয়েছিল, একই স্বপ্নে রাত জেগেছিল। এই সোমবারটা ঐ কমরেড'দের, এই সোমবারটা হরিপদ বিশ্বাসের, এই সোমবারটা শালকু সরেনের, এই সোমবারটা রীতা দাসের, এই সোমবারটা হক আদায়ের, এই সোমবারটা জবাব চাওয়ার, এই সোমবারটা কেতাদুরস্ত নবান্নে ঐ লাল ঝাণ্ডাটা উড়িয়ে দেওয়ার...