বুধবার, ৩ মে, ২০১৭

চিকিৎসা ও হলুদ সাংবাদিকতা ~ দোলনচাঁপা দাশগুপ্ত

আমি চুপ ছিলাম। আছিও। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনা,  দুর্ঘটনা,  ঘাত প্রতিঘাত ঘটে যে চুপ থাকাটাও বড্ড কঠিন আর ক্লেশকর হয়ে ওঠে।  চারিদিকে অজস্র দীনতা আর দিন আনা দিন খাওয়া পাপক্ষয়ের মধ্যে নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে আর কতোকাল বসে থাকবো? হলুদ সাংবাদিকতা আজ ঠিক করে দেবে চিকিৎসা বিদ্যার কোন টা ঠিক আর কোনটা বেঠিক?  বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিবাদ করতে গিয়ে  একজন নামকরা কবি ক'দিন আগে তার টাইমলাইনে লিখলেন- 'কেন গাছতলায় বসে অতি সহজেই রুটি অর্জন করবে  ডাক্তার রা? ' বোঝো!  ঘৃণা এবং প্রতিহিংসা কোথায় এবং কতদূর ছড়িয়েছে।  স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বদলাতে চেয়ে চিকিৎসক সমাজের প্রতি বিষ উগড়ে দেওয়া। ইনি কেমন মানুষ?  কবি হবার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। আর এইসব অশিক্ষিত মূঢ় সাংবাদিক?  যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে চিকিৎসককে অপরাধী বানান - গর্ভের মৃত সন্তান কে ক্রেনিওটমি নামক পদ্ধতিতে বার করে মায়ের জীবন রক্ষা করেছেন চিকিৎসক অভিজিৎ দাশগুপ্ত।  প্রশংসার বদলে তার নামে প্রত্যেকটি ছাপার কাগজে যে  মিথ্যা হঠকারী সংবাদ পরিবেশন করা হল তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ফেসবুকে আমার অনেক বিদগ্ধ সাহিত্যিক,  ফিল্মমেকার, শিল্পী,  কবি  বন্ধু আছেন যারা আমার পোষ্ট চুপিচুপি পড়েন কিন্তু জানান দিতে চান না।  তাদের উদ্দেশ্যে বলি আমি নামজাদা চিকিৎসক নই, অন্যান্য গুণ ও কম যাতে কিনা বড় বড় মিডিয়া হাউজে ঝপাঝপ ছবি ও লেখা বেরোবে।  আমি এক অতিসাধারণ ঘরের মেয়ে যে লড়াই করে উঠে এসেছি।  চিকিৎসক হবার আগে এক আত্মসম্মান যুক্ত মানুষ।  পৃথিবীর প্রথম একশো জন ধনী লোকের তালিকায় আমার নাম নেই, সাহিত্যে পুলিতজার বা বুকার আমার দিবাস্বপ্ন,  কান ফিল্ম ফেস্টিভালে ফিল্ম পাঠানো আমার বেড়ালের শিকে ছেঁড়ার মতো ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু এসবে আমি মোটেও দুখী নই। এখন যারা এসব পাচ্ছেন তারা বোধহয় সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ।তাদের সৃষ্টি তে কিন্ত আমজনতার কষ্ট হতাশা কিছুই ফুটে উঠছে না। মিডিয়াকে তারা চটাবেন না স্বাভাবিক - হয়তো পুরস্কার তিরস্কারে বদলে যেতে পারে। 
আমি শুধু আমার কথা বলিনি। আমির বদলে আমরা পড়ুন। সমাজে চিকিৎসক আর রুগি কিছু আলাদা নন। এখনো।  এতো অন্ধকারেও আলোর রেখা আছে। পুরোটা বিষিয়ে দিতে পারেনি বেনিয়া বহুজাতিকের দল।
আমার শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক স্যার Rezaul Karim এর এই প্রতিবাদ টি পড়ুন। ব্যক্তিগত ভাবে আমি বিপর্যস্ত থাকার জন্য বহুদিন ফেসবুকে আসতে পারিনি। আজ আর চুপ করে থাকতে পারা গেল না। 
আর হ্যা, আপনি যদি সমাজমনস্ক সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকেন,  চিকিৎসাব্যবস্থার বদল ঘটানোর স্বপ্ন দেখেন,  যদি সেলিব্রিটি না হন - তবে এই পোস্ট টিকে শেয়ার করুন। 
নয়তো আগামি দিন খুব ভয়ংকর।  লাল সবুজ গেরুয়া যে মৌলবাদী দল ই আসুক না কেন আপনাকে আমাকে কিন্তু চিকিতসকের কাছে যেতেই হবে। 
সাম্প্রতিক কালে চিকিৎসা বিভ্রাটের নানারকম ঘটনায় চিকিৎসক সমাজের দুর্নীতি নিয়ে অনেকেই মুখ খুলছেন- আশার কথা তাদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসক। খবরের কাগজ যে খবর ছাপে তার মধ্যে বিপননের চাপ থাকে, সবকিছুকেই রহস্যময় করতে পারলে ব্যবসায় লাভজনক হয়। আমাদের দেশের সাংবাদিকরা তো আর রবার্ট ফিস্কের মত নয়- যে যুদ্ধের খবর করতে গিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বেইরুটে গিয়েই জীবন কাটিয়ে দেবেন। তাকে  ফ্যালানজিস্ট স্পেশালিস্ট বললে কম বলা হয়। তিনি মধ্য-এশিয়ার যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ, তিনি প্রায় সব যুদ্ধবাজ, খুনে, গনহত্যাকারী, শান্তিকামী, মানবাধিকার কর্মী সবার নাডী নক্ষত্র চেনেন।  একদিকে  বোমা পডছে তার মধ্যে তিনি রেঁস্তোরায় বসে পাস্তা চিবুতে পারেন। ডালরিম্পলের মনে হয়েছে-"Fisk was...unexpectedly boyish... no amount of kindness could disguise the fact that Fisk was clearly a war junkie, suffering from all the side effects of an addiction to bombs, kidnapping, loud explosions and unhealthy quantity of adrenaline..." তিনি যুদ্ধ-সাংবাদিক, তিনি আদ্যন্ত পেশাদার। তার আড়ালে  যে বিদগ্ধ, স্নেহপ্রবণ মানুষটি লুকিয়ে আছে পেশার সাথে তার আপাত বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি পেশার মান রক্ষা করার জন্য কোন ঢাকঢাক গুডগুড না করে, যা দস্তুর তাই মান্য করেছেন। আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা বেশীরভাগ কিছু পড়াশোনা করেন কিনা সন্দেহ আছে- কেউ চাকুরি বাঁচানোর জন্য লেখেন, কেউ পাব্লিক কি খাবে সেটা ভেবে লেখেন। প্রায়শ: তাদের কলমে উঠে আসে চিকিৎসক, শিক্ষক বা অন্য পেশাদারদের মানবিকতার মূল্যায়ন বা সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। তারা নিজেরা কি সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ নন? একজন সাধারন মানুষের দৃষ্টিকোন থেকে কোনটা খবর? সে জানতে চায় তার জীবনধারণের প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু। কোন ভণ্ড রাজনীতিক কি বললেন, কে দল বদল করল, কে রাতবিরেতে রাসলীলা করতে করতে জীবন দিয়েছে তা মানুষের গ্রহনযোগ্য কোন খবর হতে পারে না। অথচ, প্রানধারনের সব গ্লানিকর দিকগুলিই খবরের কাগজের মুখ্য বিষয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার কেবলমাত্র খারাপ দিকগুলিই সাংবাদিক দেখতে পান। সেদিন খবরের কাগজ হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ থ হয়ে বসে রইলাম। একটি শিশুর মাথা ছিঁডে ফেলতে হলে কি অমানুষিক শক্তি থাকতে হবে- কারো কি তা থাকতে পারে? ধরুন, চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে আপনার কোন ধারনা নেই কিন্তু সাংবাদিকতার মহান পেশাগত দায়বদ্ধতা আপনার আছে। একটু পড়ে নেওয়া যায়, বহু নামী সাংবাদিক আছেন যারা সুশিক্ষিত তাদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যায়। আবার ইচ্ছা করলে চিকিৎসকদের কাছ থেকেও জেনে নেওয়া যেতে পারে। অথচ, খবরটি এমন ভাবে পরিবেশিত হল যে চিকিৎসক আসলে মেডিকেল কলেজে বোধহয় খুন করার ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তাই শিশুর মাথাটি ধড থেকে আলাদা করে তার শিক্ষা সম্পূর্ণ করেছেন। চারিদিকে শুধু অন্তহীন তমিস্রা, চিকিৎসকরা রক্তচোষা জোঁক, তারা রোগীদের মেরে ফেলছেন। "তারা" বলতে গেলে কতজন লাগে, শতকরা কতজন খারাপ হলে একটি সম্প্রদায়কে খারাপ বলা যায়? কাল যে সাংবাদিকরা একটি বহুচর্চিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভুল ব্যাখা করে জনগনের মধ্যে আতঙ্ক ও চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্ত করলেন তার ভিত্তিতে কি বলবো সাংবাদিকরা গনশত্রু। 
আমি সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানলাম এই সমস্ত ব্যাপারে প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করা যায়। আমাদের আইনী শাখা এবার থেকে যে কোন ধরনের মিথ্যা খবরকে আইনি পথে প্রতিহত করবে। অনিচ্ছাকৃত ভুল, অজ্ঞতা বা নাশকতা ও প্রতিশোধমূলক খবর আইনী পথে প্রতিরোধ করা হবে এ আমরা জানিয়ে রাখছি। পাশাপাশি এটা মনে করিয়ে দিই- আমরা কেউ ত্রুটিহীন নই, আমাদের ভুল হয়, আমাদের ভুল অনেকসময়ে মারাত্মক বা প্রানঘাতী ও হয়। অপরাধ বিজ্ঞানী একজন আমাকে বললেন- অপরাধের মোটিভ থাকে, সেখান থেকে অপরাধীর লাভের সম্ভাবনা থাকবে। একটা ঘটনা ঘটলে প্রথমে দেখা দরকার অপরাধ-ইচ্ছা ছিল কিনা। বিদেশে এ ধরনের ভুল হলে একদিকে মেডিকেল কাউন্সিল অন্যদিকে চিকিৎসকদের পেশাগত প্রতিষ্ঠান সেগুলি নিয়ে দিক নির্ণয় করে। অনেকসময়ে চিকিৎসকদের শাস্তিও হয় কিন্তু খবরের কাগজে গাঁজাখুরি গল্প লিখে গনহিস্টিরিয়া তৈরী করা যায়,  সমস্যার সমাধান হয় না। টক শো গুলোকে তো প্রায় কোন কথায় বলা যায় না, সেখানে চাঁদবদনটি দেখানো আর কিছু চটকদার কথা বলা ছাড়া কিছু হয় না। সুতরাং খাপ পঞ্চায়েতে  চিকিৎসকদের ফাঁসি হতে থাকবে, কেউ আটকাতে পারবে না। এর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে আসল স্বাস্থ্য সমস্যা- কেন জনস্বাস্থ্য বাজেট কমে, টীকাকরনে কেন অধোগতি, কেন শিশু মৃত্যুর হার কমে না, কেন শয্যা সংখ্যা বাডে না, ক্লাবের জন্য টাকা খরচ হয়,  হাসপাতাল রঙ হয় কিন্তু চিকিৎসা কেন তিমিরে!! গরীব মরলেও খবর হয় না- আজ যদি একজন চিকিৎসক সত্যিকার অন্যায় করে পার পেয়ে যায় আর সংবাদ মাধ্যম জেনেও চুপ করে থাকেন তাহলে বলতে হবে সে পাপের তারা সমান ভাগীদার। যা সত্য ও ইচ্ছাকৃত পাপ তা প্রকাশ করতে হবে। তার জন্য অনুশীলন করতে হবে।
ফিস্ক রূপকথা লেখেন না। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে হাসপাতালে ফসফরাস বোমা মারার পরের ঘটনা শুনুন- in a book filled with horror ...he met a nurse. After the bombardment had ended she had to put several burning babies into a big bucket of water in order to put out the flames. When she took them out half an hour later, they were still burning. Even in the freezing cold of the mortuary they were smouldered. The following morning the doctor took the tiny corpses out of the mortuary for burial". আনন্দবাজার হলে নিশ্চয় লিখতো- নিজের চোখে দেখলাম নার্সটি কচি বাচ্চার সুস্বাদু ঝোল বানাচ্ছিল, পরদিন ডাক্তার প্লেটে সাজিয়ে সেগুলি নিয়ে অদৃশ্য হল। যে নিরাসক্তি নিয়ে কাজ করার কথা আমাদের মহাপুরুষরা বলে গেছেন তার একান্ত অভাব আছে তাই নয়, এদের দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীন। মন প্রস্তুত হবার আগে কলম ধরতে শিখেছে, কলমের সব কালি তাই নিবের বদলে অগঠিত চরিত্র থেকে চুঁইয়ে আসছে। চারিদিকে হতাশাগ্রস্ত মানুষ তাৎক্ষনিক উত্তেজনার খোরাক পাচ্ছে। কিন্তু সমাজ যে অন্ধগলিতে পথ হারিয়ে ফেলছে সে হিসেব কে রাখে?  মনে পড়ে গুরুদেব লিখেছিলেন-"এত বর্তমান অভাব-নিরাকরণ এত উপস্থিত সমস্যার মীমাংসা আবশ্যক হইয়াছে, প্রতিদিনের কথা প্রতিদিন এত জমা হইতেছে যে, যাহা নিত্য, যাহা মানবের চিরদিনের কথা, যে-সকল অনন্ত প্রশ্নের মীমাংসার ভার এক যুগ অন্য যুগের হস্তে সমর্পণ করিয়া চলিয়া যায়, মানবাত্মার যে-সকল গভীর বেদনা এবং গভীর আশার কাহিনী, সে আর উত্থাপিত হইবার অবসর পায় না। চিরনবীন চিরপ্রবীণ প্রকৃতি তাহার নিবিড় রহস্যময় অসীম সৌন্দর্য লইয়া পূর্বের ন্যায় তেমনি ভাবেই চাহিয়া আছে,চারি দিকে সেই শ্যামল তরুপল্লব, কালের চুপিচুপি রহস্যকথার মতো অরণ্যের সেই মর্মরধ্বনি, নদীর সেই চিরপ্রবাহময় অথচ চির-অবসরপূর্ণ কলগীতি; প্রকৃতির অবিরামনিশ্বসিত বিচিত্র বাণী এখনো নিঃশেষিত হয় নাই; কিন্তু যাহার আপিসের তাড়া পড়িয়াছে, কেরানিগিরির সহস্র খুচরা দায় যাহার শাম্‌লার মধ্যে বাসা বাঁধিয়া কিচিকিচি করিয়া মরিতেছে, সে বলে–'দূর করো তোমার প্রকৃতির মহত্ত্ব, তোমার সমুদ্র ও আকাশ, তোমার মানবহৃদয়, তোমার মানবহৃদয়ের সহস্রবাহী সুখ দুঃখ ঘৃণা ও প্রীতি, তোমার মহৎ মনুষ্যত্বের আদর্শ ও গভীর রহস্যপিপাসা, এখন হিসাব ছাড়া আর-কোনো কথা হইতে পারে না।' আমার বোধ হয় কল-কারখানার কোলাহলে .. বিশ্বের অনন্ত সংগীতধ্বনির প্রতি মনোযোগ দিতে পারিতেছে না; উপস্থিত মুহূর্তগুলো পঙ্গপালের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে আসিয়া অনন্তকালকে আচ্ছন্ন করিয়াছে।"