শুক্রবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৭

লজ্জা ~ স্বর্ণালী ইসাক

আমার প্রোফাইলের সকল মহিলাদের উদ্দেশ্যে আমার এই পোষ্ট, আমি আপনাদের কিছু বলতে চাই,,,,,
 কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়,,, কিছু স্বীকারোক্তিও বলতে পারেন। করতে হবে,তাছাড়া তো আর উপায় দেখছি না। ব্যাঙ্গালোরের "Mass molestation" এর ভিডিওগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর থেকে এটাই মনে হচ্ছে বারবার। 
তাহলে শুনুন, তখন আমি 15, বাবা সদ্য কিছুমাস হয়েছে মারা গেছেন।মা ট্রমাটাইজ্ড। কথা বলা বন্ধ,নড়াচড়া করেন না,ঘরে বসে থাকেন, আর চোখের জল বেরোতে থাকে শুধু। এমতাবস্থায়, কিছু জরুরী ব্যাঙ্কসংক্রান্ত কাজের জন্য আমি আমার এক আত্মীয়ের শরণাপন্ন হই। ইনি আমার বাবার থেকেও বয়সে বড় এবং শিশুকালে এনার কোলেপিঠে চড়েছি অনেক। বলাই বাহুল্য 15 বছরের আমি ব্যাঙ্কসংক্রান্ত কাজের কিছুই বুঝিনা। উনি ওনার বাড়িতে(পাশের পাড়াতেই) ডাকায় আমি সেখানে যাই। সেদিন তিনি একলা ছিলেন এবং আমায় চমকে দিয়ে তিনি আমায় আক্রমণ করেন। ঘটনার আকষ্মিকতায় বিহ্বল হয়ে আমি কিছু মিনিটের জন্য কেমন স্তব্ধ হয়ে যাই, আর সেই সুযোগে উনি আমার পোষাক এদিক ওদিক কিছুটা ছিঁড়ে ফেলতে সমর্থ হন। কয়েক মিনিটের বিহ্বলতা কাটাতেই আমি বাঁচার জন্য চিৎকার আর লাফালাফি শুরু করি। তাতে আমায় জলের জগ,দরজার খিল, এবং চড়-লাথিও মারা হয়। তারপর সেই দরজার খিলটা দিয়েই ওনার মাথা ফাটিয়ে আমি নিজেকে কোনোক্রমে বাঁচিয়ে বেড়িয়ে আসি ওনার বাড়ি থেকে। জামা ছেঁড়া,মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত আহত আমি ও পাড়া থেকে নিজের বাড়ি অবধি কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসেছিলাম। কিন্তু বাড়ি ঢুকে দেখি অসুস্থ মা ছাড়া কেউ নেই।আমি বারান্দাতেই শুয়ে পড়ে থরথর করে কাঁপছিলাম। মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। খুব জলতৃষ্ণা পাচ্ছিল কিন্তু ওঠার শক্তি ছিল না।কী অপমান লাগছিল।শরীরের যেটুকু জায়গায় ওই আত্মীয় হাত দিতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেসব জায়গা কেটে বাদ দিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। স্তন,মুখ,কোমর,,,, ,মনে হচ্ছিল,খাবলে মাংস তুলে ফেলে দিলে বোধহয় ওই স্পর্শজনিত অপমান কিছুটা কমে। ইতিমধ্যে বাড়ির সবাই আধ ঘন্টা পর দল বেঁধে কোথাও থেকে এসে আমার উপর চড়াও হলেন। আমায় বলা হোল আমি নাকী সেই আত্মীয়ের কাছে টাকা চেয়েছি আর না পাওয়ায় ওনার মাথা ফাটিয়েছি। আমার ছেঁড়া জামা, মুখে অতটা আঘাত দেখেও কারো কিচ্ছু সন্দেহ হয়নি। আমি ওই ছেঁড়া জামা পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, আর বিজ্ঞচোদেরা সামনে দাঁড়িয়ে শালিসি করে যাচ্ছেন। কেউ একটা গামছা অবধি এগিয়ে দেননি নিজেকে ভালোভাবে ঢাকতে। তার উপর নোংরা কথা। একবারও আমার কথা কেউ বিশ্বাসও করেননি,কারণ করতে চাননি। প্রথম 20-25 মিনিট জানেনতো দিদিরা,,,  আমার খুব লজ্জা লাগছিল। ছিঁড়ে যাওয়া জামার জন্য। হাত দিয়ে বামস্তনের ছেঁড়া দিকটা ঢাকতে চাইছিলাম।আরেকহাত দিয়ে পেটের কাছের ছেঁড়া টা।কুঁকড়ে বেঁকে দাঁড়িয়েছিলাম। 26 নম্বর মিনিট থেকেই কিছু একটা হতে লাগল। আমি আস্তে আস্তে সোজা হতে লাগলাম। কারণ আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম যে, আমার কষ্টের দাম এই মূহুর্তে কারো কাছে নেই। আমার সত্যি অভিযোগটা এদের কাছে মিথ্যা। হাত দিয়ে শরীর আড়াল করার চেষ্টা ছেড়ে দিলাম।বুঝলাম এখন নিজের কথা এদের শোনাতে গেলে এদের বাধ্য করতে হবে শুনতে।এখন লড়াই করে সারভাইভ করার সময়,এখন শরীর নিয়ে ব্যস্ত হলে চলবে না। সব লজ্জা,ঘেন্না,কষ্ট সাইডে রাখলাম জোর করে, না, সেসব শরীর-মন ছেড়ে চলে যায়নি তখনো,জাষ্ট সাইডে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করে সব বলতে লাগলাম। জিনিসপত্র ভাঙতে লাগলাম। আরো কিছু লোক জমা হয়ে গেল। ততক্ষণে ফাটা মাথা সেলাই সেরে সে আত্মীয় হম্বিতম্বি করবেন ভেবে এসে গেছিলেন।গেট পার হতে দেখেই আমি শাবল নিয়ে ওনাকে তাড়া করি।তখন কিচ্ছু করতে পারিনি যদিও।ওনাকে ধরার আগেই সবাই আমায় ধরে নিয়েছিল,বরং যারা ধরেছিল,তাদেরই আহত করেছিলাম।ভয়ঙ্কর সীন ক্রিয়েট হল। কিন্তু এতে একটা লাভ হয়েছিল,, আর কোনো আত্মীয় আমার দিকে আঙ্গুল তোলার সাহস দেখাননি। আর সেই সুওরের বাচ্চাও বাড়ি বেচে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। 
 আমার বাপ শিখিয়েই গেছিলেন, "সব পরিস্থিতির একটা প্যাটার্ণ হয়, সেই প্যাটার্ণটা বোঝ, আর সেই অনুযায়ী নিজের শরীর মন তৈরী করে সারভাইভ কর,পরিস্থিতির প্যাটার্ণ টা ধরতে পারলে আর তার গোলামী করতে হয়না"। -- এটার মানে আমি তখন বুঝিনি যখন বাপ বলেছিলেন। এইদিন বুঝেছি যখন না বুঝেই আমি বাপের পরামর্শ পালন করে ফেলেছিলাম। 
.
        এতো হ্যাজ দেওয়ার একটাই কারণ, তা হল, আমি আপনাদের প্রত্যেকটা মহিলাকে এটা বলতে চাই যে , আপনাদের নিজেদের শরীরটা নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? সারাক্ষণ নিজের শরীর আগলাতে গিয়ে যে ঠিক করে লড়তে পারেন না, তা কী দেখেছেন? আমি ব্যাঙ্গালোর কান্ডের ভিডিওগুলো দেখছিলাম। মেয়েগুলো বুক বাঁচাতে ব্যস্ত ছিল, নিজের যেটুকু শক্তি ছিল, সেটাও কাজে লাগাতে পারল না বুক,পাছা আর যোনী বাঁচাতে গিয়ে। অথচ মিনিটখানেকের মধ্যে ঘটনার আকষ্মিকতা সামলে যদি ঘুরিয়ে একটা মুখে ঘুষি বা নিদেনপক্ষে চোখে আঙ্গুলও ঢুকিয়ে দিতে পারত, তাহলেও বেঁচে যেত ওই মেয়েটি যাকে দুজন বাইকারোহী আক্রমণ করেছিল। তা না করে সে বুক গার্ড করে নীচু হয়ে গেল, তখন ওই জানোয়ারের বাচ্চাগুলো পিছন থেকে ওর জামায় হাত ঢুকিয়ে হেনস্থা করল।
যাদেরকে এক দল জানোয়ার ছেঁকে ধরেছিল, তাদের লড়াই করাটা কঠিন ছিল জানি, তবু শরীর বাঁচাবার চেষ্টায় কুঁকড়ে বসে না পড়ে ঘুরে হাত চালালে সেক্ষেত্রে অনেক আগেই সেফ হতে পারতেন তাঁরা।
"এরকম কেন হবে?" "এই অব্যবস্থার মানে কী?" এই প্রশ্ন সবাই করবেন, করছেন। একটা লোম্বাও ছেঁড়া যাচ্ছে না তাতে অপরাধীদের। লড়াই করুন।প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। আপনাদের নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছোঁয়া এত সোজা কেন জানেন? কারণ আপনারা ভাবেন স্তন, যোনী ,পেট এসবে আপনাদের "শ্লীলতা" থাকে। শরীরের আবার শ্লীল অশ্লীল কী বাঁড়া? আমাদের  শরীরের প্রতিটা স্কোয়ার ইঞ্চ আমাদের। হাত ধরে টানলেও ঘুরে মারুন, স্তনে খামচালেও তাই। একটা বালের সমাজ এতদিন আপনাদের স্তন, যোনী আর নিতম্বসর্বস্ব করে রেখেছে। আর আপনাদেরও লজ্জা করেনা যে আপনারা তাই হয়েই বেঁচে আছেন? রাস্তায় জামা কাপড় এদিক ওদিক হলে লজ্জা, পোষাকে মাসিকের দাগ লাগলে লজ্জা, কেউ হিসি করতে বসতে দেখে নিলে লজ্জা ..... এদিকে কনুই ছুলে গেলে সমস্যা নেই, কেউ ধাক্কা মেরে লাইন থেকে সরিয়ে নিজে ঢুকে গেলে সমস্যা নেই(যতক্ষণ না সেই ধাক্কাটা স্তন বা পাছায় লাগছে) ইত্যাদি। আপনারা নিজের শরীরের কয়েকটা অঙ্গে এত বন্দি কেন এটাই হেকা বুঝতে পারে না। ফাঁকা রাস্তায় কেউ টেনে জামা খুলে দিতে চাইলে নিজেই নিজের জামা খুলে নিয়ে তাতে রাস্তার ঢিল,আধলা ইঁট কুড়িয়ে ঢুকিয়ে জামাটাকে সৌরভ গাঙ্গুলীর ষ্টাইলে ঘুরিয়ে মুখ আর মাথা লক্ষ্য দে মার, দে মার। ছাড়েন কেন? আপনারা এত দিনেও বোঝেন নি যে আমাদের মেয়েদের এই শরীর সংক্রান্ত লজ্জাটা আসলে জানোয়ার চামড়াখেকোদের অস্ত্র? 
,
আমি ওসব বড় বড় নারীবাদী বালবিচি বুঝি না, বুঝতেও চাইনা। কোথাও একটা ধর্ষন, শ্লীলতাহানি হবে, আর ফেবু জুড়ে "প্যাট্রিয়ার্কাল","প্যাট্রিলিনিয়াল" ইত্যাদি শব্দের চোদনামী শুরু হবে। হা হুতাশ, কান্নাকাটি।মোমবাতি মিছিল, আরো কত বালবিচালি। এসব বালের জিনিস খালে দিন। লড়তে শিখুন। স্তন, যোনীকে শরীরের আরো 5 টা অঙ্গের মতো স্বাভাবিক নিতে শিখুন। হাত আর মন খুলে একবার মেরে দেখুন। ধর্ষকরা ভয় পাবে, পিছোবে। আমি আদারে বাদারে জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই। ইউপি বিহার বেল্টে অনেকবার অনেক অসভ্যতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু ওই লজ্জা কম থাকায় বেঁচে বেড়িয়ে এসেছি। গায়ের জোর,শারীরিক শিক্ষার থেকে বেশী কার্যকরী হল লজ্জাহীনতা। 
আক্রমনকারীর মুখ চোখ ফাটিয়ে বিচি ফিচি থেঁতলে তার ওই যন্ত্রনাবিদ্ধ শরীরের সামনে ব্রা খুলে দাঁড়ান। আপনাদের অনাবৃত উর্ধাঙ্গ সামনে পেয়েও যখন জানোয়ারগুলোর চোখে শুধু মাথা আর বিচিফাটা যন্ত্রনা আর মুখে কাতর গোঙ্গানি শুনবেন। অদ্ভুত closure পাবেন,মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন। ইয়ার্কী ভাববেন না, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।   নিজেকে ভালবাসুন, নিজের জন্য লড়ুন। ছিঁড়ে দিন নারীমাংসলোভীদের মুখ,চোখ আর লিঙ্গ। যা করবার করুন কিন্তু দয়া করে আর অসহায় হয়ে পড়ে থাকবেন না। এ লাটক আর নেওয়া যাচ্ছে না। পায়ে ধরছি।
I love u all <3  blessed be )o(