রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৭

নববর্ষের স্মৃতি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

আমার ছোটবেলার নববর্ষের স্মৃতি এখনকার তুলনায় একেবারেই আলাদা।

মাজদিয়ায় বড়দিন বা নতুন বছর বলে কিছু ছিল না। শীতকাল, তাই সন্ধ্যেবেলা খেজুরের রস পাওয়া যেত। রবিবারে বুধবারে খেজুরের গুড়ের হাট বসত ইস্কুলের সামনের রাস্তায় আর তার পাশের মাঠে। দূর দূর থেকে লোক আসত সাইকেলের হ্যান্ডেল আর কেরিয়ারে বা গরুর গাড়িতে গুড়ের ভাঁড় সাজিয়ে। রাস্তা চলা সহজ হ'ত না, সাইকেল থাকলে তো আরো মুশকিল। ব্যাপারীরা লোহার লম্বা শিক ভাঁড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে চেক করত ভাঁড়ের তলায় বাজে গুড়ের পাইল দেওয়া কিনা। দরাদরি হ'ত। লাইন দিয়ে লরি দাঁড়িয়ে থাকত, বিকেলের পড়ন্ত রোদে সেগুলো ভাল কোয়ালিটির গুড়গুলো তুলে নিয়ে রওনা হ'ত। আমরা জানতাম - ওরা যাচ্ছে কলকাতায়, দিল্লীতে, আমেরিকায়। আমরা না পাঠালে ওখানকার মানুষ তো নলেন গুড় কী, তা জানতেই পারবে না। 

তবে এর সাথে পয়লা জানুয়ারির কোনো সম্পর্ক নেই। পঁচিশে ডিসেম্বরেরও। যদি কোন কারণে সে বছর মামার বাড়ি কৃষ্ণনগরে যেতাম ওই সময় - মাঝে মাঝে যেতাম - তবে তার মধ্যে কোনোবার চার্চে বেড়াতে যাওয়া হ'ত। কৃষ্ণনগরের গীর্জা বেশ পুরনো আর বেশ বড়, সে সময় মেলার মত ভিড় হ'ত। মনে আছে একবার, তখন আমি বেশ ছোট, সেখানে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মাকে খুঁজে না পেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে মাইকওলার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, বলে দাও না, আমার মা হারিয়ে গেছে।

কেক নামক বিচ্ছিরি খাদ্যটি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে চোখেই দেখিনি। 

তখন ক্যালেন্ডার ইয়ারই ছিল আমাদের অ্যাকাডেমিক ইয়ার। পুজোর সময় ছুটি থাকত একমাস, ভাইফোঁটার পর স্কুল খুললেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা। তার রেজাল্ট বেরোতো ডিসেম্বরে। হেড মাস্টারমশাই সুসিতবাবু প্রত্যেক ক্লাসে গিয়ে পাশ করা ছাত্রদের নাম ঘোষণা করতেন। বাবা ঐ স্কুলেরই শিক্ষক ছিলেন, জীবনেও কোনদিন আগে থেকে বলতেন না আমার রেজাল্ট কেমন। ধুকপুকুনিটুকু জেগে থাকত হেডস্যারের মুখ থেকে নিজের নাম শোনা পর্যন্ত। 

অবশ্য পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেই মা এর ওর বাড়ি থেকে চেয়ে আনত পরের ক্লাসের অঙ্কবই। সকালে ঘুম থেকে তুলে সামনে বাড়িয়ে দিত তবলা বাঁয়া। আমি লেপের মধ্যে নিজেকে ঢেকে দু চারবার ধা তেরেকেটে মেরে আবার শুয়ে পড়ার ধান্দা করতেই মা চেঁচিয়ে উঠত তোলা উনুনে কয়লা সাজাতে সাজাতে। তাই আরো দু চারবার বাজাতে হ'ত ধা তেরেকেটে ক্রেধা তেরেকেটে ধিন্না কত্তা। উঠে তুষের চাদরে নিজেকে পেঁচিয়ে আভা না বিভা দাঁতের মাজন বাঁহাতের তালুতে ঢেলে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে দাঁত মালিশ করতে করতে চলে যেতাম বাসরাস্তার ধারে। হলুদ নরম রোদ উঠত তখন। রাস্তার ধারে কাঠ আর পুরনো খবরের কাগজ জ্বেলে হাত পা সেঁকত কেউ কেউ, আমি তার পাশে গিয়ে বসতাম। ইস্কুল ছুটি, তাই বাবার টিউশনির ছাত্ররাও তখন পড়তে আসত না। 

তখন আমাদের খেলা ছিল সিগারেটের বা দেশলাইয়ের খাপের ছবি দিয়ে তাস খেলা। মাটির ওপরে একটা বিন্দু, সেটা হচ্ছে এখনকার কম্পিউটারের ভাষায় 'হোম'। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা লোহার কড়াইভাঙা চাকতি - যার মাপ বারো থেকে ষোলো বর্গ-ইঞ্চি, সেটা চালা হ'ত এমনভাবে, যাতে সেটা কুড়ি বাইশ মিটার দূরের কোনো এক জায়গায় এমনভাবে বসানো যায়, যাতে যে পরে চালবে, সে কিছুতেই তার চার-আঙুলের প্রস্থের দূরত্বে ফেলতে না পারে। চেলে নিজেকেই বুঝে নিতে হ'ত কতটা কঠিন জায়গায় চাকতিটা বসেছে। সেইমত তার ওপর একগোছা তাসের চ্যালেঞ্জ, মানে তুমি এর ঘাড়ে চাকতি বসালে আমি তোমাকে এতগুলো তাস দেব। চ্যালেঞ্জার কখনো সেই চ্যালেঞ্জ নিত, আর বসাতে পারলে জিতত, না বসাতে পারলে ততগুলো নিজের তাস গুনে দিত তাকে। সে চ্যালেঞ্জ না নিয়ে প্রথম চালা চাকতিধারীকে হোমে ফিরে আসার চ্যালেঞ্জও জানাতে পারত। এই খেলা চলত যতক্ষণ না একপক্ষ নিজের সব তাস হেরে যেত। সঙ্গে যত তাস আছে, তাকে বলা হ'ত হাত-প্যান্ট-পকেট। লোকজন চোট্টামো করে নিজের অঙ্গের বিচিত্র সব জায়গায় তাস লুকিয়ে রাখত। হাপ্প্যানপকেট ডেকে জিতলে বের হ'ত সেই সব তাস। সে নিয়ে মারামারিও হ'ত। 

কত বিচিত্র রঙের আর ডিজাইনের সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বাক্স ছিল তখন। এখন আর দেখি না, সব উঠে গেছে। 

ডান্ডাগুলি বা লাট্টু খেলা হ'ত ইউনিয়ন বোর্ডের মাঠে। কাঁচের গুলি দিয়েও খেলা হ'ত খোলা জায়গায় বা দেওয়ালের ধারে। অনেক জন মিলে খেললে সেই গুলি চালা হ'ত কুলোয় ঢেলে। কুলো জিনিসটাই এখনকার বাচ্চারা হয়ত চোখে দেখেনি। 'ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো' বললে কী বলা হচ্ছে, তা বোঝাতেই সব্বোনাশ। ক্রিকেট খেলা হ'ত, অবশ্যই টেনিস বলে - আমরা বলতাম ক্যাম্বিস বল। রবার ডিউস নামে এক শক্তপোক্ত রবারের বল পাওয়া যেত, তার লাফানি দুরন্ত। প্যাড-গ্লাভ্‌স্‌ লাগিয়ে আসল বলে ক্রিকেট খেলার সঙ্গতি আমাদের ছিল না, তাই মাঝে মাঝে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ঐ রবার ডিউস। তখনকার ফুটবল এখনকার এই নিটোল স্ফেরিক্যাল ছিল না। চামড়ার গোলকের মধ্যে ভরা থাকত রবারের গোলক, তার মুখে নল লাগানো। চামড়ার গোলকের এক জায়গায় কাটা থাকত, তার দুপাশে বোতাম লাগানোর মতন ঘর করা। নলে হাওয়া ভরা হ'ত, আর তারপর নলটা চেপ্টে ভাঁজ করে চামড়ার গোলকের মধ্যে ভরে জুতোর ফিতে বাঁধার মত সেই চামড়ার কাটা জায়গাটা বাঁধা হ'ত। বল পুরনো হয়ে গেলে সেই কাটা জায়গাটা বিচ্ছিরি রকম ফেটে যেত, তার তার মধ্যে থেকে রবারের ফুলানো বল আবের মত উঁচু হয়ে বেরিয়ে থাকত। আমরা অবশ্য বাতাবিলেবুর বল লাথানোর পরে সেই বল পেলেই উল্লসিত হয়ে তাই নিয়ে পেলে-র মত ড্রিবলিং করতাম। 

ইস্কুলের মাঠে স্যাররা ব্যাডমিন্টন খেলতেন। ছাত্র-শিক্ষক মিলে ভলিবল খেলত। একপাশে বাস্কেটবলও খেলা হ'ত কখনো কখনো।  

তবে বাড়ি ফিরে আমি সাধারণত অঙ্ক বইটা নিয়ে বসতাম। দোসরা জানুয়ারি নতুন ক্লাসে গিয়ে বসার একটা আনন্দ ছিল। ক্লাস শুরুর আগেই চার পাঁচটা চ্যাপ্টার আমি নিজে নিজেই করে ফেলতে পারতাম। তখন আর পুরনো বইটা ভাল লাগত না। নতুন ক্লাসে উঠলে নতুন বই এনে দিত বাবা, স্কুল থেকে বিক্রি হ'ত বঙ্গলিপি খাতা। 

আমরা একত্রিশে ডিসেম্বরের শীতের রাতে অন্য রাতের মতই রুটি-তরকারি-মাছের ঝোল খেতাম, শুয়ে পড়তাম রাত দশটার মধ্যেই। পয়লা জানুয়ারি ঘুম ভাঙত ভোরবেলা মা'র ডাকেই, যদিও তার অনেক আগে থেকেই বাবা বিছানায় বসে বসেই আবৃত্তি শুরু করে দিত - ওঁ পার্থায় প্রতিবোধিতাং ভগবতা নারায়ণেন স্বয়ম্ / ব্যাসেন গ্রথিতাং পুরাণমুনিনা মধ্যে মহাভারতম্‌ ...