শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭

ডেঙ্গু ~ ড: রেজাউল করীম

ডেঙ্গু তরজা থামার কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছে না। শাসকদলে যে এত বড় বড় অজানা জ্বর বিশেষজ্ঞ আছেন জানা ছিল না। আজ একজন মন্ত্রী বললেন- যে জ্বর হচ্ছে তার সব ডেঙ্গু নয়, অজানা জ্বরেও মানুষ মারা যাচ্ছে, ডাক্তার বাবুরা ভুল করে ডেঙ্গু লিখে ফেলছেন। এদেশের পেশাদার রাজনীতিকরা যে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন সে বিষয়ে আমাদের অল্পস্বল্প ধারনা ছিল কিন্তু তারা যে অবিবেচক তা আরো নতুন করে প্রতিদিন প্রমান করছেন। শুধু এই রাজ্যে নয়, গোটা দেশ জুড়েই এই অবস্থা- জনরোষ থেকে বাঁচার জন্য সবরকম অপবিজ্ঞানের চাষ হচ্ছে। যারা রাজ্য আর দেশের কর্ণধার আগামী  কোন একদিন তারা ক্ষমতা থেকে নির্বাসিত হবেন কিন্তু এই দেশ থাকবে। আজ যে অপবিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা আর অকর্মন্যতা ঢাকার চেষ্টা করছেন,তা কিন্তু জনমানস থেকে মুছতে অনেক সময় লেগে যাবে।
পৃথিবীর আর কোন দেশে নির্বুদ্ধিতার প্রতিযোগিতা হয় না, সাধারন মানুষের জীবনের দাম সেখানে অমূল্য। মানুষকে সেখানে মর্যাদা দেওয়া হয় এবং সরকার জনগনের ক্ষোভ প্রশমনেও আন্তরিক। এদেশের অন্যত্রও অবস্থা এত খারাপ নয়। সম্প্রতি কর্নাটকে দেখা গেল চিকিৎসকদের কথা শুনতে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী হাজির- তিনি চিকিৎসকদের অনেক দাবী দাওয়া মেনেও নিয়েছেন এবং প্রস্তাবিত বিলে প্রয়োজনীয় সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছেন। দক্ষিনের রাজ্যগুলিতে অন্তত: স্বাস্থ্যের মত গুরুতর বিষয়ে নিয়ে অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য করা থেকে রাজনৈতিক নেতারা অনেক সতর্ক। আমাদের নেতারা হ জ ব র ল সব নিয়ে বিশেষজ্ঞ। সুকুমারের ব্যকরণ সিংও সব কিছু খায় না, কিন্তু... তা যাক সেকথা।
এই রকম পরিস্থিতিতে এ রাজ্যে প্রতিরোধমুলক ব্যবস্থা নিয়ে সরকার যে মনোযোগ দেবে না তা বলাই বাহুল্য। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এই রাজ্যে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্র, নোংরা ও বসবাসের অযোগ্য পরিবেশ, বেকারি, অশিক্ষা, অপুষ্টি, অনাহার ও রাজনৈতিক কুনাট্যে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। কে বলবে বাঙালী একদিন সারা ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তার মেধা ও অধ্যাবসায় তাকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল। যারা শিরদাঁডায় তফাৎ নিয়ে কাব্য রচনা করছিলেন তারাও নিরাপদ দূরত্বে দাঁডিয়ে দাঁডিয়ে মজা দেখছেন। আজকাল হস্ত প্রক্ষালন করেও অনেকে পি সি সরকারের  মত ম্যাজিক-দণ্ড ছোঁয়া রত্ন  হয়ে যান। সুতরাং অধ্যাবসায়ের প্রয়োজন নেই। একটা চার আনা নেতার মাথায় অক্সিজেন সাপ্লাই নিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অক্সিজেনের অভাবে কি হতে পারে সেই ব্যাখার আমরা চমৎকৃত হয়েছিলাম। কিন্তু সে ছিল অপবিজ্ঞান শুরুর দিনগুলির কথা, এখন সেটা ফুলে ফলে পল্লবিত হয়ে সমাজের মর্মমূলে স্থাপিত হচ্ছে। আমরা সচেতন ভাবে রাজনৈতিক কূট ক্ষুরস্যধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চেয়েছি।তা সত্বেও যারা আমাদের অভিভাবকত্ব করবেন বলে আমরা আশা করেছিলাম তাদের অন্যায় আচরনের জন্যই  প্রতিদিন পেশার উপর আক্রমণ হচ্ছে ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হচ্ছে। চিকিৎসকদের কাজ ও প্রতিদিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। এই অবস্থায় কর্নাটি চিকিৎসকদের মত ঐক্যের নজির সৃষ্টি করতে হবে। ঐক্য অমূল্য ও অসীম গুরুত্ব সহকারে তা অর্জন ও রক্ষা করা দরকার। আই এম এ (পশ্চিমবঙ্গ, রাজ্য শাখা) যদি কর্নাটি শাখার মত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিত তাহলে বোধহয় ঐক্য ঐক্য বলে এত কথা বলতে হত না। কিন্তু তারা তাদের ন্যস্ত দায়িত্ব পালন না করে সবকিছুর মধ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আর সিপিএমের ভুত দেখছেন। যদিও জানি ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না,  সে আসে ধীরলয়ে আপনার নিজস্ব গতিতে। ন্যায় বিচারের পথ সুগম,প্রশস্থ ও তরান্বিত করতে না পারলে কিন্তু ইতিহাসের কাছে আমরাও অপরাধী থেকে যাবো। রাজনীতির কালনেমি ভাগ নিয়ে যার ইচ্ছা কাড়াকাড়ি করুক আমরা নিজেদের পেশার  সম্মান যেন রক্ষা করতে পারি আর সব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার সুনিশ্চিত করতে পারি, শুধু সেই কামনাই করতে চাই।

শুক্রবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৭

কর্নেল চিত্তরঞ্জন দাস ~ সাক্যজিৎ ভট্টাচার্য্য

বৃদ্ধ কর্ণেল এবং তাঁর হাঁপানিতে ভোগা স্ত্রী-এর কাছে কোনও টাকাপয়সা ছিল না। তাঁদের একমাত্র ছেলেকে নিষিদ্ধ পত্রিকা বিলি করবার অভিযোগে গুলি করে মারা হয়। কর্ণেলের কাছে ছিল একটা লড়ুয়ে মোরগ, যেটা আগামী শীতে মোরগ লড়াইতে নামবে বলে গোটা শহর তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা বাজী রেখেছে। কর্ণেল এবং তাঁর স্ত্রী নিজেরা না খেয়ে মোরগটাকে খাওয়াতেন । আর সহস্র দিনের যুদ্ধে অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ দিয়ে লড়বার জন্য সরকার যে পেনশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কর্ণেল গত পনেরো বছর ধরে সেই চিঠির  অপেক্ষায় বসে ছিলেন। প্রতি শুক্রবার নতুন মেল আসবার  দিন পোস্ট অফিসে হানা দিতেন তিনি, এবং প্রতি সপ্তাহেই পোস্টম্যান ব্যতিক্রমহীন উচ্চারণ করে যেত, 'কর্ণেলকে কেউ চিঠি লেখে না'।

চরম দারিদ্র্যের  মধ্যেও কর্ণেল তাঁর মোরগটাকে বিক্রি করেন নি। কারণ ওটা একদিন লড়াইতে জিতবে, জিতবেই। আর সেই লড়াইয়ের দিন আসার আগে নিজেদের খাবার জুটবে কীভাবে? কেন? সেই  চিঠিটা যে আসবে? সেই প্রাপ্য সম্মানটুকু? যেটার জন্য পুত্রহীন কর্ণেল সমস্ত অসম্মানকে সহ্য করে যাচ্ছেন! আর চিঠি যদি না আসে? তাহলে না খেয়ে থাকবেন, তবু মোরগটাকে লড়াইতে জেতাবেনই !

বিধাননগরের বাসিন্দা চিত্তরঞ্জন দাস।  তাঁর উনিশ বছরের মেয়ে রিয়া চলে গিয়েছে ডেঙ্গুতে  ভুগে। এবং মেয়ের মৃত্যুর পরে চিত্তরঞ্জন দাস দাঁতে দাঁত চিপে লড়াই করে গিয়েছেন।  একটা ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য, যেটাতে লেখা থাকবে মৃত্যুর কারণ আসলে ডেঙ্গু।  বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালের চিকিৎসক, সম্ভবত সরকারী অদৃশ্য নির্দেশনামা মেনেই, ডেঙ্গু  লিখতে অস্বীকার করেছিলেন। সন্তানহারা চিত্তরঞ্জন সারাদিন হাসপাতালে পড়ে থেকেছেন।  ছোটাছুটি করেছেন থানাতেও।  শুধুমাত্র যেন ডেথ সার্টিফিকেটে ডেঙ্গু  লেখা হয় এটুকুই দাবী ছিল তাঁর ।  কেন এরকম দাবী ? এতে করে তো আর রিয়া ফিরে আসবে না ! কারণ, চিত্তরঞ্জনের ভাষায়, "লিখিতভাবে ডেঙ্গু  থাকলে সেটা নিয়ে  স্থানীয় পুর-প্রশাসনকে সতর্ক করা সম্ভব, যাতে অন্য অনেকের এই রোগ না হতে পারে"।

একটা মারণ রোগ সরকারী সহায়তায় যখন শহরের ওপর থাবা বিস্তার করছে, তখন এই ব্যক্তিগত প্রতিরোধগুলোর গল্পও আর্কাইভড থাকুক। এই পৃথিবীর কোনও এক গুপ্ত পোস্ট অফিসে কর্ণেলের চিঠিটি সযত্নে রক্ষিত আছে, এবং এই পৃথিবীর  এমন কোনও তৃণমূল সরকার নেই যা চিত্তরঞ্জন দাসের প্রতিজ্ঞার সামনে অটল থাকবার  ধক দেখাবে--এই বিশ্বাসটুকু না থাকলে এই লেখাটার কোনও অর্থই  থাকত না। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের , মামাটি উৎসবের , টলিউড চিত্রতারকাদের নিয়ে নাচগানের উৎসবের অথবা  বিশ্বকাপ ফুটবলের শহরজোড়া  পোস্টারে  সহাস্য নেত্রীর মুখের কদাকার ছবিটিকে ম্লান করে দিয়ে আশ্চর্য্যভাবে একদিন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এই ব্যক্তিগত প্রতিরোধগুলির গল্প, ডাক্তার অরুণাচল দত্তচৌধুরীদের কাহিনী, যেগুলো  একদিন না একদিন সমষ্টিতে মিলবেই , এবং মোরগটা শেষ লড়াইতে জিতে যাবে তখন  -- এই বিশ্বাসটুকুকে কি বলা যেতে পারে?  ডেঙ্গুর দিনগুলিতে প্রেম?

কর্নেল চিত্তরঞ্জন দাস , মার্কেজের ভাষাতেই, 'is the orphan of his child'।  এই অনাথ পিতার প্রতিজ্ঞাকে এক  সামান্য কলমের পক্ষ থেকে সহস্র তোপধ্বনি।

(সূত্র ঃ  এবেলা, ১৪/১১/২০১৭)

বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৭

জমি অধিগ্রহণ ~ আর্কাদি গাইদার

মাত্র ৩০০ জন স্পার্টার সৈন্য নিয়ে রাজা লিওনাইডাস যখন গ্রীসকে রক্ষা করতে পারস্যের রাজা জার্ক্সিস এবং তার ১০ লাখের সেনাবাহিনীর সামনে দাড়িয়েছিলো, তখন জার্ক্সিস তাকে সুযোগ দিয়েছিলো আত্মসমর্পণ করবার। লিওনাইডাস রাজি হয়েনি। জার্ক্সিস বলেছিলো - তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। নির্মূল হয়ে যাবে। তোমাদের কোন চিহ্নও বাকি থাকবে না। একটা পাখি বা একটা পাথরও তোমাদের সাক্ষ্য বহন করবে না। তোমাদের অস্তিত্ব বলে কোন কিছু থাকবে না এই জগতে।
লিওনাইডাস বলেছিলো - থাকবে। মানুষের মনে থাকবে। তাদের মনে থাকবে যে ৩০০ জন তোমার ১০ লাখ সেনার সামনে লড়েছিলো। বহু বহু যুগ পরে, যখন এই পৃথিবীতে আমি বা তুমি কেউই থাকবো না, তখনও মানুষ আমাদের ৩০০ জনের কথা মনে রাখবে।

বোলপুরে শিবপুর মৌজার অন্তর্গত ২৯৪ একর জমি পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম অধিগ্রহন করেন ২০০১ এবং ২০০২ সালে বিভিন্ন পর্যায়। এই জমি হস্তান্তর করা হয় শিল্প স্থাপনের জন্যে। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৫ বছর। সেখানে শিল্প স্থাপন হয়নি।
বর্তমান সরকার ঠিক করেছেন, সেখানে আবাসন প্রকল্প করবেন। বর্তমান সরকারের আধুনিক বিশ্ববীক্ষাতে শিল্প মানে আবাসন প্রকল্প হতেই পারে। যেমন তারা ইনফোসিসকে দেওয়া জমিতেও তাই করতে চান। কিন্তু ওই গ্রামের মানুষগুলো কিঞ্চিত প্রাচীনপন্থী বলেই হয়তো তারা বর্তমান সরকারের এই মহান উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে পারেননি। 

তাই ওই গ্রামের মানুষরা আন্দোলন শুরু করেছেন। ওনাদের দাবিগুলো খুবই সামান্য। শিল্পের জন্যে নেওয়া জমিতে শিল্পই হোক। আর শিল্প না হলে সেই জমি আবার ক্ষতিপূরন সহ ফিরিয়ে দেওয়া হোক। শিল্পের জন্যে অধিগৃহণ করা জমিতে ফ্ল্যাটবাড়ি তুলে প্রমোটার, সাপ্লায়ার আর রিয়েল এস্টেট চোরপোরেটদের রমরমায় সামিল হতে তাদের অসুবিধে আছে। 

কিন্তু বর্তমান সরকার এই অন্যায় দাবি মেনে নেবে কেন? তারা সর্বশক্তিমান, ইশ্বরের মতন আরকি, আর ইশ্বর সমালোচনা সইতে পারে না। আর এতো সমালোচনা নয়, সরাসরি বিদ্রোহ! তাই মাঠে নেমেছেন বাংলার নতুন মূক্তিসূর্য অনুব্রত মন্ডল। সামরিক কায়দায় তিনি তার ক্র্যাক ব্যাটেলিয়নদের দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘিরে সেখানে মারধোর শুরু করেছেন। সাইকোলজিকাল ওয়ারফেয়ার। মানে একটা সংখ্যার লোককে পেটালেই বাকিরা চুপ করে যাবে। অনুব্রত মন্ডলের সামরিক স্ট্র্যাটেজি দেখলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বড় বড় জেনারেলরা লজ্জা পেতে পারেন। জার্মান আর্মি প্রথমে কোন একটি অঞ্চল আক্রমন করে সেখানে আধিপত্য কায়েম করতো। তারপর তাদের ভূমিকা শেষ। এরপর ঢুকতো এস এস। এস এসের ইউনিটরা সেই অঞ্চল ধরে ধরে সিভিলিয়ানদের আস্তে আস্তে কাবু করতো, প্রতিরোধে নামগন্ধ মিটিয়ে দিতো। একই কায়দায় শিবপুরে প্রথম ঢুকছে পুলিশ। তারপর অনুব্রতর ক্র্যাক ব্যাটেলিয়ন। 

কিন্তু বোকা গ্রামবাসীরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়না। এরা তার পরেও সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের সভায় যখন অনুব্রতর বাহিনী আক্রমন করে, কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়, তখন তাদেরকে ধাওয়া করে মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। অনুব্রত প্রেসে হুংকার দিয়েছেন - এই ঝামেলা না থামলে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। এবং তা শুরু হবে কালকে থেকেই।

আমরা জানি, এই লড়াই অসম লড়াই। পুলিশ এবং অনুব্রতর বাহিনীর সামনে গ্রামবাসীদের প্রতিরোধ না টেকবার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ র এই বিশ্বে এই বাস্তবকে মেনে নিয়েই আমরা বেচে আছি, থাকবো। কিন্তু আমরা তো একটা কাজ করতেই পারি।
মনে রাখা। আমরা মনে রাখবো, কতগুলো অচেনা অজানা সাধারন লোকও এই অসম লড়াই লড়েছিলো। প্রতিরোধ করেছিলো। 
বিশ্বাস করুন, একদিন অনুব্রত থাকবে না। মমতা থাকবে না। মোদীও থাকবে না। কিন্তু থেকে যাবে এই মানুষগুলোর লড়াইয়ের স্মৃতি। কারন আমরা মনে রাখবো। আমাদের মনে রাখতেই হবে।

সোমবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৭

ধর্মঘট ~ আর্কাদি গাইদার

শাবানা, দিল্লী
==========

"নোটবন্দী আর জিএসটি, দুটোই আমার পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের গ্রাম মুস্তাফাবাদের ৫০০ জন, যার মধ্যে আমি আর আমার স্বামীও রয়েছি, একজন কন্ট্র‍্যাক্টরের সাথে কাজ করতাম, কোম্পানীগুলোর জন্যে কাপড় সেলাই করে। সেলাই মেশিন কোম্পানি দিতো আর কনট্র‍্যাক্টর জনপ্রতি দিনে ১৫০ টাকা দিতো। এই জিএসটি কি সেটা আমি বুঝি না, কিন্তু যবে থেকে লাগু হয়েছে, আমরা সবাই কাজ হারিয়েছি। তিনমাস ধরে কোম্পানিগুলো কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কন্ট্র‍্যাক্টর জানিয়েছে তার হাতে কোন কাজ আসছে না।"

শিবশংকর বন্দোপাধ্যায়, এল আই সি এজেন্ট, চূঁচুড়া
==========================

"এল আই সি কে ধ্বংস করবার প্রক্রিয়া মনমোহন সিং শুরু করেছিলেন, মোদী এসে তাকে তরান্বিত করেছেন। এল আই সি'র নিজস্ব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, আর সরকার নিজের স্টেক বিদেশী কোম্পানিদের বেচে দেওয়ার ফিকির করছে। এই গোটা দেশের পরিকাঠামো - রাস্তা, জল, বিদ্যুৎ তৈরিতে এল আই সি'র লাভ্যাংশের ভূমিকা বিশাল। এল আই সি'র বর্তমান ভ্যালুয়েশন ২৪ লাখ কোটি টাকা। এটাকে বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দিলে কার স্বার্থরক্ষা হবে? এই বেসরকারি মালিকরাই ব্যাংকগুলোর কাছে ৮.৫ লাখ কোটি টাকা ঋন নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। তার থেকে আমাদের নজর ঘোরাতে প্রথমে এলো নোটবন্দী, তারপর জিএসটি। 
এই জিএসটির জন্যে সিংগেল প্রিমিয়াম পলিসিতে এল আই সি'র পলিসি হোল্ডারদের ১.৮% অতিরিক্ত কর দিতে হচ্ছে। দেশজুড়ে আমাদের পলিসির বিক্রি কমছে।"

লক্ষনীয়া দেবী, বিহার
===============

" আমি আর আমার বন্ধুরা নালন্দা থেকে এসেছি। আমরা সরকারি স্কুলে মিড-ডে মিল রান্না করি। আমরা কাজ করি ১২ মাস কিন্তু আমাদের মাইনে আসে ১০ মাসের। নোটবন্দীর সময় আমাদের স্কুলে রেশন আসা বন্ধ হয়ে যায়। আমি অশিক্ষিত, জিএসটি মানে বুঝি না। কিন্তু দেখছি যবে থেকে এটা লাগু হয়েছে, আমাদের মিড-ডে মিলের আনাজ আর সবজির পরিমান কন্ট্র‍্যাক্টর কমিয়ে দিয়েছে। আগে মাঝেমধ্যে ডিম আর ফল আসতো, সেগুলোও আর আসে না। কন্ট্র‍্যাক্টরকে নালিশ জানালে বলে জিএসটির পরে এর বেশি দিলে তার লস হবে। বাচ্চারা কম খেলে সেটা তার মাথাব্যাথা না।"

শত্রুঘ্ন কুমার, উত্তর প্রদেশ
==================

"জিএসটি আমাদের শেষ করে দিয়েছে। আমি গাজিয়াবাদে একটি ছোট কাপড়ের মিলে চাকরি করতাম। জিএসটির আগে আমরা ১০০০০ টাকা মাইনে পেতাম, এখন সেটা কমে ৭৫০০ হয়ে গেছে। আমার সন্তানদের স্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছি, গ্রামেও আর টাকা পাঠাতে পারি না। মালিক বলেছে যতদিন না জিএসটি পুরোপুরি ঠিকঠাক বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে এর বেশি মাইনে দিতে পারবে না। তাও আমার চাকরিটা আছে, অনেকের তো সেটাও চলে গেছে। 
আসলে নোটবন্দীর পরে আমাদের ক্যাশে মাইনে বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক একাউন্ট তো গ্রামে, তাই ব্যাংকে যে মাইনে আসছিলো তা তুলতে পারিনি, ধার করে চালিয়েছি। এখনো সেই ধার শোধ করছি, তাই অতিরিক্ত চাপ রয়েছে।"

সারবান কুমার, হরিয়ানা
=================

"আমি এখানে এসেছি দিনমজুরদের নূন্যতম বেতনবৃদ্ধির দাবিতে। আমি নির্মাণ শ্রমিক, দিনে ২০০ টাকা পাই। আমি চাই এটা নূন্যতম ৭০০ টাকা হোক। এর কমে আজকাল সংসার চালানো যায় না। এমনিতেই নোটবন্দীর পরে নির্মাণশিল্পে কাজ পেতে খুব কষ্ট হয়। এর বাইরে আমরা যে ইটভাটায় কাজ পেতাম, সেগুলোও সব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মাসে ১০ দিন কাজ পেতেও কষ্ট করতে হয়। 
আগে আমরা গ্রামে ক্ষেতে মজুরির কাজ করতাম খারাপ সময়ে। এখন সেই কাজও পাওয়া যায় না, চাষীদের অবস্থা খুব খারাপ, ওরা বলছে চাষে আর প্রফিট নেই।"

হেমলতা, কেরালা
============

"আমি একজন অংগনওয়াড়ি কর্মী। আমরা ৫০০০ জন এই ধর্ণায় এসেছি। আমাদের এখন মাসে ১০০০০ টাকা দেওয়া হয়। এই সরকার আসবার পরে আমাদের জন্যে বাজেটে নতুন কোন বরাদ্দ হয়নি। আমরা চাইছি আমাদের নূন্যতম বেতন ১৮,০০০ টাকা করা হোক, এবং এর সাথে আমাদের সরকারি কর্মচারীদের মতনই ছুটি আর বোনাসের সুযোগ সুবিধে দেওয়া হোক। "

যাদের জবানবন্দী ওপরে লিপিবদ্ধ করলাম, তারা এবং দেশের আরো কয়েক লাখ শ্রমিক মিলে গত সপ্তাহে তিনদিন ধরে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রীটে ধর্ণাতে বসেছিলো। ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন স্বাধীন ফেডারেশনের ডাকে। 

দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রীটে সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ শ্রমিকের লড়াইয়ের ঘোষনা, কোন টিভি বা খবরের কাগজ আপনাকে দেখিয়েছে? আপনি জানতে পেরেছেন যে দেশের রাজধানীতে এইরকম বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো?
না জানতে পারেননি। কারন যাদের দায়িত্ব আপনাকে জানানোর, তারা মনে করেছে হয়তো এটা আপনাকে জানানো অতটা গুরুত্বপূর্ন না। তার মানেই এই মিডিয়া সবাই সরকারের দালাল? একদমই না।সরকারের বিরুদ্ধে অন্য যে বিভিন্ন ইস্যুতে লড়াই চলছে, যেমন ধর্ম, বাকস্বাধীনতা, লিঙ্গ, জাত, খাদ্যভাস, ইত্যাদি, এই লড়াইতে সবসময়েই এই মিডিয়াদের পাশে পাবেন। কিন্তু অর্থনীতির প্রশ্ন এলেই দেখবেন এনারা  ঘুমিয়ে পড়েন। কেন বলুন তো? কারন শ্রেনী। শ্রেনী বড়ই বিষম বস্তু। তাই জিগ্নেশ মেওয়ানিকে নিয়ে খবরের কাগজগুলো আর্টিকেল লিখবে, আপনাকে জানাবে সে দলিতদের অধিকারের জন্যে লড়ছে, কিন্তু তার প্রধান দাবি যে দলিতদের মধ্যে এক্ষুনি ভূমিবন্টন করা হোক, সেটা আপনাকে জানতে দেওয়া হবে না। আপনি নারীর অধিকার, স্বাধীনতা, সুরক্ষা নিয়ে মাঠে নামুন, টেলিগ্রাফ আপনার পাশে ঝাপিয়ে পড়বে, আপনি খাদ্যের স্বাধীনতা এবং ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিয়ে মিছিল করুন, এনডিটিভি আপনাকে এক ঘন্টার কভারেজ দেবে। কিন্তু আপনি যদি শ্রমিকের অধিকারের জন্যে ট্রেড ইউনিয়নের লড়াইয়ের কথা বলেন, তখন দেখবেন, এনারা খুব রেগে গেছেন। 

কারন ওই একটাই, শ্রেনী। 

ওই ওরা যেটা বোঝে, আমরাও সেটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো, ততই ভালো। আসল লড়াইটা মোদীকে সরিয়ে রাহুল কে জেতানো না। আসল লড়াইটা ২০১৯ বা ২০২১ এর না। এগুলো একেকটা battle. আসল লড়াইটা war. শ্রেনী যুদ্ধ।  আজকে মোদীর বিরুদ্ধে যাদের পাশে পাচ্ছেন, এই টেলিগ্রাফ, এনডিটিভি, ইত্যাদি, আসল লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তারা কিন্তু দিক বেছে নিতে ভুল করবে না। আপনিও যেন ভুল না করেন। 

যেমন করেননি ওই কয়েক লাখ শ্রমিক। ওনারা ঘোষনা করেছেন, এর পরেই বাজেট ঘোষনার আগেই ওনারা দেশজুড়ে 'জেল ভরো' আন্দোলন শুরু করবেন। এবং তারপরেও তাদের দাবী না মানা হলে তারা লাগাতার ধর্মঘটের দিকে এগোবেন। মানে একদিনের সাধারন ধর্মঘট না। সমস্ত দাবী না মানা অবধি দেশজুড়ে লাগাতার ধর্মঘট। যা শেষবার এমার্জেন্সির সময় হয়েছিলো। 
এই লড়াই আসল লড়াই। এই লড়াই প্রধান লড়াই। এই লড়াই পবিত্র লড়াই। এখানে নিরপেক্ষ থাকবার অবকাশ নেই। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই লড়াইতে আপনি কোনদিকে থাকবেন।শাবানা, দিল্লী
==========

"নোটবন্দী আর জিএসটি, দুটোই আমার পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের গ্রাম মুস্তাফাবাদের ৫০০ জন, যার মধ্যে আমি আর আমার স্বামীও রয়েছি, একজন কন্ট্র‍্যাক্টরের সাথে কাজ করতাম, কোম্পানীগুলোর জন্যে কাপড় সেলাই করে। সেলাই মেশিন কোম্পানি দিতো আর কনট্র‍্যাক্টর জনপ্রতি দিনে ১৫০ টাকা দিতো। এই জিএসটি কি সেটা আমি বুঝি না, কিন্তু যবে থেকে লাগু হয়েছে, আমরা সবাই কাজ হারিয়েছি। তিনমাস ধরে কোম্পানিগুলো কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কন্ট্র‍্যাক্টর জানিয়েছে তার হাতে কোন কাজ আসছে না।"

শিবশংকর বন্দোপাধ্যায়, এল আই সি এজেন্ট, চূঁচুড়া
==========================

"এল আই সি কে ধ্বংস করবার প্রক্রিয়া মনমোহন সিং শুরু করেছিলেন, মোদী এসে তাকে তরান্বিত করেছেন। এল আই সি'র নিজস্ব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, আর সরকার নিজের স্টেক বিদেশী কোম্পানিদের বেচে দেওয়ার ফিকির করছে। এই গোটা দেশের পরিকাঠামো - রাস্তা, জল, বিদ্যুৎ তৈরিতে এল আই সি'র লাভ্যাংশের ভূমিকা বিশাল। এল আই সি'র বর্তমান ভ্যালুয়েশন ২৪ লাখ কোটি টাকা। এটাকে বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দিলে কার স্বার্থরক্ষা হবে? এই বেসরকারি মালিকরাই ব্যাংকগুলোর কাছে ৮.৫ লাখ কোটি টাকা ঋন নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। তার থেকে আমাদের নজর ঘোরাতে প্রথমে এলো নোটবন্দী, তারপর জিএসটি। 
এই জিএসটির জন্যে সিংগেল প্রিমিয়াম পলিসিতে এল আই সি'র পলিসি হোল্ডারদের ১.৮% অতিরিক্ত কর দিতে হচ্ছে। দেশজুড়ে আমাদের পলিসির বিক্রি কমছে।"

লক্ষনীয়া দেবী, বিহার
===============

" আমি আর আমার বন্ধুরা নালন্দা থেকে এসেছি। আমরা সরকারি স্কুলে মিড-ডে মিল রান্না করি। আমরা কাজ করি ১২ মাস কিন্তু আমাদের মাইনে আসে ১০ মাসের। নোটবন্দীর সময় আমাদের স্কুলে রেশন আসা বন্ধ হয়ে যায়। আমি অশিক্ষিত, জিএসটি মানে বুঝি না। কিন্তু দেখছি যবে থেকে এটা লাগু হয়েছে, আমাদের মিড-ডে মিলের আনাজ আর সবজির পরিমান কন্ট্র‍্যাক্টর কমিয়ে দিয়েছে। আগে মাঝেমধ্যে ডিম আর ফল আসতো, সেগুলোও আর আসে না। কন্ট্র‍্যাক্টরকে নালিশ জানালে বলে জিএসটির পরে এর বেশি দিলে তার লস হবে। বাচ্চারা কম খেলে সেটা তার মাথাব্যাথা না।"

শত্রুঘ্ন কুমার, উত্তর প্রদেশ
==================

"জিএসটি আমাদের শেষ করে দিয়েছে। আমি গাজিয়াবাদে একটি ছোট কাপড়ের মিলে চাকরি করতাম। জিএসটির আগে আমরা ১০০০০ টাকা মাইনে পেতাম, এখন সেটা কমে ৭৫০০ হয়ে গেছে। আমার সন্তানদের স্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছি, গ্রামেও আর টাকা পাঠাতে পারি না। মালিক বলেছে যতদিন না জিএসটি পুরোপুরি ঠিকঠাক বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে এর বেশি মাইনে দিতে পারবে না। তাও আমার চাকরিটা আছে, অনেকের তো সেটাও চলে গেছে। 
আসলে নোটবন্দীর পরে আমাদের ক্যাশে মাইনে বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক একাউন্ট তো গ্রামে, তাই ব্যাংকে যে মাইনে আসছিলো তা তুলতে পারিনি, ধার করে চালিয়েছি। এখনো সেই ধার শোধ করছি, তাই অতিরিক্ত চাপ রয়েছে।"

সারবান কুমার, হরিয়ানা
=================

"আমি এখানে এসেছি দিনমজুরদের নূন্যতম বেতনবৃদ্ধির দাবিতে। আমি নির্মাণ শ্রমিক, দিনে ২০০ টাকা পাই। আমি চাই এটা নূন্যতম ৭০০ টাকা হোক। এর কমে আজকাল সংসার চালানো যায় না। এমনিতেই নোটবন্দীর পরে নির্মাণশিল্পে কাজ পেতে খুব কষ্ট হয়। এর বাইরে আমরা যে ইটভাটায় কাজ পেতাম, সেগুলোও সব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মাসে ১০ দিন কাজ পেতেও কষ্ট করতে হয়। 
আগে আমরা গ্রামে ক্ষেতে মজুরির কাজ করতাম খারাপ সময়ে। এখন সেই কাজও পাওয়া যায় না, চাষীদের অবস্থা খুব খারাপ, ওরা বলছে চাষে আর প্রফিট নেই।"

হেমলতা, কেরালা
============

"আমি একজন অংগনওয়াড়ি কর্মী। আমরা ৫০০০ জন এই ধর্ণায় এসেছি। আমাদের এখন মাসে ১০০০০ টাকা দেওয়া হয়। এই সরকার আসবার পরে আমাদের জন্যে বাজেটে নতুন কোন বরাদ্দ হয়নি। আমরা চাইছি আমাদের নূন্যতম বেতন ১৮,০০০ টাকা করা হোক, এবং এর সাথে আমাদের সরকারি কর্মচারীদের মতনই ছুটি আর বোনাসের সুযোগ সুবিধে দেওয়া হোক। "

যাদের জবানবন্দী ওপরে লিপিবদ্ধ করলাম, তারা এবং দেশের আরো কয়েক লাখ শ্রমিক মিলে গত সপ্তাহে তিনদিন ধরে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রীটে ধর্ণাতে বসেছিলো। ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন স্বাধীন ফেডারেশনের ডাকে। 

দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রীটে সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ শ্রমিকের লড়াইয়ের ঘোষনা, কোন টিভি বা খবরের কাগজ আপনাকে দেখিয়েছে? আপনি জানতে পেরেছেন যে দেশের রাজধানীতে এইরকম বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো?
না জানতে পারেননি। কারন যাদের দায়িত্ব আপনাকে জানানোর, তারা মনে করেছে হয়তো এটা আপনাকে জানানো অতটা গুরুত্বপূর্ন না। তার মানেই এই মিডিয়া সবাই সরকারের দালাল? একদমই না।সরকারের বিরুদ্ধে অন্য যে বিভিন্ন ইস্যুতে লড়াই চলছে, যেমন ধর্ম, বাকস্বাধীনতা, লিঙ্গ, জাত, খাদ্যভাস, ইত্যাদি, এই লড়াইতে সবসময়েই এই মিডিয়াদের পাশে পাবেন। কিন্তু অর্থনীতির প্রশ্ন এলেই দেখবেন এনারা  ঘুমিয়ে পড়েন। কেন বলুন তো? কারন শ্রেনী। শ্রেনী বড়ই বিষম বস্তু। তাই জিগ্নেশ মেওয়ানিকে নিয়ে খবরের কাগজগুলো আর্টিকেল লিখবে, আপনাকে জানাবে সে দলিতদের অধিকারের জন্যে লড়ছে, কিন্তু তার প্রধান দাবি যে দলিতদের মধ্যে এক্ষুনি ভূমিবন্টন করা হোক, সেটা আপনাকে জানতে দেওয়া হবে না। আপনি নারীর অধিকার, স্বাধীনতা, সুরক্ষা নিয়ে মাঠে নামুন, টেলিগ্রাফ আপনার পাশে ঝাপিয়ে পড়বে, আপনি খাদ্যের স্বাধীনতা এবং ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিয়ে মিছিল করুন, এনডিটিভি আপনাকে এক ঘন্টার কভারেজ দেবে। কিন্তু আপনি যদি শ্রমিকের অধিকারের জন্যে ট্রেড ইউনিয়নের লড়াইয়ের কথা বলেন, তখন দেখবেন, এনারা খুব রেগে গেছেন। 

কারন ওই একটাই, শ্রেনী। 

ওই ওরা যেটা বোঝে, আমরাও সেটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো, ততই ভালো। আসল লড়াইটা মোদীকে সরিয়ে রাহুল কে জেতানো না। আসল লড়াইটা ২০১৯ বা ২০২১ এর না। এগুলো একেকটা battle. আসল লড়াইটা war. শ্রেনী যুদ্ধ।  আজকে মোদীর বিরুদ্ধে যাদের পাশে পাচ্ছেন, এই টেলিগ্রাফ, এনডিটিভি, ইত্যাদি, আসল লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তারা কিন্তু দিক বেছে নিতে ভুল করবে না। আপনিও যেন ভুল না করেন। 

যেমন করেননি ওই কয়েক লাখ শ্রমিক। ওনারা ঘোষনা করেছেন, এর পরেই বাজেট ঘোষনার আগেই ওনারা দেশজুড়ে 'জেল ভরো' আন্দোলন শুরু করবেন। এবং তারপরেও তাদের দাবী না মানা হলে তারা লাগাতার ধর্মঘটের দিকে এগোবেন। মানে একদিনের সাধারন ধর্মঘট না। সমস্ত দাবী না মানা অবধি দেশজুড়ে লাগাতার ধর্মঘট। যা শেষবার এমার্জেন্সির সময় হয়েছিলো। 
এই লড়াই আসল লড়াই। এই লড়াই প্রধান লড়াই। এই লড়াই পবিত্র লড়াই। এখানে নিরপেক্ষ থাকবার অবকাশ নেই। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই লড়াইতে আপনি কোনদিকে থাকবেন।

রবিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৭

ডেঙ্গু ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

আলব্যের কামুর 'দ্য প্লেগ' উপন্যাসে একটি আলজেরিয়ান শহর, ওরান, প্লেগের কবলে পড়েছিল। আস্তে আস্তে মৃতের সংখ্যা যখন বাড়ছিল, শহরটিকে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। গ্রিক ট্র্যাজেডির ফর্মে লেখা পাঁচ পরিচ্ছদে বিভক্ত উপন্যাসটিতে প্রথম পরিচ্ছদের শেষে গিয়ে গম্ভীর বিষণ্ণ কণ্ঠে প্রিফেক্টের নির্দেশ এসেছিল "ক্লোজ দ্য টাউন"। 

আর এইভাবে, নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সের অবরুদ্ধ হয়ে পড়া এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের অন্তহীন সংগ্রামের কাহিনীর প্যারাবল  হয়ে উঠেছিল প্লেগের আক্রমণ, অবরোধ এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। 

আমাদের কোনও কামু নেই। তাই মৃতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়ালেও ডেঙ্গু নিয়ে এরকম লেখা কখনো হবে না।  সরকার অস্বীকার করবে, নির্মম উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে বিশ্ববাংলা উৎসব করবে, কর্তব্যরত চিকিৎসককে সাসপেন্ড করবে, আর একটা গোটা শহরকে ধীরে ধীরে কব্জা করে নেবে একটা মারণ রোগ।  আসলে কে না জানে, আপনি যখন স্বপ্নে বিভোর, কোল্ড ক্রিম আপনার ত্বকের গভীরে কাজ করে। আমরা যখন সুপ্ত অচেতন, শোষক কীট আমাদের  সর্বাঙ্গ কুরে খায়। আপনি যখন আকাশের আনন্দে মগ্ন, ফ্যাসিবাদ তখন নিঃশব্দে প্রবেশ করে ! 

প্লেগ উপন্যাসটি শেষ হয়েছিল এই বলে 

"...the plague bacillus never dies or disappears for good; that it can lie dormant for years and years in furniture and linen-chests; that it bides its time in bedrooms, cellars, trunks, and bookshelves; and that perhaps the day would come when, for the bane and the enlightening of men, it would  rouse up its rats again and send them forth to die in a happy city." 

এই প্লেগকে কেউ কেউ ডেঙ্গু নামে  জানে, কেউ জানে তৃণমূল সরকার নামে।

শুক্রবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৭

হাসপাতালের জার্নাল ~ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

যাহা বলিব সত্য বলিব 
অথবা 
কার্নিভ্যাল সমগ্রঃ

গত ৬ই অক্টোবর আমার অ্যাডমিশন ডে ছিল।  সরকারি জেলা হাসপাতালে। ওয়ার্ডের নোটিসবোর্ডে আমার নাম Dr.A.D.C.
সকাল ৯টা থেকে পরের দিন সকাল ৯টা অবধি যত রোগী/রোগিনী ভর্তি হবেন সব টিকিটে লেখা আমার নাম। অর্থাৎ এই রোগীদের ভর্তি পরবর্তী চিকিৎসা,  রেফারেল, যদি মৃত্যু ঘটে সে'ই দুঃখজনক ঘটনা সব কিছুর জন্যই "আই উইল বি হেল্ড রেসপন্সিবল।"
এই ২৪ ঘণ্টা কাটানোর পর সব মিলিয়ে আমার অবস্থা কেমন? শরীরের কথা থাক। মনের কথাটা বলি। উদাহরণ দিয়ে বলি। কিশোর বেলায় ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ঘুড়ি যখন আকাশে আর লাটাই আমার হাতে সেই সময় উত্তেজিত থাকতাম খুব। কখন সুতো ছাড়ব, কখন টানব, ঘুড়ি কোন বাতাসে কোন দিকে গোঁত্তা খাচ্ছে … সে এক তুলকালাম অবস্থা। কিন্তু সেই ঘুড়িটা কেটে গেলে, মন নিমেষে উত্তেজনা মুক্ত। কাটা ঘুড়ির পেছনে দৌড়োনো স্রেফ অভ্যেস বশে। মন জানে, লাভ নেই। এখনও প্রায় সেই রকমই। ভর্তি রোগীর সংখ্যা অকল্পনীয় হওয়ায়, মনে আর কোনও চাপ নেই। অপরাধবোধ? তা' একটু রয়েছে বটে। আশা, প্রশাসকদের দেখে সেই লজ্জা আবরণটিও সরে যাবে।
যখন আমার নামে ভর্তি হওয়া মানুষের মোট সংখ্যা পঞ্চাশ ষাট ছিল কয়েকসপ্তাহ আগেও জানতাম ঘুড়িটা উড়ছে। কান্নিক খাচ্ছিল… তবুও উড়ছিল। কিন্তু তার পরে এই জেলায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জ্বর, সেই কারণে প্রচুর মৃত্যু, আর অকল্পনীয় মৃত্যুভয়।
অথবা অন্য ভাবে বললে, ভর্তি রোগীর সংখ্যাটা যতদিন কম ছিল মানে কম বেশি একশ', জানতাম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কাজ করছি। আজ যখন সে সংখ্যা পাঁচশ'র আশেপাশে, জেনে গেছি যুদ্ধ অসম্ভব। বন্যার জল ঢুকে পড়েছে, এখন একমাত্র গতি ভেসে যাওয়া।
ইতিমধ্যে কর্পোরেট হাসপাতালে জ্বরে মৃত্যুর কারণে ভাঙচুর মহামান্য মিডিয়া সাড়ম্বরে ছেপেছে। দেখিয়েছে।
সেই মিডিয়া কিন্তু প্রান্তিক হাসপাতাল দেগঙ্গা বা রুদ্রপুর হাসপাতাল ছেড়ে দিন, এমন কী জেলা হাসপাতালে উঁকি দিয়েও দেখেনি। কাজ সেরেছে সম্ভবত স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসকদের সাথে কথা বলে, যাদের একমাত্র কাজই হচ্ছে তথ্য চেপে যাওয়া।
যাই হোক, যা বলছিলাম, মেডিসিন ওয়ার্ডের মেঝে ছেড়ে উপচে ওঠা ভর্তি রোগীর ভিড় নেমে এসেছে হাসপাতাল বিল্ডিংএর অন্যান্য মেঝেতে, যেখানেই প্লাসটিক শিট পাতার সামান্যতম জায়গা রয়েছে, সে'খানে। 
পা রাখার জায়গা আক্ষরিক অর্থেই নেই। ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা? কেউ জানে না, শুধু কম্পিউটার জানে। 
সবার গায়ে জ্বর। অনেকের কাছেই বাইরের ল্যাবে করানো ব্লাড রিপোর্ট। সবারই এক আর্তি, রিপোর্টে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে, অর্থাৎ এনএসওয়ান পজিটিভ আর প্লেট(পড়ুন প্লেটলেট) কমেছে। সবার বাড়ির লোকের দাবী, স্যালাইন দাও।
সবাইকে সেই দিনের ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার ইচ্ছে থাকলেও ছুঁয়ে দেখতে পারছে না। কারণ ত্রিবিধ। প্রথমত মোট  রোগীর সংখ্যা, সম্ভবত পাঁচশ, একলা দেখতে হবে রাউন্ডে। দ্বিতীয়ত বেড হেডটিকিটের উল্লিখিত রোগীকে খুঁজে পাওয়া। কোন বারান্দার বা কোন ঘুপচির মধ্যে গাদাগাদি হয়ে রয়েছে সে হাজার ডাকাডাকি করেও পাওয়া যাচ্ছে না। তৃতীয়ত খুঁজে যদিও বা পাওয়া গেল, গায়ে গা লাগিয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে অন্যকে পায়ে না মাড়িয়ে পৌঁছোনো কার্যত অসম্ভব। 
জেলার স্বাস্থ্য প্রশাসক অতি চালাকের মত বিবৃতি দিচ্ছে হাসপাতালে সব ব্যবস্থা(পড়ুন নির্ভেজাল অব্যবস্থা) রয়েছে। হাসপাতালের প্রশাসক অসহায়। অলিখিত নির্দেশ রয়েছে অব্যবস্থার কথা বা ছবি ঢাকতে হবে যে কোনও মূল্যে। তা' নইলে নেমে আসবে ব্যক্তিগত কোপ। আর তার নিজেরও আনুগত্য দেখিয়ে স্বাস্থ্যভবনের প্রসাদকণা পাবার আকাঙ্ক্ষা বড় কম নয়। 
আর আমি? একদিনে যাকে দেখতে হবে কমবেশি পাঁচশ জন, সেই আমি অতিব্যস্ত আগামী এক দেড় দিনের মধ্যেই নমো নমো করে এ'দের অনেককে জ্বর গায়েই বাড়ি পাঠিয়ে দিতে, কেন না পরের দিন গুলোয় নতুন পাঁচশ জনের তো "সাব হিউম্যান তবু সব ব্যবস্থা থাকা" সরকারী হাসপাতালে জায়গা চাই। আক্রান্ত জনসমুদ্র ঝাঁপয়ে পড়ছে ইমারজেন্সিতে।
এর মধ্যেই মারা যাচ্ছে জ্বরের রোগী। বুঝিয়েসুজিয়ে(প্রশাসনিক জবানে কাউন্সেলিং করে), কান্না মোছানোর চেষ্টা করছি। ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লিখছি…না না ডেঙ্গু নয়। 
এই রাজ্যে ডেঙ্গু হওয়া বারণ। এই অতি চালাক আমি… রক্তচোখের ভয়ে  ভীত কেন্নোর মত সন্ত্রস্ত এই আমি অভাগার ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লিখছি 'ফিভার উইথ থ্রম্বোসাইটোপিনিয়া'।
আর রক্তচোখের মালকিন মালিকেরা তখন কার্নিভ্যালে কৃত্রিম একধরণের ঠোঁট প্রসারিত চালাক চালাক প্রায় অশ্লীল হাসির ভঙ্গিমায়, কখনও বিসর্জন দেখছে, কখনও দেখছে ফুটবলের কবন্ধ রাক্ষুসে মূর্তি। 

এর মধ্যে বলাই বাহুল্য জ্বর ছাড়া অন্যান্য রোগীরাও ভর্তি হয়েছেন মেডিসিন ওয়ার্ডে। মানে হার্ট অ্যাটাক, সেরিব্রাল স্ট্রোক, সিরোসিস, কাশি-বমিতে রক্তপাত, খিঁচুনি ইত্যাকার বহু দুর্ভাগা। তাঁদের দেওয়া সুচিকিৎসা(?)র কথা সহজেই অনুমেয়। আমার দেওয়া তথ্যের সমর্থনে রোগীদের দুর্দশার ছবি মোবাইলে তুলে সাঁটানোই যেত এই দেওয়ালে। কিন্তু মহামহিম স্থানীয় প্রশাসক কার যেন মোবাইল এই অপরাধে নাকি বাজেয়াপ্ত করেছেন। সরকারী গোপন তথ্য ফাঁস করা অপরাধ। 
একটা পুরোনো রাশিয়ান কৌতুকী মনে পড়ল।
শিক্ষামন্ত্রীকে গাধা বলেছিল একটা লোক। বিচারে দু'দফায় জরিমানা হয়েছিল তার। প্রথম কারণ শিক্ষামন্ত্রীকে অপমান, দ্বিতীয় কারণ রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস। 
জানি না আমার এই লেখায় সেই গোপন তথ্য ফাঁসের অপরাধ ঢুকে গেল কিনা।

প্রান্তিক ভোটার আপাতত জ্বরে কাঁপছে। কাঁপুক।
মরে যাচ্ছে। যাক।
অপ্রতিহত চলুক ভোগান্তি আর মৃত্যুর কার্নিভ্যাল।
নিষ্ঠুর হলেও সত্যি, আবার ভোট এলে প্রসাদ কুড়োনো করে কম্মে খাওয়া ভাইবেরাদরদের হাত দিয়ে পাঠানো হবে ভিক্ষের অনুদান। 
মশা আর ভোট বেড়ে যাবে এ'ভাবেই… ফিবছর।
-------------------------------------------------------------------
মেল মেডিসিন আর ফিমেল মেডিসিনের নোটিশ বোর্ডের ছবি দিলাম। বাহুল্যবোধে আইসোলেশন ওয়ার্ডেরটা দিলাম না।
---------------------------------------------------------

অরুণাচল ~ আর্যতীর্থ

এই তো কেমন পেয়েই গেলেন সত্যি কথা বলার ফল,
সবার মুখে কুলুপ আঁটা , বলেন  শুধু অরুণাচল।

সবাই জানে হচ্ছে যেটা, সত্যি তবু বলতে নেই,
প্রদীপগুলোর তেলের অভাব, জ্বলার মতন পলতে নেই।

যুগটা এখন অন্ধ সাজার, জিভের লালায় বশ্যতা
এমন সময় ও বেয়াদপ, এত সাহস পাস কোথা?

উপচে পড়ুক জ্বরের রোগী, তাই বলে লিখবে ছাই?
আপ্তবাক্য পড়েননি কি, শতংবদ , লিখতে নাই?

এই রাজ্যে জ্বরজ্বালা তো, বলতে পারো গুপ্তরোগ,
চোরের মতন চুপিচুপি , সইতে হবে সে দুর্ভোগ।

সাহসকে যাই বলিহারি! রাজার পরে ,রাজার খায়,
আপোষ নামক পাপোষ ছেড়ে, কলম তবু গর্জে যায়।

গর্দানটি আস্ত আছে, এটাই জেনো পূণ্যফল,
সত্যি কথার দাম দিতে হয়, জানেন সেটা অরুণাচল।

ভাবছি বসে সমস্যাটা, এতেই কি আর মিটবে সব?
অতই সহজ করা কলম জবুথবু, জরোদগব?

শব্দরা তাঁর ফুলকি হয়ে, আগুন ছড়ায় সব বুকে,
রাজার চরে আটবে কুলুপ, খুঁজে খুঁজে কয় মুখে?

উঠছে বাতাস, বইছে বাতাস, নড়বে এবার ধর্মকল,
ভালো করে দেখুন রাজা, তৈরী হাজার অরুণাচল।


বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৭

গুল্প-সমগ্র ~ অরুণাচল দত্ত চৌধুরি

কোর্টে দেওয়া হলফনামা… 
ফালতু হাসির গল্প থামা
জ্বরের কারণ পুজোয় নাকি 
বাইরে ঘুরতে গিসল মামা।

'যাচ্ছিস যা লালপাহাড়ি, 
সঙ্গে কিন্তু নিস্ মশারি',
পিসির হুকুম।( সেই যে পিসি, 
ভাইপোরা যার বদের ধাড়ি)।

সেই মশারিই গেছিস ভুলে? 
ভিন রাজ্যের মশক ছুঁলে, 
ঘটার যে'টা ঘটল সে'টাই, 
ডেঙ্গি ছিল তাদের হুলে।

কামড়াল তো, তার পরে কী? 
অবাক হয়ে সবাই দেখি
সবার গাত্রে জ্বরের তাড়স। 
চেঁচায় পিসি রিপোর্ট মেকি।

এই সে'দিনও ঢাক পিটিয়ে
দিচ্ছিল এই বিকট ইয়ে
হঠাৎ কেন ডেঙ্গি কথা 
করছে স্বীকার কোর্টে গিয়ে?

জিভের গোড়ায় বেজায় মিথ্যে। 
ক্লাব অনুদান পাগলু নৃত্যে
ভোটের হিসেব। আজকে বুঝি 
ভয় জেগেছে ও'টার চিত্তে?

অন্য রাজ্যে ভ্রমণ পাড়ি ,
দেয় যারা সব দেগঙ্গারই?
বাদুড়িয়ার বসিরহাটের? 
এ' গুল কি কেউ মানতে পারি?

তার চাইতে বল্ না সোজা
ইচ্ছে করেই চক্ষু বোজা
কার্নিভ্যাল আর মেলায় খেলায়
যায়নিকো রাজধর্ম খোঁজা।

রবিবার, ৫ নভেম্বর, ২০১৭

পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গু ~ সুশোভন পাত্র

ঠিকই  তো বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মশা তো আর সরকারের হাতে নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মশার ডিমও পাড়েন না। খাল কেটে মশা ডেকেও আনেন না। জমা জলেই তো মশা ডিম পাড়ে। কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তো আর পাড়ে না। মশার কামড়েই তো ডেঙ্গু হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিমটি কাটলে তো আর হয় না। আপনার ঘরে মশারি কি মুখ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টাঙ্গিয়ে দিয়ে যাবেন ? নর্দমায় ব্লিচিং পাউডার কি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছড়িয়ে দেবেন?  আরে বাবা, আপনার জ্বর হলে ব্লাডের অগ্নিপরীক্ষা কি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন নাকি ? নো ! নেভার !  
এর পরেও কি আপনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নূন্যতম দায়বদ্ধতা আশা করছেন? নির্বাচিত সরকারের কাছে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রিঅ্যাক্টিভ অ্যান্ড কারেক্টিভ মেসার্স আশা করছেন? মৃত্যু মিছিল থামাতে প্রশাসনিক তৎপরতা আশা করছেন? আপনার ট্যাক্সের বিনিময়ে উন্নত পরিষেবা আশা করছেন? তাহলে কাইন্ডলি কদিন পরে আসুন! আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সরকার এবং প্রশাসন -মৃতের সংখ্যা নিয়ে জটিল অঙ্ক কষতে ব্যস্ত আছেন।  
১২'ই অক্টোবর মনিটরিং কমিটির বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "বেসরকারি কিছু ল্যাবরেটরি বাণিজ্যিক স্বার্থে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছে৷ ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে" ¹। ২৫শে অক্টোবর নজরুল মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ধিত কোর কমিটির বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীই আবার জানালেন "আর পাঁচটা রাজ্যের চেয়ে ঢের ভালো আছে বাংলা। এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা মাত্র ৩৪" ² । আর ৩০শে অক্টোবর নবান্নে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীই সাংবাদিক'দের বললেন "এখন পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গু মৃতের সংখ্যা মাত্র ১৩" ³ ।  
২৫শে অক্টোবরের ৩৪, ৩০শে অক্টোবর হয়ে গেলো ১৩। তাহলে কি ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা রাজ্যে প্রতিদিন কমছে? তাহলে কি 'মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায়' মৃত ব্যক্তি ডেঙ্গু সারিয়ে প্রাণও ফিরে পাচ্ছে? না, এমন বেয়াড়া প্রশ্ন করে মুখ্যমন্ত্রীর গৃহপালিত মিডিয়া সরকার কে বিব্রত করেনি। আসলে, শিলাদিত্যরা জানে, এ রাজ্যে প্রশ্ন করা মানা। অম্বিকেশরা জানে, এ রাজ্যে কার্টুন আঁকা মানা। আর ডাঃ শ্যামাপদ গড়াইরা জানে, এ রাজ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানা। 
 ২৬শে মে, ২০১১। 'পরিবর্তন' তখন টাটকা। মহাকরণের রুট বদলে সেদিন গাড়িটা সটান থেমেছিল বাঙ্গুর হাসপাতালে। স্বাস্থ্য পরিষেবা সরজমিনে পরিদর্শন করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে গণ্ডা খানেক মন্ত্রী। ডজন খানেক পারিষদ। এবং শ-খানেক সাংবাদিক। 
মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন শুনে ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে পৌঁছন বাঙ্গুরের নিউর সায়েন্সে ডিপার্টমেন্টের অধিকর্তা ডাঃ গড়াই। শুরু হয় র‍্যাপিড ফায়ার রাউন্ড। "এম.আর.আই করতে দেরি হয় কেন?", "স্যালাইন ওয়াটারের সাপ্লাই নেই কেন?", "আউটডোরে লম্বা লাইন কেন?" – আফটার অল সি.পি.এম'র পরিত্যক্ত বাঙ্গুর তো; নবাগতা মুখ্যমন্ত্রীর তাই অভিযোগের লম্বা লিস্টি। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অপ্রত্যাশিত ভিড়ে রোগীদের অসুবিধা হবে বুঝে, মুখ্যমন্ত্রী কে বসে আলোচনার প্রস্তাব দেন ডাঃ গড়াই। বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন ,"আমি এসেছি বলে আপনার কি অসুবিধা হচ্ছে? আপনি ফাইল নিয়ে কাল মহাকরণে দেখা করুন।" ডাঃ গড়াই সেদিনই জানান সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা অবধি অপারেশনের শিডিউল রয়েছে, 'কাল' দেখা করা সম্ভব নয়। আর তারই হাতে গরম জবাব দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যুৎ গতির তৎপরতায় রাতেই সাসপেন্ড হন ডাঃ গড়াই। পরিবর্তন দাদা পরিবর্তন ! 'ডু ইট নাও' থেকে 'সাসপেন্ড হিম টু-নাইট' ⁴ !
বড্ড ভুল করেছিলেন ডাঃ গড়াই। অপারেশন ছেড়েই মহাকরণে যাওয়া উচিত ছিল। গলায় গামছা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কে 'আপনি-আজ্ঞে' করা উচিত ছিল। ডাঃ গড়াই'র বোঝা উচিত ছিল, পরিদর্শনের নামে সেদিনের সারপ্রাইজ ভিজিটটা আসলে আপাদমস্তক রাজনৈতিক ব্রাউনি পয়েন্ট কুড়ানোর গিমিক। না হলে আজকে যখন ডেঙ্গু আক্রান্তদের ভিড়ে সরকারী হাসপাতালের বারান্দা উপচে পড়ছে;  কেন্দ্রীয় ভেক্টরবোর্ন ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের নির্দেশাবলী যখন ছত্রে ছত্রে অমান্য হচ্ছে;  চিকিৎসক সংগঠন যখন পৃথক কমিশন গঠন করে সত্য প্রকাশ্যের দাবি জানাচ্ছে ⁵; হাইকোর্ট যখন ডেঙ্গু পরিস্থিতির রিপোর্ট তলব করছে  ⁶; তখন মুখ্যমন্ত্রী 'স্বাস্থ্য পরিষেবা সরজমিনে' পরিদর্শন তো দূর বরং পায়ের উপর পা তুলে সাংবাদিক সম্মেলনে মৃতের সংখ্যা নিয়ে জাগলারি করছেন। আর অ্যাডিস মশাতে'ও সিপিএম'র ভূত দেখছেন ² ।
মুখ্যমন্ত্রী আপনিই ঠিকই বলেছেন কেরালা'তে সি.পি.এম'ই আছে। ডেঙ্গু'ও হয়েছে। লোক'ও মরেছে। কিন্তু আপনি যখন মৃত্যু কে ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত, তখন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, "এই বিপর্যয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দলের একসাথে কাজ করা জরুরী। প্রাইভেট হাসপাতালের ডাক্তার'দের সরকারী হাসপাতালে পরিষেবা প্রদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। সকল মিডিয়া কে সচেতনতা মূলক প্রচার শুরু করতে অনুরোধ করছি। জন প্রতিনিধি'রা এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষক'রা 'ক্লিন কেরালা' প্রোগ্রামের নেতৃত্ব দিন। আমরা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সমাজের প্রত্যেকের অংশগ্রহণ ছাড়া সেই যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়" ⁷ ⁸ । আর সেই সার্বিক প্রচেষ্টা'তেই আপাতত বিপদমুক্ত কেরালা। অগাস্ট অবধি যেখানে ডেঙ্গু তে মৃতের সংখ্যা ছিল ২৮, সেখানে গত দু মাসে নতুন করে কাউকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মরতে হয়নি কেরালায় ⁹ ¹⁰ । 
ডিয়ার মুখ্যমন্ত্রী, ডেঙ্গু কে 'মহামারী' ঘোষণা করলেও আপনার ভোট ব্যাঙ্ক অক্ষতই থাকতো। 'অজানা জ্বরে'র জায়গায় ডেঙ্গু লিখলেও পঞ্চায়েত ভোট আপনার দলই জিতত। সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাহায্য চাইলেও আপনার সম্মান বলবৎ'ই রইত। প্রশাসনিক তৎপরতায় কটা প্রাণ বাঁচলে মানুষ আপনাকে আশীর্বাদই করত। কিন্তু আমরা জানি, আপনি এসব কিছুই করবেন না। করবেন না, কারণ ঘোলা করে জল খাওয়া আপনার পুরনো অভ্যাস। জ্ঞানেশ্বরী থেকে ডেঙ্গু -সিপিএমের ভূত দেখা আপনার পুরনো অভ্যাস। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে লাশ কুড়ানো আপনার পুরনো অভ্যাস। শুধু মনে রাখবেন, বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ জমিয়ে সিন্ধু গড়ে গদি উল্টে দেওয়া কিন্তু আমাদেরও পুরনো অভ্যাস। গিমিক সর্বস্ব রাজনীতি কে নবান্নের চোদ্দতলা থেকে মাটিতে নামিয়ে আনা কিন্তু আমাদেরও পুরনো অভ্যাস। আর লাশ কুড়ানো স্বৈরাচারী শাসক'দের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা কিন্তু ইতিহাসেরও পুরনো অভ্যাস।










বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৭

ডেঙ্গু = অজানা জ্বর

বুড়ো বলল, "তা হলে লিখে নাও—আক্রান্তের সংখ্যা ১৫০০, মৃতের সংখ্যা ১৩।"
আমি বললাম, "দুৎ! আমার জেলাতেই মৃতের সংখ্যা ৯০ ছাড়িয়ে গেছে , বলে কিনা ১৩!"
বুড়ো খানিকক্ষণ কি যেন ভেবে জিজ্ঞাসা করল, "বাড়তি না কমতি?"
আমি বললাম, "সে আবার কি?"
বুড়ো বলল, "বলি ডেঙ্গিতে মৃত্যু এখন বাড়ছে না কমছে?"
আমি বললাম, "মৃত্যু আবার কমবে কি?"
বুড়ো বলল, "তা নয় তো কেবলই বেড়ে চলবে নাকি? তা হলেই তো গেছি। কোনদিন দেখব মৃতের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে একেবারে ষাট সত্তর আশি পার হয়ে গেছে। শেষটায় পঞ্চায়েতে হারি আর কি!"
আমি বললাম, "তা তো হারবেই। এত মানুষ মরলে হারতে হবে না!"
বুড়ো বলল, "তোমার যেমন বুদ্ধি! আশি জন ডেঙ্গিতে মরবে কেন? চল্লিশ হলেই আমরা মৃতের সংখ্যা ঘুরিয়ে দিই। তখন আর একচল্লিশ বেয়াল্লিশ হয় না—উনচল্লিশ, আটত্রিশ, সাঁইত্রিশ করে মৃতের সংখ্যা নামতে থাকে। এমনি করে যখন দশ পর্যন্ত নামে তখন আবার মৃতের সংখ্যা বাড়তে দেওয়া হয়। আমার রাজ্যে তো কত উঠল নামল আবার উঠল, এখন হয়েছে তেরো৷" শুনে আমার ভয়ানক হাসি পেয়ে গেল।
কাক বলল, "তোমরা একটু আস্তে-আস্তে কথা কও, আমার হিসেবটা চট্‌পট্‌ সেরে নি।"
জন্তটার রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি কে? তোমার কি হয়েছে?"
সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, "আমার অজানা জ্বর হয়েছে । আমার অজানা জ্বর হয়েছে, আমার ভাইয়ের অজানা জ্বর হয়েছে, আমার বাবার অজানা জ্বর হয়েছে, আমার পিসের অজানা জ্বর হয়েছে—"
আমি বললাম, "তার চেয়ে সোজা বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ সবার অজানা জ্বর হয়েছে।"
সে আবার খানিক ভেবে বলল, "তা তো নয়, আমার সেপ্টিসিমিয়া উইথ্ লো প্লেটলেট কাউন্ট! আমার মামার সেপ্টিসিমিয়া উইথ্ লো প্লেটলেট কাউন্ট, আমার খুড়োর সেপ্টিসিমিয়া উইথ্ লো প্লেটলেট কাউন্ট, আমার মেসোর সেপ্টিসিমিয়া উইথ্ লো প্লেটলেট কাউন্ট, আমার শ্বশুরের সেপ্টিসিমিয়া উইথ্ লো প্লেটলেট কাউন্ট—"
আমি ধমক দিয়ে বললাম, "সত্যি বলছ? না, বানিয়ে?"
জন্তুটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, "না, না, আমার শ্বশুরের প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে, ব্রেনে অক্সিজেন কম যাচ্ছে।"
আমার ভয়ানক রাগ হল, তেড়ে বললাম, "একটা কথাও বিশ্বাস করি না।"কাকটা আমনি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, "সে তোমাদের হিসেব অন্যরকম।"

বুধবার, ১ নভেম্বর, ২০১৭

মৌলবাদের আগ্রাসন ~ স্বাতী রায়

হঠাৎ করে একটি মেসেজ মোবাইলে ভাইরাল হচ্ছে, যেটার মূল বক্তব্য – রামমন্দির গড়তে ভোট চাই। খুব ভালো কথা, কোথায়? না বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপ হাটিয়ে। এখানে রাম মন্দির ছিলো, হিন্দুদের রক্তে তৈরি ইত্যাদি নানান রকম যুক্তি। মুসলিম রা হিন্দু মন্দির ভেঙেছে অতয়েব মুসলিম দের মসজিদ ভেঙে মন্দির হোক। যে এই কথাগুলি বলছে সে একটি বছর কুড়ির বাচ্চা মেয়ে। তার কথা অনুযায়ী
১. মুসলিমরা অতিশয় খারাপ। চোর, ডাকাত, রেপিস্ট ইত্যাদি।
২. এরা ধর্মান্ধ, কথায় কথায় হিন্দু মারে। ভারতে খুব শান্তিতে আছে, ভারত থেকে এদের তাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
৩. ভারত আদতে হিন্দুস্থান, তাই এটি হিন্দুদের বাসভূমি হওয়া উচিত।
৪. মুসলিম রা খুব খারাপ, মেয়েদের বোরখায় ঢেকে রাখে, স্বাধীনতা দেয় না।
৫. ভারতের রিজার্ভেশন সিস্টেম খুব খারাপ, তুলে দেওয়া উচিত।
৬. বিভিন্ন সময়ে মুসলিম রা অনেক হিন্দু মহিলা কে রেপ করেছে, তাই হিন্দুস্থানে মুসলিম থাকা উচিত নয়।
৭. কোরানে লেখা আছে অন্য ধর্মের মানুষ কে হত্যা করার কথা।
৮. সমস্ত মসজিদে অস্ত্র মজুদ থাকে।
৯. মসজিদে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
১০. একজন মুসলিম দিদির কাছে সে পড়ে, সে বেশ শিক্ষিত এবং "হিন্দুদের মতই"।
১১. পরিবারের উচ্চশিক্ষিত ( ডিগ্রিধারী) দাদা ও দিদিরা তাকে এই সব বোঝাচ্ছে।
ওহো মূল বক্তব্য – ১২. বাবরি মসজিদের জায়গায় হিন্দু মন্দির ছিল, বিষ্ণু মূর্তি পাওয়া গেছে। হিন্দুদের রক্ত দিয়ে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়েছে। মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানো হয়েছে। তাই মসজিদ ভেঙে ঠিকই করা হয়েছে, ওখানে মন্দির হওয়া উচিত।

এত কিছু শোনা/ পড়ার পর আমার যে আশঙ্কা হল বা দুশ্চিন্তা – আইসিস রাও ঠিক এই ভাবেই ব্রেইন ওয়াশ করে জঙ্গি বানায়। প্রথমত হিন্দুত্ব কোনো ধর্ম নয় এটাই সত্তর শতাংশ মানুষ জানেননা।, দাবী করেন যে এটি প্রাচীনতম ধর্ম। আশা করি তারা আসীরীয়, সুমেরীয় ব্যাবিলনীয় সভ্যতার কথা শোনেননি। এমনকি সিন্ধুসভ্যতাও যে প্রাগার্য তাও স্বীকার করেননা। তাঁদের ধারণা পুষ্পক রথ আদতে বিমান ছিল, গোমূত্র পানে ক্যান্সার নিরাময় হয়। অদ্ভুতভাবে এই সমস্ত কথা গুলি ধর্মান্ধ এবং অশিক্ষিত অশীতিপর বৃদ্ধথেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবসমাজ পর্যন্ত বিশ্বাস করছে, প্রশ্ন করছে না। আসলে গোয়েবলস থিয়োরি অনুযায়ী বারংবার একটি মিথ্যা বলে গেলে ও প্রচার করে গেলে সেটাই সত্যতে পর্যবসিত হয়। রাজনীতিতে এই প্রোপাগান্ডা খুব সফল। এবং অনিবার্যভাবে ধর্ম সব থেকে বড় রাজনীতি হওয়ায় এখানে "বিগ লাই" থিওরি খুবই সফল। এই থিওরি দ্বারাই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ আগামী পঞ্চাশ বছরে বিবর্তনবাদে হোমোসেপিয়েন্স কে বস ট্যরাস বানিয়ে দেবে।

এবার পূর্বোক্ত পয়েন্ট অনুযায়ী আমার উত্তরে আসি।
১. আঠেরো বছর বয়েস থেকে বাড়ি ছাড়া হওয়ার পর থেকে আমি "ভালো" মুসলিমদের সংস্পর্শেই বেশি এসেছি। চোর ছ্যাঁচোড় রেপিস্ট মুসলিম দের কথা এখনো অবধি নিউজপেপারেই পড়েছি। সেখানে লাইন দিয়ে প্রচুর হিন্দুদের নাম ও থাকে। নির্ভয়ার ধর্ষণকারী ছয়জন অপরাধীর পাঁচ জনই হিন্দু ছিলো।

২. ধর্মান্ধতায় হিন্ধুরাও কিছু কম যায় না, ডিটেলস লিখতে গেলে একটি উপন্যাস হয়ে যাবে। কিন্তু যে সমস্ত মুসলিম ভারতে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, জনগনমন শুনলে আমার মতই আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন, মুসলিম দাঙ্গাবাজ দেখলে লজ্জায় মুখ লুকোন ( সংখ্যা গরিষ্ঠ) তাঁরা কি দোষ করেছেন? একটা বড় দোষ অবশ্য এই যে তাঁরা সংঘবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদও করেন না।
যে সমস্ত হিন্দুকে দেশভাগের সময় পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ছেড়ে আসতে হয়েছে তাঁরা কি এখনো লাহোর বা ঢাকা শুনলে স্মৃতিচারণ করেন না? "দ্যাশ" এর কথায় চোখে ঘোর লাগে না? সাদাত হাসান মান্টো শেষ জীবন অবধি তাঁর "দেস" ছেড়ে মুহাজির হওয়ার কষ্ট বয়ে বেরিয়েছেন।

৩. সিন্ধু – সিন্ধ – ইন্দাস থেকে হিন্দু – একথা কি আর পাঠক্রমে পড়ানো হয়না? না হলে কেন হয়না?

৪. পর্দাপ্রথা হিন্দুদের মধ্যেও প্রবল। আধ হাত ঘোমটা আর বোরখা-হিজাব একই জিনিস। যে সমাজে নারী পুরুষের ও পরিবারের সম্পত্তি সেখানে পর্দাপ্রথার মত বর্বরোচিত প্রথা সানন্দে পালিত হবে এ আর নতুন কি? এখনো নতুন বউয়ের শ্বশুর -ভাশুরের সামনে ঘোমটা দেওয়া সৌজন্যমূলক। এর পর নারীর অবমাননা – আবার উপন্যাস হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, এক দুটোই যথেষ্ট। বেদে বলছে – " ভুক্ত্বোচ্ছিষ্টং বধ্বৈ দদাৎ" অর্থাৎ কি না খেয়ে এঁটোটা স্ত্রী কে দেওয়া উচিত। এ ছাড়া পুত্র‍্যার্থে ক্রিয়তে ভার্যা। সুকুমারী দেবীর কথায় বেদে এরকম অসংখ্য মণিমুক্তা আছে। সর্বগুণান্বিতা নারীও সবচেয়ে নির্গুণ পুরুষের অধম।
ব্যাপার টা অনেকটা আমার নম্বর খারাপ হয়েছে এ কথায় বকা খাওয়ার পর বাচ্চাদের বলার মত যে "অমুক তো আরোও কম পেয়েছে"। অন্যের সমালোচনা ভালো, কিন্তু তারও আগে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, আত্মশুদ্ধির জন্যই।
এখানে বলার কথা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মগুরু নিজমতে ও ধ্যান ধারনা অনুযায়ী কোরান অনুবাদ করে গেছেন। এখানে আমার যা বলার তা রাহুল সাংকৃত্যায়ন ইসলাম ধর্মের রূপরেখায় বলে গেছেন, আমি হুবহু তুলে দিলাম।
" প্রবাদ আছে যে শয়তানও তার মতলব হাসিল করার জন্য শাস্ত্রের দোহাই পাড়ে, ঠিক সেই ভাবেই মুসলমান পুরুষের এটা ঘোরতর অন্যায় যে কোরানশরিফে বর্ণিত পর্দায় সন্তুষ্ট না হয়ে তারা মেয়েদের পুরু পর্দার আড়ালে বন্ধ করে রেখেছে। কোরানশরিফ তো শৃঙ্গার, আদি রসভাবের যাতে প্রকাশ না হয় সেজন্য কয়েকটি বিশেষ নারী অঙ্গকে ঢাকার কথা বলেছেন। কিন্তু সেই সুযোগে পুরুষেরা, মেয়েদের সমস্ত শরীরে বোরখা চাপিয়েও সন্তুষ্ট হয় না। তাদের অন্তঃপুরে বন্ধ করে রাখা টা কেই উচিত মনে করে।" এই পর্দাপ্রথা হিন্দুসমাজে শুধুমাত্র মুসলিমদের দান নয়, ভিক্টোরিয়ান আদব কায়দারও দায় আছে। নগ্ন টেবিলের পায়াকে মোজা পরিয়ে শ্লীলতা বজায় রাখার মত।

৫. কতজন প্রকৃত শিডিউলড কাস্ট/ ট্রাইব এর সুবিধা পান? রিজার্ভেশন হওয়া উচিত ছিল আর্থিক সঙ্গতির ভিত্তিতে। দেখা গেছে ভারতবর্ষে দারিদ্রের প্রভাব মূলঃত এই অনগ্রসর জনজাতির মধ্যেই। আম্বেদকর সাহেব যা প্রস্তাব করে গেছিলেন, সেটা সেই সময়ের নিরিখে। পরবর্তী কালে মন্ডল কমিশনে ১৯৭৯ এ ফলপ্রসু হয়। আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য যে সময় বদলের সাথে আইন বদলায় না। ভোটব্যাঙ্ক বড় বালাই।

৬. দাঙ্গা বা যুদ্ধের সময় প্রথম কোপ নেমে আসে মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদের উপর কারণ এরা শারীরিক ভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল। যে কোনো বড় যুদ্ধ বা দাঙ্গার সময়ে একটা জনজাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে অন্যতম হাতিয়ার ধর্ষণ। সে জার্মানদের ইহুদি মহিলা ধর্ষণ হোক, বা আমেরিকার জাপানী মহিলা। দেশভাগের সময়ে কাতারে কাতারে হিন্দু ও মুসলিম মহিলা অন্য ধর্মের মানুষের হাতে ধর্ষিত, নিহত হয়েছেন। এমনকি একাত্তরের বাংলাদেশে প্রচুর বাঙালি মুসলিম মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন খান সেনা অর্থাৎ স্বধর্মের মানুষের হাতে। যুদ্ধ স্বধর্ম -বিধর্ম রেয়াত করেনা, এটা যুদ্ধনীতি।

৭. আসলে কোরানে আছে – ইসলামে সম্পূর্ণ রূপে প্রবিষ্ট হও (২:২৫:১২), যারা ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মকে স্বীকার করেছে, কদাপি তারা স্বীকৃতি পাবেনা এবং কেয়ামতের দিন তারা লোকসানের সম্মুখীন হবে। ( ৩:৮৫)
অন্য ধর্মের মানুষ কে হত্যা করার কথা কোরানে নেই, তা পুনরায় কোনো ধর্মান্ধ কূপমণ্ডূক ধর্মগুরুর নিজ মস্তিষ্কজাত শয়তানি। কোরান যা বলছে – " পূণ্য হল ঈশ্বর, অন্তিম দিন, ফেরেস্তাগণ, পবিত্র গ্রন্থ এবং প্রাচীন নবীগণের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। ধনসম্পদ কে প্রেমিক, আত্মীয় সম্বন্ধী, অনাথ, দএইদ্র, পথিক, ভিক্ষুক এবং দাসত্বমোচনের জন্য ব্যয় করা। উপবাস (রোজা) রাখা, দান করা, প্রতিজ্ঞা করলে তা পালন করা, বিপত্তিতে, ক্ষতিতে এবং যুদ্ধে সহিষ্ণু থাকা। যারা এরকম করে, তারা সত্যপরায়ণ ও সংযমী।" (২: ২২:১)
বর্তমানে বিভিন্ন বাংলাদেশি সাইটে কোরানের যা ব্যাখ্যা দেখা যায় তাতে অন্য ধর্মের মানুষের মুসলিমদের ঘৃণা করাই অত্যন্ত স্বাভাবিক।

৮. এই তথ্যটি কোথায় প্রকাশিত জানা নেই, কিন্তু দাঙ্গার সময় বা নিদেন পক্ষে পাড়ার মারপিটেও সব ক্লাব থেকেই হকি স্টিক, ব্যাট বা সাইকেলের চেন জাদুবলে বেরিয়ে পড়ে। তার মানে সমস্ত ক্লাবগুলি ও সেখানকার সদস্যরা সন্ত্রাসবাদী!
এবার যদি মসজিদে সংরক্ষিত মহরমের তাজিয়া এবং শোভাযাত্রার অস্ত্রও কেউ দাঙ্গা উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত অস্ত্র ভেবে মসজিদকে সন্ত্রাসবাদের আঁতুর ঘর বলেন তাহলে সবার আগে তাঁদের দেবী দুর্গা বা কালীর হাত থেকে খাঁড়া ত্রিশুল, তরবারি ইত্যাদি কেড়ে নিয়ে নানাবিধ ফুলের তোড়া ধরিয়ে দেওয়া উচিত।

৯. ব্যক্তিগত ভাবে আমি দিল্লীর জামা মসজিদ, ফতেহপুর সিক্রীর সেলিম চিস্তির দরগা সংলগ্ন মসজিদ, মুম্বাইয়ের হাজি আলআলি দরগার, তাজমহল সংলগ্ন মসজিদ, এবং কলকাতার নাখোদা মসজিদ, টিপু সুলতান মসজিদে প্রবেশ করেছি। মহিলাদের মাথায় ওড়না দিয়ে ভালো করে ঢেকে ঢুকতে বলা হয় এবং পুরুষ হলে ফেজ টুপি বা রুমাল দিয়ে মাথা ঢেকে নেওয়া আবশ্যক। কোথাও বলা হয়নি মহিলা তাই ঢুকতে পারবে না। যেখানে বলা হয় তাঁরা আর কেরলের সবরিমালা মন্দিরের অছি'দের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই যেখানে রজঃস্বলা হওয়ার "অপরাধে" দশ থেকে শুরু করে পঞ্চাশ অবধি মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

১০. চারপাশে যত হিন্দু চোখে পড়ে তাঁদের সত্তর শতাংশই ধর্মভীরু দেখি। হিন্দুরা উন্নত বা উদার কোনদিক দিয়ে তা আমার চোখে পড়ে না। যেটুকু পড়ে তা অধিকাংশই মুখোশ।

১১. সেই শিক্ষার মানে কি যা মানুষ কে বিভ্রান্ত করে? প্রায় শত বছর আগে লিখে যাওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধে যে সমাজের চিত্র ধরা পড়েছে বর্তমানেও সেই একই চিত্র। বরং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ পরিচালিত সরস্বতী শিশুমন্দিরের বাড়বাড়ন্ত ও পাঠক্রমে দেবদেবীর বন্দনা, স্কুলে ধর্মীয় উৎসব পালন বেড়েই চলেছে।

১২. হঠাৎ করে এই রামমন্দিরের জিগির। ভারতীয় ইতিহাসের কালো দিন ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২, পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত স্থাপত্য বাবরি মসজিদ ধ্বংস। তালিবানদের বামীয়ান বুদ্ধ ধ্বংসের মতই এ লজ্জা লুকোবার জন্য সঙ্ঘীদেরও স্ব-স্ব গুহ্যদ্বার একমাত্র স্থান। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮০ অব্ধি বারংবার প্রত্ন উৎখননেও কোনো রামমন্দিরের চিহ্ন তো পাওয়া যায়ই নি বরং ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক এ কে নারায়ন ও বি বি লাল বলেন ১১শ শতক থেজে ১৫শ শতক পর্যন্তকালের বহু মুসলিম গৃহস্থালির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর থেকে প্রমাণ হয় ওই অঞ্চলে এর আগে কোনো মন্দির ছিলনা বরং মুসলিম বসবাস ছিল।
এবার আসি রক্ত দিয়ে তৈরি মসজিদ প্রসঙ্গে – যে কোনো স্থাপত্য মজদুরের পরিশ্রম দাবী করে। বার বার এই পরিশ্রম ঘাম রক্ত ইত্যাদি দিয়ে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে এরকম ধরনের স্থাপত্য তৈরির সময়ে ডিউ পন্টের সেফটি মেজারমেন্ট না থাকায় দুর্ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হত। তা বাবরি মসজিদ হোক বা তাজমহল বা কোনার্কের সূর্যমন্দির। কত শত প্রাণ বলি গেছে এই স্থাপত্যগুলি নির্মাণ করতে তা ঐতিহাসিকরা বলতে পারবেন। হালফিলের কলকাতায় সাউথ সিটি বিল্ডিং তৈরি করতে গিয়ে বেশ কিছু মজদুর অসাবধানতা বশত মারা গেছে। তাহলে গরীব মজদুরের রক্তে তৈরি সাউথ সিটি ইমারত ভেঙে ফেলা হোক!

ছোটশিশুর প্রতি বাবা মা আত্মীয় সবাই একটু বেশিই খেয়াল রাখেন, প্রকারান্তরে রক্ষণশীল হয়ে থাকেন। সপ্তম শতকের শুরুর দিকের একটি ধর্মের প্রতি যে সেই ধর্মের দালালরা অতিরিক্ত রক্ষণশীল হবেন এ আর নতুন কথা কি? প্রকৃত শিক্ষার প্রসার পাছে তাদের যুক্তিবাদি করে তোলে সেই ভয়ে "হারাম, গুনাহ'র" শিকল পরিয়ে বোরখা আবৃত করে রাখা সহজ। যেমন দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা বাকিদের পাপের ভয় দেখিয়ে করে এসেছেন। সময়ের নিরিখে বলা যায় ধর্মভীরু মুসলিম এখনো ৭০০ বছর পিছিয়ে আছে, এবং আমাদের বর্তমান রাজনীতিবিদেরা তারই ফায়দা তুলে একদা উদার হিন্দুদেরও অচ্ছেদিনের লোভ দেখিয়ে সেই আঁধারেই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে ধর্মের বিরুদ্ধে খুব কম লোক প্রশ্ন তোলার সাহস রাখেন, প্রশ্ন তুললে পরিনাম হয় চাপাতি নয় বন্দুকের গুলি। অভিজিত ওয়াশিকুর কালবুর্গীরা প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন আসলে ধর্ম যুক্তির সামনে ভয়ে সদা কম্পমান।

হোয়াটস অ্যাপ বা ফেসবুকের যুগে টেকনোলোজির সাহায্যে নিপুণ ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ধর্মের খোলসে সর্বনাশা বিষ। বিস্ময়কর হলো এই যে কারো রক্ত লাগবে এ কথা অতিকষ্টে প্রচার করতে হয়। অনায়াসে ছড়িয়ে যায় রামমন্দির-বাবরিমসজিদ সংক্রান্ত দ্বেষ।

সমাধান একটাই। শিক্ষা মানে শুধুই ডিগ্রী নয়, যে শিক্ষা যুক্তিবাদী করে তোলে, অন্ধের মত অনুসরণ করতে শেখায় না সেই শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করে তুলুন, মনের প্রসার বাড়ান, প্রমাণ চান- স্বর্গ বা জন্নত কে দেখেছে?

কৃতজ্ঞতা স্বীকার – রাহুল সাংকৃত্যায়ন ( ইসলাম ধর্মের রূপরেখা); সুকুমারী ভট্টাচার্য ( উত্তরাধিকার)

মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭

শীত ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

বছর শেষ হতে চললো, আমরাও আরেকটু এগিয়ে চললাম আমাদের শেষের দিকে। হালকা টান পড়ছে চামড়ায়, সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রীম বোরোলীন আর মহার্ঘ অলিভ অয়েলে সেজে উঠছে ড্রেসিং টেব্‌ল। বচ্ছরকার অতিথি এল বলে। চারদিকে তাকালেই দিব্যি মালুম হচ্ছে। অর্ধেক পাতা-ঝরা গাছগুলো হাত-পা ছড়িয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে পার্কের কুয়াশাভেজা বেঞ্চের পাশে। লাল,সবুজের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর ক'দিন বাদেই দেখা যাবে আপামর বাঙ্গালীর মাঙ্কিক্যাপে। গেরুয়াও চোখে পড়বে ইতি-উতি। তবে এসব বাদ দিলেও যে ব্যাপারটায় আমি আশ্চর্য হই, যে শীতকালে যেন শব্দরা বড্ড বেশী জীবন্ত হয়ে ওঠে। গভীর রাতে যখন টুপ্‌টাপ্‌ ঝরে পড়ছে শিশির ফোঁটা, একটা অস্পষ্ট শব্দ যেন শুনতে পাই। দূরে ডেকে ওঠা কোন একলা কুকুর বা সমবেত সারমেয় উল্লাস ফেলে যাওয়া বিবাহনুষ্ঠানের উচ্ছিষ্ট ঘিরে -- সব যেন বড় বেশী উচ্চকিত। মাঝরাতে কোন ডায়াবেটিক রুগীর বাথরুম ব্যবহার করার ছ্যাড়ছ্যাড়ানি, রাতটাকে উলঙ্গ করে দিতে চায়। জলের আওয়াজ এত কদর্য, অশ্লীল? কই, আগে তো কখনও খেয়াল করিনি! প্রতিবেশীর শীৎকার কান জ্বালিয়ে দ্যায়, অন্যসময় কিন্তু শুনতে পাইনা। তার মানে কি ওরা শুধু শীতকালেই...? ধুর, মরুগ্‌গে, কানের ওপর বালিশ চেপে ধরে মানসিক শান্তি ও শালীনতা বজায় রেখে ঘুমোনোর চেষ্টা করি।

এই শীতকাল এলেই যত রাজ্যের উদ্ভুট্টি চিন্তা আসে মাথায়। একদিকে কত মেলা, হস্তশিল্প, বস্ত্রশিল্প, সস্তাশিল্প, মহার্ঘশিল্প ইত্যাদি প্রভৃতি... আর অন্যদিকে দ্যাখো, রোগা রোগা চেহারার কেলে-কুচ্ছিত কতগুলো বাচ্চা নোংরা, খড়ি-ওঠা জেব্রা ক্রসিং মার্কা হাত বের করে কেঁদে-ককিয়ে ভিক্ষে চেয়েই চলেছে। ব্যাটাচ্ছেলেরা আবার ইন্টেনশ্যানালি ঠিক ওই মেলার গেটগুলোর কাছেই দাঁড়িয়ে থাকবে। ক্যানো বাপু? ইদিক-উদিকে গিয়েও তো দাঁড়াতে পারে, তা'লে অন্তত এই 'ইমোশন্যাল অত্যাচার' থেকে বাঁচা যায়। আবার উত্তুরে হাওয়ায় হি-হি করে কাঁপছে দ্যাখো! বলি কী-ই বা এমন শীত পড়ে কলকাতায়? যেতিস যদি এই সময় দার্জিলিং বা সিকিম, ভুটান... কী করতিস? এই যে... এই দ্যাখ আমার ইম্পোরটেড ফার-কোট (গরম লাগে বটে এখানে গায়ে চাপালে কিন্তু তাও লোকে তো টেরিয়ে দ্যাখে, সলিড জিনিস) এতেও ঠান্ডা শানাতোনা।

তারপর ধরো যে এই ঠান্ডার সময়েই তো একটু খেয়ে-পরে আরাম আছে এই শহরে, শীতের উষ্ণতায় একটা বেশ মন-ভাল-করা আমেজে চট করে ফুরিয়ে আসা বিকেলগুলোতে বেরিয়ে পড়েছি হয়তো। কিন্তু দ্যাখো কান্ড, যেই দুপুরটা বিকেলের হাত ছুঁইয়েই সন্ধ্যার গায়ে এলিয়ে পড়ে, ঠিক তক্ষুণি মনে পড়ে যায় এইরকম ...ঠিক এইরকম একটা না-বিকেল-না সন্ধ্যা সময়েই ঠাম্মা বলে উঠেছিল,"শালখান আমার গায়ে জড়্যাইয়া দে কেউ, যাওনের সময় অইলো গিয়া"। ব্যস্‌ , বুড়ির শেষ বলা ডায়লগ যেই মনে পড়া, অমনি দ্রুত জুম-আউট হতে থাকে, নীল-সাদা ব্রীজ, রোশনাই ওয়ালা সারি সারি দোকান...কিচ্ছুটি আর হাতছানি দ্যায়না...স-অ-ব ঝাপসা। নিজেকেই খিস্তাতে ইচ্ছে করে। যাচ্ছিস একটা ফান-ড্রাইভে...এই সময় সেন্টিমেন্টের ঠাম্মা-দিদা না করলেই নয়? যত্ত সাব-অল্টার্ন ন্যাকামো!

তবুও শীতার্ত উত্তাপ ছড়ায় ধমনীতে। কেঁদুলীর মেলায় বন্ধুদের সঙ্গে নিষিদ্ধ উত্তেজনা, ''চোখ বন্ধ করে টান মার, বাবার প্রসাদ...কিস্যু হবে না ...আগুন-লাগানো ঘাস জাস্ট" ...তারপর কাশতে কাশতে প্রায় টিবি রুগী...সম্মোহিতের মত বসে সারারাত বাঊল গান, অজয়ের ওপর কুয়াশার মসলিন মায়াজাল।এক চোখ বিষণ্ণতা নিয়ে বসে থাকা এক সদ্য যুবতী, জীবনানন্দ... সেই যে, "এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা, কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।"  আমি? আমি-ই ছিলাম নাকি ওটা? নাকি অন্য মৃত্যু কোনো...কে জানে। স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে মাঘ, এই ভরা মাঘ। এইজন্যেই বিচ্ছিরি লাগে। বড্ড বেশী বিবর্ণ যেন চারপাশ। রঙচঙে মোড়ক কত, সযত্নে সরিয়ে রাখা মনখারাপ, তবুও ন্যাপথলিন আর একফালি পুরনো রোদের গন্ধমাখা নস্ট্যালজিয়া উঁকি দেবে, দেবেই। এইখানেই বোধহয় জিতে যায় এই বেয়াড়া ঋতুটা, পুরো প্রকৃতিটাকেই ডিফ্লাওয়ার করে দেওয়া, উদ্দাম, নির্মম এক সন্ন্যাসী। কুরে কুরে বের করে নিয়ে আসা আচমকা একরাশ যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে লেপের ওমের ভেতর দুটো শরীর এক হয়ে যায়। বসন্ত নয়, শীতকেই প্রেমের শিরোপা দেওয়া উচিৎ আমার মতে, আফটার অল,"Nothing burns like cold"।

আর সেই যে না-খেতে-পাওয়া, ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া চেহারাগুলো? ওদের কথা মনে পড়েনা আর। ক্রিসমাসের 'জিংগল বেল' আর কেক, নিউ ইয়ারের উদ্দাম ফূর্তির মাঝে কোথায় ওরা? আবার কোন এক দিন...সিগ্‌ন্যালে থেমে যাওয়া গাড়ীর পাশে উদয় হবে, কয়েক মুহূর্তের অপরাধবোধ আর মন-খারাপের উস্কানি। ব্যস্‌, আবার কী? শীত তো চলেই গেল...  


শুক্রবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৭

BPMO জাঠা ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

তো, কমিউনিস্ট পার্টি আসলে কী? কেমন ছিল আমাদের যাদবপুর বেহালা টালিগঞ্জ কসবা অঞ্চলের পার্টির গল্পগুলো? পার্টি বলে কি আসলে কিছু ছিল? না কি পুরোটাই এক মায়াম্যাজিক? ছিল একমাত্র আমাদের স্বপ্নে, অথবা মাথার ভেতরে? এক অসঙ্গেয় অতিকথা হয়ে? 

বেশির ভাগ সময়ই একে একে দুই হয় না। মড়ার খাটের তলায় কে বোমার বস্তা ফেলে থাকে আমরা জানতে পারি না। জানি না কখন বেমক্কা খালি বন্দুক থেকে গুলি ছুটে খোপরি ফাঁক করে দেবে । আমাদের মগজে এই হিসেবগুলো মিলতে চায় না। একে একে দুইয়ে অভ্যস্ত মগজ বিব্রত হয়। ঘেন্না, রাগ, ভয়, ভালোবাসা, বিশ্বাস- সব মিলেমিশে এই রাজনৈতিক প্রবচনের কোন খোপে আমাদের চেনা যুক্তি আর কোথায় সেই অচেনা বোধ কাজ করে- ঠাহর হয় না। আমাদের গুলিয়ে যায়- ধর্ম। রাজনীতি। নৈতিকতা। বিশ্বাস। বিশ্বাস। এবং বিশ্বাস। নিটোল ক্ল্যাসিফিকেশন এবং নিখুঁত কম্প্যারিজন আমাদের স্বস্তি দিত- কিন্তু বেওয়াফা ইতিহাস সেই আরামটুকু দেয় না।

অশোক মিত্র একে বলেন পরিবৃত্ত- পার্টির পরিবৃত্ত। গত চল্লিশ পঞ্চাশ বছর ধরে পারিবারিক অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে, গোষ্ঠীগত লোককথা সম্বল করে, একসঙ্গে ইতিহাসের আঁচে বদলাতে বদলাতে গড়ে ওঠা এক পরিবৃত্ত। এখন কেউ দলছুট, কেউ নিরলস, কেউ বা ক্লান্ত, কেউ নিস্পৃহ- যেরকম হয় ইতিহাসে। যেরকম ভাবে মাকন্দো গড়ে উঠেছিল, এবং ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু এই বিভিন্ন পথে চলে যাওয়া আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো জড়ো হতে হতে যে যৌথ ইতিহাস তৈরি হয়েছে সেটা এই পরিবৃত্তের সবার কাছেই একটা রেফারেন্স ফ্রেম। প্রাইভেটে পাশ করা রিফিউজি বাপকাকা, ঘোর দারিদ্র্যের মধ্যে সবকিছু ছেড়ে ঝাণ্ডা হাতে পথে নামা, আবার হয় তো শান্তিকল্যাণ এলে নিশ্চুপে কোটরে ফিরে আসা, কংগ্রেসি গুন্ডাদের আক্রমণে ফেলে আসা ধ্বস্ত ঘরদুয়ার, বুককেসে এখনও সারি সারি হালকা সবুজ মলাটের  কালেক্টেড ওয়ার্ক্স অফ ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সাদা লাল মলাটে দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, পার্টি অফিসে জড়ো হতে থাকা ফড়ে দালালদের ছায়াপুঞ্জ। এই যৌথ ইতিহাসের উত্তরাধিকার, আমরা- এই পরিবৃত্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেকে  বহন করি। জ্ঞানে ও অজ্ঞানে আমাদের রাজনৈতিক সত্তায় এই ইতিহাস ছায়া ফেলে- আপাতত: উল্টোপথে চলা প্রাক্তন কর্মী, বা ক্রমশ: নির্জন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ কমরেড, কিম্বা ইদানীং ডান বা বাম কোনোদিকেই না থাকা সফল পুরুষটি- কেউই এই উত্তরাধিকার থেকে মুক্ত হতে পারি না। এই উত্তরাধিকার ঘেন্না-রাগ-ভয়-নিস্পৃহতা, এবং সর্বোপরি ভালোবাসার ইতিহাস- বাস্তবের ইতিহাস এবং ম্যাজিকের ইতিহাস- যুক্তির নিয়মমাফিক প্রকোষ্ঠের বারমহলে এই ইতিহাসের আনাগোনা। কেই বা জানে কেন এখনও ঠাকুরদার ফেলে যাওয়া চশমা, ট্রাঙ্কে তোলা আম্মার পুরোনো শাড়ির গন্ধ, ষাট সালে রাস্তা থেকে বাবার কেনা ফুটনোটসম্বলিত জেম্‌স জয়েস আমাদের ভালোবাসার শেষ সম্বল!

জীবনের সব ভালোবাসা এবং বিষাদ খুব ভেবেচিন্ত হিসেব করে হয় না। রাজনীতিও না। পিতৃপ্রেম এবং পিতৃদ্রোহ- দুইই একে অন্যের হাত ধরাধরি করে চলে। পঞ্চাশ ষাট  বছর ধরে বৌদ্ধিক সত্তায় , এবং প্রাত্যহিক জীবনচর্যায় আঁকশিলতার মতো জড়িয়ে যেতে থাকে এতদিন শুনে আসা যাবতীয় অতিকথা, কাহিনী এবং প্রবাদ। যে সময় পেরিয়ে আসতে হয়েছে সেই সময়ের হাত এড়াবার স্পর্ধা কারই বা থাকে? মায়া রহিয়াই যায়। এই মায়ার কোনো ইউনিভার্সালিটির দাবী নেই। যাদের ছুঁয়ে থাকে তাদেরই ছুঁয়ে থাকে। এই মায়ার কোনো লোক জড়ো করার তাগিদ নেই, অন্যকে দলভুক্ত করার ইচ্ছা নেই। পার্টিগত রাজনীতির হৈচৈ উল্লাস রক্তপাতের সীমানার বাইরে এই মায়া নিয়ে আমরা মরে যেতে থাকি।

(ভেবেছিলাম জাঠা নিয়ে লিখব। হল না। পার্টির  ভেতরে বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সামান্য সমর্থকের মাথার ভেতর অবিরত বহমান জাঠা নিয়েও লেখার কেউ থাকুক। যদিও সঙ্গের ছবিটি এক ভোরবেলার গ্রামের পথে জাঠারই ছবি। বাকিটা ব্যক্তিগত, হয়ত বা )


বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭

ভূতচতুর্দশী ~ অর্ক ভাদুরী

ভূতচতুর্দশীর রাতে পৃথিবীতে আত্মারা নেমে আসে। কাতারে কাতারে, ধোঁয়া ধোঁয়া। আঙুলকাটা হাত তুলে গোঙাতে গোঙাতে নেমে আসেন পূর্ববঙ্গের নীল চাষি। তাঁকে সঙ্গ দেন পাবনা আর রংপুরের কৃষক। আসেন বীরসা মুন্ডা, তিতুমীর, সিধু-কানহুর লোকজন, ওয়াহাবি আর মোপলা বিদ্রোহের শহীদ। বেনিয়ানে পিস্তল লুকিয়ে কলেজ স্ট্রিট থেকে কলুটোলার দিকে চলে যায় ঝকঝকে যুবক। বউবাজার মোড়ের শহীদবেদি ভেঙে বেরিয়ে আসেন লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, গীতা। মির্জাপুর স্ট্রীট ধরে হেঁটে যায় শান্তি-সুনীতি, টেগরা আর ক্ষুদিরাম। হিন্দ সিনেমার সামনে রডা কোম্পানির অস্ত্র লুঠের কুশীলবেরা-  শ্রীশ মিত্র, গিরীন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপীন গাঙ্গুলি, আশুতোষ লাহিড়ি। বিনয়-বাদল-দিনেশ আর মেজর সত্য বক্সীর পাশাপাশি হেঁটে আসছে শহীদ রামেশ্বর। জানবাজারের পুজোমন্ডপের পাশে বিড়ি ধরালেন কানপুরের সিপাহী, গলায় ফাঁসির দাগ। হেদুয়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বেথুন কলেজের প্রীতিলতা। ব্যারাকপুর থেকে, আলিপুর থেকে, বরাহনগর-কাশীপুর থেকে, ব্যারাকপুর যখন ব্যারাকপুর নয়, সেই চনকের নৌকোঘাট থেকে, রামপ্রসাদ সেনের ধুঁতির খুঁট থেকে, চল্লিশের কঙ্কালসার লাশের গন্ধ থেকে, দক্ষিণের সোনারপুর, যাদবপুর থেকে, কাকদ্বীপ থেকে উঠে আসছেন বৃদ্ধ-অতিবৃদ্ধ আত্মারা। ভূতচতুদর্শীর সন্ধ্যে রাতের দিকে বেঁকে যাচ্ছে।

ভূত চতুর্দশী ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য

ভূতপেত্নি দৈত্যদানো
আজকে সবাই দারুণ খুশি
পঞ্জিকাতে পষ্ট লেখা
আজকে তো ভূত চতুর্দশী।।

ভূতের ছেলে বায়না ধরে
ক্যাপ পিস্তল আতসবাজি
শাস্ত্রে এসব বারণ আছে
ব্রহ্মদৈত্য তাতেই রাজি।।

পান্ত ভূতের খুড়শাশুড়ি
বনগাঁ যাবেন লোকাল ট্রেনে
মুড়কি নাড়ু সঙ্গে নেবেন
ফেমাস ভীষণ, সবাই চেনে।।

কিপটে ভূতের ঘুম আসেনা
নিমগাছে কি পয়সা ফলে
সখ দেখে গা পিত্তি জ্বলে
বাজার করে শপিং মলে।।

জম্মে যে ভূত চান করে না
সে'ও দেখি আজ সাবান মাখে
খড়ম পায়ে,গগস চোখে
ডান পকেটে রুমাল রাখে।।

ভূতের মেয়ে সবুজ সাথী
সাইকেলে যায় হাই ইস্কুলে
আজকে সেও খুব সেজেছে
ঘাগরা চোলি কানের দুলে।।

আনন্দে আজ নৃত্য করে
ক্লান্ত ভূতের শান্ত পিসি
ভূতের শ্বশুর গাইছে ভজন
আজকে তো ভূত চতুর্দশী।।

সোমবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৭

মশা ও ডারউইন ~ আর্কাদি গাইদার

মশাদের জগতে একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটে চলেছে। ধরুন প্রথম যখন মশা মারবার জন্যে মানুষ কোন কীটনাশক আবিষ্কার করলো। সেই সময় যত মশা ছিলো তার মধ্যে ৯৫% এর ওপর এই কীটনাশক কাজ করে। বাকি ৫% এর ওপর করে না। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের আগে এই ৫%কে সেই ৯৫% এর সাথে প্রতিযোগীতা করে টিকে থাকতে হতো। মশার জগতে তাদের অনুপাতও ওই ৫% এর আশেপাশেই থাকতো। এবার কীটনাশক আবিষ্কারের পরে এই ৯৫% এর মধ্যে অনেক মশা ধ্বংস হতে শুরু করলো। একটা পরিসরে তখন এই ৫% যারা ছিলো, তাদের বৃদ্ধি ঘটতে শুরু করলো। বেশ কিছু প্রজন্ম পরে দেখা গেলো যে ওই ৫% কীটনাশক-প্রতিরোধী মশারা বৃদ্ধি পেয়ে এখন সংখ্যাগুরু। তাই মশা ধ্বংস করবার কাজে ওই কীটনাশকের উপকারিতা নিম্নগামী। এখন মানুষকে নতুন কীটনাশক তৈরি করতে হবে। 
এই হলো Darwinism. এইতো কয়েকদিন আগেই বিজেপির অঘোষিত মুখপত্র 'স্বরাজ্যম্যাগ' একটি সম্পাদকীয় লিখে আমাদের আলোকিত করলো - বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার নাকি আমাদের ওপর এই Darwinism প্রয়োগ করতেই একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। সরকার চায় এই 'চ্যালেঞ্জ'গুলোর দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে দেশের মানুষ শক্তিশালী হোক, উন্নততর হোক। আমাদের কান্নাকাটির কোন মানে নেই। কারন সবশেষে, এই সুবিশাল Darwinian experiment এর পর, যে মানুষগুলো টিকে থাকবে, তারা হবে fittest. যেটা উহ্য রাখা হয়েছে, সেটা হলো যে যারা fittest না, তাদেরকে এই এক্সপেরিমেন্টের স্বার্থে খরচের খাতায় ফেলতে হবে। তারা expendable. কারন তারা যথেষ্ট fit নয়।
Darwinism কে সহজভাবে বোঝাতে অনেকেই survival of the fittest বলে এক লাইনে অভিহিত করেন। এটা বৃহৎভাবে ভুল বোঝাপড়া। Darwin নিজে কোনদিন এই লাইনটা ব্যাবহার করেননি। ওনার থিওরীকে যদি এক লাইনে প্রকাশ করতেই হয় - তাহলে সেটা হতে পারে survival of the most adaptable. কিন্তু ডারউইন নিয়ে বিতর্কের জন্যে এই লেখা না। এই লেখা মশা আর কীটনাশক নিয়ে। 
মশা - যার নাম সোনিকা কুমারী। ১১ বছর বয়স। দূর্গা পুজোর ছুটি বলে স্কুল বন্ধ। মিড ডে মিল নেই। আধার কার্ড নেই বলে বাড়িতে রেশন বন্ধ হয়ে গেছে। ৮দিন অভুক্ত থেকে মারা গেছে। 
 যদিও সুপ্রীম কোর্ট রায় দিয়েছে যে আধার কার্ডের সাথে কোনরকম বেনিফিট লিংক করা যাবে না। তাও। কারন উন্নততর দেশ বানানোর লক্ষ্যে সুপ্রীম কোর্ট, সোনিকা কুমারী, এদের নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। কীটনাশক তৈরি আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা একের পর এক কীটনাশক তৈরি করে যাবো। এবং প্রতিবার যারা টিকে থাকবে তাদের জন্যে তৈরি হবে নতুন কীটনাশক। নোটবন্দী। আধার। জিএসটি। সব শেষে যারা টিকে থাকবে তারাই হবে উন্নততর ভারতের উন্নততর নাগরিক। তাদের বেচে থাকতে রেশন লাগবে না। গ্যাসে ভর্তুকি লাগবে না। চাষে নূন্যতম মূল্য নির্ধারন লাগবে না। সারে ভর্তুকি লাগবে না। মিড ডে মীল লাগবে না। ১০০ দিনের কাজ লাগবে না। হাসপাতালে অক্সিজেন লাগবে না।
তাদের শুধু লাগবে ১০০ কোটি টাকার রামমূর্তি। তার পদতলে বসে তারা গান করে, আড্ডা মেরে, হাওয়া খেয়ে সুখে দিন কাটাবে। আর লাগবে আধার কার্ড। মরার পর গলায় কার্ড ঝুলিয়ে চুল্লিতে বা কবরে প্রবেশ করবে। সোনিকা কুমারীর যদিও আধার কার্ড নেই। তাই না খেয়ে মরে গেছে। আপাতত সরকারি ব্যাবস্থায় দাহও করা যাবে না বোধহয়। চলুন স্লোগান তুলি - জয় শ্রী ডারউইন।

শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৭

ফুটবলার সেজমামা ~ চন্দন গোস্বামী

এই ফুটবলারটিকে চিনতে পারছেন? ইনি হচ্ছেন সেই ছাগলের সেজমামা।
মনে পড়ছে না, তাইতো? 
হযবরল স্মরণ করুন।

''...বলতেই ব্যাকরণ শিং ব্যা ব্যা করে ভয়ানক কেঁদে উঠল ।
আমি বললাম, 'আবার কি হল ?' ছাগল বলল, 'আমার সেজোমামার আধখানা কুমিরে খেয়েছিল, তাই বাকি আধখানা মরে গেল ।' আমি বললাম, 'গেল তো গেল, আপদ গেল । তুমি এখন চুপ কর।''

হে পাঠক, বাকি আধখানা মরে নাই, যুবভারতীর সামনে ফুটবল খেলিতেছিল।

দিদির কল্যাণে আজ পুনরায় দৃশ্যমান হইল।

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৭

কুমারী পূজা ~ তপব্রত ভাদুরী

আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রধান দেবতা ছিল পৃথিবী৷ পৃথিবী শস্য ও উদ্ভিজ্জপ্রাণের উৎস৷ তাই আদিম সমাজে পৃথিবী হয়ে ওঠে আদিমাতা (Primordial Mother)৷ পাশাপাশি মানুষ দেখেছে, নারী সন্তানের জন্ম দেয়৷ এ-ব্যাপারে  পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে আদিম সমাজ ছিল অজ্ঞ৷ লোকবিশ্বাসে রহস্যময় সৃষ্টিক্ষমতার গৌরবে নারী ক্রমে আদিমাতা পৃথিবীর সমকক্ষ ও প্রতিভূ হয়ে ওঠে৷ এইভাবে ধরিত্রীমাতা ও নারীর প্রজননশক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে প্রাচীন এক ধর্মমত – উর্বরতাবাদ (Fertility Cult)৷ এর সূচনা হয়েছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজে৷ প্রজননশক্তির অধিষ্ঠাত্রীরূপে লোকবিশ্বাসে কল্পিত হয়েছিল বিভিন্ন নারীদেবতা৷ নানা দেশে  নানা নামে৷ ননা, অনৎ, অল্লৎ, ইশতার, সিবিলি, আইসিস, মা, মাইয়া, আর্তেমিস প্রভৃতি৷ নারীই হতেন সে দেবতার পূজক তথা পুরোহিত৷ যৌনক্রিয়া ছিল পূজানুষ্ঠানের অঙ্গ৷ সেইসঙ্গে হত পশুবলি৷ 

গোড়ায় এই আদিমাতা ছিলেন অবিবাহিতা চিরকুমারী৷ পরে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ যখন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত হল, তখন নারীদেবতাদের পুরুষসঙ্গী কল্পিত হল৷ পরবর্তী যুগে ক্রমে ক্রমে তাঁরা পুরুষদেবতার সঙ্গে বিবাহসম্পর্কে আবদ্ধ হলেন৷ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দেবতার পূজার অধিকার নারীর হাত থেকে চলে গেল পুরুষের হাতে৷ মন্দিরের নারীপূজকরা পরিণত হলেন পবিত্র গণিকায়৷ নতুন পুরোহিতদের বিধানে সমাজের অন্য নারীদেরও বিয়ের আগে অন্তত একবার দেবমন্দিরে বারাঙ্গনা বৃত্তি অবলম্বন করতে হত (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৩৯১, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ : আগস্ট ২০১০, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, কলকাতা, পৃ. ২২-২৩)৷ 

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরবর্তী যুগে উর্বরতাশক্তির এই দেবীদের যুদ্ধদেবতা রূপেও উপাসনা করা হত৷ এসব ক্ষেত্রে যিনি সৃষ্টিশক্তির দেবী, তাঁকেই একাধারে ধ্বংসের দেবতা রূপেও কল্পনা করা হয়েছে (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২০)৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ গ্রিসের দেবী এথেনা, সুমের বা মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের দেবী ননা, প্যালেস্টাইন অঞ্চলের দেবী অনৎ এবং ব্যাবিলন ও আসিরিয়া অঞ্চলের দেবী ইশতারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ ভারতের দেবী দুর্গাও সৃষ্টিশক্তির প্রতিভূ আদিমাতার একটি রূপ৷ একই সঙ্গে তিনি রণদেবী৷ এথেনা আর্তেমিস প্রভৃতি পৃথিবীর অন্যা্ন্য প্রান্তের মাতৃকা দেবতাদের মতো দুর্গাও গোড়ায় ছিলেন কুমারী মাতা (Virgin Mother)৷ দেবতাদের তেজঃপুঞ্জ থেকে তিনি কুমারী নারী রূপেই আবির্ভূত হন৷ পরবর্তী কালে দেবীকে শিবজায়া রূপে কল্পনা করা হয়েছে৷ কিন্তু বৃহন্নীলতন্ত্রের মতো প্রাচীন শাস্ত্রে আছে, শিব দেবীর পুত্র – 'ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবানাঞ্চ প্রসূতে করুণাময়ি'৷ দেবী নিজ পুত্র শিবকে পতিত্বে বরণ করেন (উপেন্দ্রকুমার দাস, শাস্ত্রমূলক ভারতীয় শক্তিসাধনা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৯)৷

তন্ত্রশাস্ত্রবিহিত কুমারী পূজার মধ্যে  কুমারী আদিমাতার উপাসনার প্রত্নস্মৃতি লুকিয়ে আছে৷ কুমারী এক্ষেত্রে দেবীর প্রতিভূ ও প্রজননশক্তির বিগ্রহ৷ আগম মতে, পূজার জন্য মনোনীত কুমারীকে অবশ্যই হতে হবে 'অজাতপুষ্পা' (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড, সপ্তম মুদ্রণ, ২০০৮, সাহিত্য অকাদেমি, পৃ. ৬৫০) ৷ 'রজোদর্শনের পূর্বপর্যন্ত কুমারী পূজ্যা৷' (সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তিরঙ্গ বঙ্গভূমি, প্রথম সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৯১, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃ. ৯৬)  অর্থাৎ, যার মধ্যে প্রজননশক্তি এখনও সুপ্ত অবস্থায় আছে, পরিস্ফুট হয়নি, এমন বয়সের কুমারী কন্যাই পূজার জন্য উপযুক্ত৷  প্রজননশক্তির প্রতীক রূপে নারীর পূজা এবং সে পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রজোদর্শনের টাবু নারীর পক্ষে শ্লাঘনীয় কিনা, সে বিচারের ভার নারীর উপরেই ছেড়ে দিলাম৷ 

আধুনিক কালে কুমারী পূজার শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রবর্তিত করেন বিবেকানন্দ ও তাঁর রামকৃষ্ণ মিশন৷ সেই 'জ্যান্ত দুর্গা'র পূজার আড়ম্বরের অন্তরালে নারী সম্পর্কে এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে ঠিক কী, তা জানার জন্য ঔৎসুক্য বোধ হওয়া স্বাভাবিক৷ রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা যে দশনামী   সম্প্রদায়ের অন্তর্গত, তার প্রতিষ্ঠাতা আদি শঙ্করাচার্য তাঁর 'মণিরত্নমালা'য় লিখেছিলেন, 
'কিমত্র হেয়ং? – কনকঞ্চ কান্তা৷'
অর্থাৎ, মুমুক্ষু ব্যক্তির পক্ষে কোন্ কোন্ বিষয় পরিত্যাগের যোগ্য? – ধন ও স্ত্রী৷
'কা শৃঙ্খলা প্রাণভৃতাং হি? – নারী৷'
অর্থাৎ, জীবের দুশ্ছেদ্য বন্ধন কী? – নারী৷
'ত্যাজ্যং সুখং কিং? – রমণীপ্রসঙ্গঃ'
অর্থাৎ, কোন্ সুখ সম্যকরূপে পরিত্যাজ্য? – স্ত্রীসম্ভোগ৷
'দ্বারং কিমাহো নরকস্য? – নারী৷'
অর্থাৎ, নরকের দ্বার কী? – নারী৷
'বিজ্ঞান্মহাবিজ্ঞতমোঽস্তি কো বা? –
নার্য্যা পিশাচ্যা ন চ বঞ্চিতো যঃ৷'
অর্থাৎ, এই জগতে বিজ্ঞ থেকে মহাবিজ্ঞতম কে? – যাঁকে পিশাচীরূপিণী নারী বঞ্চনা করতে পারেনি৷
'মণিরত্নমালা'র এই উদ্ধৃতিটি আছে বিপিনবিহারী ঘোষাল প্রণীত  'মুক্তি এবং তাহার  সাধন' বইতে ( অষ্টম পুনর্মুদ্রণ, মে ২০১৫, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃ. ১২১) ৷ বইটির ভূমিকায় স্বামী হিরণ্ময়ানন্দ লিখেছেন, রামকৃষ্ণের সংগ্রহে এই বইটি ছিল৷ তিনি তাঁর তরুণ শিষ্যদের বইটি পড়তে দিতেন৷ রামকৃষ্ণের বহুল ব্যবহৃত বইটি বর্তমানে বেলুড় মঠের গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে৷

নারীকে রামকৃষ্ণও 'কামিনী' রূপে দেখেছিলেন৷ কথামৃতে একাধিক জায়গায় 'কাঞ্চন' আর 'কামিনী' সম্পর্কে ভক্তদের সতর্ক করা হয়েছে৷ বিশেষ করে 'সন্ন্যাসীর বড় কঠিন নিয়ম৷ স্ত্রীলোকের চিত্রপট পর্যন্ত দেখবে না৷' ('সন্ন্যাসী ও কামিনী – ভক্তা স্ত্রীলোক', শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  চতুর্থ ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ২০০২, দে'জ পাবলিশিং, পৃ. ৬৮৩) রামকৃষ্ণের উপলব্ধিতে " অত পাশ করা, কত ইংরাজী পড়া পণ্ডিত, মনিবের চাকরী স্বীকার করে তাদের বুট জুতার গোঁজা দু'বেলা খায়৷ এর কারণ কেবল 'কামিনী'৷" ('কামিনী-কাঞ্চন জন্য দাসত্ব', শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  প্রথম ভাগ, চতুর্থ খণ্ড, চতুর্থ পরিচ্ছেদ, পৃ. ৬৮৩) 'মেয়েমানুষ থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়, তবে যদি ভগবান লাভ হয়৷' ( 'ঘোষপাড়ার স্ত্রীলোকের হরিপদকে গোপালভাব – কৌমার বৈরাগ্য ও স্ত্রীলোক', শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  দ্বিতীয় ভাগ, ঊনবিংশ খণ্ড, পৃ. ৩৫২) রামকৃষ্ণ বিচার করতে বলেছেন, 'কামিনীকাঞ্চনই যোগের ব্যাঘাত৷ বস্তু বিচার করবে৷ মেয়েমানুষের শরীরে কি আছে – রক্ত, মাংস, চর্বি, নাড়ীভুঁড়ি, কৃমি, মুত, বিষ্ঠা এই সব৷ সেই শরীরের উপর ভালবাসা কেন?' ( "ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যোগতত্ত্ব – যোগভ্রষ্ট – যোগাবস্থা – নিবাতনিষ্কম্পমিব প্রদীপম্' – যোগের ব্যাঘাত", শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত,  তৃতীয় ভাগ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৪৬৩)

ব্রাহ্মণ্য পিতৃতন্ত্রের স্মৃতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে সেকালের শঙ্করাচার্য  হয়ে একালের রামকৃষ্ণ পর্যন্ত বয়ে আসা নারীঘৃণার এই অসুস্থ বিকৃত বিপজ্জনক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসী সঙ্ঘ আর তাদের 'জ্যান্ত দুর্গা'র পূজা পরস্পরের প্রতিবাদ করতে করতে বছর বছর চলে আসছে৷

শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বিষয়- সাগু ~ কৌশিক মজুমদার


জনমেজয় কহিলেন, হে মহর্ষে! আপনি কহিলেন যে, কলিযুগে সাগু নামে এক প্রকার মনুষ্যেরা পৃথিবীতে আবির্ভূত হইবেন। তাঁহারা কি প্রকার মনুষ্য হইবেন এবং পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কি কার্য্য করিবেন, তাহা শুনিতে বড় কৌতূহল জন্মিতেছে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া সবিস্তারে বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে নরবর! আমি সেই বিচিত্রবুদ্ধি; ফেসবুককুশলী সাগু তথা সাহিত্য গুন্ডাগণকে আখ্যাত করিব, আপনি শ্রবণ করুন। আমি সেই চস্‌মাঅলঙ্কৃত, উদরচরিত্র, দেড় ব্যাটারি, অপভাষী, কুৎসাপ্রিয় সাগুদিগের চরিত্র কীর্ত্তিত করিতেছি, আপনি শ্রবণ করুন। হে রাজন্, যাঁহারা বিচিত্রস্তাবকাবৃত, সর্বদা খরগহস্ত, বিশ্বজ্ঞানী, এবং মহাপাদুক, তাঁহারাই সাগু। যাঁহারা কুবাক্যে অজেয়, কুভাষাপারদর্শী, মাতৃভাষার বানানে অপটু, তাঁহারাই সাগু। মহারাজ! এমন অনেক মহাবুদ্ধিসম্পন্ন বাবু জন্মিবেন যে, তাঁহারা ঘুটুবাজি ব্যাতীত অন্য কাজে অসমর্থ হইবেন। যাঁহাদিগের দশেন্দ্রিয় অপ্রকৃতিস্থ, অতএব অপরিশুদ্ধ, যাঁহাদিগের কেবল রসনেন্দ্রিয় লেখকবিশেষনিষ্ঠীবনে পবিত্র, তাঁহারাই সাগু। যাঁহাদিগের মস্তক বুদ্ধিহীন শুষ্ক গোময়ের ন্যায় হইলেও কুবাক্যে সক্ষম; হস্ত দুর্ব্বল হইলেও কি বোর্ড ধারণে এবং ভারচুয়াল বিপ্লবে সুপটু; চর্ম্ম কোমল হইলেও পরদ্রব্যবিশেষের প্রহারসহিষ্ণু; যাঁহাদিগের ইন্দ্রিয়মাত্রেরই ঐরূপ প্রশংসা করা যাইতে পারে, তাঁহারাই সাগু। যাঁহারা বিনা উদ্দেশ্যে দল বাঁধিয়া কলহ করিবেন, কলহের জন্য স্ক্রিনসট দিবেন, স্ক্রিনসটের জন্য  ইনবক্স করিবেন, ইনবক্সের জন্য গায়ে পড়িয়া আলাপ জমাইবেন, তাঁহারাই সাগু।
মহারাজ! সাগু শব্দ নানার্থ হইবে। যাঁহারা কলিযুগে ফেসবুকাভিষিক্ত হইয়া, মেম্বার নামে খ্যাত হইবেন, তাঁহাদিগের নিকট "সাগু" অর্থে সাহিত্য গ্রুপের অ্যাডমিন  বুঝাইবে। নির্বোধদের নিকটে "সাগু" শব্দে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী বুঝাইবে। লেখকের নিকট "সাগু" অর্থে আপদ বুঝাইবে। এ সকল হইতে পৃথক্, কেবল সাগুজন্মনির্ব্বাহাভিলাষী কতকগুলিন মনুষ্য জন্মিবেন। আমি কেবল তাঁহাদিগেরই গুণকীর্ত্তন করিতেছি। যিনি বিপরীতার্থ করিবেন, তাঁহার এই মহাভারত শ্রবণ নিষ্ফল হইবে। তিনি লেখকজন্ম গ্রহণ করিয়া সাগুদিগের ভক্ষ্য হইবেন।
হে নরাধিপ! বাবুগণ দ্বিতীয় অগস্ত্যের ন্যায় গ্রুপরূপী মেম্বারদের শোষণ করিবেন, কি বোর্ড ইঁহাদিগের গণ্ডূষ। কিছু লেখক প্রকাশক ইঁহাদিগের আজ্ঞাবহ হইবেন-"বই উদ্বোধন" এবং "ফিতাকাটা" নামক দুইটি অভিনব বিষয় আশ্রয় করিয়া রাত্রি দিন ইঁহাদিগের গ্রুপে ছবি লাগাইতে থাকিবেন। ইঁহাদিগের যেমন মুখে অগ্নি, তেমন জঠরেও অগ্নি জ্বলিবেন। এবং গেট্টু নাম দিয়া পেটোয়া মেম্বার লইয়া তৃতীয় প্রহর পর্য্যন্ত ইঁহাদিগের রথস্থ যুগল প্রদীপে জ্বলিবেন। আলোচিত সঙ্গীতে এবং কাব্যেও অগ্নিদেব থাকিবেন। তথায় তিনি "মডার্ন" এবং "পোস্ট মডার্ন" রূপে পরিণত হইবেন। ফেবুবাসীদের মতে ইঁহাদিগের কপালেও অগ্নিদেব বিরাজ করিবেন। যেকোন লেখককেই ইঁহারা নস্যাৎ করিবেন-ভদ্রতা করিয়া সেই দুর্দ্দর্ষ কার্য্যর নাম রাখিবেন, "রিভিউ"। কেবল বিনা পয়সায় বই দেওয়া লেখক ও প্রকাশকদিগকে ইঁহারা পূজা করিবেন। সেই মন্দিরের নাম হইবে "অ্যাডভেঙ্চার"।
হে নরশ্রেষ্ঠ! যিনি কাব্যরসাদিতে বঞ্চিত, সঙ্গীতে দগ্ধ কোকিলাহারী, যাঁহার পাণ্ডিত্য শৈশবাভ্যস্ত ফেবুগত, যিনি আপনাকে অনন্তজ্ঞানী বিবেচনা করিবেন, তিনিই সাগু। যিনি কাব্যের বা সাহিত্যের   কিছুই বুঝিবেন না, অথচ কাব্যপাঠে এবং সমালোচনায় প্রবৃত্ত, যিনি বারযোষিতের চীৎকার মাত্রকেই সঙ্গীত বিবেচনা করিবেন, যিনি আপনাকে অভ্রান্ত বলিয়া জানিবেন, তিনিই সাগু। যিনি রূপে কার্ত্তিকেয়ের কনিষ্ঠ, গুণে নির্গুণ পদার্থ, কর্ম্মে জড় ভরত, এবং বাক্যে সরস্বতী, তিনিই সাগু। যিনি অন্য গ্রুপ দখলের জন্য কলহ করিবেন, বন্ধুর ইনবক্স পাইয়া পায়ে পা লাগাইবেন, গ্রুপের স্থাপককে বাহির করিয়া দিতে সচেষ্ট হইবেন এবং না পারিলে চোখের জল মুছিয়া নতুন গ্রুপ খুলিবে, তিনিই সাগু। যাঁহার গমন অনাহুত সভায় এবং আহার প্যাকেটের সিঙারা, তিনিই সাগু। যিনি মহাদেবের তুল্য তান্ডবপ্রিয়, ব্রহ্মার তুল্য চতুরানন, এবং বিষ্ণুর তুল্য লীলা-পটু, তিনিই সাগু। হে কুরুকুলভূষণ! বিষ্ণুর সহিত এই বাবুদিগের বিশেষ সাদৃশ্য হইবে। বিষ্ণুর ন্যায় ইঁহারাও দিবারাত্র ফেবুতে অনন্তঅনলাইন হইবেন। বিষ্ণুর ন্যায় ইঁহাদিগেরও দশ অবতার-যথা, কেরাণী, মাষ্টার, প্রকাশক, রিভিউয়ার, ফেবুলেখক, উকিল, আই টি, পা চাটা, সম্বাদপত্রসম্পাদক এবং নিষ্কর্ম্মা। বিষ্ণুর ন্যায় ইঁহারা সকল অবতারেই অমিতবলপরাক্রম লেখকগণকে বধ করিবেন। 
মহারাজ! পুনশ্চ শ্রবণ করুন। যাঁহার বাক্য মনোমধ্যে এক, কথনে দশ, লিখনে শত এবং কলহে সহস্র তিনিই সাগু। যাঁহার বল হস্তে একগুণ, মুখে দশগুণ, পৃষ্ঠে শতগুণ এবং লেখনকালে অদৃশ্য, তিনিই সাগু। যাঁহার বুদ্ধি বাল্যে পুস্তকমধ্যে, যৌবনে বোতলমধ্যে, বার্দ্ধক্যে গৃহিণীর অঞ্চলে, তিনিই সাগু। যাঁহার ইষ্টদেবতা নিজ স্বয়ং, গুরু অন্য অ্যাডমিন, বেদ  ফেবু এবং তীর্থ "জীবনানন্দ সভাঘর" তিনিই সাগু।  যাঁহার যত্ন কেবল পরিচ্ছদে, তৎপরতা কেবল উমেদারিতে, ভক্তি কেবল কলহে, এবং রাগ কেবল সদ্‌গ্রন্থের উপর, নিঃসন্দেহে তিনিই সাগু।
হে নরনাথ! আমি যাঁহাদিগের কথা বলিলাম, তাঁহাদিগের মনে মনে বিশ্বাস জন্মিবে যে, আমরা তাম্বূল চর্ব্বণ করিয়া উপাধান অবলম্বন করিয়া সভা সমিতিতে গিয়া, দ্বৈভাষিকী কথা কহিয়া, এবং লেখকদের গুষ্টি উদ্ধার করিয়া বাংলা সাহিত্য পুনরুদ্ধার করিব।
জনমেজয় কহিলেন, হে মুনিপুঙ্গব!সাগুদিগের জয় হউক, আপনি অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ করুন।

বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

রোহিঙ্গা ~ অবিন দত্তগুপ্ত

৪৭-এর দেশভাগের সময় অসংখ্য মানুষ , পায়ে হেঁটে ট্রেনে চেপে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় এসেছিলেন । দুরন্ত জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন । বুকের রক্ত দিয়ে সেচ্‌ দিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ফসল বুনেছিলেন । তাদের এই যুদ্ধ , কিন্তু ধর্মীয় ঘৃণা দ্বারা পরিচালিত হয় নি ... বেঁচে থাকাকে ভালবেসেই তারা লড়ে গেছিলেন । সেদিন, তাদের ঘৃণাকে উস্কে দিয়ে তাদের দ্বিতীয়,তৃতীয় বা অজুতবার খুন করতে চেয়েছিল আর এস এস এবং জাতিয় কংগ্রেসের একাংশ । কিন্তু তারা হেরে গিয়েছিল । ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বন্ধু খুঁজতে শিকড়হীন মানুষের ভুল হয়নি । ভালোবাসার পক্ষে , বেঁচে থাকার পক্ষে ,তারা বামপন্থীদের হাত ধরে ছিলেন । মা ঈগলের মতো তাদের স্বার্থের লড়াই লড়েছে লাল ঝান্ডা ।

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় , বর্ডার খুলে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী । রাজাকার আর খান সেনার হাতে অত্যাচারিত লক্ষ মানুষ সেদিন ভারতের কাছে আশ্রয় নিতে এসছিলেন । মাথা বড় , ছোট শরীরের অভুক্ত বাচ্চাদের কোলে নিয়ে , মায়েরা যশোর রোড ধরে লঙ মার্চ করেছিলেন - হাতে বন্দুক । প্রতিপদে রক্তাক্ষয়ি যুদ্ধ চালিয়ে , সন্তানদের নিয়ে ভারতের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন অজুত উদবাস্তু জননী । এদের জন্য টাকা তুলতে গিয়ে ৭১এর আজাদগড়ে সি আর পি-র গুলি খেয়ে খুন হয়ে যান বামপন্থী যুবক । আজাদগড় কলোনী - উদবাস্তু রক্তে সেচ্‌ দেওয়া উদবাস্তু ভবিষ্যৎ ।

বহুপরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় ,খবরের কাগজে একটা ছবি বেরিয়েছিল । এক সিরিয় বাবা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে বর্ডার-এর দিকে দৌড়াচ্ছে । তাকে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দিচ্ছেন এক ইউরোপীয় সাংবাদিক । বাচ্চাটার মাথা বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় মাথা আগলে রেখেছেন বাবা । আমার ঠামি তখনই প্রায় ৯০,বলেছিল - "ওরা কি ট্রেনটা ধরতে পেরেছে ? " মনের কোন গহিন কোনের স্টেশনের ট্রেন , কোন সীমান্ত পেরনো ট্রেন জানা নেই । তবে ট্রেনে চড়ার ফলাফল যে শিকড় হারানো আর ট্রেনের গন্তব্য যে বেঁচে থাকার এক ফালি আশিয়ানা , এ বিষয় কোন সন্দেহ নাই । আসলে একবার যে উদবাস্তু , তার শিকড় বরাবরের মতো বাঁধা পড়ে যায় শিকড় হারানোয় ।

রোহিঙ্গার মায়েরা তাদের সন্তানদের কোলে নিয়ে ,এভাবেই লড়াই করছেন - বেঁচে থাকার আশিয়ানার খোঁজে । রোহিঙ্গার মানুষ (হিন্দু,মুসলমান এবং বৌদ্ধ) আদতে আমাদেরই উদবাস্তু অতিতের বর্তমান বাসিন্দা । ভারতের ঐতিহ্যের প্রতি তারা আস্থা রেখেছেন । ভারত কখনোই অন্যায় ভাবে ছিন্নমূল মানুষকে ( যে কোন ধর্ম বা ভাষার বা জাতের) ফিরিয়ে দেয় নি । ওরা ভরসা রেখেছেন ভারতের উপর । ভারতের এক কোনে এক চিলতে জমিতে , রক্তের সেচ্‌ দিয়ে ওরা আবার ওনাদের ভবিষ্যতের চাষ করবেন । বরাবরের মতোই এবারও লাল ঝান্ডা ঈগল পাখির মতোই রক্ষা করবে ছিন্নমূল মানুষের অধিকার । কাল ছাত্র ফেডারেশন ও যুব ফেডারেশনের মিছিল , মায়ানমার দুতাবাস-এর লক্ষ্যে । মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার , সবচাইতে বড় গণতান্ত্রিক অধিকার ।গণতান্ত্রিক অধিকারের মিছিল । আমার ঠামির এখন জানা-বোঝার আর ক্ষমতা নাই । থাকলে রোহিঙ্গাদের ট্রেনটা কোন স্টেশনে থামবে ,সেই খবরটা অবশ্যই নিতেন ।

সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বাঙ্গালীর দুগ্গাপুজো

"কৈলাস হতে বাপের বাড়ি এসেছে পার্বতী,
সঙ্গে গনেশ, কার্তিক আর লক্ষ্মী সরস্বতী। "

মহালয়ার আর হপ্তা খানেক বাকি। পূজোর আগের লাস্ট উইক এন্ড। কৈলাসে মর্ত্যে যাবার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। এমন সময় কার্তিক ফেসবুকে স্ক্রোল করা থামিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল "খবর শুনেছ?  ইন্দ্র আমাদের মামারবাড়ি যাওয়া নিয়ে ইনজাংশান জারি করছে।"
 সরস্বতী খবরের কাগজ পড়ছিল বিরক্ত মুখে বলল "কেতো ফেসবুক পড়ে ফালতু গুজব ছড়াস না, মর্ত্যের কিছু ভক্ত বাঙালিদের দূর্গাপুজোর ধরনধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, ভক্ত অসন্তোষের ব্যাপারটা নিয়ে ইন্দ্রের সভায় আলোচনা হয়েছে, ব্যাস এইটুকুই,সব কিছুকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়ায়।

মা ব্ল্যাকবেরীটা চেক করতে করতে একটু চিন্তিত গলায় বললে "শুধু আলোচনা নয়, ইন্দ্র ম্যাসেজ পাঠিয়েছে, কাল দেবতাদের পাঁচ সদস্যের এক কমিটি দূর্গাপুজোর ধর্মীয় ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে কৈলাসে আসবেন। আমরা যেন কোওপারেট করি।"

লক্ষ্মী রেগে টং, "মা নিজের বাপের বাড়ি যাবে আমরা মামার বাড়ি যাব, তাতে কমিটি কি করবে? আসলে হিংসে। তেত্রিশ কোটির আর কারো তো এরকম মামারবাড়ির আদর নেই।"

গনেশ সবসময় অন দ্য টপ অফ এভরিথিং থাকে। বলল "মা আমি মর্ত্যের ট্রেন্ড টা দেখলাম, সকলে সনাতন হিন্দু ধর্মের দিকে ঝুঁকছে, আমাদের কাল কমিটির কাছে প্রেসেন্ট করতে হবে আমরাও খুব সনাতন।" মা বললেন "কত পুরোনো?  বৈদিক যুগ? মহামায়া রূপে ফিরে যাব?" গনেশ আরে না অতটা না ওই মধ্যযুগের শেষের দিকটা যখন অরাজকতার দরুন কুসংস্কার খুব বেড়েছিল।"

যাই হোক মা আর ছেলেমেয়েরা ঠিক করলেন কমিটির সামনে দূর্গাপূজার সনাতন রূপ তুলে ধরবেন। মা ভেবেছিলেন কমিটিতে অগ্নি, বরুন, পবন ইত্যাদি দেবতারা থাকবেন কিন্তু দেখলেন এসেছেন তিরুপতি, বৈষ্ণোদেবী, স্বামী নারায়ন, সিদ্ধি সাঁইবাবা,  পদ্মনাভন।
গনেশ ফিসফিস করে বললেন এঁরাই এখন স্বর্গের টপ ফাইভ রেভেনিউ জেনারেটর।

প্রশ্নোত্তর পর্ব আরম্ভ হল।

ভক্তির প্রথম স্টেপ হল মূর্তি, সেটার মেটেরিয়ালটা কি? মা জানালেন খড়, মাটি, রঙ। ওঁরা বললেন "ওসব নয় সোনা, রূপা, অষ্টধাতু, রত্নের বিগ্রহ হয়?" মা জানালেন ওসব হয় না তবে কাঠ, কাগজ, শোলা, সিমেন্ট,পাট, দড়ি, পেরেক, ঘুড়ি,ছাতা, ননী, ছানা, বাবলগাম, তাস,  ভাঁড় ইত্যাদি মেটেরিয়াল মূর্তি বা প্যান্ডেলে ব্যবহার হয়। কমিটি একটু হেঁচকি তুললেন।

দ্বিতীয় হল খাওয়া দাওয়া। ভক্তরা কতটা খাওয়ার কৃচ্ছ্রসাধন করে? উপবাস? লবন বিহীন অন্নগ্রহণ, ননভেজ না খাওয়া, ভক্তরা এর মধ্যে কোনটা করে? মা বললেন এগুলো ঠিক করে না তবে বাছারা পূজোর সময় ঢেড় খাওয়ার কষ্ট সহ্য করে। আরসালানের সামনে আড়াই ঘন্টা লাইন দিয়েও মাটন বিরিয়ানি না পেয়ে চিকেন বিরিয়ানি খায়, পুজোর কদিন রোজ সন্ধ্যেবেলা আধকাঁচা এগবিহীন এগরোল খায়, অম্বলে গলা জ্বলে গেলেও ষষ্টি থেকে দশমী ফুচকা খাওয়া ছাড়ে না।"
এহেন কৃচ্ছ্রসাধনের বিবরণে কিন্তু কমিটির মন গলল না। তারা গম্ভীর মুখে পরের প্রশ্নে গেলেন। 

"নামগান কিরকম করে ভক্তরা?" এবার সরস্বতী হাল ধরলেন। পাছে মা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজা "তোদের ঘুম পেয়েছে বাড়ি যা" বা "এ তুমি কেমন তুমির" কথা বলে বসে, তাই সরস্বতী ঘরোয়া পূজোয় বাজা রবীন্দ্রসংগীত গুলো এগিয়ে দিল। কিন্তু গান গুলো রিভিউ করতে গিয়ে কমিটির মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। একে তো নিরাকার উপাসক কবি,তায় মুসলমানের মত জোব্বা পড়া, বড় বড় দাড়ি। তার উপর ঔদ্ধত্য দেখ? লিখেছে "আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে।"
নাম গানের ঘরে ঢ্যাঁড়া পড়ল।

পরের টপিক ভক্তের পরীক্ষা, কে কত কষ্ট সহ্য করতে পারে দেবতার জন্য। মাথার চুল দান করে? দন্ডি কাটে? ঠান্ডা কনকনে জলে ডুব দেয়, কাঠফাটা রোদে খালি পায়ে হাঁটে? 
মা সোতসাহে জানালেন শরীরপাত করে বইকি? ঠাকুর দেখতে হোল নাইট জাগে, হাই হিল জুতো পরে মাইলের পর মাইল হাঁটে, বাঁশবাঁধা লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অন্যের কনুইএর গুঁতো খায়। কিন্তু মনের খুশিটা কিছুতেই যায় না। একে অন্যের পা মাড়িয়ে, প্যান্ডেলের লাইনে অন্যের ঘামে ভেজা টিশার্টে মুখ ঘষেও হাসিমুখে মায়ের প্রতিমার সাথে সেল্ফি তোলে।

মা এবং ছেলেমেয়েরা সভয়ে দেখলেন ভক্তের কৃচ্ছ্রসাধনের ঘরেও গোল্লা বসল। এদিকে সরস্বতীর টেবিলে এবছরের পূজোসংখ্যা গুলো রাখা ছিল কমিটির সে দিকে নজর পড়ল। সরস্বতী জানালেন ওগুলো দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে স্পেশালি ছাপা হয়। কমিটি ভাবলেন স্তবস্তুতি প্রার্থনামন্ত্র হবে। খুলে লেখার নমুনা দেখে চক্ষুচরকগাছ। এখানে বড়ই কনফ্লিক্ট হল। কমিটিও কিছুতেই বুঝতে পারছে না ধর্মের সাথে সম্পর্ক বিযুক্ত এইসব সাহিত্যের পুজোর সময় কিসের দরকার? এদিকে মা আর ছেলেমেয়েরাও বুঝতে পারছে না পূজোসংখ্যা ছাড়া দুর্গাপূজো হয় নাকি?

অবশেষে কমিটি শেষপ্রশ্নে পৌঁছল। দুর্গাপূজায় রেভেনিউ জেনারেশন কেমন হয়? গনেশ খাতাপত্র খুলে বসল। এইতো দেখা যাচ্ছে প্রচুর চাঁদা ওঠে, প্লাস পুজোর মাসে বাঙালি গৃহস্থের খরচাপত্র খুব বেড়ে যায়, কর্তাদের নাভিশ্বাস ওঠে। কমিটি জানতে চাইলেন প্রণামীর বাক্স সেকথা বলছে না কেন? মায়ের মন্দির কই? সে মন্দিরের ট্রাস্টফান্ডে সম্পদ কই? রেভেনিউ যাচ্ছে কোথায়? গনেশ জানালো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়, খানিক থীম শিল্পির ঘরে, খানিক কুমোরটুলিতে, আর্টকলেজে, প্যান্ডেলের মজুরের ঘরে, ঢাকীর ছেলের ধোঁয়াওঠা গরম ভাতে, তাঁতশিল্পির ঘরে, শাড়ীর দোকানদারের মেয়ের বিয়ের খরচে, কাজের লোকের বকশিশে, রক্তদান শিবিরে, কম্বল বিতরনে, অষ্টমীর খিচুড়ি ভোগে, ফুচকাওয়ালার ময়লা পকেটে ছড়িয়ে পড়ে এই রেভিনিউ।
কমিটি হতভম্ব হয়ে গেলেন। এরম ভাবে দেবতারা বর দেন নাকি? ওঁদের সব সোজা হিসাব। মন্দিরে সোনার বিগ্রহ দিলে ব্যাংক্রাপ্টসির হাত থেকে বাঁচিয়ে লন্ডনে পাঠিয়ে দেব, পাঁচসিকের পুজো দিলে ছেলের সর্দি সারিয়ে দেব, মাথার চুল মানত করলে আমেরিকার ভিসা, সোমবার উপোষ করলে এন আর আই বর। এতেই ভক্তের মনে ভয়, ভক্তি জাগে। থীম পুজোর প্যান্ডেলে জন খেটে রোজগারের টাকায় ছেলের চিকিৎসা হলে মানুষ ভগবানকে শ্রদ্ধাভক্তি করবে কেন?

মা মৃদু হেসে বললেন ভক্তি তো চাইনি ভালোবাসা চেয়েছি, স্তব পাইনি, "নবমী নিশি পোহাইও না রে" আকুল আবেদন পেয়েছি, ভক্তের মস্তকমুন্ডন চাইনি, থীমের পূজোয় নিউ হেয়ার স্টাইল পেয়েছি, প্রণামী চাইনি, শিউলি চেয়েছি, বর দিতে চাইনি, আনন্দ দিতে চেয়েছি, ভক্তের শুদ্ধশুচি উপবাস চাইনি বচ্ছরকার দিনে ছেলেপুলের হাতে নারকেল নাড়ু দিয়ে চেয়েছি, মহিষাসুরমর্দিনী হতে চাইনি উমা হতে চেয়েছি।"

তাই বলে কি মায়ের এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় কমিটির রায়দানে কোনো হেরফের হল? ওরকম হলে আল্লা, গডের সাথে পাল্লা দিয়ে সনাতন ধর্ম টিকিয়ে রাখা যেত না। কমিটি জানালেন ওঁরা দুর্গার মর্ত্যের ট্যুরের উপর স্থগিতাদেশ জারি করবেন। বাঙালিরা পূজোর নামে এই যে অধর্মীয় কাজ করছে সেটা বন্ধ করা দরকার।
কৈলাসে অন্ধকার নেমে এল। মা জানেন "আর অসুর দমন করব না" বলে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। অসুরদের সাথে দেবতাদের তলায় তলায় সমঝোতা হয়ে গেছে।

ভোলানাথ ক্যাসুয়ালি ইন্দ্রের সভায় গিয়ে জানালেন "গলাটা বড়ই ট্রাবল দিচ্ছে হে, এতদিন ধরে হলাহল গলায় ধরে রাখা তো চাট্টিখানি কথা নয়। অন্যবার মহামায়া বাপের বাড়ি গেলে কয়েক হাজার ছিলিম গাঁজা চড়িয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজে রাখি। তা এবার তো ওদের যাওয়া বন্ধ, হলাহল টা নাহয় ইন্দ্রলোকেই নামিয়ে রাখি?"

ইন্দ্র আমতা আমতা করে বললেন "ইয়ে মানে যাওয়া বন্ধ নয় তো, কতগুলো ব্যাপারে কমিটি আপত্তি করেছে, ব্যাপারটা আলাপ আলোচনার মধ্যে মিটিয়ে নেওয়া যায়।"

মহাদেব বললেন "বাঙালিদের একে আঠারো মাসে বছর, তায় এমনি ল্যাদখোর কিন্তু বাঙালের গোঁ খুব, ওদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ভদ্র হিন্দু করতে সময় লাগবে। ততদিন হলাহলটা তুমিই ধারণ কর না হয়।"

এই কথোপকথনের আধঘন্টার মধ্যেই মায়ের মোবাইলে ইন্দ্রের ম্যাসেজ এল যে কমিটির সবাই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, মায়ের বাপেরবাড়ি যাওয়া নিয়ে তেত্রিশকোটির কারোর আপত্তি নেই।
প্রতিবারের মত গৌরী এবারেও বাপেরবাড়ি আসছেন। মা মেনকা পান্তাভাত আর কচুরশাক রেঁধে রেখেছেন।

(সংগৃহীত)

বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সরকারি কর্মচারী ~ সুভাশীষ

পরিবর্তনের সরকার মানুষের আকাঙ্খাতেই ক্ষমতা এসেছিল। আর পূর্বতন সরকার আর পার্টির নানা ত্রূটিবিচ্যুতি ছিল, সে তো তারাই পরবর্তীকালে নানা লেখাপত্রে আত্মসমালোচনা করেছেন। এই দুটো প্রতিপাদ্য নিয়ে আমি কোনও বিবাদ করিনি। কিন্তু গোল বেঁধেছে অন্যত্র। সরকার আর কর্মচারী সংগঠনের আন্ত:সম্পর্ক নিয়ে যে বিশ্লেষণ শুনছি, সেটা নিয়ে কিছু আলোচনা করা দরকার। 

এটি ঠিক যে বামফ্রন্ট সরকারকে রক্ষা করার স্লোগান এই রাজ্যের কর্মচারী সমাজের একটা বিরাট অংশ দিয়েছিলেন। কেউ কেউ অতি উৎসাহে 'চোখের মনির মত রক্ষা করার' কথাও বলতেন। সরকারী কর্মচারীদের সার্ভিস রুলে দলীয় রাজনীতি করার অধিকার নেই। সেটা ব্রিটিশ সার্ভিস রুলে আছে। কিন্তু দেশের  রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারী কর্মচারী ও তাদের পরিবারের ভাগ্য যেহেতু অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত আছে, তাই নির্বাচনে তাঁরা নির্বিকল্প ভূমিকা পালন করতে পারেনা। আবার সরাসরি কোনও পক্ষকে ভোট দিতে বললে সেটা সার্ভিস রুলে আটকায়। তাই খেয়াল করলে দেখা যাবে নির্বাচনের সময় সংগঠন বলেছে 'জীবন ও জীবিকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সপরিবারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন।' 

এটা ঠিকই যে ২০১১ সালে বামফ্রন্টে নির্বাচনী বিপর্যয়ের বছরেও কর্মচারীদের ভোট বিপুলভাবে বামফ্রন্টের পক্ষেই গিয়েছিল।  বাম সরকারের প্রতি কর্মচারীদের এই পক্ষপাত তো তাদের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল  কর্মচারীদের সঙ্গে বামপন্থীদের এই মৈত্রী কিন্তু গড়ে উঠেছিল বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার বহু পূর্বে সুদীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সর্বস্তরে  গণতন্ত্রের প্রসার, জমি বা খাদ্যের দাবিতে বিপুল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। দুর্ভাগ্য আজকের প্রজেন্মর জানাই নেই যে এই সব সংগ্রামের মধ্যে ওতোপ্রতোভাবে বামপন্থীরা লড়াই করেছিলেন সরকারী কর্মচারীদের দূরাবস্থা নিরসনেও। লোকসভায়, বিধানসভায় এবং রাস্তায়। 

সরকারি কর্মচারীদের দাবির সমর্থনে আইনসভাগুলিতে জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ঞ কোঙার, ভূপেশ গুপ্ত, জ্যোতির্ময় বসু, এ কে গোপালন, ইন্দ্রজিত গুপ্তদের বহু স্মরণীয় ভাষণ এখনও রোমাঞ্চ জাগায়। 1958 সালে এসপ্লানেড ইষ্টে সরকারি কর্মচারীদের অভিযান  আটকাতে জমায়েত তিন দিক থেকে ঘিরে নিয়েছিল সশস্ত্র পুলিশ। অবধারিত জালিওয়ানাবাগের পরিস্থিতিতে ধূমকেতুর মত আবির্ভূত হয়ে অসীম সাহসে মিছিল বার করে নিয়ে গিয়েছিলেন ৫ ফুট ২ ইঞ্চির এক খর্বকায় বাঙালী। জ্যোতি বসু! 

স্বাধীনতার পর ৭৭ -পূর্ববর্তী পুরো সময়টাই ছিল সরকারী কর্মচারীদের কাছে একটা কালো অধ্যায়। ডাঃ বিধান রায়ের মত মানুষ প্রকাশ্যেই বলতেন, সরকারী কর্মীরা সরকারের গোলাম। বলতেন, কর্মীরা  দাবি নয়; সরকারের কাছে প্রার্থনা করতে পারে। সে সময় কুখ্যাত Service Conduct Rule ছিল। গ্রুপ ডি কর্মীদের অফিসে  বসার অধিকার ছিলনা। সাহেবের ঘরে জুতো খুলে ঢুকতে হত। অধস্তন কর্মচারীরা উপরওয়ালাকে চিঠি শেষ করতেন 'your most obedient servant' বলে। গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করলে নেমে আসত নির্মম শাস্তির খাঁড়া। পুলিশের লাঠি, গ্রেপ্তারি, হুমকি, বাড়িতে আক্রমণ,  বদলী, পে কাট, সুপারসেশন, সাসপেনসন,  ইনক্রিমেন্ট কাট; মায় সংবিধানের ৩১২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বরখাস্ত। 

অনেকে নিশ্চই জানবে সে সময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আন্দোলনের সঙ্গে সরকারী কর্মচারীদের আন্দোলন মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাই অবলীলায় সরকারী কর্মীদের মহার্ঘ ভাতার দাবিতে মিছিলে নামতেন সাধারণ মানুষ। এই পটভূমিতেই ৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজ্যের অন্যান্য অংশের মানুষের সাথে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন সরকারী কর্মচারীরাও। তারপর যা হয়েছিল তা ইতিহাস! নিছক পাওনা-গন্ডা ছেড়ে দিলাম, মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন সরকারি কর্মীরা। বাতিল হয়েছিল সার্ভিস কন্ডাক্ট রুল,  অফিসে বসার অধিকার ও মাথার উপর ফ্যান পেয়েছিলেন গ্রুপ ডি কর্মীরা। 'সরকারের গোলাম' থেকে 'জনগণের সেবকে' উত্তীর্ণ হয়েছিলেন কর্মচারী সমাজ। ফেরৎ এসেছিল মাথা উঁচু করে সংগঠন করার অধিকার। দলমত নির্বিশেষে রাইটার্সে, কালেক্টরেটগুলিতে সংগঠনের কাজ করার জন্য অফিসঘর দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের লিখিত অর্ডারে।  কো-অর্ডিনেশন পেয়েছিল, ফেডারেশনও।  সংগঠন মন্ত্রী-আমলাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে দ্রূত সময় দিতে হবে, সংগঠন চিঠি দিলে উত্তর দিতে হবে--- আদেশনামা বার করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। মুখ্যমন্ত্রীরা কর্সমচারীদের সম্বোধন করতেন  'প্রিয় সহকর্মী' বলে। জ্যোতি বসু সার্ভিস রুল পাল্টে ধর্মঘটের অধিকার দিয়েছিলেন রাজ্য কর্মীদের (জরুরি পরিষেবা ছাড়া)। যেটা ভূভারতে নেই। অনেকে মানা করেছিলেন। শোনেননি। আমি নিজের কানে শুনেছি, রাজ্য কর্মীদের সভায় বলেছেন, "ধর্মঘটের অধিকারটা ছাড়বেন না। বামফ্রন্ট সরকারের হাতেও নয়।" 

তাই বলছিলাম, বাম সরকারকে রক্ষা করার শ্লোগানটা কেউ ফতোয়া জারী করে দেয়নি, ওটা উঠে এসেছিল কর্মচারীদের ভিতর থেকে, তাঁদের জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে। ঠিকই, সময়ের সাথে সাথে যেমন ষাট-সত্তরের দশকের স্মৃতি কর্মচারীদের মধ্যে ফিকে হয়েছে, তেমনই সরকারের মতাদর্শগত অবস্থানও কোথাও-কোথাও শিথিল হয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, সেটা নিয়ে মন্ত্রিসভার সঙ্গে কো-অর্ডিনেশন কমিটির তুমুল সংঘর্ষও হয়েছে। আমরা তাঁর সাক্ষী। ২০০৫ সালে সূর্যকান্ত স্বাস্থ্য দপ্তর বেসরকারী করে হেল্থ কর্পোরেশন গঠন করতে চেয়েছিলেন।পাঁচ হাজার কর্মী নিয়ে স্বাস্থ্য ভবন ঘেরাও করেছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি। সিদ্ধান্ত রদ হয়েছিল। 

জ্যোতিবাবুর সময়কাল থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীরা যেতেন কো-অর্ডিনেশনের সম্মেলনে। বাছাই করা বক্তাদের মঞ্চে তুলে দেওয়া হত সরকারের সমালোচনার জন্য। ২০০৪-এর পুরুলিয়া সম্মেলন। সম্মেলন চলাকালীন  প্রলয়াঙ্করি  সুনামি হল এশিয়ায়। সম্মেলনের ভিতরেও সুনামি। অবসরের পর আমলাদের গণহারে পুনর্ণিয়োগসহ নানা ইস্যুতে সরকারকে তুলোধোনা করছেন উত্তর দিনাজপুরের শম্ভু চক্রবর্তী, মুর্শিদাবাদের আশিস বাগচী , উত্তর ২৪পরঘনার খগেন নাগেরা। সেই সময় আমাদের রেজিস্ট্রার ছিলেন এন জি চক্রবর্তী। অবসরের পর তিনিও রি-এমপ্লয়েড হয়েছিলেন  আর সি এস পদে। কো-অর্ডিনেশন সব সংগঠনের কাছে রি-এমপ্লয়েড আমলাদের তালিকা চেয়েছিল। আমরা এন জি চক্রবর্তীর নাম পাঠিয়েছিলাম। কেউ একজন দপ্তর ধরে ধরে এই সব আমলাদের নামের তালিকা পড়ছেন আর আর থমথমে মুখে শুনছেন বুদ্ধবাবু। অথচ কী বৈপরিত্য; তার আধঘন্টা আগে। মঞ্চে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিরাপত্তারক্ষীদের নানা কায়দা-কানুনের জেরে ১৫মিনিট বন্ধ হয়ে আছে অমন সুশৃঙ্খল সম্মেলন। শেষে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল স্মরজিতদার। (তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের)। মাইক টেনে বললেন, নিরাপত্তা অফিসারদের বলছি, "আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, আমরাই নিরাপত্তা বুঝে নেব। আপনারা দয়া করে নেমে যান।'। সম্মেলন কক্ষ ফেটে পড়ল করতালিতে। বিব্রত হয়ে নেমে গেলেন এসপিজি অফিসারেরা। 

সমবায় ক্ষেত্র। রাজ্য সরকার বৈদ্যনাথন কমিটির সুপারিশ কার্যকর করবেই। আমরা বামফ্রন্টের রাজনৈতিক দলিল খুঁজে দেখিয়ে দিলাম কেন্দ্রীয় সরকারের শর্ত মেনে মৌ স্বাক্ষর করলে তা বামফ্রন্টের নীতি বিরোধী হয়ে যাবে। মৌলালীতে সংগঠন আলোচনাসভা আহ্বান করল। বিনয় কোঙারকে বসিয়ে রেখে ক্ষুরধার বক্তব্য রাখলেন প্রণব চট্টোপাধ্যায়। শেষে অসীম দাশগুপ্ত ডেকে পাঠালেন। কো-অর্ডিনেশন কমিটির জেনারেল সেক্রেটারিকে নিয়ে দেখা করলাম। বললেন আপনাদের অবস্থান সঠিক। তবে অনেকগুলো টাকা দেবে। সর্বভারতীয় চাপ আছে। তবে আমরা আইনের ন্যূনতম সংশোধন করব। যদি দেখা যায় নতুন আইনে খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, আবার  পর্যালোচনা করব। এই ছিল বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে কর্মচারীদের সম্পর্ক।

এ থেকে কী প্রমাণিত হয়? বামফ্রন্ট সরকারের সঙ্গে কর্মচারীদের লড়াই হয়নি? প্রকৃত প্রস্তাবে সরকার রক্ষা নয়, সেটা ছিল আদতে বামফ্রন্টের নীতি রক্ষার লড়াই। মধ্যেকার দ্বন্দ্বটা তাই ছিল ভ্রার্তৃত্বমূলক, নন-অ্যান্টাগনিস্টিক। কর্মচারী জানত খোদ বামফ্রন্ট সরকারটাকেই  উচ্ছেদ করে দিলে বামফ্রন্টের নীতি রক্ষা করা যাবেনা। তাই আলবাৎ সরকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই ছিল, কিন্তু তা শত্রুতামূলক ছিল না। আর নিছক পাওনাগন্ডার কথাও যদি ধরি, স্বাধীনতার পর সব কটা পে কমিশন, ৮-১৬-২৫, হেল্থ স্কিমের মত কর্মচারী স্বার্থবাহী বিষয়ে সারা দেশের মধ্যে পাইওনিয়ার ছিল তো বামশাসিত পশ্চিমবঙ্গই। 

এটা ঠিক যে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ আমরা বাম আমলেও কখনও পাইনি, কেবলমাত্র একবার ছাড়া। সবসমই কয়েক কিস্তি পিছিয়ে থেকেছি। কিন্তু মনে রাখা দরকার ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার বছরে রাজ্য কর্মীদের বকেয়া ডিএ ছিল ৭২%। তবে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়ার স্বীকৃতিটা এখনকার মত হাই কোর্টে হলফনামা দিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়নি। জ্যোতিবাবুতো বটেই, বুদ্ধদেবুও বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন,  কেন্দ্রীয় হারে ডিএ আপনাদের প্রাপ্য। কিন্তু সরকার একটু সমস্যায় আছে। একটু সুযোগ পেলেই দিয়ে দেব। আমরা একটাই পরিবার একটু সমস্যাটা ভাগ করে নিন। এবং ঘটনা হল সে সময় সরকারটা যে সমস্যায় আছে আমরা বুঝতে পারতাম। এই রাজ্যের মন্ত্রী- বিধায়কদের বেতন-ভাতা ছিল সারা দেশের মধ্যে সবথেকে কম। সরকারি অনুষ্ঠানে ফুল দেওয়া অর্ডার করে বন্ধ করে  দিয়েছিলেন অসীম দাশগুপ্ত। সরকারি মিটিং-এ চা-বিস্কুট ছাড়া আর কিছু দেওয়া মানা ছিল। কোনও মন্ত্রী-আমলা ঘর সাজানোয় আড়ম্বর করলে কর্মচারীই রিপোর্ট করত। সেটা পৌঁছে যেত অর্থমন্ত্রীর টেবিলে। মনে আছে একবার বামফ্রন্টের এক মন্ত্রী অ্যাম্বাসেডর ছেড়ে  স্করপিও চড়তে শুরু করায় তুলকালাম করেছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি। আমরা কি এসব বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখব না? 

অনেকে সরকারের সঙ্গে কর্মচারীদের শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের কথা বলে। তাই কী? পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কোন  মালিক  সার্ভিস রুল সংশোধন করে শ্রমিককে ধর্মঘটের অধিকার দিয়েছে? দিয়ে আবার বলেছে, এই অধিকারটা ছাড়বেন না! কোন মালিক ক্ষমতা দখলের পর প্রথম তিনটে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের একটা নিয়েছে এই মর্মে যে,  কোনও শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ যাবেনা! কোথাও একটুও মনে হয়নি, যে এই সরকারটা অন্য রকম? হ্যাঁ এটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে বামফ্রন্ট সরকার সর্বগুণসমন্বিত, ত্রূটিবিচ্যুতিহীন একটি ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। তারা নিজেরাও কখনও সেই দাবি করেননি। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল আজ তা মর্মে মর্মে  অনুভব করছে কর্মচারী সমাজ যখন ন্যায্য  দাবিগুলি আজ কুৎসিত ঈঙ্গিতে অনুকম্পার অনুজ্ঞায় বদলে যাচ্ছে। মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। শেষ পর্যন্ত জনগণের উপর বিশ্বাস আমাদের রাখতেই হবে। আর সেটাই তো এত অপমান আর লাঞ্ছনা সত্বেও আমাদের দপ্তরে কাজের অনুপ্রেরণা যোগায়। সিপিএম আমাদের বেতন দেয়নি, টিএমসি-ও দিচ্ছেনা। আমাদের অন্নের সংস্থান হচ্ছে  রাজ্যের দরিদ্র্যতম মানুষটির পয়সায় যে একটা আট আনার দেশলাই কেনার সময়ও ৫ পয়সা ট্যাক্স দিয়ে যাচ্ছে সরকারি কোষাগারে।  আমার ভাষ্যে একমত না হওয়ার অধিকার সবার থাকছে। স্বাভাবিক। আর আমরাদের লড়াইটাতো ভিন্নমত পোষণের অধিকারের  সপক্ষেও বটে।