রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

দাঙ্গা ~ কৌস্তভ কুন্ডু

১৯৪৭ এ পুরো পরিবার চলে এলেও দাদু থেকে যায় বাংলাদেশে। বরিশালের গৌড় এ। তামাকের ব্যবসা ছেড়ে আসতে রাজী হয়নি। বা ১৯৫০ এ যখন ২০০ জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাম দা দিয়ে একে একে গলা কাটা হয় তখনও আসেনি, (এটা গল্প নয়, বা গুজব নয়, ১৯৫০ বরিশাল genocide নিয়ে ঘাটাঘাটি করুন এর উল্লেখ পাবেন।) । কিছুতেই ব্যবসা ছেড়ে আসতে রাজী ছিলো না।
তারপর ১৯৭১, গ্রামে গ্রামে রাজাকার বাহিনী তান্ডব চালাচ্ছে । দাদুর মাথার দাম দিয়েছে ১০ হাজার টাকা। একদিন গ্রামের কিছু মুসলমান এসে বলল রাজাকার বাহিনী আসছে, তারাই বলল গ্রামের সব হিন্দুরা বড় গোডাউনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ুক। তাহলে রাজাকার বাহিনী খুঁজে পাবেনা, সুরক্ষিত থাকবে। সেই রাতে ৮২ জন হিন্দু আশ্রয় নেয় গোডাউনে। দাদু ভোরের আলো ফোটার আগে প্রাতঃকৃত সারতে মাঠে যায় । তখন দেখতে পায় মশাল, তরোয়াল নিয়ে ক্ষেতের আল ধরে কারা গোডাউনের দিকে যাচ্ছে । রাজাকার বাহিনী । আর ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই ছেলেগুলো যারা গোডাউনে আশ্রয় দিয়ে বলেছিল আপনারা সুরক্ষিত । প্রাণভয়ে দৌড়তে শুরু করে দাদু, দূর থেকে দেখেছিল গুদামে আগুন লাগানো হচ্ছে। ভোরের দিকে স্টিমার ঘাটে পৌঁছয়, সেখানেও রাজকাররা, কোন হিন্দু কে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। খুন করা হচ্ছে, আর মেয়ে হলে তাদের রেখে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধকালীন খাদ্য হিসেবে । যতদিন যুদ্ধ চলবে ধর্ষণ করা হবে। গ্রামে একসাথে থাকতে গিয়ে নামাজ পড়ার কায়দাটা জানত দাদু। সবার সাথে নামাজ পড়তে বসে যায়। নামাজ পড়তে দেখে সন্দেহ করেনি কেউ, স্টিমারে উঠতে দেয়। তারপর চলে আসে দাদু এদিকে, আর কোনদিন বাংলাদেশে ফিরে যায়নি।
পরে খবর পায় ঐদিন বাকি ৮১ জনকে গোডাউন সুদ্ধু জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ।
ছোট থেকে ঘটনাটি শুনে বড় হয়েছি, তারপর একদিন গুজরাত দাঙ্গার বার্ষিকীতে কোন একটা খবরের চ্যানেল গুজরাতের ভয়াবহতার কথা দেখাচ্ছে, দাদু আর আমি দেখেছি, দাদু বলছে "ইসস, মানুষ না হালারপোলা গুলান।" আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম তোমাদের সাথেও তো এরম হয়েছিল বাংলাদেশে। দাদু বলল "হোন, যারা একবার দাঙ্গা দ্যাখছে নিজের চোখে, হে আর দাঙ্গা support করবো না।"
আমি ঘৃণা করি দাঙ্গা, ঘৃণা করি জামাত, ঘৃণা করি বিজেপি ।
ফিরে যায়নি দাদু বাংলাদেশ, একদিন google map খুলে দেখাচ্ছিলাম বরিশাল, দাদু খুশি হয়ে ওঠে । তারপর দুজন মিলে অনেক খুঁজে খুঁজে পেয়ে গেছিলাম নিজেদের ঘর, গৌড় নদীর পাশে........

(Courtesy: Kaustav Kundu )