শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৬

মুক্ত বাজার অর্থনীতি ~ সুশোভন পাত্র

অফিস ফেরত মোড়ের ট্রাফিক'টায় আজকাল প্রায়ই মিনিট দশেক আটকে থাকতে হয়। রাস্তায় তখন ব্যস্ত মানুষের স্রোত, রেড লাইটার গা ঘেঁষে বহুজাতিকের আকাশছোঁয়া বিজ্ঞাপন, দুপাশে গাড়ির কর্কশ হর্ন, ফ্লাই ওভারে আধুনিক সভ্যতার সাক্ষ্য গায়ে মেখে ছুটে চলা পর্যাবৃত্ত মেট্রো, আর শীর্ণ, দীর্ণ কয়েকটা ভিক্ষাজীবীর অসহায়তা। এসবের মধ্যেই সেদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম আকাশে উড়ে যাচ্ছে একদল পাখি। দিল্লীর এই চুলোতে এ'দৃশ্য বিরল বৈকি। চাইলে এখানে মাথার উপরে হাফডজন উড়োজাহাজ দেখতে পাওয়া যায়, প্রাসাদসম ফ্ল্যাট গুলোর মাথায় মোবাইল টাওয়ারের টিমটিম করা লালবাতি গুলোকে শনাক্ত করা যায়, চিমনির একরাশ কালো ধোঁয়ারও হদিশ পাওয়া যায়, কিন্তু রাতের আকাশের কালপুরুষটা খুঁজে পাওয়া যায় না, তর্জনীর ডগা দিয়ে লাইন টেনে সপ্তর্ষিমণ্ডলটা মিলিয়ে নেওয়া যায় না, ডানা ঝাপটে নীল আকাশের বুক চিরে উড়ে যাওয়া পাখির দলের অনাবিল হর্ষধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় না। আসলে আমাদের মত O₃, SO₂ NO₂, মাইক্রোমিটারের পার্টিকুলেট ম্যাটার কিম্বা অ্যারোডাইনামিক্সের বিজ্ঞানটা না বুঝলেও, দিল্লীর  নিকৃষ্টতম বাতাসে প্রতিমুহূর্তের জরুরী নিঃশ্বাস'টাও যে প্রবল বিপজ্জনক পাখিরা সেটা বোঝে। বোধহয় আমাদের থেকে একটু বেশীই বোঝে।দীপাবলির পর গত পাঁচদিন আর একটাও রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল দেখেনি দিল্লী। C.S.E'র ডিপাৰ্টমেন্ট জানিয়েছে এই বুধবার সতেরো বছরের জঘন্যতম 'স্মগে' ডুবে ছিল দিল্লী। এপ্রিলে হু, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ু বয়ে বেড়ানোর ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করেছে দিল্লী কে।'এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে'র মাপকাঠিতে বছরে নাকি মাত্র দু'দিন, বুকভরা শ্বাস নেওয়ার মত 'দূষণ মুক্ত' বাতাসের সৌভাগ্য হয় দিল্লীর। তবুও নিশ্চিন্ত, নির্বিকার এই জাহাঁবাজ দিল্লী। আমার যে পরিবেশ সচেতন কলিগ সেদিন বাতাসে CO₂ মিশে যাবার আশঙ্কায় হোটাসঅ্যাপে চিনের সামগ্রী বয়কটের আবেদন জানালেন, সোমবার তিনিই বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করলেন "ইস বার চালিশ হাজার কা পটাকা ফোড়া।" আসলে  বয়কটের আবেদনটা পরিবেশ রক্ষার্থে ছিল না। আবেদনটা ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদের হিড়িক তুলতে। আসন্ন অল ইম্পরট্যান্ট তিন বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেশপ্রেম জাহিরের আগুনে খেলায় ফার্স্ট ইনিংসে লিড নিতে। আফসোস শুধু একটাই, আমাদের মাথার উপরের আকাশটা, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা বাতাসটা, এই জাতীয়তাবাদটা বোঝে না, কাঁটাতারে আবদ্ধ দেশপ্রেমের গণ্ডী গুলো চেনে না, জিও পলিটিক্সের জটিল অঙ্ক গুলো কষতে জানে না, তাই চিনের CO₂ আর ভারতের CO₂ তে দূষণের পার্থক্যটাও করতে পারে না।
শুধু আপনার নিঃশ্বাস নেওয়া বাতাসের কম্পোজিশনটাই নয়, বদলে যাচ্ছে আপনার বৃষ্টি মাথায় ফুটবল খেলার অমলিন শৈশবটা, বদলে যাচ্ছে আপনার পাড়া মাথায় তোলা চায়ের দোকানের আড্ডাটা, বিকেলের মা বৌদি'দের পুকুর পাড়ের চেনা ছবিটা, ঘুমনোর আগে গল্পের বই পড়ার আপনার নিখাদ অভ্যাসটা। আসলে বিশ্বায়নের নামে বদলে যাচ্ছে আপনার আশেপাশের গোটা সমাজটাই। পরিবেশে দূষণের মাত্রার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আপনার শয্যাশায়ী মায়ের ওষুধের খরচা, ছেলের কলেজের ফিস, মেয়ের কসমেটিকসের দাম, আপনার মাসকাবারি ছাপোষা ফর্দের দৈর্ঘ্যটা আর মুকেশ আম্বানির মোট সম্পত্তির পরিমাণটা। বর্তমানে যে সম্পত্তির পরিমাণ ২৩.১ বিলিয়ন ডলার। অঙ্কটা আপনার দেশের ১৪টা রাজ্যের, আর বিশ্বের ১৯টা দেশের জিডিপি'র থেকে একটু বেশী। ২০১৩-২০১৫'র আর্থিক বছরে ২৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে বৃহৎ কর্পোরেট'দের বকেয়া মোট অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ১.১৪ লক্ষ কোটি টাকা। অঙ্কটা আপনার রোমান্টিক হানিমুনের নিশ্চিন্ত ডেসটিনেশন, ঐ  নর্থ ইস্টের স্টেট গুলোর সম্মিলিত জিডিপি'র থেকেও একটু বেশি। প্রথম ১৫ জন ধনী ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পত্তির অঙ্কটা আজ দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার সম্মিলিত সম্পত্তির থেকে একটু বেশি। আর এই প্রবল আর্থিক বৈষম্যের পরেও অর্থমন্ত্রী তাঁর প্রেয়সী যে অর্থনীতির প্রশংসা করে সন্ধেবেলার সাংবাদিক বৈঠকে নিয়ম করে 'ফিলগুড ফ্যাক্টর' বিলিয়ে দেন তার নাম 'মুক্ত বাজার অর্থনীতি।' এই মুক্ত বাজার জাতি, রাষ্ট্রের পরিসর বোঝেনা। এই মুক্তবাজার বোঝে ডিমান্ড সাপ্লাই রেশিও। বোঝে লো কস্ট প্রোডাকশনের প্রফিট। বোঝে কনজিউমার সারপ্লাসের অঙ্ক। এবং বোঝে বলেই চিনের অর্থনীতির ঠাণ্ডা লাগলে ভারতের বাজারে হাঁচি হয়। বোঝে বলেই গোটা বিশ্বে চিনের পণ্য রমরমিয়ে বিক্রি হয়।
আচ্ছা, লেবার ব্যুরো রিপোর্টে যে দেশের বর্তমানে বেকারত্বর হার শেষ ৫ বছরের সর্বোচ্চ, যে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং গ্রোথ মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রতি কোয়ার্টারে, যে দেশের আটটি শ্রম নিবিড় শিল্পে গত আর্থিক বছরে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১.৭৫ লক্ষ; একটা হোটাসঅ্যাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে সে দেশের অর্থনীতি উদ্ধার করার কষ্টকল্পনা আপনার বালখিল্যতা মনে হয় না? অরে মশাই, মুক্ত বাজারের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করা আমেরিকাও চিনের পণ্যের আমদানি রোধে চড়া হারে শুল্ক ধার্য করেছে। এবং এতদসত্ত্বেও চিনের সাথে বর্তমানে আমেরিকার ট্রেড ডেফিসিটের অঙ্কটা স্টেগারিং, অঙ্কটা ৩৪৩ বিলিয়ন ডলার।  
অর্থনীতি'তে 'স্বদেশী' ফ্ল্যাবারের দর্শন আমদানির জন্য সংঘের লোকজন দীনদয়াল উপাধ্যায় কে খুব মান্যি যত্ন করেন।প্রধানমন্ত্রী আদর্শগত আনতির জন্য তাঁর নামে যোজনার নামকরণে শ্রদ্ধা তর্পণ করেন, মেক ইন ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়ার গাল গপ্পো পাড়েন। আর বিজেপি'র ক্যাবিনেট, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেই 'স্বদেশীয়ানা'র পিণ্ডি চটকে, আপনার জীবনদায়ী ওষুধে ৭৪% আর প্রতিরক্ষা তে ১০০% এফ.ডি.আই'র বিল পাশ করে, আমেরিকার সাথে লজিস্টিক এক্সচেঞ্জের চুক্তি সাক্ষর করে। হিন্দুত্বের আঁতুড়ঘরের গুজরাত সরকার যখন নর্মদার ধারে চিনা ব্রোঞ্জ দিয়ে সর্দার প্যাটেলের মূর্তি গড়ে, সংঘের হেডকোয়ার্টার নাগপুরের মেট্রোতে যখন চিনের কোম্পানি কোচ তৈরির রমরমা ব্যবসা করে, দেশভক্তির সাক্ষাৎ অবতার স্বয়ং মোহন ভাগবতও তখন তাঁর জাতীয়তাবাদী লেজ গুটিয়ে মৌনব্রত পালন করেন। ডিয়ার গোমাতার বাধ্য সন্তানদল, আপনাদের রাজনৈতিক গডফাদার'রাই যখন বাড়ি বয়ে মুক্ত বাজার অর্থনীতির দালালি করেন তখন আপনারা কেন খামকা উগ্র দেশপ্রেমের আমাশয় ভোগেন? মুক্ত বাজারের সাম্রাজ্যে তো এটাই ডায়নামিক্স। মুক্ত বাজার সাম্রাজ্যে এটাই তো নিয়ম। আর এ সাম্রাজ্যের আপাতত চিনই সম্রাট।   টেক ইট অর লিভ ইট…