শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৬

আহারে বাংলা ~ সুশোভন পাত্র

- হ্যাভ ইউ এভার বিন টু ইউরোপ? এলে বুঝতিস, প্রফেশেনালিজম কি জিনিস। কি ডিসিপ্লিন, কি ডেকোরাম। ঐ 'শ্রমিক ঐক্য' দিয়ে কিস্যু হবে না। 'দুনিয়ায় মজদুর' আর কবে এক হবে? অষ্টমীর সকালে চেতলা অগ্রণীর সর্বজনীন মণ্ডপে? না দশমীর সকালে বারোয়ারি ম্যাডক্স স্কয়ারে? মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট... যত্তসব ডিসগাসটিং এলিমেন্ট। ডেভলাপমেন্ট করতে একটা 'ওয়ার্ক কালচার' লাগে রে। আই মিন.. 'কর্ম সংস্কৃতি'। যেটা ঐ ৩৪ বছরের বাংলায় ছিল না। কনটেম্পোরারি কিছু ভাব ভাই, না হলে কিন্তু...  
স্কাইপি তে, বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়টা প্রায় হুমকি দিয়েই শেষ করলো আমার প্রবাসী 'নিরপেক্ষ' ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু। আমি অবশ্য তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছি, সি.পি.এম'র চিতা জ্বলা শশ্মানের সোনার বাংলায়, সঞ্জীবনী 'কর্ম সংস্কৃতি'র পুনর্জন্ম হয়েছে। এখন হারাধন বাবুর মাসতুতো বোনের ননদের ছেলের বৌ কিম্বা পাশের বাড়ীর শ্যামল কাকুর নাতজামাই'র পিসতুতো ভাইয়ের খুড়শ্বশুরের মত কিছু লুপ্তপ্রায় প্রাণী ছাড়া আপামর 'নিরপেক্ষ' বাঙালি 'কর্ম সংস্কৃতি'টা গুলে খেয়েছে। আনন্দবাজার তাঁদের শিখিয়েছে, শ্রমিকদের নুন্যতম মজুরি আদায়ের ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘটে কর্ম সংস্কৃতি ধ্বংসের যে পাপ লাগে, দুর্গা স্তুতির এক্সট্রা ছুটিতে সে পাপ ধুয়ে যায়। কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম চাওয়া রাজপথের মিছিলে 'সাধারণ মানুষ' যে হেনস্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, রাস্তা জোড়া দুর্গা মণ্ডপ ফাঁদলে সেই হেনস্তা'ই ভক্তি রসে ডুবে যায়। মহালয়া থেকেই দুর্গাপূজার শুভারম্ভের মুখ্যমন্ত্রীর মুখনিঃসৃত খোয়াবনামায় -বাংলার 'উন্নয়নে' আর ভাঁটা পড়ে না, পার ক্যাপিটা ইনকামের মহাভারত আর অশুদ্ধ হয় না, হাওড়া থেকে হনুলুলুর সিঁড়ি চড়তে গিয়ে সেনসেক্সের সূচকেরও পা হড়কে যায় না। 
সন্ধ্যালোকে ইডেন প্রান্ত থেকে বীরদর্পে মুখ্যমন্ত্রী মঞ্চে অবতীর্ণ হতেই রেড রোডের ব্যস্ত রাস্তা বন্ধ করে শুরু হল ওয়ার্ল্ডের 'বিগেস্ট কার্নিভ্যাল' -'পূজার শেষে ঠাকুর দেখা'। ফোর্ট উইলিয়াম প্রান্ত থেকে একে একে ৩৯টি পূজা কমিটির বর্ণাঢ্য র‍্যাম্প শো। মঞ্চের সামনে উদ্যোক্তা'দের উলুধ্বনি তে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে উজাড় করা নিরঙ্কুশ আনুগত্য। কারও গলায় 'থ্রি চিয়ার্স ফর আমাদের দিদি', কেউ বললেন 'হি পি পুরে', কোনও সুসজ্জিত ট্যাবলোর ব্যানারে আবার রবীন্দ্র-নজরুল-টেরেসার সাথে মাখামাখি হয়ে সুশোভিত হলেন 'আজকের দুর্গা...' স্বয়ং সততাময়ী মমতা। মুখ্য-সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডি.জি, কলকাতা পুলিশের কমিশনার পরিবেষ্টিত, লাস্যময়ী নীল নিয়নে ভেজা মুখ্যমন্ত্রীর মুখে তখন আত্মমুগ্ধতার একগাল হাসি, সরকারি পয়সায় মা দুর্গার খাতিরের কর্ম সংস্কৃতি বাস্তবায়নের একবুক তৃপ্তি। 
আচ্ছা, নবমীতে মুর্শিদাবাদের সালিশি সভায় 'স্বামী কে ছেড়ে যাওয়ার অপরাধে' ১০৮ বার কঞ্চির বাড়ি মেরে যে গৃহবধূর মাথার চুল কেটে নেওয়া হল কিম্বা প্রেম প্রত্যাখ্যানের অপরাধে হাঁসখালির যে মা-মেয়েটার মুখে অ্যাসিড ছোঁড়া হল –মঞ্চ থেকে তাঁদের সমবেদনা জানালে কি 'বিগেস্ট কার্নিভ্যাল'র মাহাত্ম্যে কিঞ্চিৎ ব্যাঘাত ঘটত? আগুনে পোড়া তিলজলার নাজিয়া ফাইজা কিংবা অনাদায়ী পনের দায়ে উলুবেড়িয়ার মিতা মণ্ডলের নিথর দেহের বিচার চাইলে কি নবান্ন'র দুর্গার মোচ্ছবের বাড়া ভাতে ছাই পড়ত? 'পূজার শেষে ঠাকুর দেখা'র আয়োজনী খরচা, দেবীপক্ষে রাজ্য জুড়ে নারী নির্যাতনে বলি ছ'জন গৃহবধূর পরিবারে বিলিয়ে দিলে কি মা দুর্গার আপ্যায়নে একটু খামতি থাকতো?
আপনার 'নিরপেক্ষতা' যখন সীমান্তের যুদ্ধ জিগির আর হাজীনগরের দাঙ্গা উস্কানির মাঝে পেন্ডুলামের মত দুলছে, আপনার ফেস্টিভ মুড যখন টলিউডের নায়িকার কোজাগরী আরাধনার গ্ল্যামারাস বাইটে আটকে, নার্কোটিক কন্ট্রোল ব্যুরোর রিপোর্ট অনুসারে বাংলা তখন বে-আইনি আফিম চাষে দেশের মধ্যে ফার্স্ট হয়েছে। বুলডোজারে গুড়িয়ে দেওয়া সিঙ্গুরের ৯৯৬ একর কে 'চাষযোগ্য' করে কৃষকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ায় দেখে আজ যে সংবাদ মাধ্যম্যের লুস মোশেন হয়েছে, সেই সংবাদমাধ্যমই আবার মালদা'র ৭০০০ একর জমিতে বে-আইনি আফিম চাষের খবর, চুপচাপ চেপে দেওয়ার কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছে। আপনি জানতেই পারবেন না যে, নিয়মিত ক্লাবে আর দুর্গাপূজা কমিটিতে অনুদান দেওয়া আপনার সাধের এই রাজ্য সরকার, অভাবের সংসারের হাঁড়ির হাল ফেরাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রাম ডিপো গুলো লিজ দিয়ে ২৫৮ কোটি টাকা কোষাগারে তুলেছে। আপনি যখন ব্যস্ত ছিলেন পূজা প্যান্ডেলের হপিং'এ কিম্বা অর্ধাঙ্গিনীর সাথে ম্যান ল্যান্ড চাইনার টেবিলে, রাজ্য সরকার তখন বাজার থেকে ধার করেছে আরও ১৫০০ কোটি। গত পাঁচ বছরে মোট ১ লক্ষ ২২ হাজার কোটি। পূজার বোনাস নেই, বকেয়া মহার্ঘ্য ভাতা নেই, রেশনে বরাদ্দ নেই, চাকরিতে নিয়োগ নেই, শিল্পে বিনিয়োগ নেই, কিন্তু তবুও সরকারের ধার করাতে খামতি নেই। আসলে ধার করাও তো একটা 'কাজ'। আর মোচ্ছবের খরচ চালাতে নিয়মিত ধার করাটা 'কর্ম সংস্কৃতি'।
জঙ্গলমহলের যে বেতাজ বাদশা লেনিনিষ্ট কনজাংচারের গ্রহ-তারা-নক্ষত্র বিচার করে তৎকালীন বিরোধী নেত্রীর রাজনৈতিক চরিত্রে নিজেদের 'শ্রেণী বন্ধু' খুঁজে পেয়েছিলেন, তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী বানাতে চেয়ে সাপের পাঁচ পা দেখেছিলেন, তিনি আজ বেঁচে থাকলে দেখতেন; হেমন্তের অলস দুপুরে, মাননীয়ার সরকার এখন পাঁচদিন ব্যাপী 'আহারে বাংলা'র খাদ্য উৎসব করছে। দেশী-বিদেশী তাক লাগানো সব মেনুর সম্ভারে মিলন মেলা প্রাঙ্গণে পেট-পূজার রাজসিক আহ্লাদীপনার আয়োজন হচ্ছে। চাকদহর বারো হাতের দুর্গার আশীর্বাদে যখন হিন্দ মোটর্স, ডানলপ, জেশপের বন্ধ কারখানার তালা খোলেনি, চটকলের শ্রমিক মহল্লায় উৎসবের দিনেও আলো জ্বলেনি, 'মাননীয়ার অনুপ্রেরণায়' যখন উত্তরবঙ্গের চা-বাগানে রেশন আর স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়নি, অনাহারে আর অপুষ্টিতে গত চার বছরে যখন সেখানে ৬০০ জনের লাশ হয়ে যাওয়া আটকানো যায়নি তখন সরকারের এই মোচ্ছব মুখরতার বিরোধিতা করলে কি নীল-সাদা উন্নয়নের রং একটু ফ্যাকাসে হয়ে যাবে? বেকারদের চাকরি চেয়ে মিছিল-মিটিং করলে কি রাজ্যের 'কর্ম সংস্কৃতি'র মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? চা-বাগানের শ্রমিকদের পক্ষ নিলে কি কনটেম্পোরারি ফ্যাশনের 'নিরপেক্ষ' ইমেজে অল্প এট্টু চুনকালি লেগে যাবে? লোকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে ছিঃ ছিঃ করবে? করলে করবে। তবুও আমি পক্ষপাতদুষ্ট। কায়মনোবাক্যেই পক্ষপাতদুষ্ট। আমি গর্বিত আমি পক্ষপাতদুষ্ট...