রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

কানহাইয়া ও কারাত ~ পুরন্দর ভাট

জেএনইউর ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার প্রকাশ কারাটকে খোঁচা মেরেছেন কারণ কারাট বলেছেন যে বিজেপি ফ্যাসিস্ট শক্তি নয় এবং বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই কংগ্রেসের মতো দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে করা যাবে না। কানহাইয়া তাতে বলেছেন যে লড়াই করার ইচ্ছে যদি না থাকে কারাট বাবু অবসর নিয়ে বিদেশে গিয়ে পড়ান। এরপর দেখছি কিছু সিপিএম কর্মী সমর্থক কানহাইয়াকে গালমন্দ করছেন। তা ভালো, ২৫ দিন জেল খেটে এসে বিজেপিকে ফ্যাসিস্ট বলা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা  কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলানোর নয়, প্রশ্নটা অনেক গভীর।

কানহাইয়া এবং সাবেকি কমিউনিস্টদের চিন্তাধারার মধ্যে একটা মূল তফাৎ আছে। কানহাইয়া যতখানি মার্ক্সবাদী ততখানিই আম্বেদকারবাদী, এটা সে বক্তৃতায়, লেখায়, বার বার বুঝিয়ে দিয়েছে। আর কানহাইয়া একা নন, উত্তর ভারতে বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত অধিকাংশ নেতা কর্মীর কাছে  সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ। কানহাইয়া তাই মনে করে যে আরএসএস বিজেপির বিরুদ্ধে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে এক বৃহত্তর ঐক্য তৈরী করতে হবে, তাতে অবামপন্থীরাও থাকবে। আরএসএস যে উচ্চবর্ণের স্বার্থসিদ্ধি করার একটা সংগঠন এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই কারণ বর্ণবাদ ব্যাতি রেখে হিন্দুত্ববাদ সম্ভব না, ওটা বাদ দিলে যা দাঁড়ায় তাকে বৌদ্ধ ধর্ম বলা যেতে পারে, চৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্ম বলা যেতে পারে, বাউল অথবা সহজিয়া অথবা চার্বাক ধর্ম বলা যেতে পারে কিন্তু সনাতনী হিন্দু ধর্ম বলা যায় না। আরএসএস হিন্দুত্ব বলতে চৈতন্য বা বাউল বা চার্বাক বোঝে না, বোঝে সনাতন ধর্ম। তাই কানহাইয়া মনে করেন যে আরএসএস এর সিঁড়দাঁড়ার গাঁটগুলো একে একে খুলে ফেলতে হলে সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলন গড়ে তোলাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র আর সেই আন্দোলনে হিন্দুত্ববাদ বিরোধী সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করা দরকার।

এর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে কারাটের মতো সাবেকি কমিউনিস্টরা মনে করেন যে আরএসএস কে হারাতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন, নব উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণীর একতা তৈরী করতে হবে এবং এই একতা ধর্ম, জাত পাতের উর্ধে উঠে গড়তে হবে। এই একতা তৈরী হলেই বড় পুঁজি আর পশ্চিমী  সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ বিজেপি-আরএসএস কে প্রতিরোধ করা সম্ভব। অর্থাৎ আরএসএস-এর হিন্দু ঐক্যর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য। তাই কারাট বলছেন যে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়া করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়া যাবে না কারণ কংগ্রেস একই অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে।

এই নিয়ে সন্দেহ নেই যে নব উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে না লড়লে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব নয় কারণ ভারতে যে ধরণের পুঁজিবাদ আজকে বিরাজমান তা বর্ণবাদী শোষণ কমানো তো দূরে থাক বরং বাড়িয়েই চলেছে। তাই নব উদারবাদী নীতি সমর্থন করে যে সব রাজনৈতিক শক্তি তাদের সঙ্গে জোট করে সামাজিক ন্যায়ের লড়াই কোনোদিন ফলপ্রসূ হবে না।  আমার মনে হয় যে কানহাইয়াও তা অস্বীকার করেন না। কিন্তু প্রশ্নটা হলো যে গুরুত্ব কোনটিকে দেওয়া হবে? সামাজিক ন্যায়ের লড়াইকে না কি নব উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে শ্রেণী আন্দোলনকে? এই প্রশ্নটা কিন্তু প্রাসঙ্গিক, এই জন্যে যে দ্বিতীয়টাকে যখনই মূল লক্ষ্য বলে স্থির করবো তখনই স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নটা আসবে যে নব উদারবাদী নীতিকে আটকে দিলেই কি বর্ণবাদী শোষণ কমে যাবে? সম্পূর্ণ নির্মূল না হলেও অন্তত কিছু মাত্রায় কি সুরাহা হবে? আমার মনে হয় এর উত্তর হলো না। তাই যদি হতো তাহলে ৫০-৬০ এর দশকে নেহরুবাদি সমাজতন্ত্রের সময় বর্ণবাদী শোষণ কম থাকতো এখনকার তুলনায়। সেটা যে নয় তা সকলেই জানে। বর্ণবাদী শোষণ শুধু বেসরকারি পুঁজিই লালন পালন করে না, সরকারি পুঁজিও তা করে। সরকারি অফিসার, পুলিশ, সেনা সবেতেই বর্ণবাদ বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং বেসরকারি পুঁজির জায়গায় সরকারি পুঁজি থাকলেও সেই অফিসার, পুলিশ, সেনারাই বর্ণবাদী শোষণকে ধারণ করতে সাহায্য করতো। তাই আম্বেদকারবাদীদের যদি গিয়ে বলি যে ভাই তোমরা সব ছেড়ে আপাতত নব উদারবাদ বিরোধী আন্দোলনকেই পাখির চোখ করো তাহলে তারা শুনবে কেন? সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলন নব উদারবাদ বিরোধী আন্দোলন ছাড়া অসম্পূর্ণ সেটা মানলেও গুরুত্ব দিতে হবে সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের ওপরেই।

ইদানিংকালে বামপন্থীদের মধ্যে  "জয় ভীম" স্লোগান জনপ্রিয় হলেও মাত্র ৩-৪ বছর আগেও সামাজিক ন্যায়ের লড়াইকে "আইডেন্টিটি পলিটিক্স" বলে খাটো করতেন তারা। প্রকাশ কারাট কয়েক বছর আগেই লিখেছিলেন "The ruling classes in India are not disturbed by the diversity of identity politics and the limited movements that they spawn. They seek to engage and give concessions to such identity politics. The obverse side of this is that identity politics disrupts the unity of the working class by preventing the broader mobilisation against the system; by diverting the attention of the people from the rampant inequalities and exploitation under the neo-liberal regime." বলাই বাহুল্য যে এইরকম মানসিকতা নিয়ে দলিত অধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হওয়া সম্ভব না। যদিও গত তিন চার বছরে সিপিএম নিজেদের কর্মসূচি এবং ভাবনাচিন্তার অনেক বদল ঘটিয়েছে।     

আম্বেদকর বলতেন যে ভারতে শ্রমিক শ্রেণী বলে কোনো শ্রেণী নেই, শ্রমিক শ্রেণী গোষ্ঠী বলে একাধিক শ্রেণী আছে। উনি বামপন্থীদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন যে "আপনারা শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র তৈরী করতে চান কিন্তু সেই একনায়কতন্ত্রে কোন শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে বেশি থাকবে? আপনারা কি নিশ্চিত যে উচ্চবর্ণের শ্রমিকরা সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিয়ে দলিত শ্রমিকদের চেপে দেবে না?" ১৯২৮-এ যখন বোম্বের কাপড় কলের শ্রমিকরা এক ব্যাপক ধর্মঘট করে কমিউনিস্ট পার্টির কিংবদন্তি নেতা ডাঙ্গের নেতৃত্বে তখন আম্বেদকর শ্রমিকদের দাবিসমূহ সব সমর্থন করেন কিন্তু তার সাথে  ডাঙ্গের কাছে আরও একটি বিশেষ দাবি করেন। বোম্বের কাপড় কলের শ্রমিকদের মধ্যে দুটো প্রধান ভাগ ছিল কাজের ভিত্তিতে। যার মধ্যে একটি কাজে সুতোতে মুখের থুতু দিতে হতো। যেহেতু সেই সুতো নিয়ে তারপর অন্য শ্রমিকদের কাজ করতে হতো তাই ওই থুথু দেওয়া কাজে কোনো দলিত শ্রমিককে নিয়োগ করা যেত না, দলিতের থুথু দেওয়া সুতো  উচ্চবর্ণের শ্রমিকরা ছোঁবে না বলে। কিন্তু সেই থুথু দেওয়ার কাজের মজুরি ছিল বেশি। তাই আম্বেদকর ডাঙ্গেকে চিঠিতে লেখেন যে বাকি সব দাবির সাথে এই বর্ণ ভিত্তিক নিয়োগের দাবি তোলাকেও রাখা হোক। ডাঙ্গে তাতে অসম্মত হন কারণ তিনি বলেন যে এতে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য ব্যাহত হবে। তাই শ্রেণী বনাম বর্ণ এই বিবাদ বামপন্থী আম্বেদকারপন্থীদের মধ্যে নতুন না, ভারতে বামপন্থার শুরু থেকে এটা চলছে। প্রকাশ কারাট আর কানহাইয়ার মধ্যে বিভেদেও এই কোনটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার তার প্রশ্ন রয়েছে।