শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

পেট্রোল ডিজেল গ্যাস এর দাম ~ সুশোভন পাত্র

কে.সি নাগের অঙ্ক তো নয় যেন গব্বর সিং'র জুলুম। অনুশীলনীর তিরিশ, একত্রিশের অঙ্কগুলো তো কষার জন্য নয় বরং অঙ্কের টিউশনে যৌবনের প্রেস্টিজ কে ছড়িয়ে ছাপ্পান্ন করার জন্যই লেখা। বাজার থেকে একটু চা-পাতা কিনতে যাবেন অর্ধেক আসাম চা-পাতার সাথে দার্জিলিং চা-পাতা, ভেজাল চা-পাতা মিশিয়ে কে.সি নাগ আপনাকে লাভ-ক্ষতির হিসেব করতে বসিয়ে দেবেন। স্নান করতে যাবেন দেখবেন কে.সি নাগ চৌবাচ্চা তে একটা বড় আর একটা ছোট ফুটো করে দিয়ে চলে গেছেন। এবার পাটীগণিতের মাথা খেয়ে স্নান করবেন না, জল ধরবেন-জল ভরবেন? দুনিয়ায় একমাত্র কে.সি নাগের বইয়েই কোনও বাঁদর তৈলাক্ত বাঁশে উঠতে চেষ্টা করে। একবার ৫ ফুট উপরে ওঠে আবার তার পরের মিনিটেই ৪ ফুট নিচে নামে। ঠিক যেন পেট্রোল-ডিজেলের দাম। পরশু ২ টাকা ২৭ পয়সা কমল। কাল আবার ৩.৩৮ বেড়ে গেলো। বাঁদরও যেমন এতদিনেও আর বাঁশের মাথায় উঠলো না, পেট্রোল-ডিজেলের দামও তেমন আজও সাধারণ, মধ্যবিত্তর নাগালে এলো না।   

২০০৫'র রঙ্গরাজন এবং ২০০৯'র কিরীট পারিখ কমিটির সুপারিশ মেনে, সরকার যখন পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম বিনিয়ন্ত্রণ করছে, তখন দুর্বার বাজার অর্থনীতির অভিমুখে দেশের অর্থনীতির আরও একধাপ উত্তরণের করতালিতে মুখরিত হয়েছিল দেশের তাবড় সংবাদমাধ্যম। পেট্রোল-ডিজেলের ভর্তুকির গলদঘর্ম ত্যাগে রাজকোষের শ্রীবৃদ্ধি এবং সমানুপাতিক হারে 'পরিকাঠামো উন্নয়নের' স্বপ্নের মায়াজাল বেঁধেছিলেন কেতাদুরস্ত অর্থনীতিবিদরা। আকাশছোঁয়া পেট্রোল-ডিজেলের দামে নাজেহাল সাধারণ মানুষ কে শান্ত করতে তখন বিশ্ব-বাজারে অপরিশোধিত তেলের অগ্নিমূল্যের কেতাবি অজুহাত। বিভিন্ন 'জিও-পলিটিক্যাল' কারণে গত ১৬ মাসে বিশ্ব-বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৭৫% কমে এখন জলের থেকেও কম। এক লিটার মাত্র ১২.৫৮ টাকা। 'তরল সোনার' এই ইন্দ্রপতনে যখন সর্বস্বান্ত হওয়ার জোগাড় ভেনিজুয়েলার মত একাধিক তেলের রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি তখন ৮০% তেল বিশ্ব-বাজার থেকে আমদানি করা ভারতের মত দেশের অর্থনীতির রমরমা। তাহলে কেন আপনি এখনও পেট্রোল-ডিজেলর অগ্নিমূল্যে  প্রতিদিন জ্বলে পুড়ে মরছেন?
বিনিয়ন্ত্রণের  নিয়ম অনুযায়ী যদি বিশ্ব-বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের উপরেই যদি পেট্রোল-ডিজেলের দাম নির্ভর করে তাহলে তো গত ১৬ মাসে পেট্রোল-ডিজেলের ক্রয়মূল্যও ৭৫% কমে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়েছে কি?

দেশে যে সমস্ত সংস্থা অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে কিম্বা বিদেশ থেকে আমদানি করে তারা 'আপস্ট্রিম সেক্টর'। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ONGC কিম্বা বেসরকারি রিলায়েন্স, HOSE, প্রিমিয়ার ওয়েলের মত 'আপস্ট্রিম সেক্টর' যে দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে অর্থনীতির পোশাকি ভাষায় বলা হয় 'প্রাইস অফ ক্রুড ওয়েল'। বর্তমানে এক লিটার পেট্রোলের ক্ষেত্রে যা ১৯.৮০ টাকা।
এবার সরকারী IOCL, HPCL এবং বেসরকারি রিলায়েন্স, এসার, শেলের মত 'ডাউনস্ট্রিম সেক্টর' এই অপরিশোধিত তেল রিফাইনিংর পর যে মূল্যে ব্যবহার যোগ্য পেট্রোলিয়াম পণ্য হিসেবে বিক্রি করে সেটা 'রিফাইনারি গেট প্রাইস'। এক লিটার পেট্রোল পিছু রিফাইনিং খরচা যদি ৩.৭৩ টাকা হয় তাহলে এই অবস্থায় 'রিফাইনারি গেট প্রাইস' ২৩.৫৩ টাকা। পরিশোধিত এই তেল  আবার বিভিন্ন পরিবহনকারী সংস্থার গাড়ি বয়ে আপনার নিকটবর্তী পেট্রোল পাম্প রিটেলারের দুয়ারে এসে পৌঁছায়। ট্রান্সপোর্টেশেন খরচা সহ  তখন তেলের এই 'প্রি-ট্যাক্স প্রাইস' মেরেকেটে ২৬.২১ টাকা। এরপরই শুরু আসল গল্প। ২৬.২১ টাকার এক লিটার পেট্রোলের উপর এবার বসে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ২১.৪৮ টাকার 'এক্সাইস ডিউটি' আর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পলিউশেন সেস ও সারচার্জ মিলিয়ে ১৩.৪৯ টাকার ভ্যাট। ব্যাস কেল্লা ফতে!  বুকে পাথর রেখে এক লিটার পেট্রোল ভরতে যেই আপনি পাম্পে দাঁড়িয়ে ইলেক্ট্রনিক্স মিটারে চোখ রাখবেন অমনি ২৬.২১ টাকার পেট্রোল আর ৩৪.৯৭ টাকার মোট ট্যাক্স মিলিয়ে, ঘ্যাঁচাৎ করে কাটা যাবে ৬৩.৪৭ টাকা। মানে,  আগে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের আকাশছোঁয়া দামের খেসারৎ দিয়ে আপনার পকেট কাটা হত। আর এখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাবার সুযোগে নিয়ে গত দু-বছরে বিজেপি সরকারের ডিজেলে ৪০০% আর পেট্রোলের ১৩৩% 'এক্সাইস ডিউটি' বৃদ্ধির বদান্যতায় আপনার পকেট কাটা হয়।
অতএব মুক্তবাজারের অর্থনীতির অঙ্কে, সরকারের লাভ হোক বা ক্ষতি, পকেট কিন্তু কাটা হবে এক্সক্লুসিভলি আপনার।  
তখন একদিকে রিলায়েন্সের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক গ্যাস চুরির অভিযোগে, অন্যদিকে কেজি অববাহিকার একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ইচ্ছাকৃত কম উৎপাদন করে গ্যাসের বাজার দর ইচ্ছাকৃত ভাবে বাড়িয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের অভিযুক্ত রিলায়েন্স একটি জনস্বার্থ মামলা সুপ্রিম কোর্টে রীতিমত কোণঠাসা। ঠিক সেই সময়ে দিল্লীর শাস্ত্রী ভবনের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস মন্ত্রকের দরজার ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে সরকারী ফাইল থেকে চুরি হয়ে গেলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। চুরি হওয়া কাগজের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ইনপুট  হিসেবে তেল-মন্ত্রকের দেওয়া দু-পাতার নোট এবং তেল-মন্ত্রকের বিদেশ নীতির খসড়া। ধৃত সাংবাদিক শান্তনু সাইকিয়া বলেছিলেন তেল-মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের এই গুপ্তচরবৃত্তি আসলে একটা '১০০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির টিপ অফ দি আইসবার্গ।'

কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই 'আইসবার্গের' আর হদিশ পায়নি সরকার। খুঁজে বের করতে পারেনি কাদের পরামর্শে এই তথ্য চুরি করার কাজ করেছিল সরকারী দপ্তরের সাধারণ ছা-পোষা ঐ কেরানী গুলো। তদন্তে উঠে আসেনি কোথায় গিয়েছিলো আর কাদেরই বা বাড়া ভাতে ছাই দিতে কাজে লেগেছিল ঐ তথ্যগুলো? ৫৬ ইঞ্চির সরকার জিজ্ঞাসাবাদ করার সাহস করেনি একজনও রিলায়েন্সের কর্মকর্তা'দের। আসলে দিনের শেষে সরকার কে তো পেট্রোল-ডিজেলে 'এক্সাইস ডিউটি' বাড়িয়ে, আমার আপনার পকেট কেটে, কর্পোরেট ট্যাক্সেই প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার ছাড় দিয়ে হয়। দিনের শেষে এই সরকার কে তো আম-আদমির নয় আম্বানি-আদানিরাই স্বার্থসিদ্ধি করতে হয়।
দিনের শেষে তো আদানিদের চার্টার্ড ফ্লাইটেই লোকসভার প্রচার সারতে হয়। দিনের শেষে তো প্রধানমন্ত্রী'কেও সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় রিলায়েন্স জিও'র বিজ্ঞাপনে দন্ত বিকশিত করে ভোডাফনের কুকুরের মার্কেট ভ্যালু কে টেক্কা দিতে হয়...