বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

বোদ্ধাদেবের নির্বুদ্ধিতা ও একটি টকটকে লাল স্টেগোসরাসের অপমৃত্যু ~ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

হাজার হাজার বছর আগে যখন পৃথিবী অন্য রকম ভূগোল নিয়ে অবস্থান করতো - ঠিক তখনকার কাহিনী এটি। সেই প্রাগৈতিহাসিক দুনিয়ায় এক উপমহাদেশ ছিল যার নাম ছিল রংবং। সেখানে দানবাকৃতি সবুজ গাছপালার মধ্যে বিচরণ করতো নানা রকম ডাইনোসর, আর তাদের বিবর্তনও সাথে সাথে ঘটে চলেছিল। এটি একটি অসাধারণ স্টেগোসরাসের গল্প যার নাম ছিল লালু। কেন মশাই, কুকুর, বেড়াল, বাঁদরের নাম থাকতে পারে, আর স্টেগোসরাসের নাম থাকতে পারে না? প্রথমে স্টেগো নাম দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু স্টেথো-স্টেথো শুনতে লাগছিল আর গা গোলাচ্ছিল বলে লালু নামটাই রাখলাম। এই নামের পেছনে আরো একটা কারণ আছে, বলছি দাঁড়ান...
এখন মনে হতেই পারে এই স্টেগোসরাস অসাধারণ কিসের? প্রথমতঃ, সে ছিল টকটকে লাল, ঠিক ধরেছেন - লালু নামটা এই জন্যেও মানানসই। দ্বিতীয়তঃ, তার স্বভাবটি ছিল খুবই পরোপকারী - সে নিজে শাকপাতা খেয়ে থাকত, আর আশেপাশের অন্যান্য জন্তুজানোয়ার যারা শাকপাতা খেত (যেমন ম্যামথ, ব্রকিওসরাস ইত্যাদি) তাদের রাতের বেলা পাহারা দিত। কেউ বলে নি লালুকে, কিন্তু লালু তাও পাহারা দিত, সবাই শান্তিতে আর নিরাপত্তায় থাকলে তার লম্বা প্লেট-লাগানো ল্যাজটা তিড়িংতিড়িং করে লাফাত, সেটা লালুর খুব ভালো লাগত। তাই সে পাহারা দিত, আর সবাইকে নিরাপদ রাখত।
তৃতীয়তঃ, তার একটা গভীর সংবেদনশীল মনও ছিল, ছোট জানোয়ার, কীটপতঙ্গদের সে খাওয়াত জল থেকে শ্যাওলা আর আরো কি সব হাবিজাবি উদ্ভিদ তুলে এনে। এই ভাবে বেশ চলছিল, প্রায় ২৫-৩০ বছর লালু রংবং-এর প্রাণী ও উদ্ভিদকুলকে সুখে শান্তিতে রেখেছিল, ফলে সবাই তাকে ভালবাসত, আর আদর করে লাল সেলাম ঠুকত।
ইতিমধ্যে রংবং-এ এসে হাজির হল একগাদা টেরোডাকটিল। তারা আকাশ থেকে এসে চোখের সামনে যাকে পেত তুলে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলত আর খাওয়ার পরে বিষাক্ত বিষ্ঠা ত্যাগ করে যেত রংবং-এর জঙ্গলে। অতিষ্ঠ হয়ে বাকিরা সবাই লালুকে বললো - "তোর তো প্রচুর গায়ের জোর, যা না গিয়ে এই আপদগুলোকে বিদেয় করে আয়।"
সব শুনে লালু চড়তে আরম্ভ করল সেই পাহাড়ের গা বেয়ে যার ওপরে টেরোডাকটিলের দল থাকত। হতভাগারা আবার নিজেদের নাম দিয়েছিল "মুক্ত বিহঙ্গ" আর পাহাড়টাকে বলতো "কং ফ্রেশ" কারণ পাহাড়ের গুহায় ফ্রেশ কিং কং পাওয়া যেত। এখন রাগে আরো লাল হয়ে গিয়ে লালু পাহাড় চড়তে লাগল। চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে লালু দেখত পেল মুক্ত বিহঙ্গদের দলপতি মোহন বিহঙ্গকে। মারামারি করবে বলে যেই না এগিয়ে গেল সাথে সাথে মোহন বিহঙ্গ ততোধিক মোহন স্বরে লালুকে বলল - "এসো, এসো বোদ্ধা, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।" অবাক লালু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল, মোহন বলে উঠল - "তোমাকে আমরা সবাই চিনি বোদ্ধা হিসেবে, তুমি আমাদেরও রাজা হতে পারো।"
অবাক লালু বলে - "কিভাবে?" মোহন বললো - "গুটিকতক শর্ত আছে, আর একটা সহজ পরীক্ষা দিতে হবে।" লালু - "তা সে শর্তগুলোই না হয় আগে শুনি।" মনমোহিনী হাসি হেসে মোহন - "এক - তোমাকে ওই নীচের জঙ্গলের হতভাগা জন্তু জানোয়ার কীট পতঙ্গগুলোকে ত্যাগ করতে হবে; দুই - ওদের আমরা যাতে সহজেই টপাটপ গিলে খেয়ে ফেলতে পারি সেই জন্যে তোমাকে সাহায্য করতে হবে, তুমি রোজ সন্ধ্যেবেলা ওদের পশুসভা, নির্বাচন বা কিছু একটা বলে নদীর ধারে ডেকে নিয়ে আসবে, বাকিটা আমরা বুঝে নেব; তিন - কেউ যদি কোন প্রশ্ন করে তাহলে তুমি বলবে - "বিপ্লব নামের এক মোহিনী সাতরঙ্গা পাখী আসবে, আর সে আমাদের খাওয়া, দাওয়া, থাকার সব দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেবে।" তারপরেও যদি কোন বেয়াদব ঝামেলা করে তাকে কান ধরে জঙ্গলের বাইরে বার করে দিয়ে আসবে। এইভাবে পাঁচ বছর চালাও, তারপরে তোমাকে একটা ছোট পরীক্ষা দিতে হবে। তারপরেই তোমার নামে এই পাহাড়কে আমরা লালপাহাড় বলে ডাকব, তুমি হবে আমাদের অবিসংবাদী দেবতা, তোমার নতুন নাম হবে বোদ্ধাদেব। রাজী আছো?"
লালুর শক্ত প্লেটলাগানো ল্যাজটা একেবারে ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা নড়ার মত দুলতে লাগল আনন্দে। লালু বুঝতে পারল ডাইনোসর কুলে তার নাম অমর হয়ে যেতে চলেছে। সে মুক্ত মোহন বিহঙ্গর কথামত চলতে লাগল, জঙ্গলের জানোয়ার শেষ হয়ে যেতে লাগল, টেরোডাকটিলদের বিষ্ঠায় গোটা রংবং দূষিত হয়ে গেল, আর লালুর সঙ্গীসাথীরা সব তাকে ছেড়ে চলে গেল অন্য জঙ্গল খুঁজতে। কিন্তু লালুর মাথার ভূত নামল না, তাকে যে বোদ্ধাদেব হতে হবে!
পাঁচটা বছর কেটে গেল, লালু কথা রাখল, লালু মোহনের ইশারায় সব কাজ করে খুশী করে দিল আর গভীর মমতায় মোহন বিহঙ্গ রংবং-কে প্রায় শ্মশানে পরিণত করে দিল। ঠিক পাঁচ বছর শেষ হওয়ার পরে লালু গেল মোহনের কাছে, বলল - "মোহন, আমি আর পারছি না, এবারে কি পরীক্ষা দিতে হবে বল, আমাকে বোদ্ধাদেব হতেই হবে।" মোহন বলল - "খুব সহজ, আমরা যে রকম এই পাহাড়ের ওপর থেকে ডানা মেলে উড়ে যাই, তোমাকেও সেটা শিখে ফেলতে হবে, তুমি অর্ধেক দেব হয়েই গেছ, এটা শিখে নিলেই বোদ্ধাদেব, আগামীকাল এসো, তোমাকে শিখিয়ে দেব।"
মনের আনন্দে দ্বিগুণ জোরে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে লালু রংবং-এ ফিরলো আর তার মাকে বলল সব কথা, মা অনেক চেষ্টা করল লালুকে বোঝানোর যে স্টেগোরা উড়তে পারে না, প্রকৃতি তাদের সে ক্ষমতা দেয় নি, কিন্তু লালু মানল না। লালুর বন্ধুদেরও মুক্ত বিহঙ্গেরা একে একে খেয়ে নিয়েছে এর মধ্যে, ফলে তাকে বোঝানোর আর কেউই নেই রংবং-এ। সকাল হতেই লালু উঠে গেল পাহাড়ের মাথায়, সেখানে মোহন অপেক্ষা করছিল তার জন্যে, যেতেই তাকে নিয়ে চলে গেল পাহাড়চূড়োর ধারে। সেখানে নিয়ে গিয়ে বলল - "কোন ব্যাপার নয়, লাফিয়ে পড়ো, গা ভাসিয়ে দাও, একটু বাদেই দেখবে তুমি উড়ছো, আর তারপরেই তুমি বোদ্ধাদেব।" লালু লাফিয়ে পড়ল, গা ভাসিয়ে দিল...
..............................................................
(এই গল্পের সাথে যারা আজকের রংবং নির্বাচন ফলাফলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন - তাদের অনুরোধ আজকের মাথামোটা লালুদের কং ফ্রেশ পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে আসুন বুঝিয়ে সুঝিয়ে, নয়তো তারাও কিন্তু ডাইনোসরদের মত প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাবে একের পর এক লাফ মেরে মেরে)