বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

(মিছিলের আগে) যে কবিতা লাল কাপড়ে লেখা হবে ~ সৌম্যজিৎ রজক

সুশীল খন্ড 

'বুদ্ধিজীবী'তে গিজগিজ করছে অডিটোরিয়াম। মঞ্চে হাত নাড়া চলছে। চলছে বক্তৃতা ও টীকাটিপ্পনী। 'বুদ্ধিজীবী'রা জানেন, শুধুমাত্র তাহাই পবিত্র যাহা ব্যক্তিগত। মানুষের ভিড় তাঁহাদের পক্ষে আন-হাইজেনিক। ব্রিগেড ক্ষতিকারক এবং হকার ভর্তি ফুটপাথ 'নোংরা'। যদিও গ্রামের হাট 'বুদ্ধিজীবী'দের কাছে রোমান্টিসিজমের উপাদান। আর গ্রামের লোক 'সাইলেন্ট সাব-অল্টার্ণ'।

ওরা এমনটা যে ভাবেন সেটাও শ্রেণি-নিয়ন্ত্রিত। যতই লাফ-ঝাঁপ করুন; শেষ অব্দি মধ্যবিত্তের স্বভাবই তো এই। ছৌ-শিল্পী খুন হলে ওঁরা চুপ থাকবেন। খেতমজুরের জমি কেড়ে নিলে চুপ থাকবেন। শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিলেও রা কাড়বেন না। তবে শ্রমিক, খেতমজুর আর প্রান্তিক শিল্পীরা এসে নগর কলকাতার রাজপথ দখল করলেই ওঁরা চিৎকার করে উঠবেন; দোহাই দেবেন ট্রাফিক-জ্যামের। এঁদের পছন্দ-

                                             "ক্ষমতার আশেপাশে চক্কর, এবং সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট"

                                                            (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ পাঁচ; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার)।

গরিব-গুরবো মেহনতি মানুষ মানেই বিপদ। তাই দূরে রাখো ওদের। 'বুদ্ধিজীবী'র নোটবই থেকে দূরে রাখো। কবিতার ব্যকরণ নিয়ে ভাবো,ভাবো ছন্দ-শিল্পরূপ নিয়ে। কবিতা থেকে দূরে রাখো মানুষকে। 'বুদ্ধিজীবী' তাই রায় দিয়েছেন বারেবারে, জীবনের জন্য নয়; শিল্প নিখাদ শিল্পেরই জন্য। দায়  নেই তার কোনও আর। জীবনের কাছে, ভবিষ্যের কাছে।

 

হার্মাদ খন্ড 

অডিটোরিয়ামে ঢুকে পড়ল একটি ছেলে; ব্যাগে যার লালঝান্ডা, গায়ে মিছিল ফেরত ঘাম আর প্রত্যয়। সাথে সাথে ধিক্কার জানাল কলাকৈবল্যবাদীরা। রে রে করে উঠল।

 

আর যদি দেখা যায়, মিছিলেরই কথা লিখে ফেলেছে সে! তখন? তার কবিতা ছাপতে অস্বীকার করবেন মহান গণতান্ত্রিক প্রকাশক। 'কবি' – এই বিশেষণ তাহলে তার জন্য নয়। ছেলেটির জন্য বরাদ্দ থাকবে 'হার্মাদ' আর 'ক্যাডার' শব্দ দুটো। আমাদের এই কমরেডও, নিশ্চয়, এরকমই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন। তাই তো, প্রথম কবিতার বইতেই, তিনি লিখেছেন ...

"... মারুন, কাটুন আর কুচিকুচি করুন আমাকে, আমি এভাবেই শুরু করব লেখা। কবিতার ভার নিয়ে আমার সত্যি কোনও মাথাব্যথা নেই শ্বৈলেশ্বরদা, ওগুলা ছাড়ান দেন, মিডিলকেলাস আজো বাকি আছে চেনা?...

পারেন তো ক্ষ্যামা দিন। নাইবা বলুন 'কবি'।... যতক্ষণ তবু এই সি পি এম পার্টি রয়ে যাবে, কলম ঘষটানো আর যে কোনও কবিতা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করা নিছকই অলীক। আমরা ক্যাডার, এটা জানেন নিশ্চয়।"

                                                                                                                   (উন্মোচিত চিঠি ; ভ্রমণকাহিনী)।

প্রসঙ্গত মনে রাখা জরুরি, বাজারের কাগজগুলো 'ক্যাডার' শব্দটি যেভাবেই ব্যবহার করুক; শব্দটার আসল মানেটি যারা জানেন তাদের কাছে কম্যুনিস্ট পার্টির ক্যাডার হওয়াটা গর্বের। আর কিছু নয়।

 

যাইহোক, 'বুদ্ধিজীবী' কোনও শ্রেণি নয় কখনই। প্রতিটি শ্রেণিরই কিছু বুদ্ধিজীবী থাকে। যেমন থাকে প্রতিটি শ্রেণির নিজস্ব পার্টি আর যোদ্ধা। আমাগো বাংলায় শ্রমিক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর সংখ্যাটা কোনও কালেই কম নয়; যারা এই শ্রেণির কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন। আপোষহীনভাবেই। তবে এত রাগ, এত জোর, এত অভিমান জয়দেব বসুকে আলাদা করেই চেনায়। 'প্রতিহিংসা'র বৈধতা নিয়ে এত তীব্র সওয়াল এঁকেই মানায়। শ্রেণির প্রতি, শ্রেণির শক্তি – কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি, পার্টি-শৃঙ্খলার প্রতি গর্ববোধ ও ভালোবাসা বারেবারে ছলকে উঠেছে শব্দে, এঁর কবিতায়। নিজেকে 'ক্যাডার' বলে প্রকৃতই স্পর্ধিত হতেন তিনি। নাম আর পদবির মাঝে 'হার্মাদ' শব্দটা পুরে নিতে মজা পেতেন। আর ছিল হিম্মত; যার কিছুই নেই হারাবার তার যেরকমটা থাকে। নাহলে কবিতা লিখতে আসা কোনও তরুণ, এ বাংলাতেও, প্রথম কবিতা-বই উৎসর্গ করে 'ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)'কে? তখনও কবি-সমালোচক-পাঠক মহলে নেই কোনও 'স্বীকৃতি' (পরে যেটা পেয়েছেন)! আপনি তো জানতেন, বাংলা কবিতার জগতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক বাচন মানে কী এবং সেটাই শেষ কথা! প্রথম বইয়ের 'উৎসর্গ পৃষ্ঠা'টাই যথেষ্ঠ কারণ হতে পারত আঁতুড় ঘরে আপনায় খতম করে দেওয়ার জন্য। তবু কী দুঃসাহস কমরেড!

 

শুনেছি, এস এফ আই-এর রাত জেগে অবস্থান ছিল সেদিন। সে রাতেই দুজন কমরেড দেখে ফেলেছিল ব্যাগের ভেতর একটা খাতা। খাতা খোলা হয়। পাওয়া যায় টাটকা নতুন কিছু কবিতা, যা এতদিন লুকিয়ে রাখতেন জয়দেব বসু। কাউকে জানাতেন না। খবর গেল রটে। কবিতাগুলোও, বোধহয়, মুখে মুখে গেল ছড়িয়ে! ব্যাস! আর কখনো সঙ্কোচ করেন নি। লজ্জা পান নি, কবিতা লেখেন বলে। ভয় পান নি, কবিতায় 'সমাজতন্ত্র' আর 'মিছিল' শব্দদুটো লিখে।

 

কবিতা লিখেছেন কমরেডদের সাথে 'রাতপাহারা'র অভিজ্ঞতা নিয়ে। লিখেছেন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চেহারার অ্যানাটমি-

"ওরা ডিজনিল্যান্ডে যায়

আরও নানাবিধ করে বায়না

ওরা পশুদের ভালবাসে

তবে, কালো লোকেদের চায়না

             ...

ওরা ভোট দেয় দুটি দলকে

ভোট নিয়মিত দিয়ে যায়

যারা সৌদিতে সেনা রাখে

রাখে দিয়েগো-গার্সিয়ায়

             ...

ওরা চাকরি রাখার চিন্তায়

কী করবে ভেবে পায়না

ওরা গণতন্ত্রও মানে

তবে, অন্যের দেশে চায়না"

                                                                                      (আপনি কি আদর্শ মার্কিন নাগরিক হতে চান? ; আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ)।

প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। তবে সেসব কবিতা, ভুলেও, আরচিসের কার্ডে কোট করা হবে না কখনো –

" ... আমার তো মনে হয় কৃষক আন্দোলনে মেয়েটিরও সমর্থন আছে। তোমাকে বলেছে কিছু এ বিষয়ে? রোহিতাশ্ব, অকারণ তোমার এই পুচ্ছ নাচানো দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়। সিরিয়াস হও ভাই। তুমি কি চালাবে কথা? বোলো, আমি কুঁড়ে তবু এখনো বাতিল নই। তেমন সময় এলে আশা করা যায় আমাকেও পুলিশ ধরবে। ভালো মেয়েদের তবু বিশ্বাস করতে নেই খুব। কম্বল ধোলাই খেয়ে আমি যদি কোনোদিন মুখ খুলে ফেলি, তখন আমায় ঘৃণা করবে তো? পারবে তো সে মেয়েটি, বিচ্ছেদ চাইবে তো? জেনে নিও রোহিতাশ্ব। সেই বুঝে বাড়িতে জানাব। "

                                                                                                                                                 (পূর্বরাগ ; ভ্রমণকাহিনী)।

অথবা, সেই লাইনটা যা মিছিলে স্লোগান দিতে দিতে এস এম এস করেছিল আমাদের আরেক কমরেড ...

                                                           " গঞ্জের নাম শ্রেণিসংগ্রাম, মেয়েটির নাম কু। "

                                                                                                                ( কু, ভ্রমণকাহিনী)।

কবিতা সম্বন্ধে প্রিতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকেও তছনছ করে করে গেছেন জয়দেব। কবিতার লাইন সাজানোর চিরাচরিত নিয়ম মানেন নি বহু-বহুবার। ইস্তেহার লেখার মতোই টানা গদ্যে (run on) কবিতা লিখেছেন অজস্র। জয়দেব বসুর এইরকমের কবিতাগুলো বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক-একটা মাইলফলক এবং বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র, নতুন যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি, তা আমাদের কবিতাকে কতটা অক্সিজেন দিয়েছে - সেকথা 'বিশুদ্ধ কবিতা' বা 'পবিত্র শিল্প'-এর মন্ত্র আওড়ানো বুদ্ধিজীবীরাও জানেন, নিশ্চয়। তাই কবি জয়দেব হার্মাদ বসুকে ওঁরাও অস্বীকার করতে পারেন  নি। পারেন নি বাতিল করে দিতে। উল্টে মেনে নিতে হয়েছে তাঁর শক্তি। শিল্পের জোরেই শিল্পের পরীক্ষাতেও তিনি জিতে গেছেন। উৎপল দত্ত, সলীল চৌধূরীর মতো।

 

মার্কসবাদীরা জানেন 'শিল্প'-এর সঙ্গে 'রাজনীতি'র বিরোধ নেই কোনও। বরং শিল্পের দাবি পূরণ না করলে, যতই বিপ্লবের কথা থাক, কবিতা-গান-ছবি সবই জায়গা পায় ডাস্টবিনে। এবং উল্টোটাও সত্যি। প্রতিক্রিয়ার প্রোপাগান্ডায় শিল্পসৌন্দর্য যতই সুচারু হোক, ইতিহাস তাকে বাতিল করবেই। জয়দেব বসু, তাই, লিখে যান "জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার''।

"এবার অন্যভাবে কবিতা বানানো যাক – এসো, লেখাপড়া করো,

কবিতা লেখার আগে দু'বছর পোস্টার সেঁটে নেওয়া ভালো,

কায়িক শ্রমের ফলে বিষয় মজবুত হয়- এবং, সমান ভালো

রান্না শেখা, জল তোলা, মানুষের কাছাকাছি থাকা।

পার্টি করার থেকে বিশল্যকরণী আর কিছু নেই কবির জীবনে, আমি

অভিজ্ঞতা থেকে এই পরামর্শ দিয়ে যেতে পারি।"   

                                                                                      (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ এক; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার'')।

সাহিত্য মধ্যবিত্তদের জন্য নয়। কবিতা লেখা আয়েসের নয়, পরিশ্রমের কাজ। হ্যাঁ, কবিতা লেখা আসলে 'কাজ'। চাষ করার মতোই, বাড়ি বানানোর মতোই। অর্থাৎ, মানিক ব্যানার্জি যেমন বলতেন নিজেকে – 'কলম-পেষা মজুর'। তেমনই জয়দেব বসু।

 

আপোষহীনতাই মজুরের সহজাত মনোভাব। শ্রমিক-কবিরও। গণতন্ত্রের কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আপোষ নেই। নীতির প্রশ্নে মধ্যবর্তী কোনও রাস্তা নেই।

 

যাদের বিশ্বাস নেই তাঁরা পড়ে দেখুক।

আমরাও এই আগুন ঝলসানো সময়ে,আসুন, পড়ে ফেলি আরেকবার। জয়দেব বসুর কবিতা। পোস্টারে লেখার মতো নতুন কোনও লাইন, হয়ত, খুঁজে পেয়ে যাব।