বুধবার, ১১ মে, ২০১৬

আমার পাওয়া প্রথম প্রপোজাল ~ শ্রুতি গোস্বামী

আজকাল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেম দিবস থেকে শুরু করে ব্রেক আপ দিবস সবই পালন হচ্ছে, ফেসবুক এর দৌলতে কে কার প্রেমিকা কে কি কিনে দিল, কি খাওয়াল, কোথায় শোওয়ালো, কবার ভালবাসি বললো, সব ই জানা যাচ্ছে। যাকে বলে, প্রাইভেট বলে আর কিসসু রইল না। সবাই চায়, লোকে তার ব্যপার নিয়ে, সে পার্সোনাল হোক, কি পাব্লিক, ইন্টারেস্ট দেখাক। কি করলাম, সেটা আসল না। ছবি তুলে দেখালাম কিনা, সেটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা এই প্রেম আর বিচ্ছেদ এর মধ্যে আছে প্রপোজাল ডে। আমরা চিরকাল যেটা জানতাম, প্রপোজ মানে বিয়ের প্রস্তাব, সেটা এখন পালটে দাঁড়িয়েছে প্রেমের প্রস্তাব। তাই সই। আজকাল বিয়ে হবে কিনা সেই নিয়েই কেও আর শিয়র নয়। তা এমন ই এক প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে আজকের লেখা।

তখন ক্লাস ফাইভ। সকালে কোনো রকমে স্কুল করে ফিরে খেয়ে দুপুর কাটতে না কাটতেই বাইরে খেলতে বেরিয়ে যেতাম। আমার সাথে প্রায়ই সবসময় থাকতো মণি, একই ক্লাস এ আমরা। বাকিরা সবাই পড়াশোনা করতো বলে দেরী তে বেরতো। আমাদের সেসবের বালাই নেই। দুপুর টা গল্পের বই পড়ে কাটিয়ে বিকেলে খেলা। সে কাট ফাটা রোদই হোক কি বৃষ্টি। আমরা জনা আটেক মেয়েরা খেলতাম। এক ই স্কুল, সামনের পেছনের পাড়া, বয়েস ও ওই এক দুবছরের এদিক ওদিক। আমাদের ওখানে দুজন ছেলে ছিল, দুজনের ই ডাক নাম রাণা। তা আমাদের বয়েসী যে ছিল তাকে আমরা ছোট রাণা আর আমাদের চেয়ে বয়েসে এক বছরের বড় যে ছিল,তাকে আমরা ডাকতাম বড় রাণা বলে। ছোট রাণা প্রায়ই আমাদের সাথে খেলতো, একা ছেলে। বড় রাণা বিকেলে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াত রাস্তায়, মাঝে মাঝে ছোট রাণা কে আওয়াজ দিত, আমাদের সাথে খেলছে বলে। ওর তাতে বয়েই যেত। তা সে দিনকে তখনো বাকিরা বেরয়নি, আমি আর মণি রাস্তায় হাঁটছিলাম,গল্প করছিলাম। দেখলাম বড় রাণা বেশ কয়েকবার সাইকেল নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করলো। কিছুক্ষণ পরে আমরা রাস্তায় হাঁটা বন্ধ করে আমাদের বাড়ির সামনে ছোট ফাঁকা জায়গা তে এসে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছি। জায়গাটার পাশেই একটা সরু পিচ রাস্তা,তারপরে ড্রেন আর তারপরে বিশাল খেলার মাঠ। বিকেলে মাঠে কাছের এক ক্লাবের ছেলেগুলো ফুটবল খেলত। বহুবার বল এসে আমাদের গায়ে লেগেছে, আমরাও খেলছিলাম, রেগে মেগে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি বল দূরের মেইন রাস্তায়। যাইহোক, বড় রাণা মেইন রাস্তা ছেড়ে এবারে বাড়ির সামনে পিচ রাস্তায় সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকলো:" এই বান্টি শোন।" আমি আর মণি দুজনেই ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যপার।
" আমার তোর সাথে দরকারী কথা আছে। একটু এদিকে আয়।"
দুজনেই এগতে বলে: " মণি র আসার দরকার নেই। ওকে একটু যেতে বল।"
শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল। মণিও ঝাঁঝিয়ে উঠলো:" কেন রে? ও আমার বন্ধু। তোর যা বলার আমাদের দুজনের সামনেই বলতে হবে। কি এমন বলবি যে আমি থাকতে পারবোনা?"
আমিও ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। কি দরকার? তবে কি ও আমাদের সাথে খেলতে চায়, সেটা বলার জন্য ডাকছে? নাকি আমরা খেলার সময়ে ওকে মেইন রোড এ সাইকেল চালাতে বলি সেই নিয়ে? খেলার জায়গায় বহুবার ওর সাইকেল এ আমরা ধাক্কা খেয়েছি। সেই নিয়ে বেশ কয়েকবার রাগারাগি হয়েছে। তবে কি সেটা নিয়ে বলবে?
উপায় না দেখে রাণা বললো: " তোকে বলার ছিল যে তোকে আমি পছন্দ করি।"
আমি হাঁ করে চেয়ে রইলাম। বাপের জন্মে এরকম কথা শুনিনি। পছন্দ করে মানে? আমার সাইকেল টা চালাতে চায়? মনে পড়লো কিছুদিন আগে আমার নতুন বি এস এ এস এল আর দেখে রাণা বলেছিল সাইকেল টা ভাল।বলেছিলাম রেসিং সাইকেল, রেস করবি নাকি? মুখ ভেটকে বলেছিল আমি মেয়েদের সাথে রেস করিনা। জ্বলে গিয়েছিল, বলেছিলাম ছেলেদের সাথে তো পারবিনা,আমার সাথে চেষ্টা করে দেখ,আস্তে চালাবো। তাতে বেশ চটে গেছিল। তাহলে কি সাইকেলের লোভে এসব বলছে? নাকি পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু বলতে চাইছে? কিন্তু ও আমার চেয়ে এক ক্লাস সিনিয়ার। স্কুল ও আলাদা। নাহ। সেটা কারণ নয়।এরকম বলার মানে কি? মাথায় কিছুই ঢুকছেনা।

মণি বুঝে গেছিল। ও হেসে মুখ বেঁকিয়ে বলে " হুঁহ পছন্দ করিস! আয়নায় নিজের মুখ টা দেখেছিস? সাইকেল চালাচ্ছিস তাই চালা। পাকামো মারিস না। প্রেম করার শখ হয়েছে! স্কুল এ কি এই সব শিখছিস নাকি! "

রাণা রেগে গেলে একটু তোতলাতো। বললো" তো তো তোকে বলেছি নয় দূ দূ দূরে যা নাহলে চুপ থাক। তুই কে?"

আমার মাথায় তখন ঢুকলো! আচ্ছা এই ব্যপার! চড়াৎ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল। আমাকে পছন্দ করে? আমি কি সাইকেল না বই না জিনিস যে আমাকে পছন্দ করছে? সাহস তো কম না? আমাকে পছন্দ করার কারণ কি? আমাদের সাথে খেলে না বন্ধুত্ব নেই কিছুনা, মুখ উঠিয়ে বলতে চলে এল! এত সাহস!
" তোর যা বলার বলে ফেলেছিস? এবারে যা। চল মণি।"
এগতে যাব, রাণা সাইকেল নিয়ে আমার রাস্তা আটকে দাঁড়ালো।
" তোর উত্তর টা পেলাম না। তুই আমাকে পছন্দ করিস না করিসনা?"
মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। এত বড় আসস্পদ্দা! আবার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে! মুখ বেঁকিয়ে বললাম" তোকে পছন্দ করার মতন আছে টা কি? যা তো। বেকার সময় নষ্ট করাচ্ছিস।"
আবার এগতে যাব, আবার সাইকেল নিয়ে রাস্তা আটকালো।
" ভাল হচ্ছেনা রাণা। রাস্তা ছাড়বি? "
" না ছাড়লে কি করবি?"
" দেখবি কি করবো?"
" হ্যাঁ দেখা!"
ওমনি আমি রাণার সাইকেল টা দু হাতে চেপে ধরে ওকে সমেত ঠেলতে ঠেলতে রাস্তার পাশে মাঠের আগে ড্রেন টাতে নিয়ে গিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম। ও বসে ছিল। টাল খেয়ে আদ্ধেক ড্রেন এ আদ্ধেক টা সাইকেল সমেত মাটিতে ঠেকে।
পেছনে মণির অট্টহাস্য।
হাত ঝেড়ে বললাম:" আর ফের যদি রাস্তা আটকাতে আসিস, এর পরে সাইকেল ভেঙে তোর মার কাছে দিয়ে আসবো। আর খবরদার আমাকে পছন্দ করতে আসবিনা।

রাণা তখনো ওই ভাবেই আদ্ধেক ড্রেন এ সাইকেল নিয়ে, হকচকিয়ে গেছে। কি করবে কি বলবে বুঝতে পারছেনা।
মণি শেষে যাওয়ার আগে বলে গেল: " নে এবার ড্রেন এ শুয়ে শুয়ে পছন্দ কর মেয়ে।"

তখন বুঝিনি, ওটা প্রোপোজাল ছিল। ওই বয়েসে এর চেয়ে বেশি ম্যাচিউরিটি ছিলনা। কি আর করা যাবে! তবে থাকলেও ছেলেটির কপালে যে দুর্ভোগ থাকতই, সে নিয়ে আজ ও সন্দেহ নেই।