শনিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৬

ক্ষমা? ~ সুশোভন পাত্র

নিভিয়া'র বডিলোশেন নিয়মিত মাখলে নাকি আপনার স্ত্রী'র ত্বক এমন একটা বিশেষ মাত্রায় 'সফট' হবে যে ঘর ছেড়ে আপনার আর অফিস যাওয়াই দায়। ডাভ সাবানের যত্নশীল ব্যবহারে আপনার গালে আবার ফিরে আসতে পারে শৈশবের নরমতা। জনসন অ্যান্ড জনসনের ম্যাসাজ ওয়েলের দ্বি-প্রাহরিক মর্দনে আপনার শিশু পুত্রের পশ্চাদদেশের নমনীয়তা টেক্কা দেবে কাপার্সের কোমলত্ব কে। লোরিয়েলের লাস্যময়ী শ্যাম্পু আপনার মাথার চুল কে করবে গোড়া থেকে শক্ত এবং বাইরে থেকে নরম। আজকাল তো, ক্লোস আপের দয়ায় ৩২ পাটি দাঁত, সিন্ডিকেটের ক্যারিশমায় উড়ালপুলের স্ল্যাব, আর ভোটের বালাইয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সুরও নরম হচ্ছে। কিছুদিন আগেও যিনি সবাইকে "ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মেপে" নিচ্ছিলেন, "কত ধানে, কত চাল" কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিচ্ছিলেন, পুলিশ কে "চাবকে লাল" করে দিচ্ছিলেন, নিজেকে "রাফ এন্ড টাফ" দাবি করছিলেন, নিজের মার্কশিটে নিজেই ১০০/১০০ বসিয়ে ফেলছিলেন আর গলার শিরা ফুলিয়ে "আমাকে ধমকালে আমি চমকাই, আমাকে বর্ষালে আমি গরজাই", "তুমি বুনো ওল হলে আমি বাঘা তেঁতুল" -- ডায়লগে বাজার গরম করছিলেন, তিনি কিনা শেষে  করজোড়ে ক্ষমা চাইছেন? ভুল স্বীকার করে মানুষের করুণা আর সহানুভূতি ভিক্ষা করছেন?
তা কে আপনাকে ক্ষমা করবে ম্যাডাম? গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ খেয়ে মধ্যমকুমারির জঙ্গলে পড়ে থাকা সালকু সরেনের লাশটা? না মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, সালকুর মৃতদেহ সৎকার করতে  সাহস না করা গ্রামবাসীরা? কার সহানুভূতি আপনি চাইছেন? ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা? না, অজিত লোহার, পূর্ণিমা ঘড়ুই, জিতেন নন্দী, প্রদীপ তা, কমল গায়েন, সুদীপ্ত-সৈউফুদ্দিন হয়ে স্বপন মালিকের ১৭৫'র লম্বা তালিকাটা? কে আশীর্বাদ করবে আপনাকে দিদিমণি? সিঙ্গুরের  অনিচ্ছুক কৃষকরা? শালবনী আর নন্দীগ্রামের জমিদাতারা? ৬৮ লক্ষের গল্প শোনা টেট আর এসএসসি'র জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা বেকাররা? ৫০% বকেয়া ডিএ'র ভুক্তভোগী সরকারী কর্মচারীরা? ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরা? অনাহারে মরা চা-বাগানের শ্রমিকরা? এ রাজ্যের মানুষ আর আপনাকে আশীর্বাদ করে না ম্যাডাম।  বরং গত চার বছরের আপনার স্বেচ্ছাচারিতা কে আর দশ হাজার ক্লাব কে ৩৮৪ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে পোষা, আপনার তা-বেদরা-তোলাব-লুম্পেনদের-গুণ্ডা-চোর'দের ঘেন্না করে, ধিক্কার দেয়, জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়।
ঐ যেদিন আপনার হেলিকপ্টারটা গাঁয়ের মাঝ বরাবর, মাথার উপর দিয়ে পতপত করে উড়ে গেল, সেদিনই সন্ধ্যে বেলায় বসেছিলাম পার্টি অফিসে। সদ্য বন্ধ হয়েছে শিলাবৃষ্টি। চারিদিক অন্ধকার।পার্টি অফিসে যিনি এসে ঢুকলেন, বয়োজ্যেষ্ঠ'দের সম্বোধনে জানলাম তিনি সবার 'দীনু দা'। অবশ্য বার্ধক্যের ছাপে, মলিন পাঞ্জাবির অবয়বে, হাঁটু অবধি ভাঁজ করা কোমরের ধুতির বাঁধনে, পুরু কাঁচের চশমার চাউনিতে, আর হাতে ধরা শেষ সম্বলের লাঠির ভারে, তিনি বোধহয় 'দিনু জ্যাঠু' হিসেবেই  বেশি মানানসই।চারিদিকের ভ্রু-কুঞ্চিত ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলাম তিনি কনটেম্পোরারি অ্যান্ড্রয়েড কমরেড'দের কাছে বেশ অপরিচিতই। ঘরে ঢুকেই একঘর ভর্তি লোকের সামনে 'দিনু দা' তাঁর গভীর উদ্বেগ নিঃসংকোচে উগরে দিলেন
-মেশিনে না হয় আমি ভোটটা কেস্তায় দিলম, কিন্তু বুঝব কি করে যে আমার ভোটটা কেস্তাতেই পড়ল? অন্য কুথাও চলে যায় যদি?
ভালবাসার আশংকা থেকে নিঃসৃত এই অনর্থক উদ্বেগ কে বাকি সবাই মিলে প্রশমিত করেই তাঁকে একটা মডেল ব্যালটে ভোট দিতে বলা হয়। বোধহয় তাঁর দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার কথা ভেবেই  এই  অমূলক পরীক্ষা। একঘর লোকের সামনে প্রথম চেষ্টাতেই 'কাস্তেটা' চিনে ফেলে, গর্বের হাসি হেসে, পুরু চশমার ভেতর দিয়ে সবার দিকে ঘুরে, ঘুরে তাকিয়ে 'দিনু দা' বললেন
-৫২ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি ব। আর কেস্তা চিনতে লারবো? ইবার তো চিনতেই হবেক। গাঁয়ে হেলিকপ্টারও উড়বেক আর আমাদের ধান গুলাও পচে মরবেক, এইটা তো চলবেক নাই।
আশ্বস্ত 'দিনু দা'র নিশ্চিন্ত প্রস্থানের পরে শুনলাম, আগে নাকি তিনি নিয়মিতই এখানে আসতেন।বসতেন। কাজও করতেন।ভবঘুরে মানুষ। হঠাৎ কি যে হল, আসা বন্ধ করে দিলেন। গত ৮-৯ বছর আর এ পথ মাড়াননি একবারও। আজ এলেন। আবার এলেন। নিজেই এলেন। কে জানে কেন এলেন... 
ম্যাডাম, আপনার তো অপরিসীম ক্ষমতা। এতো শত মন্ত্রী-সন্ত্রী,আমলা,পুলিশ পাইক, বরকন্দাজ, পেয়াদা। আর সামান্য 'দিনু দা'রা কিনা আপনাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করছে? চিড় ধরিয়ে দিল আপনার অহংকারে? হিমালয়সম আত্মবিশ্বাসে? আচ্ছা, আপনি কি ভয় পেয়েছেন ম্যাডাম? তা বেশ করেছেন। ভয় আপনার পাওয়াই উচিত, 'দিনু দা'রা ফিরে আসছে যে, প্রতিদিন ফিরে আসছে, নিজের ঘরে ফিরে আসছে, জোটে বেঁধেই ফিরে আসছে, আপনাকে হারাতেই ফিরে আসছে...