বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

দূর্গা পুজো ~ পূরন্দর ভাট

মাননীয়া মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি কাল পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে ওঠা নানান অভিযোগকে নস্যাৎ করতে। ভাষণে অনেক অসত্য কথাই তিনি বলেছেন এবং নাটুকেপনার মধ্যে দিয়ে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেইসব বাদ দিয়েও ওনার ভাষণের একটা অত্যন্ত সমস্যাজনক দিক রয়েছে। স্মৃতি ইরানি জেএনইউর ছাত্র ছাত্রীদের অপরাধমূলক কাজকর্মের তালিকা দেওয়ার সময় দূর্গা পুজোতে বিলি হওয়া একটি রাজনৈতিক প্যামফ্লেটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে সেই প্যামফ্লেট দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধকে আর্য্যদের হাতে অনার্য্যদের দমন করবার প্রতিকী রূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছিলো। তাতে মহিষাসুরকে মহান এবং দেবী দুর্গাকে এক ছলনাময়ী নারী বলা হয়েছে যে ছল চাতুরীর ব্যবহার করে মহিষাসুরকে বধ করেছে। স্মৃতি ইরানি বলেছেন যে এরকম প্যামফ্লেট লেখা বাকস্বাধীনতার চূড়ান্ত অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক কাজের মধ্যেই এগুলো পড়ে। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি-দের চ্যালেঞ্জ করেছেন সংসদে দাঁড়িয়ে যে তারা এইরকম প্যামফ্লেট কলকাতার রাস্তায় বরদাস্ত করতেন কিনা। (লিংক: http://goo.gl/RYOmGx)

যে প্যামফ্লেট নিয়ে এতো আলোচনা সেই প্যামফ্লেটটি আসলে সাঁওতালদের "হুদুর দূর্গা" উত্সব নিয়ে ছিলো। সাঁওতালদের কিছু উপজাতি বহু বহু যুগ ধরে "হুদুর দূর্গা" উত্সব পালন করে আসেন যে উত্সবে তাঁরা সাঁওতাল রাজা মহিষাসুরকে স্মরণ করে। তাদের মধ্যে যে কিংবদন্তি প্রচলিত তা হলো মহিষাসুর ছিলেন এক সাঁওতাল রাজা যাকে দূর্গা নামের এক বেশ্যা ছলে বলে ভুলিয়ে বিষ খাইয়ে খুন করে। তাঁরা ওই জন্যে দূর্গা পুজোতে আনন্দ না করে শোকের দিবস হিসেবে পালন করেন। এই নিয়ে এখন কিছু ইতিহাসবিদ গবেষণা শুরু করেছেন এবং ইংরেজি মাধ্যমের সংবাদপত্রতেও এই উত্সবের কথা প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। (লিংক: http://goo.gl/rhkdcN)

স্মৃতি ইরানি হয়তো "হুদুর দূর্গা" উত্সব সম্পর্কে জানেন না। নাই জানতে পারেন, কলকাতার উচ্চবর্ণ বাঙালিরাও জানে না। কিন্তু পার্লামেন্টে এই উত্সবকে "অপরাধ" বলে দাগিয়ে দেওয়ার আগে কি একবার খোঁজ নেওয়া উচিত ছিলো না? না কি খোঁজ নিয়েও এই কথা বলেছেন? আসলে এতে সংঘ পরিবারের মানসিকতাই প্রকাশ পায়। তারা যাকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে আখ্যা দেয় তাতে প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতির কোনো জায়গা নেই, তাদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবার কোনো অবকাশ নেই। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোরের মতো শহরের উচ্চবর্ণকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকেই তারা ভারতীয় সংস্কৃতি বলে মনে করে, সেখানে বহুত্ববাদ নেই। জেএনইউতে বেশ ধুম ধাম করেই কালী পুজো, সরস্বতী পুজো বা দূর্গা পুজো উদযাপিত হয় প্রতি বছর, যাতে হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী, কর্মচারী এবং অধ্যাপকরা অংশগ্রহন করেন। তার মধ্যে যদি কোথাও প্রান্তিক মানুষের আওয়াজ উঠে আসে তাকে "অপরাধ" এবং "বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার" বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে? এমনিতেই তো ভারতের অর্থনৈতিক প্রগতি অথবা উচ্চশিক্ষা থেকে আদিবাসী এবং দলিতদের ব্রাত্যই করে রাখা হয়েছে। "শাইনিং ইন্ডিয়া"-র ঝলমলে আলোর চারপাশে যে ঘোর অন্ধকার তার মধ্যে যারা রয়েছেন তাদেরকে আমরা আলোর ঝলকানির চোটে দেখতেই পাই না অধিকাংশ সময়। সেই অন্ধকার থেকে যদি কোনো এক টুকরো আওয়াজ, ফাঁক গলে দেশের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে তাকে "অপরাধ" বলে দেবেন সংসদে দাঁড়িয়ে? এই হলো সংঘ পরিবার কল্পিত ভারতবর্ষ। যে ভারতবর্ষ নির্মাণে সাঁওতালরা প্রাণপাত করেছেন বিদ্রোহ করে সেই ভারতবর্ষে তাদের সংস্কৃতিটুকুরও জায়গা নেই। বীরসা মুন্ডা যখন শহীদ হচ্ছিলেন তখন স্মৃতি ইরানির পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মন্ত্রী হতে আর মুচলেকা লিখতে ব্যস্ত ছিলো। আজকে তারাই পার্লামেন্টের মধ্যে দাঁড়িয়ে কত সহজে বলে দিচ্ছেন যে হুদুর দূর্গা উত্সবের কথা বলাও অপরাধ।

আপনাকে ধন্যবাদ স্মৃতি দেবী, একটা গোটা উপজাতির সংস্কৃতিকে সংসদে দাঁড়িয়ে অপমান করে "মনুস্মৃতি" ইরানি নামের সার্থকতা প্রমাণ করলেন।