শুক্রবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

মনে পড়ে? ~ সুশোভন পাত্র

ডিয়ার ম্যাডাম, অজিত লোহার কে মনে পড়ে? পড়ন্ত বিকেলে, লোডশেডিং'র অন্ধকারে, অজ গাঁয়ের হাসপাতালে যখন আনা হয়েছিল নিথর দেহটা, তখনও অবশ্য আপনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথই গ্রহণ করেননি। বিজয়োল্লাসে আপনার দুষ্টু, দামাল ভাইরা স্রেফ পিটিয়ে খুন করলো অজিত লোহার কে। আপনার মনে আছে বর্ধমানের পূর্ণিমা ঘড়ুই কে? কিম্বা গড়বেতার জিতেন নন্দী কে? 

জানেন ম্যাডাম, মধ্যমকুমারির জঙ্গলে সালকু সরেনের মরদেহটা যখন পাওয়া গেলো তখন তাঁর গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ। সবার চোখের সামনে লাশটার শরীরের চামড়া পচে গলে যাচ্ছে, পোকাতে কুরে কুরে খাচ্ছে সারা দেহ, চোখ গুলো ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসছে, চারিদিকে দুর্গন্ধ। অথচ মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, মৃতদেহ সৎকারে সাহস করছে না ধরমপুর গ্রামের কেউ! আপনার মনে পড়ে ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের কথা? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা। ২০০১-১১ দশ বছরেই জঙ্গলমহলে ২৩ ব্লকে মাওবাদীদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন ২৭৫ জন। আর আপনি বলেছিলেন "মাউ-ফাউ কিছুই নেই"। গত পাঁচ বছরে অজিত লোহারদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৫। সর্বশেষ সংযোজন উচিতপুর গ্রামের শীর্ণকায়,এই স্বপন মালিক। আপনার কাছে দু-মুঠো চাল-ডাল চাইতে গিয়ে গুলি-বোমা আর রক্তে মাখা হয়ে মরলো যে। 

আজ লাল পতাকায় মোড়া স্বপন মালিকের নিশ্চল দেহটা যখন বর্ধমান মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে শেষ বারের মত বেরোল আপনি তখন নেতাজী ইন্ডোরে দলের কেষ্ট বিষ্টু-দের সাথে আপকামিং 'অল ইম্পরট্যান্ট ইলেকশনের' রণকৌশল তৈরিতে ব্যস্ত। আপনি এখন মুখ্যমন্ত্রী, সর্বময়ী নেত্রী। আপনি ব্যানার, আপনিই পোস্টার। আপনি বিজ্ঞাপন, আপনিই সরকার। আপনিই মালিক। আপনি রাখলে রাখবেন। মারলে মারবেন। শুধু বলে দিন এই স্বপন মালিকের লাশের সাইজটা কেমন? সুদীপ্তর মতই 'ছোট্ট'? সৈফুদ্দিনের মতই 'তুচ্ছ'? না প্রদীপ তা-কমল গায়েনের মত 'বিক্ষিপ্ত'? 

৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯। ম্যাডাম, আপনি তখনও আঁতুড় ঘরে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনবিরোধী খাদ্যনীতির বিরুদ্ধে বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিনেই ১৫ দফা মুলতুবি প্রস্তাব জমা পড়ে ১১ টি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। স্পিকার শঙ্করদাস ব্যানার্জি বিবেচনা প্রস্তাব দিলেও পরে তা অস্বীকার করেন। ২৫'ই জুন রাজ্যব্যাপী ধর্মঘট ও হরতালের পর বামপন্থী দলগুলি ২০'ই অগাস্ট থেকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভাবে খাদ্যের দাবীতে গনআন্দোলনের ঘোষণা করে। আতঙ্কিত সরকারের আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় প্রমোদ দাসগুপ্ত, হরেকৃষ্ণ কোঙার, হেমন্ত বসু,  জ্যোতি বসুর নামে।  নিরঞ্জন সেন, গণেশ ঘোষ, বিনয় চৌধুরী, গীতা মুখার্জি, প্রশান্ত শূর সহ ২৭ অগাস্ট অবধি রাজ্য জুড়ে মোট গ্রেপ্তার হন, ৭০,০০০। ৩১'শে অগাস্ট খাদ্য-মন্ত্রীর অপসারণ ও খাদ্যের দাবীতে শহীদ মিনার ময়দানে ৩ লক্ষ মানুষের ব্যাপক জমায়েতের মহাকরণ মুখী অভিযানে গুলি চালায় পুলিশ। আহত সহস্রাধিক। ১৩০ জন আশঙ্কাজনক। পরে শহীদ ৮০ জন। ১'লা সেপ্টেম্বর পুলিশের এই হিংস্র তাণ্ডবের বিরুদ্ধে আবার গুলি চালায় পুলিশ। নিহত আরও ৮। আহত ৭৭। জারি হয় ১৪৪ ধারা। ২১'শে সেপ্টেম্বর খাদ্য আন্দোলন  শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বিধানসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করতে অস্বীকার করে কংগ্রেস। বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ও। হতাহতের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন পুলিশ-মন্ত্রী কালি মুখার্জি। 

কেমন লাগবে বলুন, যদি স্পার্টাকাসের জন্য দু মিনিট নীরবতা পালন করতেন জুলিয়াস সিজার? সিপাহী বিদ্রোহের শহীদ মঙ্গল পাণ্ডের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধায় নিজের রত্নখচিত বহুমূল্য মুকুট থেকে রানী ভিক্টোরিয়া খুলে ফেলতেন বেশ কিছু মরকতমণি? হিরোশিমা-নাগাসাকির পরমাণু বোমার জন্য শোকপ্রস্তাব এনে নীরবে অশ্রু ঝরাতেন মার্কিন কংগ্রেসের সনেট বৃন্দ? 

তাই ম্যাডাম, আপনি স্বপন মালিকদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করবেন না। খবরদার করবেন না। ওঁদের জীবনের মূল্য যখন লাল ঝাণ্ডা, অধিকার আদায়ের রং যখন লাল ঝাণ্ডা, ন্যায্য চাল-ডালের ছিনিয়ে নেওয়ার রং যখন লাল ঝাণ্ডা, শহীদের রক্তে ভেজা যে লাল ঝাণ্ডা তখন আপনি দুঃখ প্রকাশ করে ওঁদের অসম্মান করবেন না। লালঝাণ্ডার অপমান করবেন না। ইতিহাসই ওঁদের মনে রাখবে। ইতিহাসই ওঁদের বাঁচিয়ে রাখবে। আর মানুষ আপনার বিচার করবে।করবেই ...