রবিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০১৬

উন্নয়নের জোয়ার ~ সুশোভন পাত্র

আদর করে প্রেমিকার নাম রাখল সে 'রাজকন্যে'। কিম্বা ধরুন 'ডার্লিং'। নিদেনপক্ষে 'সোনা','রূপা'। এর নিচে জাস্ট আর নামা যায় না। প্রেমিকের নাম আর যাই হোক 'লোহা-লক্কড়' তো হতে পারে না। বিয়ের পর নববধূর নবীকরণ। নতুন নাম 'সুইট বাবি'। কাউন্টার পার্টের তুমুল জবাব ওয়ান অ্যান্ড অনলি আমার 'হাবি'। কনটেম্পোরারি সময়ে, জীব প্রেমের ঈশ্বর সেবাতে মানুষ যখন পোষা কুকুরের নাম রাখে 'পেপসি' কিম্বা 'পোস্ত', তখন প্রেম রাখতে, প্রেমে থাকতে মানুষ স্বাভাবিক কারণেই 'নামকরণে' ব্যস্ত। আর নামকরণ শুধু নামকরণই নয়। নামকরণ তো আর্ট। উপরন্তু এ রাজ্যে নামকরণ আবার উন্নয়নেরও পার্ট। ঐ যে যেমন চার মাসেই দিদিমণির ৯৯% কাজ –আগের প্রকল্পের নতুন নামকরণে কিসেরই বা লাজ ?
আমেরিকায় এখন বাচ্চাদের নামা রাখা হচ্ছে বন্দুকের থিমে। পিস্তল, ট্রিগার, শুটার। 'শর্ট অ্যান্ড প্রিসাইস'। যেমন ধরুন ইউপিএ-১ সরকারের 'কমন মিনিমাম প্রোগ্রামের' অংশ 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনার' নতুন নাম পড়ল 'কন্যাশ্রী'। 'শর্ট অ্যান্ড প্রিসাইস'। ২০১৩-১৪ এ রাজ্যে কনাশ্রী প্রকল্পে মোট আবেদনপত্র জমা পড়েছে ১৯.৮৮ লক্ষ। মঞ্জুর হয়েছে ১৮.৩ লক্ষ। আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে ১০,২৮৬। হল তো, ৯৯% কাজ? 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনা'য় যেখানে চতুর্থ শ্রেণীর কন্যা শিশুরা পেত ৫০০ টাকা আর নবম-দশম শ্রেণীর কন্যা শিশুরা ১০০০ টাকা, সেখানে এখন সবাই হাতে পরার বালা পায়, কেউ আবার সাইকেলও পায়। সে সাইকেল বিক্রি করতে OLX –এ বিজ্ঞাপনও পড়ে। এটাই তো উন্নয়ন যজ্ঞ। সাবড়াকোনের সালমা খাতুনের সাইকেল চালাচ্ছে মনিপুরের ইয়াইফাবা প্যাংগাম্বম। 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনার' মোট খরচের ১০% পণপ্রথা ও শিশু বিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি তে তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের থেকে খরচা হবার কথা ছিল। এখন ১০%'র বেশী হয়। সচেতনতা বাড়াতে নয়। গজলের জলসা বসাতে। হল, শিল্পও হল। সিঙ্গুর না হোক। গুলাম আলি তো হল।
বাঙালি তো আবার ডাকনাম ছাড়া কাজ চলে না। বিখ্যাত কিছু ডাক নাম যেমন পচা, ক্যাবলা, নন্টে ফন্টে, গাবলু , হাবলু এবং 'আনন্দধারা'। ১৯৯৯'র 'স্বর্ণজয়ন্তী গ্রাম স্ব-রোজগার যোজনা'র বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০১০ কেন্দ্রীয় সরকার নাম দিল, 'ন্যাশনাল লাইভলিহুড মিশন'। বাংলার কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে বিশ্বাসী আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর আবার ঐ শক্ত নাম পছন্দ হল না, নাম রাখলেন 'আনন্দধারা'। আগে রাজ্যের সব জেলায় যে প্রকল্প চালু ছিল। পরিসংখ্যানে দেশের মধ্যে ছিল প্রথম সারির এখন তা সর্বসাকুল্যে চালু আছে ২৪ টি ব্লকে। কিন্তু তাতে কি ? নাম তো বদল হল। অতএব, আবার উন্নয়ন হল।
বাচ্চা ছেলের নাম 'গুগল'। গুগলের গার্লফ্রেন্ড 'কিউটি পাই'। ঠিক যেমন কন্যাশ্রীর সুরে সুরে মিলিয়ে 'বেকার ভাতা' আর' যুব উৎসাহ প্রকল্পের' নতুন নাম 'যুবশ্রী'। ২০১০'র বাজেটে এই প্রকল্পের  আর্থিক বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছিলো। আর নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঐ প্রকল্পের সুবিধা পাবার শর্ত হিসেবে 'সম্পূর্ণ বেকার' শব্দবন্ধ কে বদলে দিয়ে শুধু 'বেকার' করেছেন। আফটার অল তোলাবাজরা তো আর 'সম্পূর্ণ বেকার' না। উন্নয়নের দ্রবণ, আদিবাসী তপশিলি দরিদ্র বেকার থেকে শুরু করে তোলবাজ হয়ে সাম্বিয়া সোহরাব, সবার জন্যই তো হোমজিনিয়াস হওয়া উচিত। সুতরাং তোলাবাজরাও পয়সা পেল। হল,আবার 'পরিবর্তন' হল।    
২০০৬ সাল থেকেই বৃষ্টির জল ধরে রেখে, সেচের মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় ৭২% জমিতে চাষ যোগ্য জল পৌঁছে দেওয়া গিয়েছিলো। এখন কত শতাংশ জমি সেচের আওতায়? সরকারী তথ্য কি বলে? জানেন? ছাড়ুন তো। এই প্রকল্পেরও নতুন নাম তো পড়েছে। 'জল ধর জল ভর'। নাম যখন  নতুন,তখন নিশ্চয় উন্নয়নও হয়েছে। ৯৯% জমিতেই সেচের জলও পৌঁছে গেছে। আগের 'স্বনির্ভর গোষ্ঠীর' উন্নয়নও হয়েছে, "আত্মমর্যাদা"। প্রতি ব্যক্তির ঋণ পিছু প্রকল্পেরও উন্নয়ন আজ "আত্মসম্মান"।
আসলে কি জানেন, হিজিবিজ্‌বিজ্‌ বলল, 'একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, আর ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু- কিন্তু যেই বাড়ির নাম দিয়েছে 'নবান্ন', অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে...