শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৫

আবোলতাবোল ~ আশিস দাস

বেজায় গরম। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে শুয়ে আছি, তবু বোঁটকা গন্ধে অস্থির। ঘাসের উপর নোংরা পুরনো গেরুয়া চাড্ডিটা পড়ে ছিল; ফেলে দেবার জন্য সেটা যেই তুলতে গেছি অমনি চাড্ডিটা বলল, 'হাম্বা'! কি আপদ! চাড্ডিটা খামোকা হাম্বা করে কেন?
চেয়ে দেখি চাড্ডি তো আর চাড্ডি নেই, দিব্যি মোটা সোটা সাদা ধপধপে একটা গরু শিং উঁচিয়ে আমার দিকে প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে আছে আর মোবাইল থেকে স্ন্যাপডিল আন-ইনস্টল করছে।
আমি বললাম, 'কি মুশকিল! ছিল চাড্ডি, হয়ে গেল একটা গরু।'
অমনি গরুটা বলে উঠল, 'গরু নই গরু নই, আমি গোমাতা। তাছাড়া মুশকিল আবার কি? ছিল আমির খান আর শাহরুখ খান, হয়ে গেল ঘোর শয়তান দেশদ্রোহী; ছিল দাঙ্গার মুখ, হয়ে গেল প্রধানমন্ত্রী। এতো হামেশাই হচ্ছে।'
আমি খানিক ভেবে বললাম, 'তাহলে এখন তোমায় কি বলে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের গরু, থুড়ি গোমাতা নও, আসলে তুমি হচ্ছ চাড্ডি।'
গরু বলল, 'গোমাতা বলতে পার, চাড্ডিও বলতে পার, অনুপম খেরও বলতে পার'। আমি বললাম, 'অনুপম খের কেন?'
শুনে গরুটা বলল, 'তাও জানোনা?' বলে এক চোখ বুজে ফ্যাচ ফ্যাচ করে বিশ্রী রকম হাসতে লাগল। আমি ভারী অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মনে হল ওই অনুপম খেরের কথাটা নিশ্চয় আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, 'ও হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি'।
গরুটা খুশি হয়ে বলল, 'হ্যাঁ, এতো বোঝাই যাচ্ছে- চাড্ডীর দ, খের-এর তালব্য শ, অনুপমের প, আর গোমাতার ম- হল দেশপ্রেমী। কেমন, হল তো?'
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিন্তু পাছে গরুটা আবার সেই রকম বিশ্রী করে হেসে ওঠে, তাই সঙ্গে সঙ্গে হুঁ হুঁ করে গেলাম। তারপর গরুটা খানিকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, 'এই দেশে বোঁটকা গন্ধ লাগে তো পাকিস্তান গেলেই পার'। আমি বললাম, 'বলা ভারী সহজ, কিন্তু বললেই তো আর যাওয়া যায়না?'
গরু বলল, 'কেন? সে আর মুশকিল কি?'
আমি বললাম, 'কি করে যেতে হয় তুমি জানো?'
গরু একগাল হেসে বলল, 'তা আর জানিনে, গুজরাত, ইনটলারেন্স, বিফ ব্যান, দাদরি- ব্যাস। সিধে রাস্তা, সওয়া একঘন্টার পথ, গেলেই হল'।
আমি বললাম, 'তাহলে রাস্তাটা আমায় বাতলে দিতে পার?'
শুনে গরুটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, 'উহুঁ, সে আমার কর্ম নয়। আমার মোদীকাকা যদি থাকত, ঠিক ঠিক বাতলে দিতে পারত'।
আমি বললাম, 'মোদীকাকা কে? তিনি থাকেন কোথায়?'
গরু বলল, ' মোদীকাকা আবার কোথায় থাকবে? প্লেনেই থাকে; তবে মাঝে মাঝে হিমালয়ের চূড়ায় বসে ধ্যান-ও করে '।
আমি বললাম, 'কোথায় তার সাথে দেখা হয়?'
গরু খুব জোরে জোরে শিং নেড়ে বলল, 'সেটি হচ্ছে না, সে হবার জো নেই'।
আমি বললাম, 'কি রকম?'
গরু বলল, 'সে কিরকম জানো? মনে কর তুমি যখন যাবে দিল্লিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন ম্যাডিসন স্ক্যোয়ার। যদি ম্যাডিসন স্ক্যোয়ার যাও তাহলে শুনবে তিনি আছেন মারিয়ানা খাতের তলায়। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেলেন আদানির প্রাইভেট জেটে। কিছুতেই দেখা হবার জো নেই'।
আমি বললাম, 'তাহলে তোমরা কি করে দেখা কর?'
গরু বলল, 'সে অনেক হাঙ্গামা। আগে হিসেব করে দেখতে হবে ক্যামেরা কোথায় নেই; তারপর হিসেব করে দেখতে হবে আডবানি আর অমিত শাহ এখন কোথায় থাকতে পারে; তারপর দেখতে হবে আদানি আর আম্বানি এখন কোথায় আছে।তারপর দেখতে হবে সেই হিসেব মত যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে তখন মোদীকাকা কোথায় থাকবে। তারপর দেখতে হবে-'
আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, 'সে কিরকম হিসেব?'
গরু বলল, 'সে ভারী শক্ত। দেখবে কিরকম?' এই বলে সে একটা ত্রিশূল দিয়ে ঘাসের উপর একটা লম্বা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর মোদীকাকা'। বলেই খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল।
তারপর আবার ঠিক তেমনি একখানা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর তুমি', বলে ঘাড় বেঁকিয়ে চুপ করে বসে রইল।
তারপর হঠাৎ আবার একটা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর পহেলাজ নিহালনি'। এমনি করে খানিকক্ষণ কি ভাবে আর একটা করে লম্বা আঁচড় কাটে, আর বলে, 'এই মনে কর বিহার বিধানসভা' – 'এই মনে কর যশোদাবেন পাসপোর্ট অফিস যাচ্ছে' – 'এই মনে কর জেমস বন্ড চুমু খাচ্ছে, ও না না ওটা তো সেন্সরড-'
এইরকম শুনতে শুনতে শেষটায় আমার কেমন রাগ ধরে গেল। আমি বললাম, 'দুর ছাই কিসব আবোল তাবোল বকছে, একটুও ভালো লাগেনা'।
অমনি গরুটা শিং বাগিয়ে জোরে একটা ঢুঁ মেরে বলল, 'তুই বেটা নিশ্চয় পাকিস্তানি! দেশদ্রোহী কোথাকার, যা দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যা'।