সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

শিক্ষক দিবস ~ স্বাতী ব্যানার্জী

সকাল থেকে শুধু শুভেচ্ছা স্তুতি আর ভালোবাসায় ভেসে যাচ্ছে হৃদি অলকনন্দা জলে ..... আলবাত ভালো লাগে.... শিক্ষক দিবস..... আমাদের জন্য .......সুমনের গানের মতো .....শুধু আমাদের জন্য ...... তবুও কিছু ভিন্ন খন্ডদৃশ্য গড়ে তোলে আমার শিক্ষক দিবস.... অন্য রকম....

দৃশ্য ১ :
থার্টি ফাইভ , রোল নম্বর থার্টি ফাইভ .... এই কে চিনিস মিতা বাউড়ি রোল পয়ঁতিরিশ কে.... তিনমাস ধরে আসে না.... জিজ্ঞেস করি সেভেন বি র মেয়েদের .... মিস ওর বিয়ে হয়ে গেছে.... সে কি.... চমকে উঠি..... এই বয়সে.... মেয়েটা বড্ড রোগা... লাজুক ছিল.... হ্যাঁ মিস.... ভালো ছেলে পেয়েছে মিস.... বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে ।
মিতা দারুন সেলাই করত .... ওয়ার্ক এডুকেশন পরীক্ষায় ওর সেলাই সব দিদিরা দেখতে যেতাম..... বিয়ে দিয়ে দিল.... যাঃ ।

দৃশ্য ২:
আপনারা জাতির মেরুদন্ড.... সিকখক বলে কথা.... আমাদের ক্লাব কৃতী ছাত্র ছাত্রী দের পুরস্কার দেবে এই ফিফথ সেপ্টেম্বর ... আপনি আসবেন .... মেয়র সভাপতি .... আপনিও স্টেজে থাকবেন.... হেঁ হেঁ.... উত্তরীয় দেব.... আয়োজন এ খামতি পাবেন না.....
তা আপনার কটি ছেলেমেয়ে ?
কার আমার ? অনলি ওয়ান সন.... ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি.... আই সি এস সি.... বাব্বা আমার মিসেস দিনরাত এক করে খেটে এই নামকরা সেন্ট অমুক এ দিয়েছে....
আমাদের স্কুলে দেন নি কেন ? বাড়ির কাছেই তো.....
হেঁ হেঁ বোঝেন ই তো... বাংলা মিডিয়াম আর চলে না.... তাও যদি রামকৃষ্ণ মিশন হত.... আপনার ছেলেও তো ইংলিশ মিডিয়ামেই পরে ম্যাডাম ......
দৃশ্য ৩:
মেলায় বেড়াতে গিয়ে দেখি একটা মেয়ে ডিম সেদ্ধ বিক্রি করছে.... ছেলের বায়নায় কাছে যাই.... ক্লাস এইটের তামান্না খাতুন মুখ না তুলে ডিম দেয়.... আমিও না দেখার ভাণ করে পয়সা দি.... কাল থেকে অ্যানুয়াল.... কি করছে মেয়েটা ? ....... কেমন চাপ লাগে গলায়.... বাড়ি ফিরে যাই......
দৃশ্য ৪:
ক্লাস এইটে রিনা বাদ্যকরের বিয়ে হয়ে গেছিল...... একবছর পর আবার সে ফিরে এসেছে..... আগে সারাদিন হুল্লোড় করতো.... এখন মরা মাছের চোখ নিয়ে একলা বসে.... সৎ মা আপদ চুকাতে ভালো করে খোঁজ না নিয়েই বিয়ে দিয়েছিল..... গয়না কেড়ে শাশুড়ি তাড়িয়ে দিয়েছে..... বর মামাতো বোন কে ভালোবাসে ..... রিনা আগেও পড়তো না.... এখনও পড়ে না.... শুধু আমি আর বকতে পারি না....
দৃশ্য ৫ :
বাড়ি থেকে পালানো হেমা সোরেণ কে পাওয়া গেছে সোনাগাছিতে.... কয়েক হাত ফেরত ..... ঠাঁই হয়েছে হোম এ..... দিকুর সাথে পালানোর অপরাধে তার পরিবার তার খোঁজ পাওয়ার আগেই তার পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করেছে.... তার ইউনিট টেস্টে কুড়িতে বারো পাওয়া খাতাটা লকারে রেখে দিই.....

দৃশ্য ৬ :
সম্পাদক বক্তৃতা দিচ্ছেন অ্যানুয়াল ফাঙশানে..... আমরা ইশকুলে মিড ডে মিল করে দিয়েছি..... ফ্যান এনে দিয়েছি..... দিদিমনিদের টাইট দিয়ে দিয়েছি.... টাইমে আসে টাইমে যায়........... তোরা শুধু আমাদের দলের পাশে থাক..... ইশকুল এর কত উন্নতি করি দেখবি.......
দৃশ্য ৭ :
বি এড পড়তে গিয়ে অডিও ভিশুয়াল এইড নিয়ে পড়ছি.... শিখছি প্রোজেক্টার আর স্মার্ট ক্লাস এর ব্যবহার..... স্টুডেন্ট টিচার রেশিও 35:1 কিন্তু বাস্তবে আমার সেকসনে এই রেশিও 117:1 ক্লাসে আশিটা মেয়ে এলে এক বেঞ্চে সাতজন বসে.... তুমুল হট্টগোলে চেঁচিয়ে গলা ভেঙে যায়..... অবশ্য বি এড বলেছে ক্লাসের সার্থকতা নির্ভর করে শিক্ষক এর উপর... মানে আমি আমরা ব্যর্থ .....
দৃশ্য ৮ :
প্রকল্প জমা দেয়নি বলে রেক্সোনা খাতুনকে খুব বকি....যা তা বলি.... মুখ নিচু করে কাঁদে রেক্সোনা.... ক্লাস শেষে পিছু পিছু এসে বলে বাবা আরেকটি বিয়ে করেছে... মা লোকের বাড়ি কাজ করে..... এ ফোর পেপার আর চ্যানেল ফাইল মা কিনে দেয় নি বলে সে প্রকল্প করতে পারেনি.... নিজে দামী শাড়ি পরে আছি বলে লজ্জা করে... মুখ নিচু করে এমনি কাগজে ওকে লিখতে বলে পালিয়ে আসি...
দৃশ্য ৯ :
আমি শিক্ষক দিবসে আবেগে গদগদ হই.... আজ কেউ জগ ছুঁড়বে না..... কোথাও ঘেরাও হবে না.... বোমাবাজি??? নাঃহ আজ নয়..... আবার কাল থেকে হবে.... এ শুদু সম্মানের দিন এ লগনোওও পেন্নাম ঠোকার এ্যা এ্যা এ্যা.....

দৃশ্য ১০ :
আমি বুক ফুলিয়ে সরকারি চাকরি করি... মুখ ফুলিয়ে ডি এর জন্য ঝগড়া করি.... নেতার মুন্ডুপাত করি..... পে কমিশন এর অপেক্ষায় থাকি.... ফেসবুকে জ্বালাময়ী ভাষণ দি..... নিজের ছেলেকে অন্য বোর্ডে পড়াই....... কালাম কোট করি আর সব্বাই কে চেঁচিয়ে বলি....... এস এস সি বা টেটের কারচুপি চুলোয় যাক.... শুভ শিক্ষক দিবস.... আপনাকেও আমাকেও.... হ্যাঁ আমাকেও ।
( সব ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক .... কোনো মিল পেলে তা কাকের তালু বিষয়ক হিজিবিজি .... পশ্চিমবঙ্গে এসব হয় না )