মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০১৫

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্র রাজনীতি ~ অনিমেষ বৈদ্য

এক বন্ধুর বাবার মৃত্যু হয়েছে। সেই উপলক্ষ্যে শোক সভা। সদ্য প্রয়াত কাকু ছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অবসর নিয়েছেন কিছু বছর আগেই। যাই হোক সেই শোক সভা উপলক্ষ্যে বর্ধমান যাওয়া।
এই সেই বর্ধমান। এই সেই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। হঠাৎ করে বর্ধমান এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে মনে করিয়ে দেওয়ার কী প্রয়োজন? প্রয়োজন আছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ছবিটাকে বোঝার জন্যই প্রয়োজন আছে।

প্রায় এক লাখ ছাত্রীছাত্র নিয়ে ২০০টি কলেজের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৪ র মে-জুন মাসে অনার্স ও পাসের সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা নেওয়া হয় । ২০১৫ র মার্চ মাস অব্দি অর্থাৎ প্রায় দশ মাস বাদেও এই পরীক্ষাগুলোর রেজাল্ট অপ্রকাশিত ছিল। নিমানুযায়ী এই সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রীছাত্রদের থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা দেওয়ার কথা ২০১৫ র এপ্রিল/মে মাসে। ফলত , থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা দেওয়ার ( যদি সময় মতো হতো) মাস দেড়েক আগেও ছাত্রদের হাতে ছিলো না সেকেন্ড ইয়ারের রেজাল্ট । তারা জানতোই না একমাস বাদে থার্ড ইয়ারের পরীক্ষায় বসবে নাকি পুনরায় সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা দেবে (যদি অসম্পূর্ণ রেজাল্ট আসে )! এই ইস্যু নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। ছাত্রীছাত্ররা জড়ো হয় এই বর্ধমান শহরে। সেটা এই বছর মার্চের শেষের দিকে। সমস্যার সুরাহা তো হয়ই না, উল্টে ছাত্রীছাত্রদের উপর নেমে আসে পুলিশি হেনস্থা। উপাচার্য নীরব। ২৭ মার্চ বিপুল সংখ্যক ছাত্রীছাত্র জড়ো হয় বর্ধমান স্টেশনে। মিছিল হয় সাধারণ ছাত্রীছাত্রের ব্যানারে। মিছিলের দাবী ছিল – দ্রুত দ্বিতীয় বর্ষের ফল প্রকাশ করতে হবে । উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়া হয় ডেপুটেশন । উত্তর আসে – " হমম... দেখছি "।
আন্দোলনের চাপে পড়ে ২০১৫ র এপ্রিলেই কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ফল প্রকাশ করলো। প্রথমে B.SC , B.Com এবং পরে B.A.-র । যা ছিল অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ । তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হল –INC/PNC , Roll Not Found , Absent ইত্যাদি । সমস্যায় পড়ে প্রচুর সংখ্যক ছাত্রীছাত্র। মার্কশিট দেবার পর দেখা গেল পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর ! কেউ ৬০ এর জায়গায় পেয়েছে ০৬ কেউ বা কোনো নাম্বার না , পেয়েছে "* , # " এর মত কিছু বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন। শুরু হয় আরও জোরালো আন্দোলন। যে আন্দোলনে শামিল যাদবপুর, প্রেসি থেকে শুরু করে গোটা ছাত্রীছাত্র সমাজ।
এই ডামাডোলের মধ্যেই প্রকাশিত হয় তৃতীয় বর্ষের ফল। সেই রেজাল্টের ভুল নিয়েও অসংখ্য প্রশ্ন ওঠায় বোঝা যায় যে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় আছে একই রকম। আর বিক্ষোভ আন্দোলন যেন না হয় তার জন্য বর্ধমান বিশ্বিবিদ্যালয় জুড়ে নামানো হয় পুলিশ। আন্দোলনের চাপে পরীক্ষা নিয়ামকের প্রধান নিজের কক্ষ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে সবার সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।
এই হলো গল্প। মানে বাস্তবিক গল্প। কিন্তু এই অসময়ে এই পোস্ট কেন? একটাই কারণ। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, বাড়ি জমি বন্ধক রেখে যে প্রান্তবাসীর পরিবারের ছাত্রীছাত্র ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে পা রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে সেই ছাত্রীছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ ভাবেই ছিনিমিনি খেলা হয়। আর আমরা ছাত্রীছাত্রদের আন্দোলন পড়ি খবরের কাগজে আর চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলি, ''পড়াশোনার নাম নেই, খালি আন্দোলন। ধরে চাবকানো উচিৎ"।