সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০১৫

ঈশ্বর ~ অনির্বান মাইতি


একটা ঈশ্বর থাকা না খুব জরুরি জানেন ? মানে ধরুন আমি যে কথাগুলো বলতে চাইছি লোকে সেগুলো বুঝতে চাইছে না, আমি যদি টুক করে আমার লেখার নিচে একটা ঈশ্বরের নাম লিখে দেই তা হলেই বেশ একটা জনসমর্থন জুটে যাবে। ধরুন আমি লিখলাম
ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে ।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর ,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর ।
শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো ,


শাস্ত্রে মানে না , মানে মানুষের ভালো ।
বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে ,
নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে ,
পিতার নামেতে হানে তাঁর সন্তানে ,
আচার লইয়া বিচার নাহিকো জানে ,
পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা —
দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা ।

সাথে সাথে ২০০ লাইক আর আড়াইশোটা খিস্তি বাঁধা। এবার যদি টুক করে নিচে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে দেই। ওটা গিয়ে দাঁড়াবে ২৫০ লাইক আর ১০ টা খিস্তিতে। তো এই হল আমার দেশের নাম মাহাত্ম্য । কি বলেছে তার থেকে কে বলেছে টা বরাবরই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।
এখানেই ঈশ্বরের প্রশংসা করে থেমে যাব ভেবেছেন ? উঁহু সেটি হচ্ছে না, ঈশ্বর থাকার আরো একশ একটা উপকার আছে। তার মধ্যে কয়েকটিই বলতে পারি, ধরুন আপনি ট্যাক্স দিচ্ছেন না, মানে দিতে পারছেন না। সরকার আপনার কানের সামনে মন্ত্র পড়ে দিলো -
"বাকি রাখা খাজনা
মোটে ভালো কাজ না
ভরপেট নাও খাই
রাজকর দেওয়া চাই"

তলায় লেখা সত্যজিত রায়। কবি কি বলেছে, কেন বলেছে সেসব দেখারও টাইম নেই তখন , কে বলেছে সেটাই বড় কথা। আপনি জলে গল। দরকারে টাকা ধার করে রাজকর দিয়ে দিলেন।
ঈশ্বর এবং তাঁদের বানী খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানব জীবনে। এবং এটা যে শুধু সরকার করে তা নয়। আপনি ভেবে দেখুন আপনার বাচ্চাটা খুব দুষ্টুমি করছে আপনি তাকে সামলাতে না পেরে বলে দিলেন মায়ের কথা না শুনলে ঠাকুর পাপ দেয়। যে শিশু পুন্য কি তাই জেনে উঠতে পারল না সে তার আগেই পাপের ভয় কিন্তু পেয়ে গেলো। আহা মনে মনে হলেও সে জ্বলন্ত কড়ায়, ফুটন্ত তেলে ঈশ্বরের পাপের বিচারের এক পাপী বলে ভেবে তো নিল নিজেকে ! এভাবেই ঈশ্বর সব সময় শাষনকর্তা বা কর্ত্রী কে সহায়তা প্রদান করে থাকে।
ঈশ্বর মানে যদি পাঠক শিব, যীশু, মুহাম্মদ ভেবে আমায় কোপানোর জন্য উদ্যত হন আমি অভিমান করে ফেলতেই পারি। ঈশ্বরের সংজ্ঞা এখানে অনেক বড়। শুধুমাত্র কোন পাথুরে মূর্তি দিয়েও যখন কাজ চলে না , তখন এই মানবকুল থেকেই আমরা খুঁজে নেই নতুন ঈশ্বর। যেমন ধরুন (আচ্ছা থাক ওনার নাম নেবো না লোকে বড্ড খিস্তি করেছে ইতিপূর্বে) ধরুন লোকনাথ আছেন , সাঁইবাবা আছেন, আশারাম বাপু আছেন, ওয়াইসি আছেন, এরা সকলেই কিন্তু কমবেশি ভগবান। এদের মুখ নিঃসৃত বানী আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কে বড় পুষ্ট করে। ওনারা তার মুল্যও বুঝে নেন। যে যাই বলুক রাষ্ট্রযন্ত্র কিন্তু কোনভাবেই অকৃতজ্ঞ নয়। ছাড়ুন এসব ভারি ভারি আঁতেল কথা। চলে আসুন পাড়ার ক্ষ্যাপাদার কথায়। ক্ষ্যাপাদার বাবা পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী ছিলেন মৃত্যু আগের মিনিট অবধি। বিছানাতেই মলমুত্র ত্যাগ করতেন। কোন কোন দিন একটু বেশি বাড়াবাড়ি করলে ক্ষ্যাপাদা আর তাঁর স্ত্রী যে ভাষায় বাবা কে খিস্তি দিতেন সে ভাষা শুনলে আমার স্টেটাসে যারা খিস্তি দেন তারাও লজ্জা পাবেন। কিন্তু ক্ষ্যাপাদার বাবা মারা যাবার পর ,যথারীতি একটি ছবি তার সামনে ধুপ আর মালা সহযোগে রোজ পুজো হয় । এবং ক্ষ্যাপাদা তার সন্তানদের ঠাকুরদার আদর্শে অবিচল থাকার পরামর্শ নিয়মিত দেন। বাচ্চারা বাঁদরামো করলে ঠাকুরদা ওপর থেকে সব দেখছেন তিনি পাপ দেবেন ইত্যাদিও আজকাল চলছে। বেঁচে থেকে যা দেখেছেন উপর থেকে কি তার বেশি কিছু দেখা যায় তার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।
মৃত্যু বড় সুন্দর, মানুষ কে সুন্দর করে তোলে, তার ঈশ্বর প্রাপ্তি হয়। আর একবার ঈশ্বর বানিয়ে ফেলতে পারলে তাকে ভাঙিয়েও কিছু আদায় হয়। এ প্রসঙ্গে সব থেকে বড় প্রাপ্তি হল "জয় বাবা হাইরোডেশ্বর" মেচেদা যাওয়ার পথে এক জায়গায় একটা পাথরের গায়ে লাল সিঁদুর লাগিয়ে নিচে হাইরোডেশ্বর লিখে দিয়ে কিছু লোক বেশ কামিয়ে নিয়েছেন (এখন আছে কিনা জানি না)। ভগবানের একটা বিশাল লিস্ট কিন্তু বেরিয়ে এলো। এ ব্যাপারে কিন্তু মার্ক্সবাদীরাও কম যান না। এ নিয়ে কবি সৃজন সেনের একটা ভারি ভালো লেখা মনে পড়ছে। কিছু শব্দের গন্ডগোল থাকতে পারে স্মৃতি থেকে টুকে দিচ্ছি।
(মাও সে তুঙ এর মৃত্যুর পর দিন লেখা)
মরিয়াছে ব্যাটা চুকিয়াছে ল্যাটা
এবারে আমরা ছাড়িয়া হাঁফ
সাজায়ে গুছায়ে যতনে বসায়ে
ব্যাটারে বানাবো ধম্মবাপ
মনসার পুজা ঢের বেশি ভালো
কে চায় পুজিতে জ্যান্ত সাপ ?