বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৫

May Day - ভরসা দিবস - শুভাশিষ আচার্য্য

আপনি কথা বললে মুখে সুরভিত জোতদারের গন্ধ ছোটে।
রাস্তায় হেঁটে চললে মুঘল বাদশার জুতো শব্দ করে।
হাত নাড়লে, ঠাণ্ডা গাড়ির পেছন সিটের জানলা থেকে,
তেজি ঘোড়ার পিঠের থেকে চাবুক ঘোরে দলিত পিঠে।


--"সকাল থেকে পেছন পেছন এত ছড়া কাটছ কেন। সারাদিনে আমার মত কাজ করতে পারবে। এই নিয়ে কত অলি গলি ঘুরলাম খেয়াল রাখছ। সকাল দশটা বাজে এর মধ্যে দুটো জায়গা ঘোরা হয়ে গেল। এরপর যাব খোলা মাঠে ভাষণ দিতে।"


--"আমি ত আপনার পিছনেই আছি। আমি ত দেখছি আপনি কত রোদ পুইয়ে এত ঘুরছেন।"

--"দেখছ যখন এত ছড়া কাটছ কেন বিরোধীদের মত। কি চাইছ খুলে বল কি করতে হবে।"
"স্যার একটা চাকরির খুব দরকার।"
"ওরে বোকা সেই জন্য আমাদের সরকার।"
"স্যার ভুয়ো পাসে রেলে ওঠে ওই সব আমলা।"
"একটু আধটু ওদের সাজে তুই নিজেকে সামলা।"
"স্যার পদস্থ সব অফিসাররা ঘুষ খায়।"
"বললে হবে খরচা আছে, তুই বুঝিস না হায়।"
"কাজের কথা উঠলে লোকের যত কুমন্ত্রণা।"
"সময় করে আমার মত করিস রামের বন্দনা।"
"এবার স্যার আমি কিন্তু ভীষণ খেপে যাচ্ছি।"
"আচ্ছা বাবা ব্রিগেডে যাব একদম সাচ্চি।"

--"সাচ না ঝুট সে ত সময় বলে দেবে স্যার যেমন করে সময় আর সব বলে দেয়। কিন্তু আর কতদিন রামের বন্দনা করতে বলার হুকুম দেবেন আর কতদিন ই বা ব্রিগেড ব্রিগেড খেলবেন!"

--"এই তোমাকে বিরোধী গোষ্ঠী পাঠাল নাকি। আমার সাথে সোজা কথা সহজ ভাবে বল নয়ত এসব ফালতু বাউয়াল জান বোধহয় আমি কেমন করে হ্যান্ডেল করি।"

--"আমার কথাটা স্যার খুব ছোট্ট একটা কথা ছিল। একটা কাজ দিন না তাহলে আমি প্রতিদিন ব্রিগেডে এসে পুজো দিয়ে যাব। রাম পুজো। বাম পুজো। ফুল পুজো। ডান পুজো। সত্যি বলছি। যা মন্ত্র বলতে বলবেন তাই আউড়ে যাব। মানে ওম ভগবান সহায় থেকে আল্লা মেহেরবান কিম্বা দু পয়সা সুইস ঘরে আপনি মহান। কিন্তু আপনি ব্রিগেডে এলে কি কাজ হবে। কি হবে আপনি ত জানেন

ভাষনমঞ্চে আশা নিরাশার যুগলবন্দী ভাষণ ছুটলে
বহুযুদ্ধের ব্যবসায়ীরা অবাক করে পণ্য বেচে।
ভোট জিতলে উল্লাসে পারমানবিক বোমা ফাটে
প্রজার রক্তে জমিদার-বাবু বেড়ালের শুভ বিয়ে বাঁধে।

--"এসব ই হয় স্যার আমার আর কাজ জোটেনা। তাই বলছিলাম, কাজ হলে ব্রিগেড হত। লরি আসত। বাস জমত। আস্ত একটা উৎসব হত। আমরা আসতাম।আপনি বলতেন। আপনি কি সুন্দর বলেন। আমরা সমবেত হাততালি দিতাম। আপনি হাত তুলে থামিয়ে দিতেন। টিভিতে দেখাত। সিনেমার মতন দেখত লোকে বাড়িতে বসে। আর সকালে সমস্ত কাগজে আপনি। সেই দেখে আপনি ঘুম থেকে উঠে চা খেতেন। আপনার মধ্যেই আপনি। আপনার মোহময় ভাষণ ছাপিয়ে বেরত কাগজে:

ক্ষেত খামার প্রভৃতি যা কিছু গড়ে ওঠা দরকার

কাঁধে কাঁধ দিয়ে এখনি শুরু হউক কাজ।
কলম হাতুড়ি নিরীন অথবা কম্পিউটার
যার যা কিছু আছে পুঁজি নিয়ে আয় সব।
নির্মাণ প্রকল্পে যোগ দিছি পিছুটান কি আবার! 
একে একে হয়ে যাক পরিকল্পনা মাফিক।
কাজহীন ছেলে আর মেয়ে দের বিষবুক ধুতে গিয়ে আর
শপথ করছি কিছু বরবাদ করবোনা।
জনকল্যাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মেরামত প্রযোজ্য
যা কিছু করার এ রাত্রেই করে ফেলতে হবে।

--"কত রাত যে চলে যায় স্যার।"

--"ঠিকাছে অনেক কথা হল। তোমাকে যে এতক্ষণ শুনলাম এটা .. যাকগে..নয়ত... যাকগে এটা ভবিষ্যতের শ্রমিকের মঙ্গল চিন্তা করে। আছা ভাষণ টা দিয়েনি। খোলা মাঠ এসে গেছি। তুমি এখন এস। আর  হ্যাঁ, কারুর সাথে দেখা হলে বল আমি গণতন্ত্রকে মর্যাদা দি।"

"আপনি আসুন স্যার। আমি এখানেই একটু থাকি। দেখি কারা এসেছে এই খোলা মাঠে। আজ ত সম্মিলনী। সবাই এসেছে। একটু খোজ নিই, দেখি কে কেমন আছে।"


--"আরে দাদা। কারখানার কি অবস্থা। প্রডাকশন হচ্ছে?"

--“আরে ভাই আমাদের আবার প্রোডাকশনের বিরাম আছে নাকি প্রাইভেট ফ্যাক্টরিতে। মালিক ত চায় আমরা সারাদিন যদি ফ্যাক্টরিতে বসে প্রোডাকশন দেখি তাহলে সবচেয়ে ভাল হয়আমরা ত ওভার টাইম ও পাইনা। আমাদের নাকি মাইনে বেশী।

--"ঐ এসে গেছে আমাদের হিরো। কি বেচুবাবু কেমন আছিস। দাদা কিছু যদি বেচতে হয় একে দিন।"

--"আর বলিসনা লাইফটা চাকা লাগিয়ে কেটে যাচ্ছে। বাড়ীতে থাকতেই পারিনা।"

--"কিরে কি খবর। খুব চলল অনসাইট। ভালই ত! আচ্ছা শুনলাম খুব শরীর খারাপ হল শেষের দিকে। এখন ভাল আছিস। কেমন ঘুরলি কেমন চলছে বল।"

--"গতবছর গিয়েছিলাম। খুব ভাল কাজ হল। সবকিছু ফ্যান্টাস্টিক চলছিল। চ্যালেঞ্জিং কাজ। কাস্টমার ভাল। আমার কাজ নিয়ে ওরা দারুণ খুশী ছিল। মানে বলতে পারিস এভ্রিথিং ইস ফাইন অবস্থা। শুধু শেষের তিন মাস অসহ্য পেটে যন্ত্রণা হচ্ছিল। বসকে বললাম বাড়ী যাই অন্য কেউ আসুক। কাজ ত প্রায় করেই দিয়েছি। কিছুতেই ছাড়ল না। বলে ক্লায়েন্ট তোমাকে চায় আর ত কিছুদিন। ফেস নষ্ট হবে। ওখানে আবার ডাক্তার কে, কি হয়েছে বোঝান এক ঝক্কি। স্যুটকেশে যা ছিল মেডিসিন ঐ দিয়ে চালালাম পেট চিপে টানা তিনমাস। তিনমাস পর সব কাজ শেষ প্রজেক্ট ক্লোজ করলাম। কোম্পানি বেশ কয়েক কোটি টাকা পেল। ফিরে এলাম লাস্ট ফ্রাইডে নাইট। সোমবার আর অফিস যাইনি। মঙ্গলবার অফিস যেতেই আমাকে এইচ আর ডাকল। আমি ভাবলাম এতদিনে প্রমোশনটা হল। তা রুমে যেতে বলল খুব নাকি দুঃখের সাথে আমাকে বলছে আমি আর কম্পানিতে নেই। একবার চেষ্টা করলাম আমার জন্য কম্পানির কত নাম হয়েছে সেসব বলার। মেল খুলে দেখালাম। দেখলাম বলে কিছু লাভ নেই। চলে এলাম ঘর। এখন সিভি আপডেট করে আবার চাকরীর খোঁজে আছি। এই রকম আছি। এরকম ই চলছে আই টি।


আসন্ন দুর্ভিক্ষে শিগগির দেশ ভরবে কানায় কানায়,

বৈদেশিক এখানে তাই ফাইভ-স্টার হোটেল বানায়।
মাফিয়ার আন্ডারে জিনিসপত্র করে দি চালান,
দুদিনে বড় লোক হব, ভাল না লাগলে পালান।
শিল্প বাঁচবে বলে শ্রমিকের শুধু আত্মাহুতি,
মালিক জানিয়ে দেয় অযথা এসব বিচ্যুতি।
আমাদের বোকা বানিয়ে ওনাদের নিরাপত্তা কনভয়,
আমলা প্রতিবাদ করলে একমাসে ট্রান্সফার হয়।
অসহায় হয়ে পড়ছে প্রলয় তাড়িত অনিকেত,
বুটে বেশি জোর ওয়ালা লোকেদের এ অভিপ্রেত।

কোথায় আর যাব। আজ খোলা মাঠেই থাকি। খোলা মনে থাকি। আজ ত পৃথিবীর সব চেয়ে বড় প্রগতির দিন। সভ্যতার পথে যে মুল উপাদান শ্রম তার আজ ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতিকে আমরা কিভাবে উদযাপন করছি প্রতিদিন তা আমরা জানি আমরা দেখছি। তাই যারা বিস্মৃত হয়েছি কাজের অধিকার আর মানুষকে বানিয়েছি লাট্টু, যারা পরিবার চালানর জন্য ছুঁড়ে দিয়েছি আট কি সাত ঘণ্টার হিসেবি কাজের সুখ, যারা স্কুল পালানর মত কাজ থেকে পালিয়ে যাই, যারা কাজের আনন্দে কাজ করে যাই শুধু আর যারা কাজ খুঁজে বেড়াই  - এই সবার জন্য এই একটা দিন। এই দিন থেকেই চিন্তার ধারা ঠিক করবার দিন। সবকিছু শুধরে নেবার দিন।

আজ মে ডে। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবার দিন। প্রবল এক ভরসার দিন। গৌতম বুদ্ধ যেদিন সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সেদিনটা নয়, যেদিন মা মেরী যিশুর জন্ম দিয়েছিলেন সংগ্রামী পরিবেশে সেদিনটা নয়, হজরত মহম্মদের ধর্ম প্রচারের প্রথম দিনটাও নয়, কিম্বা যেদিন হিন্দু ধর্মে মা দুর্গা এলেন শক্তি আর আনন্দময়ী হয়ে সেদিনটাও নয় এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খুশীর দিন।  পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খুশীর দিন হল আজ। কারণ মানুষ যে ধর্মের ই হোক না কেন বা যে শক্তির ই বিশ্বাসী হোক না কেনআস্তিক ই হোক বা নাস্তিক, এদের সবার শ্রমকে সম্মান জানাতে কোনও দ্বিমত নেই। নিজেকে সম্মান জানাবার জন্য  এই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষরা এক হয়ে যায় কোনও কুণ্ঠা নেই। তাই সবচেয়ে বড় উৎসবের দিন আজ। সবচেয়ে বেশী মানুষের জমায়েতের দিন আজ। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী ভরসার দিন আজ।