বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৫

করবী ~ অবিন দত্তগুপ্ত

​ মাটির দোতলা বাড়ি । দোতলার বাইরের রেলিঙটায়, ভিজে জামারা এলোমেলো হাওয়ায় জড়সড় । পেছনের ঘরের জানলাটার একটা পাট্‌ , সবসময় বন্ধ-ই থাকে । ছোট্ট ওমর জানে , মাঠে খেলতে নামলে ,আম্মি ওই অর্ধেক জানলাটা দিয়েই ওর উপর নজর রাখে । জানলাটা দিয়ে শুধু মাঠের বাঁ দিকটাই দেখা যায় । পড়া ফাঁকি দেওয়া দুপুরে , তাই ওমর রাইট হাফ । এমনিতে ,বাঁ পায়ের প্লেয়ার । মাঝমাঠ থেকে সত্যজিৎ একটা দারুণ থ্রু দিল । বল তাড়া করেও ধরতে পারল না ওমর । বলটা , মাঠের পাশের বটগাছ পেরিয়ে গেল । থ্রো-ইন । বলটা আনতে , বটগাছ পেরোতেই ওমর আরেকটা মাঠ দেখতে পেল । একদম একরকমের । সেই মাঠের-ও উত্তর দিকে ওর বাড়ি । সেই মাঠের-ও ডান পাশে একই রকমের বটগাছ । বলটা বটগাছের দিকে ছুটেই চলেছে । ওমর তাড়া করল । ধরতে পারল না । আবার বটগাছটা পেরলো , আবার একটা মাঠ দেখতে পেল । বল তাড়া করে সেটাকে পেরোতে , আরেকটা । তারপর আরেকটা,তারপর আরেকটা । সব একরকমের । বলটা গড়িয়েই চলেছে । "ওমর...ওমর, হতচ্ছাড়া ছেলে । পড়তে না বসে আবার মাঠে নেমেছিস ? এক্ষুনি ফিরে আয় । " আম্মির রাগী গলায় ভয় পেয়েই বোধহয় বলটা পেছন দিকে গড়াতে আরম্ভ করল । ওমর-ও পেছোতে লাগল পেরিয়ে আসা মাঠের পর মাঠ । বাস্তবের মাঠটায় পৌছতেই , একটা বিচ্ছিরি কড়া নাড়ার শব্দ । মোবাইল ঘড়ি বলেছে প্রায় ১১টা বাজে । বাইরে ভ্যাপসা গরম । ওমরের বাঘাযতীনের মেস-এ ফ্যান নেই । দরদর করে ঘামছে । অভ্যাসবসত বিছানার তলার মোটা লাঠিটা হাতে নিয়ে ওমর ছিট্‌কিনি খুললো । "রতন কাকু , তুমি ? "

বলেই খেয়াল হল দাঁত মাজা হয়নি । বাসি মুখে  কারো নাকের সামনে ফস্‌ফস্‌ করলেই , নাজিয়া পিট্টি দিত ছোটবেলায় । নাজিয়া , ওমরের আম্মি । 

 

                                                                                          ২

 

                         নাজিয়ার বয়স তখন ২০ । মেটে মেটে গায়ের রঙ । চোখ দুটোই কথা বলে । কিন্তু রতনের ভালো লাগত অর স্লোগান দেওয়ার ভঙ্গি । গলার শিরা ফুলিয়ে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান দিত নাজিয়া । রতন নাজিয়াকে ভালোবাসত । খোঁপায় মাঝে সাঁঝে লাল গোলাপ লাগাত নাজিয়া । লাল রঙটা ভালোবাসত ওরা দুজনেই । রতন দারুণ পোস্টার লিখতে পারত । ওর ঝাঁকড়া চুল মাথা , রুক্ষ মুখ , আধখাওয়া বিড়ি --- সব কিছুকেই ভালোবাসত নাজিয়া । ওরা একসাথে ছাত্র ফেডারেশন করত । বাড়ি থেকে ওদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি । অনেক লড়েও হেরে গিয়েছিল রতন । তিন বোনের দাদার পক্ষে বাড়ি ছাড়া সম্ভব ছিল না । নাজিয়া , ওসমান কে বিয়ে করে ।  ওসমান-ও মিছিলে হাঁটত । তখন ভরা জোয়ারের সময় । সক্কলে বাম ।

 

                          তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় বছর কুড়ি । নাজিয়া আর ওসমানের ছেলে ওমর । বয়স ১৫ । নাজিয়া এখন মহিলা সমিতি করে । মিড ডে মিলের রান্নার কাজ করে স্থানিয় একটি স্কুলে । রতন কাজ করে কারখানায় । সিটু করে রতন । ওসমান কন্ট্রাক্টর । ক্লাস নাইনে পড়ে ওমর । রতন আর নাজিয়া তখনো কমরেড । ওসমান নাজিয়ার স্বামি, কমরেড নয় আর ।

 

                          সালটা ২০০৯ ।  গ্রামে অপিরিচিত মুখের আনাগোনা বেড়েছে বেশ কিছুদিন হল । আশেপাশের চেনা মুখগুলো বদলে যাচ্ছে , আলোর গতিতে । বহুদিন বিস্মৃত হায়নারা, নখে শান দিচ্ছে । ওসমান দারুণ ঘুড়ি ওড়াতো । হাওয়ার দিক নির্ণয় করার একটা সহজাত ক্ষমতা ছিল ওসমানের । ওসমান দল বদলালো । বহুদিন ধরেই নাজিয়া আর ওসমানের সম্পর্কে চিড় ধরছিল ।ওসমানের ধারনা ছিল, কারণটা রতন । নাজিয়া জানত , কারণটা শিরদাঁড়া । দলবদলানোর ঘটনা চিড়কে , ফাটলে পরিণত করলো । এক ছাঁদের তলায় , ওরা দুজন তখন সম্পূর্ণ অন্য গ্রহের বাসিন্দা । শুধু ওমরের জন্য-ই ছাঁদ ভাগ হয়নি ।

 

                          আরও দু-বছর কাটলো । সেবার নির্বাচনে প্রচার করতে গিয়ে ,বেদম মার খেল নাজিয়া । রতনের মনে আছে, দিনটা ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ । সরকারি স্বাস্থকেন্দ্রে রক্তাক্ত নাজিয়াকে দেখতে ছুটে এসেছিল রতন । স্মিত হেসে নাজিয়া জানতে চেয়েছিল , " কেমন লাগছে আমায় দেখতে ? "

"রক্তিম ...  কি হয়েছিল ?"

"ওরা আমায় পার্টি ছাড়তে বলেছিল । বলেছিল প্রচার করা যাবে না । "

"কি জবাব দিলে ? "

"বলেছি , বাড়ির লোকের আদেশ অমান্য করে , আমি আমার প্রেমিকের সাথে দেখা করেছি । কেউ আটকাতে পারেনি । লাল ঝাণ্ডা , আমার প্রথম প্রেম । তোমরা আটকাবে কি করে ? ঝাণ্ডা ছাড়ব না । "

সেদিন রাতেই রতনদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় । গ্রাম ছাড়ে রতন । দু-মাস পরে নাজিয়ার চাকরি চলে যায় । এখন বাড়ি বাড়ি কাজ করে খায় , ছেলেকে পড়ায় । ওসমানের একটা পয়সাও নেয় না । নাজিয়া এখনো শিরা ফুলিয়েই স্লোগান দেয় ।

 

                                                         রতন আর নাজিয়ার গ্রামের নাম করবী । জেলা বর্ধমান ।

 

                                                                                         ৩

 

                              দারুণ ছবি আঁকে ওমর । পড়াশুনাতেও খারাপ নয় । ফুটবলটা বেশ ভালোই খেলে । হাতে-পায় দুরন্ত । লোকে বলে ওমরের চোখ দুটো ওর আম্মির মতো । ওমর আম্মির হাত ধরে মিছিলে যায় । আব্বু ওকে ঘুড়ি ওড়াতে শিখিয়েছে ।রতন কাকু, ফুটবল খেলা । ওমরের মিছিল ভালো লাগে না । স্লোগান ভালো লাগে না । ছবি আঁকতে , আর পাশে বাড়ির সাল্‌মাকে ওর বেশ ভালো লাগে ।

 

                              ঝরঝরে তরুণ , বেশ ভালোই কেটেছে জীবনের ১৫টা বছর । হঠাত-ই একদিন তাল কাটলো । স্কুল থেকে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে , সেদিন ওকে ঘিরে ধরে চারটে ছেলে । ওরা এ-গাঁয়ের নয় । কোন কথা না বলে , প্রথমেই দুটো চড় মেরেছিল ওরা । তারপর কলার চেপে ধরে, খিস্তি করে বলেছিল "তোর মাকে বলিস্‌ ,বেশী না উড়তে । হাল খারাপ হয়ে যাবে । সময় বদলাচ্ছে । " প্রচণ্ড অপমানিত হয়েছিল সেদিন ওমর । কোনদিন-ও রাজনীতি করেনি,শুধু আম্মির ছেলে বলেই মার খেয়েছিল সেদিন । " গ্রামের মানুষ তো তোমায় এত্ত ভালোবাসে , তবু কেন ওরা তোমায় গালি দিল আম্মি ? " - জানতে চেয়েছিল ওমর । উত্তরে নাজিয়া  নিঃশব্দে , গলির মোড়ে বাশের মাথায় বাঁধা, একটা  জরাজীর্ণ লাল ঝান্ডার দিকে আঙুল দেখিয়েছিল । তার পরদিন-ই স্বেচ্ছায় প্রথম মিছিলে হেঁটেছিল ওমর । আম্মিকে প্রচন্ড ভালোবাসত । আম্মির ঝান্ডাকে ভালোবেসেছিল সেদিন প্রথমবার । 

 

                              পরের দুবছরের ইতিহাস , শুধুই ভাঙ্গার । কখনো পরিবার ভেঙ্গেছে , কখনো সাইকেল তো কখনো পা । কিন্তু মন ভাঙ্গেনি ওমরের । লোকে বলত ওমরের চোখ দুটো ওর আম্মির মতো । ওমর জানতো , ওর ভেতরটাও আম্মি মতোই , ইস্পাতের । ২০১১র ১২ই ফেব্রুয়ারি আম্মিকে মেরেছিল ওরা । সেদিন স্বাস্থকেন্দ্রে ডাক্তারের চোখে চোখ রেখে ,ওমর বলেছিল " ওষুধ কেনার টাকা আমাদের নেই । লাল ওষুধ লাগিয়ে দিন । আম্মি ভালো হয়ে যাবে । " দিন দশেক বাদে পরীক্ষা দিতে স্কুলে গিয়ে ওমর জানতে পারে , তার নাম কাটা গেছে ।  সেদিনের সন্ধ্যা ওমর কোনদিন-ও ভোলেনি । সেদিন রাতেই তাকে খুনের ভুয়ো কেসে ফাঁসানো হয় । সেদিন-ই রাতে ওমর শেষবার সাল্‌মাকে দেখেছিল , সেদিন রাতেই শেষ দেখেছিল তার আম্মিকে । করবীকে ।

 

                               তারপর শুধুই পালিয়ে বেড়ানোর গল্প । এখন ওমর বাঘাযতীনে থাকে । ঘরে কোন ফ্যান নেই । ব্যাগে একটা লাল পতাকা আছে আর খাটের তলায় রাখা থাকে একটা মোটা লাঠি । শহরে কোন লাল মিছিলের খবর পেলে , মোটা লাঠিতে পতাকার কাপড় জুরে, সে মিছিলের পিছে পিছে হাঁটে । এভাবেই সে শহর চিনেছে । শহরের জল , খাওয়ারের স্বাদ , আকাশ ,পাখি , হাওয়া কোনটাই করবীর মতো নয় । শুধু মিছিলের মানুষ গুলোকে ওমরের আপন মনে হয় । ওমর প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখে । সাল্‌মার । আম্মির । করবীর । স্বপ্নের ভোরের ।

 

                                                                                         ৪

 

                                    রতনকাকুকে আজকে অন্যরকম লাগছিল । দরজা খুলে দেওয়ার পর অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে মুখের দিকে চেয়েছিল । প্রায় মিনিট দশেক চুপ করে থাকার পর কথা বললো রতন কাকু , "একটা খারাপ খবর দেওয়ার আছে ওমর । "

"কী ? "

"কাল রাতে ... " বলেই চুপ করে গেল রতন কাকু । দুগাল বেয়ে অবারিত ধারা । কাল রাত থেকেই কিছু খায় নি ওমর , তাই হয়ত মাথাটা ঘুরছিল । মনে হল , রতন কাকুর চোখ বেয়ে , গাল বেয়ে রক্তের ধারা বইছে যেন ... " কী, কী হয়েছে কাল রাতে ? "

"কাল রাতে , তোর আম্মিকে হায়নার বাচ্চারা ছিড়ে খুড়ে গেছে । নাজিয়া আর নেই । "

হঠাত-ই একটা সিনেমার মতো ঘটনা ঘটল । ওমরের চোখের সামনেটা সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল । তারপর স্পট পড়ল একে একে ৮বি মোড়ে , বাঘাজতিনের চায়ের দোকানে , ধর্মতলায় গড়িয়াহাটে , সারা শহর জুড়ে । সর্বত্র আকাশ থেকে পলাশ ফুল বৃষ্টি হচ্ছে । হচ্ছে তো হচ্ছেই । আকাশ ভেঙ্গে মাটি ভাসছে রক্ত পলাশে ।   জ্ঞান ফেরার পরে ওমর জিজ্ঞেস করেছিল " কাকু এ শহরে কোথাও পলাশ গাছ, আছে কি ? " রতনের কাছেও এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না । 

 

 

                                     মা কে কবর দিতে যাওয়া হয়নি ওমরের । এই ঘটনার প্রায় এক মাস বাদে গ্রামে ফিরেছিল রতন আর ওমর । মানুষের মিছিল তাদের নাজিয়ার কবরের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল । একটা মাঠ । তার উত্তর দিকে ওমরের বাড়ি । দোতলার জানলার ডানদিকের পাট্‌টা বন্ধ । মাঠের ডান কোনে একটা বুড়ো বটগাছ । বটগাছটা পেরোলেই --- আম্মির কবর ।  ওই বটগাছটা ছাড়া , আশেপাশে একটি গাছ-ও ছিল না । আম্মির কবরের বুকে , একটা লাল পলাশ পড়েছিল । কোথা থেকে , কত দূর থেকে উড়তে উড়তে এসেছে কেউ জানে না । গন্তব্যে পৌঁছতে এক মাস সময় লেগেছে , ওমর জানে । 

 

                                    লাল পলাশটাকে রতনের গোলাপের মতো লাগছিল । কবরটা------ নাজিয়ার কালো খোঁপা ।