সোমবার, ৯ মার্চ, ২০১৫

"রাজ্যটা এখনও গুজরাট হয়ে যায়নি"... স্যার ~ সুশোভন পাত্র

কিন্ত স্যার...

আপনি তো এখন প্রধানমন্ত্রী স্যার। গলার অনেক জোর। মিডিয়ার পালিশে চকচক করেন। আম্বানিদের টাকায় দশ লাখি স্যুট পরেন। কাজেরও অনেক চাপ। কত দিকে খেয়াল রাখতে হয়। কত শত জায়গায় ৫৬ ইঞ্চির ছাতি ফুলিয়ে বক্তৃতা দিতে হয়। তাই আপনার একটু আধটু স্মৃতিভ্রম তো হতেই পারে। রাজ্যসভায় উঠে দাঁড়িয়ে, "বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের  "তিন দশকের"  পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতেই পারেন তাঁদের  চোদ্দো পুরুষ কে নেতিয়ে নব্বই, হেদিয়ে হান্ড্রেড সেভেন আপনি করতেই পারেন স্যার। কিন্তু অঙ্ক যে বড় কঠিন স্যার ... 


আয়নায় মুখ দেখুন...


নভজোৎ সিং সিধু একবার বলেছিলেন ক্রিকেটে পরিসংখ্যান নাকি "Statistics are like mini skirts my friend. It reveals more than what it hides." রাজ্য পরিচালনার সাথে না হয় ক্রিকেটের দূরত্ব কয়েক যোজন, কিন্তু আজ আপনি  যে গুজরাট মডেলের গল্পের গরু কে গাছে চড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন আসুন আপনাকে সেই আয়নায় আপনারই মুখ দেখাই স্যার। 

আপনার সময়েই গুজরাটর আর্থিক উন্নয়ন হার  ছিল (১০.১%) । জাতীয় গড়ের ( ৮.৩%) থেকে অল্প বেশী হলেও তামিলনাড়ু (১০.৩%), মহারাষ্ট্র (১০.৮%) এমনকি আপনার অপছন্দের নিতিশ কুমারের বিহারের (১১.৪%) থেকেও অনেক পিছনে। ২০০০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত গুজরাটে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে ৭.২ বিলিয়ন ডলার এই একই সময় মহারাষ্ট্রতে ও দিল্লীতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে  যথাক্রমে  ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার ও ২৬  বিলিয়ন ডলার।  মানব উন্নয়ন সূচকে গুজরাটের অবস্থা ভয়ঙ্কর। ২০০৮ -র তথ্য অনুসারে ০.৫২৭ সহ বড় রাজ্য গুলির মধ্যে দশম স্থানে রয়েছে গুজরাট। কেরালা প্রথম (০.৭৯২) এমনকি হিমাচল প্রদেশ (০.৬৫২) পাঞ্জাব(০.৬০৫), মহারাষ্ট্র(০.৫৭২) হরিয়ানা (০.৫৫২) সবাই গুজরাটের থেকে ভালো জায়গায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া ২০১৩-র হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু ঋণের  শীর্ষে রয়েছে মোদীর গুজরাট(২৯২২০ টাকা)  সাক্ষরতাতে গুজরাট (৭৯.৩%) রাজ্য গুলির মধ্যে রয়েছে ১৮ তম স্থানে। জনগণনা ২০০১ গুজরাটে প্রতি হাজার পুরুষের তুলনায় মহিলা সংখ্যা ছিল ৯২০। ২০১১ এর টা কমে দাঁড়িয়েছে ৯১৮ তে। যেখানে জাতীয় গড় ২০০১ (৯৩৩) থেকে ২০১১ তে বেড়ে হয়েছে ৯৪০। এনএসএসও রিপোর্ট অনুসারে গুজরাটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার গত ১২ বছরে প্রায় শূন্য তে এসে ঠেকেছে। এটা বাস্তব যে গুজরাটে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু টা সাধারন মানুষের কাছে পৌছায় না। এখানেও গুজরাটের স্থান রাজ্যগুলির মধ্যে ১৬তম।  ২০১২-১৩ র প্ল্যানিং কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে গুজরাটে দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকে প্রায় ২৩% মানুষ যা অন্ধ্র, হরিয়ানা, কেরালা, ত্রিপুরা, হিমাচল প্রদেশ থেকে অনেক বেশী। এমনকি বিশ্ব ক্ষুধার সুচকে  গুজরাট ১৯৯৪ সালে  যেখানে ছিল দশম  স্থানে মোদীর উন্নয়নের চোটে তাঁরা আরও নেমে এখন ১৩ তম।  দ্রুত বেড়েছে নিরক্ষরের সংখ্যা। ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত গুজরাটে বাজেটের মাত্র .৭৭% ব্যায় করা হত স্বাস্থ্য খাতে যা তুলনামূলক ভাবে গরীব বিহার(১.১%) ও ওড়িশার( ১.৬৬%) থেকেও কম। আপনার গুজরাটেই ৪২% শিশুর ওজন স্বাভাবিকের থেকেক কম স্যার সে খবর রাখেন আপনি ? জন্মের সময় শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৪। অনূর্ধ্ব ৫ বছরের ৫০% অপুষ্টিতে ও ৭৫% রক্তাল্পতার শিকার। মাত্র ৫০% শিশু হাসপাতালে জন্মায়। প্রসব কালীন মায়ের মৃত্যু প্রতি হাজারে ৬২.৮ । ৬৭% গ্রামীণ পরিবারে নেই শউচালয়। আর আমুল,আম্বানি,আদানি, নিরমা, টরেন্ট, জাইদাস, ক্যাদিলা, আইপিসিএল, জিএসএফসি , জিএনএফসি এমনকি রাজকোটের মেশিন শিল্প বা ডিসেল ইঞ্জিন শিল্প, সুরাটের ও ভাবনগরের হীরা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ; এসবই আপনি  মুখ্যমন্ত্রী হবার আগেই গুজরাটে ছিল। তাই আগে আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন স্যার...  



দাঙ্গাবাজের সার্টিফিকেট...


৫০-র দশকে  রাজনৈতিক বন্দীদের নিঃশর্তে মুক্তির দাবী, ঐতিহাসিক শিক্ষক আন্দোলন, ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ক্যালকাটা ট্রামওয়েসের রাষ্ট্রীয়করনের দাবীতে আন্দোলন, ১৯৫৯-র খাদ্য আন্দোলন, বাংলা-বিহার সংযোজনের বিরুদ্ধে এমনকি পর্তুগীজ শাসন মুক্ত গোয়ার দাবীতে প্রতিবাদ গড়ে তোলাতে কোনও ভূমিকাই কি থাকেনি এই "বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের ?  ৭৭-এ দলমত  নির্বিশেষে ১৭০০০ রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ১০০০০ এর বেশী মামলা প্রত্যাহারও করেনি এই বিদেশ থেকে আমদানি করা নীতি'র গর্ভজাত সন্তানরা ?  দেশে প্রথম ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ১৮ বছরের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পৌরসভা নির্বাচন,মহিলাদের জন্য অর্ধেক আসন সংরক্ষণও  চালু হয়নি এই "তিন দশকে" ? দেশের মোট কৃষি জমির  ৪% -র কম পশ্চিমবাংলাতে হওয়া সত্ত্বেও ২০১১ পর্যন্ত দেশের ২৩% এবং উপকৃত ৫৫% (মোট ৫০ লক্ষ) মানুষের স্বার্থে ভূমি সংস্কারও হয়নি এই  "পিছিয়ে পড়া রাজ্যে ?" ২০০৫-০৮ সময়কালে যখন তৎকালীন রাজ্যসরকারের বিরুদ্ধে শিল্পায়নের জন্য কৃষকদের জমি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছিল তখনও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে ৩০,০০০ একর জমি বণ্টন করেছিলো এই "বিদেশ থেকে আমদানি করা নীতি'র" গর্ভজাত সন্তানরাই। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদিত খাদ্যশস্যের পরিমান (১৭০ লক্ষ টন) সারা দেশের মোট উৎপাদিত খাদ্যশস্যের  ৮% । ২০১০-১১ সালে  চাল, পাট, আলু, সবজি, ফল, মাছ  উৎপাদনে  পশ্চিমবঙ্গ কে দেশের  সেরা করেনি "বিদেশ থেকে আমদানি কর আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানরা ?  ৭০০০ সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতি, ৩৭টি বহুমুখী হিমঘর, নেতাজী সুভাষ কৃষি বিপনন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি এই "পিছিয়ে পড়ার তিন দশকে" ?

আপনার, কেন্দ্রীয় সরকারের রেজিস্টার জেনেরল অফ ইন্ডিয়ার সার্ভে রিপোর্ট অনুসারে  ১৯৯৭-২০০৯ স্থূল জন্ম  হ্রাসের জাতীয় গড় যেখানে ২০% সেখানে  পশ্চিমবঙ্গের  ২৫%, দেশে চতুর্থ। ২০০৮ সালে গ্রাম ও শহরের মৃত্যু হারের পার্থক্যের জাতীয় গড়ের (২৬.২%) তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে (৭.৫%)। ওই একই সার্ভে রিপোর্ট অনুসারে জাতীয় গড় ২.৫৪-র তুলনায় তৎকালীন  পশ্চিমবঙ্গে মাতৃত্বকালীন মৃত্যু হার, ১.৪১ ছিল দেশের মধ্যে অন্যতম সেরা এবং শিশু মৃত্যু হার হ্রাসে তামিলনাড়ুর পরেই ছিল পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের ৭৩% মানুষের কাছে সরকারী চিকিৎসা সহজলভ্য।

ন্যাশানাল স্যাম্পেল সার্ভের তথ্য অনুসারে "বিদেশ থেকে আমদানি করা নীতি'র" গর্ভজাত সন্তানদের আমলেই ১৯৯০-২০০৪ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে জনগণের মাথা পিছু আয় এবং গ্রামীণ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে জাতীয় গড়ের থেকে দ্রুত। একাদশ প্ল্যনিং কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৪-০৫ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিতে উন্নয়নের হার ছিল ২.৬৭% যা জাতীয় গড় ১.৮৭% থেকে অনেক বেশী ও বৃহৎ রাজ্যগুলির মধ্যে তৃতীয়। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ ১৯৯০-র দশকে( ৬.৭৫%) এবং ২০০০-র দশকে( ৬.৬১%)  আভ্যন্তরীণ মোট উৎপাদনে ছিল দেশের অন্যতম সেরা। এই পিছিয়ে পড়ার সময়েও  ২০১১ তে পশ্চিমবঙ্গে দারিদ্র সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২৮.৬% যা ১৯৭৩-৭৪ এর কংগ্রেস শাসিত বাংলার ৭৩.২% থেকে ঢের ভালো। ২০১১ তে এই "বিদেশী আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের রাজ্যেই সাক্ষরতার হার (৭৭.১%) শুধু ৭০-র দশকের (৩৩.২%) থেকে শুধু  উন্নতই ছিলনা জাতীয় সাক্ষরতার হারের (৭৪.০৪%) থেকেও ছিল ভালো। ১৯৭৬-৭৭ সালে আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য বরাদ্দ (৮.৫ কোটি) এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ (৫.৬ লক্ষ)  ২০১১-তে বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৬৭৪ এবং ৬১০ কোটিতে। এই "বিদেশী আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের  আমলেই ২০০৯-১০ এর তথ্য অনুসারে সারা দেশে ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পে সংগৃহীত অর্থের (৩৬,৩৩৩.৩৯ কোটি) সর্বাধিক ২৫% ( ৮,৮৫৬.২১ কোটি) সংগ্রহ হত। এছাড়াও ৬১টি অসংগঠিত শ্রমিকের জন্য চালু হয় স্বাস্থ্যবীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ১ লক্ষ ২১ হাজার বৃদ্ধ আদিবাসীর জন্য পেনশেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে মহিলাদের অংশগ্রহন, নারী নিরাপত্তা,  ১৪ লক্ষাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠী, মাত্র ৪% হারে ঋণের ব্যবস্থা, চা বাগিচার শ্রমিকদের জন্য ভাতা চালু হয়নি এই "তিন দশকে" ? এরাজ্য শুধু অস্পৃশ্যতার অভিশাপ মুক্তই ছিল না,ছিল সাম্রদায়িক দাঙ্গা মুক্তও। দেশে শিখ বিরোধী দাঙ্গা  হয়েছে, বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে, গুজরাটেদাঙ্গা হয়েছে – এরাজ্য ধিক্কার জানিয়েছে।"বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের জন্যই কিন্তু রাজ্যটা কিন্তু আজও গুজরাট হয়ে যায়নি। তাই আপনি আজ প্রধানমন্ত্রী হলেও, আপনার মত দাঙ্গাবাজের সার্টিফিকেট  আর যাই হোক "বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের লাগবে না স্যার।


ঐ ৩৪


হ্যাঁ এরপরও অনেক জরুরী কাজ বাকি রয়ে গিয়েছিলো।শিল্পায়ন, কৃষকের মালিকানা ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সমস্যা ছিল।  রাজনৈতিক  বিচ্যুতিও হয়েছে একাধিক। কর্মসূচী সফলভাবে রুপায়নের দ্রুততা ও অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা সহ কিছু বিষয়ে ভুল ত্রুটিও হয়েছে। তাই অনেক কাজই হয়নি। তবে তার সাথে আরও যেটা হয়নি স্যার,"রাজ্যটা এখনও গুজরাট হয়ে যায়নি..."তাই ৫৬ ইঞ্চির বুকের ছাতি নিয়ে  সাদা কে সাদা আর কালো কে কালো বলার সাহস যে দেখাতে হবে স্যার। তথ্যের আর ইতিহাসের বাস্তবতার ভিত্তিতে বিচার করতেহবে স্যার ৩৪ কে। আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন স্যার আপনি সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী ? এবার তো অন্তত সঙ্ঘপরিবারের দাঙ্গাবাজ থেকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠুন...