শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

হিন্দুত্ববাদ - সংস্কৃতি ও শ্রেণী ~ শতদ্রু দাস

​হিন্দুত্ববাদকে শুধুমাত্র একটা সাংস্কৃতিক ইস্যু বলে ভাবতে অসুবিধে আছে, যে কোনো বামপন্থীরই থাকবে। আর এটাই বোধ হয় বামপন্থীদের আর অন্যদের হিন্দুত্ববাদ নিয়ে মূল্যায়নে তফাত। আমার মতে বিজেপি  হিন্দুত্ববাদকে ব্যবহার করে তার অর্থনৈতিক এজেন্ডা গুলোকে আড়াল করতে। ধর্মের সুরসুরি দিয়ে তারা মানুষের নজর ঘুরিয়ে রাখে। হিন্দুত্ববাদকে কাজে লাগিয়ে তারা শ্রমিক শ্রেনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বাধা দেয়। আমার কাছে হিন্দুত্ববাদের সবচেয়ে বড় বিপদ এটাই। 


ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি যে অর্থনৈতিক দিশার দিকে এগিয়েছে সেটা কিরকম? এনরেগাকে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে, বিভিন্ন সমাজ কল্যাণ মূলক সরকারী প্রোগ্রাম গুলোকে কাটছাট করছে, শ্রম আইন শিথিল করা সুরু করেছে, আরো করবে। বাজেটের রিভিশনে বিভিন্ন সামাজিক খাতে যেমন শিক্ষা স্বাস্থ্যে ৭-৮ হাজার কোটি টাকা করে আর্থিক অনুদান কমিয়েছে। এটা ব্যাকডোর দিয়ে করা হয়েছে যাতে হই চৈ না হয়। জমি অধিগ্রহণ আইন পাল্টে কর্পোরেট জমি লুঠকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে, বিভিন্ন লাভজনক সরকারী সংস্থা জলের দরে বেচে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে, রেশনে কেরোসিন দেয়া বন্ধ করেছে, সরকারী ব্যাঙ্ক এসবিআই-কে বাধ্য করেছে আদানিকে বিদেশে বিনিয়োগ করার জন্যে ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিতে যাতে আর. বি. আই গভর্নর বাধ্য হয়েছেন বলতে যে কর্পোরেটের অনাদায়ী ঋণ সরকারী ব্যাঙ্কগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা। এনরেগার সুফল নিয়ে অনেক অর্থনীতির পেপার লেখা হয়েছে, ভারতের বেশিরভাগ বিখ্যাত অর্থনীতিবীদ এনরেগার পক্ষে বলেছেন, এমনকি আর. বি. আই পর্য্যন্ত একটা রিপোর্ট বের করেছে যাতে এনরেগার প্রসংসা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কথা শুনতে নারাজ মোদী সরকার। ভুলে গেলে চলবেনা যে এই এনডিএ-র আমলেই FRBM নামক কলা কানুন চালু করা হয় যার ফলে সামাজিক খাতে সরকারী খরচ ব্যাপক হারে কাটছাট করা হয়। এই কাটছাটের ফলেই ২০০০-২০০৮ এর মধ্যে আমাদের দেশ দক্ষিন এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় প্রায় সমস্ত মানব উন্নয়নের মাপকাঠিতে পিছিয়ে পড়তে থাকি। অমর্ত্য সেন এই নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন আউটলুক পত্রিকায়। কংগ্রেস যে এই বিষয়ে বিজেপির চেয়ে ভালো তা নয় তবুও ভোটের খাতিরে তাদের একটা মুখোশ রাখতে হয়, যাকে ওরা বলে "growth with a human face". তাই ওরা RTI, এনরেগা, চাষীদের ঋণ মকুব, খাদ্যের অধিকার আইন, অরণ্যের অধিকার আইন ইত্যাদির মত সব প্রকল্প নেয়। কিন্তু  বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ভেক থাকার ফলে মানবিক মুখোশ টুকুও পরার দরকার হয়না, ওরা নগ্নভাবে নিও-লিবেরাল নীতি অনুসরণ করতে পারে। নিও-লিবেরাল নীতির জন্যে যে ভোট কমবে তা হিন্দুত্বর হাওয়া তুলে মেকআপ করে দেবে।              


এবার যারা উচ্চবিত্ব বা মধ্যবিত্ব তাদের কিন্তু বিজেপির এই নগ্ন নিও-লিবেরাল নীতি নিয়ে বিশেষ সমস্যা নেই। তারা বরং লাভবান হয়েছে এসব নীতির ফলে। এই শ্রেনীর মানুষের মধ্যে যারা ধর্ম নিরপেক্ষ এবং উদারপন্থী তাদের কাছেও  বিজেপির যেটুকু সমস্যা তারা দেখতে পান সেটুকু মূলত হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি নিয়ে। হিন্দুত্ববাদ একটা সামন্তবাদী সংস্কৃতিকে তোল্লাই দেয় যার নিজস্ব সমস্যা অবশ্যই আছে কিন্তু শুধুমাত্র সেই সংস্কৃতির পশ্চাত্পর চেতনাকে যদি হিন্দুত্ববাদের মূল বিপদ বলে চিন্হিত করি তাহলে তার আসল উদ্দেশ্যটা অধরা থাকে, যা হলো শ্রেণী চেতনাকে দুর্বল করা।  এখানে মুসলমান মৌলবাদের প্রসঙ্গটাও টানবো। যারা হিন্দুত্ববাদকে শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা বলে মনে করে তারা হিন্দু মৌলবাদ আর মুসলমান মৌলবাদের তুলনামূলক বিচার করতে গিয়ে দ্বিতীয়টাকে বেশি বড় বিপদ বিচার করতে পারে। তার কারণ হলো আধুনিকতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদ যতটা না জোরদার এবং আক্রমনাত্বক তার চেয়ে বেশি আক্রমনাত্বক মুসলমান মৌলবাদ। হিন্দুত্ববাদীরা যেসব প্রাক-আধুনিক সামন্তবাদী সংস্কৃতি প্রচার করে সেসব ততক্ষণ আর ততটুকুই করবে যতক্ষণ বাজার অর্থনীতি তাকে করতে দেবে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে বাজার মেনে নেবেনা। এটা হিন্দুত্ববাদীরা ভালই জানে। মুসলমান মৌলবাদ কিন্তু বাজারের ওপর নির্ভরশীল না তাই বাজারের মন যুগিয়ে চলার দায় তার নেই, বরং বাজারের উল্টোটাই করবে। এর ফলে একটা সম্ভাবনা থাকে অনেক উদারপন্থী মানুষের এটা মনে করার যে হিন্দুত্ববাদীরা তমসাচ্ছন্ন ঠিকই কিন্তু মুসলমান মৌলবাদীরা সেই দোষে আরো বেশি দোষী। আমার মনে হয় হিন্দুত্ববাদের শ্রেণী শক্তিকে দুর্বল করার ভূমিকাকে না দেখতে পেলে এরকম সিদ্ধান্তে আসবেন অনেকেই।    


হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি দলিত চেতনা আর নারীবাদকেও দুর্বল করে যেটার প্রশ্ন শ্রেণীর থেকে ভিন্ন এবং সেটাও বড় বিপদ। কিন্তু আমি যেহেতু সেই বিষয়ে খুব বেশি জানিনা তাই লিখলাম না।  আশা করি কেউ এই লেখা পড়ে ভেবে বসবেন না যে আমি সাংস্কৃতিক প্রান্তিকীকরণকে ছোট সমস্যা বলছি। আমি শুধু বিপদের একটা দিক তুলে ধরেছি।