রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৪

ঘটি - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

এই কয়েক দিন আগের কথা। সাগরপারে থাকা এক বন্ধু বিজয়া করতে ফোন করেছিলো। কথায় কথায় পুরোনো স্মৃতি ফিরে ফিরে এলো। চল্লিশে পা রাখলে এসব স্মৃতিচারন বেড়ে যায় একটু। ডেকার্স লেনের চিত্তর হোটেল থেকে সাবিরের রেজালা, ব্রাজিল, মোহনবাগান, সিপিএম, পুরোনো বান্ধবীরা, ভাঙ্গা প্রেম, পূজাসংখ্যার পড়তে থাকা মান, ছানাপোনার কির্তি-কলাপ এসব পেরিয়ে কথার তোড় যখন একটু কমেছে, তখন বর্তমানে ফিরলাম। কি করছি, কি করছিনা এই সব। বন্ধু আমাদের পাঁচফোড়নের নিয়মিত পাঠক। তবে লেখালিখি তার ধাতে নেই। বেজায় কুঁড়ে। জানি এ লেখাও সে পড়বে, পড়ে তার “কুঁড়ে” খেতাবের জন্যে আমাকে মনে মনে একটু খিস্তিও দেবে, কিন্তু ওই যে, কুঁড়ের বেহদ্দ, তাই এসব নিয়ে কিস্যু লিখবে না। বন্ধু ১০০% ঘটি, কাজেই এটাই তার স্বভাব। মনে মনে যতই খারাপ লাগুক, মুখ ফুটে সেটা বলতে তার আলিস্যি। কথায় কথায় বললো পাঁচফোড়নে নাকি বাঙালদের নিয়ে প্রচুর লেখা বেরচ্ছে, আর সেগুলো বেশ মুখরোচক ও সুখপাঠ্য। কিন্তু ঘটিদের নিয়ে কোনো লেখা টেখা কেন নেই, সেটা তার মাথায় ঢোকেনা। এর পর, স্বগতোক্তি করলো – জয়ঢাক তো আছে, কিন্তু সেটা পেটায় কে? ওই যে , আর পাঁচজন ঘটির মতো আমাদের দুজনের ও নিজেদের নিয়ে বলতে গেলে এন্তার আলিস্যি। কিন্তু অন্যদিকে, বৈঠকি আসরে বসিয়ে দিন, ঘটিদের মুখে তুবড়ি ছুটবে। তড়বড় করে কথা বলাটা আসেনা ঠিক, ঘটিদের মধ্যে একটু বৈঠকি মেজাজ সব সময়েই থাকে। ধিরে সুস্থে তারিয়ে তারিয়ে গপ্প বলা হবে। সে গপ্প আবার পরিবেশিত হবে নিজস্ব ধারায় আর বিস্তর রসিকতার সঙ্গে। সে রসিকতার রস গ্রহন করতে আবার মাঝে মাঝে একটু সময় লাগতে পারে। এই যেমন আমার এক দাদা-স্থানীয়, তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বলতে শুরু করলেন বাড়ির রান্নাবান্না নিয়ে। ওনার অর্ধাঙ্গিনি বাঙাল, উচ্চশিক্ষিতা ও শিক্ষিকা। দাদা বললেন বাঙালরা ভালো রান্না করে। তারপর একটু থেমে বললেন, অন্ততঃ সেরকমই বলে। ব্যাস হয়ে গেল। কিন্তু এ রসিকতা বুঝতে একটু সময় তো লাগেই। তাই ঘটিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে, সময় বড় প্রয়োজন। আর ওই যে, বৈঠকি মেজাজ, সেটা ছাড়া ঘটিদের মুখ খোলানো খুব কঠিন। হ্যাঁ হুঁ করবেন তাঁরা, প্রয়োজনে দু চারটে প্রয়োজনীয় তথ্যও দেবেন। সেটুকুই। আড্ডা জমবে না। অথচ এ লোকটাই ভাইফোঁটায় খাওয়া দাওয়ার পর নাকি এক টানা ১১ ঘন্টা টানা আড্ডা দিয়েছিলো।

ঘটিদের কিছু কিছু শব্দ ও তার প্রয়োগ নিজস্বতা রাখে। এই যেমন ধরুন “সর্বনাশ”। মুজতবা আলীর মত মানুষও ঘটিদের সর্বনাশ বলা নিয়ে এক পাতা লিখে গেছেন। প্রচণ্ড ভিড়ে ঠাসা একখানা বাস এসে দাঁড়ালো বাসস্ট্যান্ডে। ঘটি দেখলেন বাসের দিকে। অস্ফুটে বললেন “সর্বনাশ”। শীতের রাত, খুব গুটিশুটি মেরে কম্বলের তলায় ঢুকে ঘটি দেখলেন ঘরের আলো নেভানো হয়নি। আবার কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে আলো নেভাতে যেতে হবে। “সর্বনাশ”।  আজকাল ঘটিদের ভাষাগত নিজস্বতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। খব সহজেই নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের বলতে শুনি “আড় কত দারিয়ে থাকবো?”। সব কিছুই বদলায়, কাজেই ভাষাও বদলাবে। উচ্চারন বদলাবে। ভুল উচ্চারন হলেও সেই ভুলটা বেশিরভাগ লোকে বললে, সেটাই চলবে। আমার এ নিয়ে কোনো আফশোস নেই। তবে, যেটা নিয়ে অল্প হলেও আছে, সেটা হলো, ঘটিদের জেলায় জেলায় নিজস্ব কিছু প্রবাদ প্রবচন ও বাক্যরীতি আছে, যে গুলো এখন অনেকটাই শুনিনা। ভাষা পাল্টাবে, কিন্তু ওই যে “স্বভাব যায় না ম’লে”। নিজেদের ব্যাপারে যতই মুখচোরা হোন না কেন, এক থালা মিষ্টির সামনে তাঁরা পৃথিবীর অন্য যেকোনো জনগোষ্ঠির থেকে বেশি মুখ খোলা। বিশ্বাস করুন, ১০০% খাঁটি ঘটি কখনো, কোনো কালে, মিষ্টি গুনে খাননি। আশু মুখুজ্যের গোঁফের দিব্যি। যদি কেউ সেটা করে থাকেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন, ব্যাটার চতুর্দশ পুরুষে নির্ঘাত ভেজাল আছে। মুজতবা আলী যেমন দেখেছিলেন, খাঁটি পাঠান কখনো আটক্‌ (সিন্ধু নদ) পেরোয় না, আর রমজান খান পেরিয়েছিলো বলে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছিলো, রমজান খানের ঠাকুমা পাঞ্জাবী। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু (সে আবার নির্ভেজাল বাঙাল) শুনে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলো, রোজ রাতে মিষ্টি আনা হয় বাড়িতে। না হলে খাওয়াই হবে না। সে বেচারা রাতে আয়েস করে ভাত মাছ খায়। তার সঙ্গে ক্ষিরকদম, লবঙ্গলতিকা, পান্তুয়া বা কেশরভোগ চলেনা। আর ঘটিদের, এই সব ছাড়া, রাতের খাওয়া অসম্পুর্ন। অর্থনৈতিক অবস্থা ভেদে বোঁদে, খেজুর গুড় এমনকি ভেলিগুড় পর্যন্ত চলতে দেখেছি। কিন্তু মিষ্টি ছাড়া রাতের খাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। বাইরের দেশে থাকার সময় আমি এক শিশি জ্যাম কিনে রাখতাম। খাবার শেষে এক চামচ মুখে দিলে, তবে খাওয়া শেষ হতো।

খাওয়া দাওয়ার কথা যখন উঠলোই, তখন বলি, ঘটিদের লুচি প্রেম অস্বাভাবিক ধরনের বেশি। আমার পৈতের পর আমার ঠাকুমা এক বছর নিরামিষ খাবার নিদান নাকচ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মা অতি কষ্টে একটি মাত্র নিয়ম আমাকে মানাতে পেরেছিলেন, সেটা হলো, ভাত খাবার সময় কথা বলা চলবে না। কথা বলে ফেললে, আর ভাত খাওয়া যাবে না। ভাত খাওয়া যাবেনা বটে, কিন্তু অন্য কিছু খেতে বাধা নেই। কাজেই, আমি একটি বছর এই নিয়মের নিদারুন ফায়দা তুলেছিলাম। আমার মত মুখচোরা লাজুক ছেলেও অধিকাংশ দিন স্কুলে যাবার সময় কথা বলে ফেলত, আর ফল স্বরুপ একখানা চিরকুট পাওয়া যেত মায়ের থেকে। স্কুলের ঠিক পাশেই আমার কাকু-কাকিমা থাকতো। আমি সেখানে কাকিমা কে চিরকুট দিয়ে চলে যেতাম ক্লাসে। টিফিনের সময় কাকিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতো। আমাকে স্কুল থেকে বেরোতে দেখলেই কড়া চড়তো, আর আমি খান কুড়ি-বাইস লুচি খেয়ে স্কুলে ফিরতাম। প্রতি মাসে ভক্তি ভরে একাদশী ও পালন করেছি। কারন সেদিন ও লুচি খাওয়ার দিন। দু বেলা। এখনো প্রতি বছর, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপূজোর অষ্টমী এসব দিনে নিয়ম করে দু বেলা লুচি, যাকে ঘটি ভাষায় আমরা বলি ময়দা খাওয়া। কলেজে পড়ার সময় এক বছর আমার এক বন্ধু অষ্টমীর দিন কবজি ডুবিয়ে পাঁঠার মাংস খাবার আমন্ত্রন জানিয়েছিলো। বিনীত ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমার কাছে, অষ্টমীর ময়দার চেয়ে সুস্বাদু খাবার পৃথিবীতে নেই। বন্ধু কে বলেছিলাম, মাংস তো নবমী তে খাবোই। সঙ্গে মিঠে মিঠে ঝুরঝুরে সুগন্ধী পোলাও।

ঘটিদের সমালোচনা বড় অদ্ভুত। ধরুন আপনি একটা ছবি এঁকেছেন, এবং নিজেরই পছন্দ হয়নি ছবিটা। খাশ ঘটি ছবি দেখে বললেন – “বাঃ বেশ এঁকেছ তো, দিব্যি হয়েছে, চালিয়ে যাও!“। আপনি প্রশংসা শুনে বিগলিত হলেন। কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। আপনার পাশে আরো একজন ছবি এঁকেছে, এবং আপনি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছেন, সেটা আপনার চেয়ে অনেকটা ভালো এঁকেছে। ঘটি ওটার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন – “সর্বনাশ, করেছ কি হে? এ তো সাংঘাতিক কান্ড, তোফা হয়েছে ছবিটা!!!”। এবারে আপনি বুঝলেন প্রসংসা কাকে বলে। খাশ ঘটি, মুখের ওপর কখনো চটকরে কোন কিছু কে খারাপ বলবে না। ওটা আপনাকে বুঝে নিতে হবে। বাঙালদের কথা একদম সোজাসুজি, স্পস্ট সরল। তারা মুখের ওপর বলে দেয়। ঘটিদের কথায় কতগুলো স্তর আছে। কারোর সরাসরি নিন্দে করার চলন ঘটিদের মধ্যে নেই বলবো না, তবে বেশ কম। আপনাকে তার প্রশংসার ধরন দেখে ব্যাপারটা বুঝে নিতে হবে। শেষে ফিরি আর এক বন্ধুর কথায়। এই বন্ধু খাশ উত্তর কলকাতার ঘটি, বেঙ্গালুরুতে একখানি বহুজাতীক সংস্থায় কর্মরত। আমি তখন বেঙ্গালুরুতে থাকি। বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে মাঝে মাঝে কাছেই এক বাঙালি রেস্টুরেন্টে খেতে যেতাম। সে খাওয়া চলতো ঘন্টা দেড়েক। জমাটি আড্ডা। আর অদ্ভুত ভাবে, সে আড্ডায় সবাই ছিলো ঘটি। এরকম নিছক ঘটি আড্ডা আর একবার বিদেশে পেয়েছিলাম, সানফ্রান্সিকোতে। আমাদের সবার সঙ্গে এই বন্ধুটি তারিয়ে তারিয়ে খেতো, আর মাঝে আফসোস করতো, রাত্রে বাড়িতে তাকে আবার অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে হবে। আমি একদিন বলেছিলাম – তোমার বাড়ি তো পাশের পাড়ায়, এখান থেকে নিয়ে গেলেই পারো মাঝে মধ্যে, তাহলে আর অখাদ্য খেতে হয় না। এক গাল হেসে অমিত দত্ত জবাব দিয়েছিলো, ভাইরে, ঘটিরা কবে থেকে একা একা সুখাদ্য খেতে শুরু করলো?


অনেক কিছুর পারেনা ঘটিরা। একা একা কোন কিছু উপভোগ করতে একেবারেই পারেনা। ঘটিত্বের অন্যতম মাপকাঠি, গুষ্টিসুখ উপভোগ করা।