মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৪

পুজো ও বাঙাল ঘটির ব্যাপার স্যাপার ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

জন্মসূত্রে 'বাঘ' হবার দরুণ, বেশ ছোটবেলা থেকেই ব্যাপারটা উপভোগ করে আসছি। বাবা অইলো গিয়া এক্কেরে বরিশাইল্যা কাঠ বাঙাল, আর মা নেহাতই হুগলী জেলার ঘটির মাইয়া। তা পুজো আচ্চার দিনে, আমাদের বাড়ীর নিয়ম ছিল, নিরামিষ আবার কি ? লক্ষ্মীপুজো হোক, বা দুর্গাপুজোর অষ্টমী বা সরস্বতী পুজো, নন ভেজ মাস্ট। আমার ঠাকুমা নাকি মা কে বলতো, "পুজার দিনে, এয়োস্ত্রীগো নিরামিষ খাইতে নাই মনি, ঘরে কিছু না থাকলেও, চাড্ডি পেঁয়াজ কুচাইয়া লইবো গিয়া।" 

তারপর ঠাকুমা তো চলে গেলেন, মা জমিয়ে রান্নাঘরে ঘটি রুল চালু করে দিল। অষ্টমীতে "ময়দা খাওয়া", সরস্বতী পুজোয় খিচুড়ি, লক্ষ্মীপুজোতে (যদিও এটা ঘটিদের নেই আদৌ) পোলাও। আমিও ছোটবেলা থেকে ঘটি খাওয়া দাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। 

তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমার পিসি একদিন ঘরে এসে তুমুল বাওয়াল দিল। এ কি, তোরা ছেলেটাকে অষ্টমীর দিন নিরামিষ খাওয়াস, ঘোর অন্যায়। মানবসভ্যতা বিপন্ন হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই ননদ এবং বৌদির সম্পর্ক একটু অম্লমধুর হয় সকলেরই জানা। সেদিন থেকেই, আমার বাবা সাপোর্ট পেয়ে কিরকম হিংস্র হয়ে গেল। তুমি শালা ঘটির মেয়ে, কি করে বুঝবে আমাদের ব্যাপার স্যাপার, অতএব, পরের অষ্টমীতেই মাছ লাও। মা একটু গাঁইগুঁই করলেও, শ্বশুর বাড়ীর রুল ভেবে মেনেই নিল আবার। 

সরস্বতীই একমাত্র অনেক দিন অবধি নিরামিষে বেঁচে ছিলেন। 

তারপর কালের নিয়মে আমার বিয়ে হল, আমার গিন্নী যিনি এলেন, তিনিও ঘটি, এবং উত্তরপ্রদেশীয় প্রবাসী। ইনি যদিও "মাছ ছাড়া ভাত মুখে তুলতে পারেন না", কিন্তু পুজো ইত্যাদির সময় "আঁশ খাবে ? তওবা তওবা, গন্ধি বাত" । ঘরের সমস্ত নারীশক্তি যদি বিপক্ষ শিবিরের হয়, তাহলে সসেমিরা অবস্থা তো হবেই। 

এতদসত্ত্বেও বেঁচে গেলাম। তৃতীয় নারীর আবির্ভাবে। যখন আড়াই বছর বয়স, তখন থেকেই নিদারুণ শাক্ত হয়ে উঠলো। চার বছর বয়সে, শ্রাদ্ধবাড়ীতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে হুঙ্কার দিয়েছিল, "চিকেন কিধর হ্যায়"। অতএব, আমি বাঁচলাম, আমার বাবা বাঁচল, অষ্টমী বাঁচল, সরস্বতীর কপালে জোড়া ইলিশ জুটল, এমন কি আগামী কাল লক্ষ্মী পুজোর দিনও সকালে জমিয়ে ইলিশ মাছের আয়োজন হয়েছে, রাতে যদিও আমি বেশ ভক্তিভরে ভোগের খিচুড়ী আর নারকেল নাড়ু খাবো। 

কে জানে, সেই বুড়ীই ফিরে এসেছে কিনা। কিচ্ছু বলা যায় না।