রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

পিছনে ফিরে তাকানো - নিলাঞ্জন গুহমজুমদার

ঠিক কোন বয়েস-এ পৌঁছে মানুষ পিছনে ফিরে তাকায়? বার্ধক্যে? না, আমার মনে হয় না। আমরা পিছন ফিরে তাকাই, জখন আমাদের সামনের চলার পথটা খুব কঠিন হয়ে আসে, অথবা আমরা কিছু হারাই, অথবা দুটোই।
...
...
সেই ইঁটপাতা গলিতে খেলা, স্নিগ্ধ বিকেল গুলোতে, আর সন্ধ্যে হলেই মা-ঠাম্মার বাড়ি ফেরার ডাক। রবিবার গুলো অন্যরকম – বাবার বাড়ি থাকা, দুপুরে খাসির মাংসের ঝোল দিয়ে অনেকটা বেশি ভাত খেয়ে ফেলা, আর তারপর একটা লম্বা ঘুম। সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ করে কারুর বাড়িতে আসা, গল্প, আড্ডা – জমজমাট সন্ধ্যে।

তারপর কৈশোর – সেই বড় হবার আনুভুতি, বাঁধন ছেঁড়ার ইচ্ছে, কিছু অন্যরকম করার উত্তেজনা। আর রোমান্টিকতা। সবকিছুতেই ভালো লাগার অনুভুতি, সেই নীল আকাশ, দুরদুরান্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, শালিক-র কিচির মিচির, বয়ে যাওয়া হাওয়া, তিরতির করে কাঁপা পুকুরের জল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত চলা বন্ধুদের আড্ডা, খোলা আকাশের নিচে। দলবেঁধে পড়তে যাওয়া স্যারেদের কাছে, পড়া, বাড়ি্র লোক-কে লুকিয়ে পড়া-ফেরত আড্ডা, নোটবই দেওয়া-নেওয়া, সেই সুযোগে হাত-র কিছু স্পর্শ, আড়চোখে তাকানো, অল্প লাজুক হাসি, চোখের ভাষায় কথা।

সময় এগিয়ে যায়। যৌবন আসে। দায়িত্ব শব্দটা মাঝে মাঝেই কানে এসে পৌঁছয়, নিজের অজান্তেই বড় হতে থাকি। কৈশোর-র কিছু ভালবাসা পূর্নতা পেতে থাকে, কিছু রয়ে যায় শুধু স্মৃতিতে।কলেজ, অন্য শহর – পৃথিবী-টা বড় হতে থাকে। নতুন মানুষ, নতুন জীবনের স্বাদ, কিছু পুরনো স্বপ্ন, কিছু নতুন। সময় এগিয়ে যায় হু হু করে।

হঠাৎ একদিন, খবর আসে, রোগ আর জ্বরার আমোঘ থাবার গ্রাস করার খবর, হয়েতো বা কোনো প্রিয়জন। বুঝতে পারি, পৃথিবী-টা শুধুই এগোনোর নয় – সেই প্রথম পিছন ফিরে তাকানো। কর্কট রোগ বাসা বাঁধে প্রিয়জন-র শরীরে – জীবনের লড়াই আর তার ক্ষতগুলো সামনে আসতে থাকে।

সংসার বড় হতে থাকে, আর্থিক স্বচ্ছলতাও বাড়তে থাকে। কিন্তু বড় হওয়া জীবন, বড় হওয়া সংসার, কেমন যেন মাঝে মাঝে দুলতে থাকে, ভাঙতে থাকে। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না, এগিয়ে যায়। শুধু দিনগুলো কেন যেন আরো দীর্ঘ হতে থাকে, রাতগুলো আরো নিঃশব্দ হতে থাকে।

আর একদিন, হঠাৎই, আকাশে একটা নতুন তারা জুড়ে যায়। আর হাত-টা যখন ঘুমের মধ্যে সেই চেনা আঁচল-টা খোঁজে, ঘুমটা ভেঙ্গে যায় এক ঝটকায়, জামাটা ভিজে যায় ঘামে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, খুঁজি সেই তারা-টাকে, হয়েতো খুঁজে পাই, জানি না, কিন্তু তার আলো আর ঊষ্ণতা আমাকে স্পর্শ করে না আর। বড় ঠান্ডা লাগে – অন্ধকারে।
আরো তারা জন্ম নেয় আকাশে, অন্ধকার আর ঠান্ডাও বাড়তে থাকে, ঘিরে ধরে চারিদিক থেকে।

এরপর, অনেক অনেক দিন পরে, হঠাৎ একদিন আবার সুর্য ওঠে চারিদিক আলো করে, মেঘ সরে যায়। ফিরে আসে ঊষ্ণতা, ফিরে আসে এগিয়ে চলার তাগিদ। পৃথিবী-টা আবার সেজে ওঠে, দিনগুলো আবার আলোকিত হয়, রাতগুলো হয় বর্নময়। জীবনের লড়াই-টা কেমন যেন সহজ হয়ে যায়। তরতর করে এগিয়ে যায় জীবন, সব ক্ষত কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
সূর্য অস্ত যায়, আবার ওঠে। ঘুম আসে, ঘুম ভাঙ্গে।
একদিন – সূর্য অস্ত গেল।
...
...
খুব মেঘ করেছে। সূর্য-টা আর দেখা যাচ্ছে না।
ফিরে আসছে ঠান্ডা, ঘিরে আসছে অন্ধকার।
সামনের পথ-টা খুব অন্ধকার। কি আছে ওখানে? দুর্বার পাহাড়? অতল খাদ? নির্মম জলহীন মরুভূমি? ঘন কালো অসীম জল?

জানিনা। হারিয়ে গেছে আলো, হারিয়ে গেছে ঊষ্ণতা।
তাই, আজ আবার পিছন ফিরে তাকালাম।