মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

দু-আনার ইচ্ছেপূরণ - গোধুলি শর্মা মিত্র

সকাল থেকেই পূজোর দালানের পাশের ফাঁকা জায়গাটায় বেশ একটা অন্য অন্য ভাব
গুটিকতক বাঁশের খুঁটি এদিক-ওদিক জোড়া লেগে মঞ্চ বেঁধেছে কোনোমতে
কাঠের পাটাতনের ওপর ছেঁড়া ছেঁড়া শতরঞ্চি কেমন যেন ঠাট্টার সুরে গা এলিয়ে দিয়েছে
প্যান্ডেল বাঁধার সাদা-নীল কাপড়ের টুকরোগুলোও নিজেদের রঙ হারিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা
আজ নাকি ওদের উৎসব , চারপাশের রাশভারী ব্যানারের আড়ালে ওই টিমটিমে মোমবাতি আর কি

দুপুর তিনটে হবে, রোদ্দুরটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে মাথার ওপর
তাতে কিছু ক্ষতি নেই, চালচুলোহীন স্বপ্নদের এতো খুঁতখুঁতে হওয়া সাজে না।
শুরু হল দু-আনার ইচ্ছেপূরণ
প্রথমেই হিজিবিজি আঁকি-বুকি খেলা
বাহারী রঙ-পেন্সিল বাক্স নেই, দামী দামী আর্ট পেপারও নেই
শুধু মাসকাবারির হিসেব থেকে কিছুটা সাশ্রয় চুরি করে
এইসব খসখসে আঙুলগুলো এঁকে যায় নরম রূপকথা    
যেমন করে আস্তাকুঁড়ে স্বপ্ন বাঁধে সাত-মহলে
যেখানে পূজা মুর্মুর আকাশটা নীলচে বেগুনী হয়ে মিলিয়ে যায় দিগন্তে
টুলু বাগের বাড়িটা আবার জলের একদম নীচে ভিজতে থাকে
ময়লা ক্যানভাস, সস্তার তুলি-কালি বুনে যায় জলছবি

এরপর শব্দবাজির আসর
যেখানে কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি সোজা পৌঁছে যায় বোম্বাগড়ের রাজার কাছে
ছোট্ট খুকি ছুটি খুঁজে বেড়ায় ভর-দুপুরে
শেখানো বুলি নেই, ভয়েস মডিউলেশনের ক্লাস নেই ,
তবু রাতের পর রাত বেসামাল বাবার বেহিসেবী অক্ষরগুলোকে বালিশে পিষে দেওয়া
বছর আটেকের লক্ষ্মী কয়াল যখন “মাগো আমায় ছুটি দিতে বল, সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা...” বলতে বলতে
ভুলে যায় তারপরের লাইনগুলো , ঢোঁক গিলে থতমত খায়,
রোজ রোজ মার খেয়ে একটু একটু করে মরে যাওয়া মায়ের চোখের কোণে চিকচিক করে বেঁচে থাকার সম্মান
দয়াবতী দাসী , শরীর জুড়ে কুঁচকে যাওয়া বয়সের ভার নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় যখন বলে ওঠে
“তিমির রাত্রি মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান, যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান
 ফেনাইয়া ওঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে দিতে হবে অধিকার ”
ছানি পড়া ঝাপসা কাঁচে ভেসে ওঠে জীবনের সাত সাতটা দশক, কাঠের জালে পুড়তে থাকা অভাব-অনটন
খ্যানখ্যানে মাইকে গমগম করতে থাকে জীবন-শৈলী

শেষপাতে পুরোটাই সুর তাল ছন্দ
আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, বুকের ভেতর ঝিম-ধরানো শব্দের আঘাত নেই
শুধু কিছু গল্প খেলা করে বেড়ায়
সেই কবে থেকে তোবড়ানো কৌটোয় সিকি-আধুলি স্বপ্ন জমাচ্ছে শিউলি
লাল চুড়ি দু-চারটে, সোনালি জরির রাংতা একফালি, কাচ বসানো টিপের পাতায় ঝলমলিয়ে উঠবে বলে
ডানপিটে দস্যি টুম্পাও লক্ষ্মীমন্ত হয়ে ঘর গোছাচ্ছে নিয়ম করে
মায়ের সবচেয়ে দামী জংলী শাড়ীটায় তার ইচ্ছেগুলো বাঁধবে বলে
সস্তার মুঠোফোনে বাজতে থাকা গানটার কথা সুর সবই অস্পষ্ট
তবু শিউলি টুম্পার পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকে জীবন...

উৎসব তো লেগেই থাকে, লেগেই আছে,
বড় বড় হোর্ডিং এ, পোশাকি পেশাদারিতায়, আকাশ-ভরা তারাদের নিয়ে...
চোখ ঝিলমিলিয়ে যায়, কেমন একটা ঘোর লেগে যায়
অন্যদিকে পূজোর দালানের পাশের ফাঁকা জায়গাটায়
অগোছালো লাল-সবুজ চেয়ারগুলো, বাসি নিমকি আর ২টাকার রঙ করা মিষ্টি দিয়ে সাজানো প্যাকেটগুলো
হাত ধরাধরি করে ভাগ করে নেয় সুখ অ-সুখের হিসেব
“অমুক সাংস্কৃতিক বর্ষপূর্তি ”, “তমুক মিলন মেলা” র ভিড়ে সাজিয়ে তোলে পরব
রোদে-বৃষ্টিতে আলো-আঁধারিতে ঝিকমিক করা মন-পরশের পরব